ঢাকা, সোমবার 23 October 2017, ৮ কার্তিক ১৪২8, ২ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চাহিদা আর উৎপাদনে তথ্যগত গড়মিলে বাজার লাগামহীন

এইচ এম আকতার: দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চালের চাহিদাও বাড়ছে। চালের বাড়তি চাহিদা পূরণে ধানের ফলন প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। চাহিদার সাথে পাল্লা দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি না হওয়ার কারণেই চালের সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। মূলত পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচে নিত্যপণ্যের বাজার। চাহিদা আর উৎপাদনে তথ্যগত গড়মিলে বাজার ব্যব¯া’ লাগামহীন হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে গত এক দশকে দেশে ধানের উৎপাদন বাড়েনি, উল্টো কমেছে ১ দশমিক ৭ শতাংশ। যা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ইফপ্রি) গবেষণায় উঠে এসেছে। 

জানা গেছে, বাংলাদেশে পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচের কারণেই চালের সঠিক চাহিদা নির্ধারণ করতে পারছে না। যে কারণে কি পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে আর কি পরিমাণ খাদ্যের সংকট রয়েছে তা বলা কঠিন হচ্ছে। আর এ কারণেই চাহিদার অতিরিক্ত চাল আমদানি করেও বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

ব্যবসায়ীরা এই বার বার সরকারকেই দায়ী করে বলেন, সরকার বলতেই পারেনি কি পরিমাণ চালের সংকট রয়েছে। কি পরিমাণ চাল আমদানি করতে হবে। শুধু তাই নয় কত লোক মোটা চাল খায় আর কি পরিমাণ লোক সরু চাল খায় তাও বলতে পারেনি খাদ্য মন্ত্রণালয়। তাহলে কিভাবে চাল আমদানি করবে ব্যবসায়ীরা। পরিসংখ্যানের নামে শুভাঙ্করের ফাঁকির কারণেই মন্ত্রণালয় সঠিক তথ্য দিতে পারছে না। আর এ কারণেই দেশে চালের সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে একটি সঠিক পরিসংখ্যান করা না গেলে এ সংকট কোন দিনই কাটবে না। একই অবস্থা দেখা যাচ্ছে ডাল, চিনি, তেল, ছোলাসহ নিত্যপণ্যের চাহিদার ক্ষেত্রে। চাহিদার অতিরিক্ত উৎপাদন হলে সংকট বুঝা যায় না। কিন্তু উৎপাদন কম হলে চাহিদা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। তারপরেও সঠিক কোন জবাব নেই।

সারা দেশে চালের গুদামে অভিযান উপলক্ষে মিলারদের সাথে মন্ত্রণালয়ে বৈঠকে বসেন সরকারের তিন মন্ত্রী। সেখানে ব্যবসায়ীদের সাথে তিন মন্ত্রীর কথা কাটাকাটি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলেন,কি পরিমাণ চালের সংকট রয়েছে তা সরকার আমাদের জানায়নি। তাহলে আমরা কিভাবে চাল আমদানি করবো।

তারা যুক্তি দেখিয়ে বলেন, আমরা চাহিদার অতিরিক্ত চাল আমদানি করেছি। তাহলে কেন চালের দাম বাড়বে। বাজারে কেন সরবরাহ সংকট থাকবে। তাহলে সরকারের দেয়া চাহিদা এবং উৎপাদনে গড় মিল রয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের এমন অভিযোগের কোন সদুত্তর দিতে পারেনি সরকার।

প্রতি বছর রমযান এলেই নিত্যপণ্যের বাজারে দেখা দেয় নানা অস্তিরতা। সরকার পণ্যের দাম কমবে না এমন ঘোষণার আগে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষ বোকা সেজে যায়। সরকার বাজারের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করলেও বাস্তব চিত্র ঠিক তার উল্টো দেখা যায়। কারণ একটাই। সরকার যে চাহিদাপত্র দিয়ে থাকে তার চেয়ে অনেক বেশি চাহিদা রয়েছে বাজারে। ব্যবসায়ীরা তার চেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করেও বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আর এ কারণেই পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। পরিসংখ্যানের এ মারপ্যাঁচে আর কত দিন পিষ্ট হবে সাধারণ জনগণ। এ প্রশ্ন এখন সবার।

প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে প্রতি বছরই কমছে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ। আবাদযোগ্য জমির অধিকাংশই এখনো এক ও দুই ফসলি জমি। আবার দেশের সিংহভাগ জমিতে কৃষিপ্রযুক্তির যথার্থ ব্যবহার হচ্ছে না। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শস্যের উৎপাদনশীলতা, যার প্রভাব ধানের উৎপাদন প্রবৃদ্ধিতেও পড়ছে।

ইফপ্রির তথ্যমতে, ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছর থেকে ২০০৫-০৬ অর্থবছর পর্যন্ত দশকে গড়ে ধানের ফলনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারে। কিন্তু ২০০৬-০৭ থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে শস্যটির ফলন প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ। ধানের ফলন বাড়া কমার প্রভাব পড়েছে চালের মোট উৎপাদনেও। ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছর থেকে পরবর্তী ১০ অর্থবছরে দেশে চালের উৎপাদন ৪ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়লেও ২০০৬-০৭ অর্থবছর থেকে পরবর্তী ১০ বছরে চালের উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে। যদিও এ সময়ে জমি আবাদের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। আগের ১০ বছরে মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ হারে জমির আবাদ বাড়লেও ২০০৬-পরবর্তী দশকে ধানের জমির আবাদ বাড়ে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ হারে।

এ বিষয়ে ইফপ্রির কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. আকতার আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের আবাদযোগ্য জমিতে এখনো প্রযুক্তির যথাযোগ্য ব্যবহার হয়নি। ফলে গত এক দশকে ধান উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি কমে গেছে, যার ফলে সার্বিক কৃষি উৎপাদনেও প্রবৃদ্ধি কমেছে। গ্রামাঞ্চলের এক-তৃতীয়াংশ কৃষকই প্রান্তিক চাষি। তাদের নিজস্ব জমি নেই। বেশির ভাগ কৃষকই স্বল্প শিক্ষিত ও প্রযুক্তি ব্যবহারে অনভিজ্ঞ। তাই কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহারে তাদের পর্যাপ্ত প্রবেশগম্যতা নেই। ধানের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এসব কৃষকের কাছে প্রযুক্তি যেমন পৌঁছাতে হবে, তেমনি তাদের উন্নত জাত ও উপকরণ সহায়তাও দ্রুত দিতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৃষকের কাছে উন্নত ধানের বীজ পৌঁছানো। পাশাপাশি কৃষি উপকরণ ও প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ব্রি) এ পর্যন্ত ৭৯টি ইনব্রিড এবং ছয়টি হাইব্রিড ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। কিন্তু এসব জাতের সবগুলো মাঠে প্রয়োগ হচ্ছে না। দেশের ৫৭ শতাংশ জমিতে আবাদ হচ্ছে ধানের পাঁচটি জাত। এছাড়া ৬৫ শতাংশ কৃষক আবাদের ক্ষেত্রে এ জাতগুলোর ওপর নির্ভরশীল। প্রায় ৭০ শতাংশ জমি ও প্রায় ৭৭ শতাংশ কৃষক বোরোর দুটি জাত ব্রি ধান ২৮ ও ব্রি ধান ২৯-এর ওপর নির্ভরশীল। ফলে ভালো জাত থাকলেও কৃষকের কাছে তা পৌঁছাচ্ছে না।

এ বিষয়ে ব্রি’র সাবেক মহাপরিচালক ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, উদ্ভাবিত জাতের গুণগত মান ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং কৃষকের চাহিদার দিকটি বিবেচনায় নিয়েই নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে। এগুলো মাঠপর্যায়ে সফলভাবে উৎপাদনের পরই কৃষক পর্যায়ে ছাড়া হচ্ছে। কিন্তু বিপণন ও সম্প্রসারণ পর্যায়ে উদ্ভাবিত এসব জাতের গুরুত্ব সঠিকভাবে কৃষকের কাছে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। ফলে গতানুগতিক ভালোবাসা থেকেই কৃষকরা কিছু জাতের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। ফলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যাচ্ছে না।

উন্নত ব্রিডিং ও ব্যবস্থাপনায় জোর না দিলে ফলন বাড়ানো সম্ভব হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, উদ্ভাবিত এ জাতগুলো গবেষণায় আট টন ফলন দিলেও মাঠপর্যায়ে হয়তো পাঁচ-ছয় টন দিচ্ছে। তাই এ ধরনের ফলন পার্থক্য কমানোর জন্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। তা না হলে জমির পরিমাণ কমে যাওয়া, জলবায়ুর পরিবর্তন ও পরিবর্তিত আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে খাদ্যনিরাপত্তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

জানা গেছে, দেড় দশক আগেও দেশে জনপ্রতি শূন্য দশমিক শূন্য ৭ হেক্টর কৃষিজমি থাকলেও বর্তমানে তা শূন্য দশমিক শূন্য ৫ হেক্টরের নিচে নেমে এসেছে। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় নয় লাখ হেক্টর জমি লবণাক্ততা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গড়ে প্রতি বছর খরাজনিত কারণে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। ফলে ধানের ফলন প্রবৃদ্ধি কমছে। ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে ধানের উৎপাদন ১ কোটি ৮৮ লাখ হলেও ২০০৫-০৬ অর্থবছরে তা ২ কোটি ৬৫ লাখে উন্নীত হয়। এই সময়ে ধানের উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ভালো হলেও পরবর্তী ১০ বছরে এ প্রবৃদ্ধি একটু কম। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ২ কোটি ৭৩ লাখ টন ধান উৎপাদন হলেও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বেড়ে ৩ কোটি ৪৭ লাখ ৯ হাজার টনে দাঁড়ায়।

এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, ধানের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বীজ শিল্পের উন্নয়নে কাজ করছে। ধানের জাত উদ্ভাবনে ব্রির কার্যক্রমে গতিশীলতা আনা হচ্ছে। বীজ কৃষকের কাছে পৌঁছাতে বিএডিসি ছাড়াও বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বীজ নীতিমালা প্রণয়ন ও বীজ আইন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে কৃষককে বীজের সুরক্ষা প্রদান ছাড়াও জাত উদ্ভাবনে কার্যকর উদ্যোগের নির্দেশনা রাখা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ