ঢাকা, সোমবার 23 October 2017, ৮ কার্তিক ১৪২8, ২ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বয়স মানসিক সমস্যা ও স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণে সাজা কমেছে

স্টাফ রিপোর্টার : পুলিশ পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান হত্যা মামলায় তাদেরই মেয়ে ঐশী রহমানকে মৃত্যুদন্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারান্ড দেয়ার হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে। গতকাল রোববার সকালে ৭৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ এ রায়ে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের স্বাক্ষরের পর তা সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত ঐশী রহমানের মৃত্যুদন্ডের সাজা কমানোর পাঁচটি কারণ হিসেবে বলেছেন, ১.দোষী সাব্যস্ত হওয়া আসামী কোনো রকম প্রত্যক্ষ অভিপ্রায় ছাড়াই জোড়া হত্যাকান্ড সংঘটিত করেছেন। তখন সে মানসিক বিচ্যুতি বা মানসিক সমস্যায় ভুগছিল। একইসঙ্গে ওভারিয়ান সিস্ট ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিল। ২.তার দাদী এবং মামার মানসিক রোগের ইতিহাস রয়েছে। ৩.ঘটনার সময়ে তার বয়স ছিল ১৯ বছর। ৪. এরআগে তার এ ধরণের ফৌজদারী অপরাধের ইতিহাস নেই। ৫. ঘটনার দুদিন পর সে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পন করেছিল।

এর আগে গত ৫ জুন হাইকোর্টের একই বেঞ্চ বাবা-মাকে জোড়া খুনের অপরাধে বিচারিক আদালতের দেয়া মৃত্যুদন্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায় দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে বিচারিক আদালতের দেয়া জরিমানা ২০ হাজার টাকা কমিয়ে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো ছয় মাসের সাজার রায় দেয়া হয়। এছাড়া মিজানুর রহমান রনির দুই বছরের সাজার রায় হাইকোর্টের রায়ে বহাল থাকে।

গত ৭ মে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে আদালত রায়ের জন্য বিষয়টি অপেক্ষমান রাখেন। ৫ জুন এই বিষয়টি রায় প্রদানের জন্য হাইকোর্টের সম্পূরক কার্যতালিকায় আসে।

গত ১২ মার্চ ঐশীর আপিল ও ডেথ রেফারেন্স এর শুনানি শুরু হয়। চলতি বছরের ১০ এপ্রিল ঐশী রহমানের মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে হাইকোর্টে হাজির করা হয়। ওই দিন আদালতে হাজির করার পর খাস কামরায় নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ওই দিন আদালত বলেন,একটি মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, চিকিৎসা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঐশী রহমান হত্যার সময় মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত ছিলেন এবং বংশগতভাবে তারা মানসিক রোগী। তার দাদি, চাচারা মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত। সেই চিকিৎসা প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাই ও পর্যবেক্ষণ করতে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে তাকে আবার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। গত বছরের ৬ ডিসেম্বর ২৫টি যুক্তি দেখিয়ে ঐশী রহমান হাইকোর্টে আপিল দায়ের করে।

২০১৫ সালের ১২ নবেম্বর ঢাকার ৩ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সাঈদ আহমেদ রায়ে ঐশীকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করেন। রায়ের এক সপ্তাহ পর বিচারিক আদালত থেকে রায়ের কপি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছে। পরে ৭ ডিসেম্বর মৃত্যুদন্ডের রায়ের বিরুদ্ধে ঐশী রহমানের করা আপিল গ্রহণ করে বিচারিক আদালতের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেন হাইকোর্ট।

বিচারিক আদালতের রায়ে ঐশীর মৃত্যদন্ডের পাশাপাশি তাকে আশ্রয় দেয়ায় তার বন্ধু মিজানুর রহমান রনিকে দুই বছর সশ্রম কারাদন্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আর হত্যাকান্ডে সহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বেকসুর খালাস পায় ঐশীর আরেক বন্ধু আসাদুজ্জামান জনি। এ মামলায় ঐশীদের বাসার শিশু গৃহকর্মী খাদিজা আক্তার সুমি অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার বিচার চলছে শিশু আদালতে।

২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। স্ত্রী, দুই সন্তান ও শিশু গৃহকর্মীকে নিয়ে মালিবাগের চামেলীবাগের এক ফ্ল্যাটে থাকতেন পুলিশের বিশেষ শাখার (রাজনৈতিক) পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, আগের রাতে কোনো এক সময়ে কফির সঙ্গে ঘুমের বড়ি খাইয়ে বাবা-মাকে কুপিয়ে হত্যা করেন ঐশী। পরদিন সকালে সাত বছর বয়সি ছোট ভাইকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় ঐশী। পরে ভাইকে এক প্রতিবেশীর বাসায় পাঠিয়ে একদিন পর গৃহকর্মী সুমিকে নিয়ে রমনা থানায় আত্মসমর্পণ করেন এই কিশোরী। পরে তার বক্তব্যের সূত্র ধরেই রনি ও জনিকে গ্রেফতার করা হয়।

২০১৪ সালের ৯ মার্চ গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. আবুল খায়ের মাতুব্বর আদালতে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। তাতে বলা হয়, বাবা-মাকে ঐশীই হত্যা করে; আর অন্যরা তাকে সহযোগিতা করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ