ঢাকা, সোমবার 23 October 2017, ৮ কার্তিক ১৪২8, ২ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাত্র ৯ মিমি. বৃষ্টিতেই ডুবছে রাজধানী সকল প্রতিশ্রুতি ও প্রকল্পই নিষ্ফল

সাদেকুর রহমান : এবছর বৃষ্টিধারায় চার দফা ডুবলো রাজধানী ঢাকা। সর্বশেষ ডুবলো নিম্নচাপজনিত বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত টানা বর্ষণে। গতকাল রোববার নি¤œচাপটি লঘুচাপে পরিণত হওয়ায় আবহাওয়া ভালো হলেও নগরবাসীর সাম্প্রতিক সময়ের দুঃখ পানিজট অনেক স্থানেই দেখা গেছে। জমে থাকা ময়লা-কর্দমাক্ত পানি পার হতে নাগরিকদের ব্যয় করতে হয়েছে নগদ অর্থ। আর সাথে দুর্ভোগ-বিড়ম্বনা তো ছিলই। এ সময়েই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন এদিন হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে ফের প্রতিশ্রুতি দিলেন, আগামী বর্ষা মওসুমের আগেই পানিবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এ লক্ষ্যে ঢাকা শহরের ৪৭টি খাল পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে মন্ত্রী পানিবদ্ধতা নিরসনে সিটি কর্পোরেশন ও ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা বিষয় স্বীকার করে বলেন, ঢাকা শহরের সমস্যাগুলো এক দিনের নয়, এইগুলো দীর্ঘদিনে সৃষ্টি হয়েছে। সমাধানেও একটু সময় লাগছে, তা নিরসন করা সম্ভব। তবে তারা আন্তরিকতার সাথে কাজ করছেন বলে তিনি দাবি করেন।

একই অনুষ্ঠান শেষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি মেয়র সাঈদ খোকন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ঢাকায় দুই দিনে ২৩০ মিলি মিটার বৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। তবে দ্রুত পানিবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বিরাজমান সমন্বয়হীনতার বিষয়ে সাঈদ খোকন বলেন, ঢাকা শহরের পানিবদ্ধতা নিরেসনে ৬টি সংস্থা কাজ করে। তবে অতিবর্ষণজনিত পানিবদ্ধতা নিরসনের মূল দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ কিছু ড্রেনেজের কাজ করে থাকে। তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশন ওয়াসার সঙ্গে সমন্বয় করে পানিবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে কাজ করে যাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, আর কতকাল রাজধানীবাসী কেবল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কথার ফুলঝুড়িতে তুষ্ট থাকবেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও মেয়র তো এর আগেও এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বৃষ্টি হলেই পানিজটের খড়গ দুর্ভোগে ফেলছে নগরবাসীকে। পানি থৈ থৈ করে রাজপথে। ভেসে যায় বিভিন্ন এলাকার অলি-গলি। গতকাল মন্ত্রী যখন রাজধানীর পাঁচতারা হোটেলে পানিবদ্ধতা নিরসনের ঘোষণা দিচ্ছেন, তখনও মগবাজার ওয়্যারলেস-মধুবাগ সড়কের টিএন্ডটি কলোনী এলাকায় অগণিত রিকশাকে সামান্য পার করেই যাত্রী প্রতি ১০ টাকা করে আদায় করে নিতে দেখা গেছে। 

নিম্নচাপের প্রভাবে টানা দু’দিনের অবিরাম মাঝারি থেকে অতি ভারী বৃষ্টির ফলে ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় পানি জমে পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিলো। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও কার্যালয়ের সামনের রাস্তায়ও পানি জমে ছিল দীর্ঘক্ষণ। এছাড়া পুরান ঢাকা, ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়ক, মতিঝিল, আরামবাগ, যাত্রবাড়ি, মিরপুর, বাড্ডা ও রামপুরাসহ প্রায় সব এলাকাতেই কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরপানি দেখা গেছে। শুক্র ও শনিবারের বৃষ্টিতে কয়েকটি এলাকার রাস্তায় ফায়ার সার্ভিসের লাইফ বোট ছাড়াও নৌাকা এমনকি ভেলা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। ঢাকার ক্রমবর্ধমান পানিবদ্ধতা সমস্যা থেকে মুক্তির কোনো পথ দেখছেন না নাগরিকরা। 

পানিবদ্ধতার কারণ : বৃষ্টি আগেও ছিল, কিন্তু তখন এতটা পানিবদ্ধতা সৃষ্টি হতো না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ূজনিত কারণে ঢাকায় বৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে গেছে। অথচ সেই পানি সরার আনুপাতিক ব্যবস্থা নেই। খাল-নদীসহ প্রাকৃতিক আধার নষ্ট ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার সাথে অপরিকল্পিত ও আনাড়ি উন্নয়ন প্রকল্পের ইট-কংক্রিট বৃষ্টি পানি প্রবাহের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্লানিং বিভাগ অধ্যাপক ড. সারওয়ার জাহান বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে অপরিকল্পিত উন্নয়ন হচ্ছে। একই সাথে প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সিস্টেম অর্থাৎ খাল বিল পুকুর যা ছিলো তা ভরাট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, পানি তো যেতে হবে কিন্তু সে সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রাকৃতিক সিস্টেম যেহেতু ধ্বংস হয়ে গেছে তাই কৃত্রিম সুযোগ তৈরি করতে হবে পানি যাওয়ার।

সবগুলো সংস্থা কি একযোগে কাজ করছে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালোভাবে করার জন্য ? এমন প্রশ্নের জবাবে ড. জাহান বলেন ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড একসাথে কাজ করতে হবে পানি নষ্কাশনের জন্য কিন্তু তাদের মধ্যে কোন সমন্বয় নেই। তার মতে, পুরো শহর ভেঙ্গে নতুন কিছু করা যাবেনা তাই ড্রেনেজ সিস্টেম যাতে কাজ করে তা দেখার পাশাপাশি নতুন ড্রেনেজ সিস্টেম মাটির উপরে ও নীচে বাড়িয়ে সেটির ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

বুয়েটের আরেক শিক্ষক ও নগর গবেষক ড. দেলোওয়ার হোসাইন বলেন, রাজধানীর ধোলাইখাল থেকে শুরু করে পরিবাগের খালসহ অনেক খালই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বৃষ্টির পানি যাওয়ার পথ তো নেই। ফকিরাপুলে একটি কালভার্ড ড্রেন করা হয়েছিলো, পরবর্তীতে তা ভর্তি করে ফেলা হয়। তিনি বলেন, আগে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলো ওয়াসা ও পাবলিক হেল্থ। এখন ৩৫ শতাংশের মতো সিটি কর্পোরেশন দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে সিটি কর্পোরেশনের আরো বেশি কাজ করা উচিত ছিলো। তারা যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে আগামী দুই এক বছরের মধ্যে শেষ করতে পারলে ঢাকায় পানিবদ্ধতা খানিকটা দূর হবে।

পানিবদ্ধতা নিরসনে মাস্টার প্ল্যান করে সিটি কর্পোরেশনকে এগিয়ে আসার পরামর্শ দিয়ে এই নগর গবেষক বলেন, ঢাকা শহরের চারদিকে নদীর নাব্যতা কমে যাচ্ছে অন্যদিকে ড্রেন বা ট্যানেলগুলো পুনরুদ্ধার করতে না পারলে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সহজেই বোঝা যায়, এতো বৃষ্টির পানি যাবে কোথায়। ঢাকা শহরের উপরিভাগে ক্লে-লেয়ার থাকায় এই পানি নিচের দিকে যেতে পারে না। ফলে বেশির ভাগ পানি ওভারফ্লো হচ্ছে। 

জানা যায়, ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজধানীর মাত্র ৩০ শতাংশ এলাকায় স্যুয়ারেজ লাইন স্থাপন করা হয়েছে। এ সব লাইনের বেশিরভাগই এখন অকেজো। ফলে বৃষ্টি হলেই খোলা ড্রেন দিয়ে মলমূত্র নিষ্কাশন হচ্ছে। রাস্তা সয়লাব হচ্ছে। বাসা-বাড়িতেও ঢুকে পড়ছে এ সব পানি। অনেক সময় ওয়াসার পানির লাইনেও ময়লা পাওয়া যাচ্ছে।

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, রাজধানীর স্যুয়ারেজ লাইনগুলোর ৩০ ভাগ কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। তবে ঢাকাকে শতভাগ পয়ঃনিষ্কাশনের আওতায় আনতে ওয়াসা কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ঢাকায় পানি ধরে রাখার জায়গা নেই। মুক্ত পানির আধার থাকার কথা ছিল ১২ শতাংশ, কিন্তু আছে মাত্র ২ শতাংশ। বৃষ্টির পানিও মাটির নিচে যেতে পারে না। প্রাকৃতিক উপায়ে পানি নিষ্কাশনের সব পথ বন্ধ। এখন কৃত্রিম ব্যবস্থায় নিষ্কাশন হচ্ছে। এছাড়া বর্তমানে ঢাকায় ১৫ কিলোমিটার বক্স কালভার্ট আছে। দক্ষিণ সিটিতে ৮ কিলোমিটার ও উত্তরে ৭ কিলোমিটার। পানিবদ্ধতা নিরসনে এগুলো উন্মুক্ত করে দেয়া ভালো। তবে এই মুহূর্তে সম্ভব নয়।

নগরীর পানিবদ্ধতার জন্য দায়ী করে অস্তিত্বহীন একটিসহ চারটি খালে ৩২৪টি অবৈধ স্থাপনা তালিকা প্রস্তুত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অবৈধভাবে দখল হওয়া খালগুলো উদ্ধারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনসহ (ডিএসসিসি)সংশি¬ষ্টপ্রতিষ্ঠানগুলো অভিযানেও নামে। রাজধানীর খালগুলোর অন্যতম নন্দীপাড়া-ত্রিমোহনী, দক্ষিণগাঁও-ত্রিমোহনী, ডিএনডিবাধ বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ঘোপদক্ষিণ খাল। খালগুলোর বিভিন্ন স্থান অবৈধভাবে দখল হয়ে আছে। আর এ খালে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনাগুলোর তালিকা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তালিকানুযায়ী, নন্দীপাড়ার দুই খাল ওয়াসার, ডিএনডির খাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের এবং অপরটি ডিএসসিসির। এই খালগুলোর বিভিন্ন স্থান দখল হয়ে আছে। কেরানীগঞ্জ, ধানমন্ডি ও রমনা সার্কেলের (রাজস্ব) তথ্যানুযায়ী প্রস্তুতকৃত তালিকায় নন্দীপাড়ার খালে ১৫৪টি, শুভাট্যা খালে ৫২, কামরাঙ্গীচর খালে ১০, কালুনগর খালে ৩১, রামচন্দ্রপুর ও সুলতানগঞ্জে ৪৮টি অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ঘোপদক্ষিণ খালটি এখন অস্তিত্বহীন। নন্দীপাড়ার খালে ৩৫টি ব্রিজ ও সাকো রয়েছে। তবে আবর্জনায় পূর্ণ এসব খালে পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।

তথ্য মতে, ঢাকা মহানগরীতে মোট ৪৩টি খাল রয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি খালের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। এ ছাড়া মহানগরীর সকল খালের মালিকানায় রয়েছে ঢাকা জেলা প্রশাসন। ডিএনসিসি এলাকায় ২৩টি খাল রয়েছে, যার সবগুলো খাল দখলে চলে গেছে। ওই সকল খাল দিয়ে নদী পর্যন্ত পানি পৌঁছাতে পারছে না। এ কারণে রাজধানীতে অল্প বৃষ্টিতে দেখা দিচ্ছে পানিবদ্ধতা।

ঢাকা শহরের ৭৩% উন্নয়নই অপরিকল্পিত : অপরিকল্পিত অবকাঠামোর বোঝা কাঁধে নিয়ে যানজট আর পানিবদ্ধতার শহরে পরিণত হয়েছে রাজধানী ঢাকা। ভূমি ব্যবহারের যথাযথ নীতিমালা না মেনে গড়ে উঠেছে বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন। নগরীতে বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে ওঠা অবকাঠামোর ৭৩ শতাংশই পুরোপুরি অপরিকল্পিত। ঢাকা শহরের উন্নয়ন কর্মকান্ডের ওপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। এ গবেষণায় দেখানো হয়, জলাশয় ও নিম্নাঞ্চল ভরাট করে গড়ে ওঠা অপরিণামদর্শী উন্নয়নের ফলে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে রাজধানীর পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা। গবেষক দলের প্রতিনিধি বুয়েটের সহকারী অধ্যাপক এসএম সোহেল মাহমুদ এ প্রসঙ্গে জানান, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠায় ঢাকা শহরে নিত্যদিনের ভোগান্তি বাড়ছে। প্রধান সড়ককে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে ওঠায় যানজটের প্রকোপ বেড়েছে। পানিবদ্ধতার কারণও অপরিকল্পিত উন্নয়ন।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের উন্নয়নে কার্যকর কোনো নীতিমালা না থাকায় যেখানে সেখানে গড়ে ওঠা এ অবকাঠামোর ফলে ভূমির যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। ১৯৫৯ সালে মাস্টারপ্ল্যানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে এ শহর। নিয়ন্ত্রণে শৈথিল্যের কারণে এ শহরের অবকাঠামো উন্নয়নে সে প্ল্যানও অনুসরণ করা হয়নি। ওই সময়ের তুলনায় এখন জনসংখ্যা বেড়েছে ৩০ গুণ। সে অনুযায়ী মাস্টারপ্ল্যান আধুনিকায়ন করা হয়নি, যার প্রভাব পড়েছে অন্যান্য উন্নয়নে।

গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নীতিমালা মেনে অবকাঠামো গড়ে তোলার মতো উঁচু জমি নেই রাজধানীতে। এখানকার মাত্র ২৫ শতাংশ ভূমি স্থাপনা নির্মাণের উপযুক্ত। বাকি অংশ নিম্নাঞ্চল বা বন্যাপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এ ঝুঁকির মধ্যেই অবকাঠামো নির্মাণ করায় প্রতি বছর প্রতিস্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ৭০০-৮০০ কোটি টাকা খরচ হয়। এছাড়া পানিবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে ১৩৩টির বেশি পাম্প রয়েছে। এসব পাম্প রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য উদ্বেগের। 

দু’হাজার কোটি টাকা পানিতেই : হালকা বৃষ্টি হলেই নগরীর বিভিন্ন এলাকা একেকটি ‘নদীতে’ রূপ নেয়। নাগরিক দুর্ভোগের খবরা-খবর ফলাও করে শিরোনাম হয়। অথচ পানিজট নিরসনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও ওয়াসা গত আট বছরে ড্রেন সংস্কার ও উন্নয়নে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। এ ছাড়া নগরীর পাশে চারটি নদী সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু এ প্রকল্পে কোনো গতি দেখা যাচ্ছে না। 

নগরবাসীর অভিযোগ, সেবা সংস্থাগুলো শুধু কোটি কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এতে জনগণের কোনো উপকার হয় না। তাহলে পানিবদ্ধতা দূর করার নামে রাষ্ট্রের যে অর্থ খরচ করা হচ্ছে, তা কি পানিতে যাচ্ছে। মাত্র ৭ থেকে ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই বন্যাকবলিত এলাকার মতো পানিবন্দি হয়ে পড়ে লাখ লাখ মানুষ। 

জানা যায়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত ১২৭ দশমিক ৬৩ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম সরাসরি পরিচালনা করছে ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনের ড্রেনেজ লাইন রয়েছে দুই হাজার কিলোমিটার। আর ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ লাইন ৩৭০ কিলোমিটার।

এদিকে রাজধানীর পানিজট নিরসনে বিগত আট বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে বিভিন্ন সেবা সংস্থা। বর্ষা মওসুমে সৃষ্ট পানিবদ্ধতা কিভাবে নিরসন করা যায়, সে ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোকে নিয়ে দফায় দফায় সভা করেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি এবং হচ্ছেও না।

ঢাকা ওয়াসা ও সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে ঢাকা ওয়াসা পানি নিষ্কাশন কাজে ব্যয় করেছে ৬১৮ কোটি টাকা। এই টাকা দিয়ে ৩৭০ কিলোমিটার গভীর ড্রেনলাইন, ৮০ কিলোমিটার খাল ও ১৫ কিলোমিটার বক্স কালভার্টের উন্নয়ন ও সংস্কারকাজ করেছে সংস্থাটি। আর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার (গভীর-অগভীর) ড্রেনলাইন সংস্কার ও উন্নয়নে ১ হাজার ২৭০ কোটি টাকা খরচ করেছে। অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড বিগত আট বছরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানি নিষ্কাশন লাইন মেরামত ও উন্নয়নে ব্যয় করেছে ১০৮ কোটি টাকা।

আবার গত বছরে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগ নদী সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। তারা প্রধানমন্ত্রীর দফতরে এ প্রস্তাব পাঠিয়েছিল; যাতে নৌবাহিনীকে দিয়ে এ চার নদ-নদীকে খনন ও সংস্কার করে এগুলোর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়। এ চার নদ-নদী সংস্কারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই কমিটি এখনো এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আমলাতন্ত্রের গ্যাঁড়াকলে পড়ে সভা আর কর্মপরিকল্পনার মধ্যেই সেই উদ্যোগ থমকে আছে।

অন্যদিকে ঢাকা জেলা প্রশাসনের মালিকানাধীন খালগুলো অবৈধ দখল উচ্ছেদ না করেই নতুন খাল খনন শুরু করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। চলতি বছরের জুলাইয়ে কুড়িল বিশ্বরোড থেকে পূর্বাচল ৩০০ ফুট সড়কের দুই পাশে ১০০ ফুট চওড়া খাল খনন কাজের উদ্বোধন করেন রাজউক চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ২৮৬ দশমিক ৯১ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে সরকারের এ উদ্যোগ নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান ও পুরনো খালগুলো সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেয়া ছিল সবচেয়ে জরুরি। পরিকল্পনা কমিশনও উক্ত প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ