ঢাকা, বুধবার 25 October 2017, ১০ কার্তিক ১৪২8, ৪ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সুষমা স্বরাজের সফর

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ দু’দিনের সফর শেষে গত সোমবার দেশে ফিরে গেছেন। তার এই সফরকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও যথেষ্ট আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ, তিনি এমন এক সময়ে এসেছিলেন বাংলাদেশ যখন মিয়ানমার থেকে গণহত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীর প্রচন্ড চাপে বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। ওদিকে অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা- বিশেষ করে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকাসহ আরো কিছু সমস্যার সমাধানও জরুরি হয়ে উঠেছে। এসবের সঙ্গে ছিল আগামী সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক জল্পনা-কল্পনাও। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের সমর্থন সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই সত্য, কিন্তু দলটির মূলত কংগ্রেসের অনুসারী ও সমর্থনপুষ্ট হিসেবে পরিচিতি থাকায় কোনো কোনো মহলের ধারণা ছিল, সুষমা স্বরাজের মাধ্যমে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর প্রতি নরেন্দ্র মোদির সরকার এবং বিজেপি সম্ভবত নমনীয় মনোভাব দেখাবে। অন্তত নির্বাচন যাতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় এবং নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার গঠনের ব্যাপারে শেখ হাসিনার সরকার যাতে বিরোধী দলের দাবি মেনে নেয়- এসব বিষয়ে সুষমা স্বরাজ ইতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়ে যাবেন।
অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সৌজন্য বৈঠক করলেও এবং সে বৈঠকে বিরোধী দলগুলোর দাবি ও বক্তব্যের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হলেও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাকি ‘শুধু শুনে গেছেন’। আশ্বস্ত করার মতো কিছুই বলেননি। তিনি এমনকি সংবাদ সম্মেলনেও বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে গেছেন। ভারত বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায়, নির্বাচন কোন প্রক্রিয়ায় হবে তা ঠিক করবে এদেশের জনগণ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দায়িত্ব সরকারেরÑ এ ধরনের গৎবাঁধা বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন নিজেকে। শুধু তা-ই নয়, সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ভারতের উদাহরণ টেনে তিনি নাকি বলেছেন, কোনো অনির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সেটা হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ‘বিচ্যুতি’। এরই পাশাপাশি তিনি আরো বলেছেন, নির্বাচন আয়োজন করার দায়িত্ব সরকারের। কথাটার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, সুষমা স্বরাজ আসলে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই নির্বাচন করার পরামর্শ দিয়ে গেছেন। এর মাধ্যমে প্রকারান্তরে তিনি বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর দাবিকেও নাকচ করেছেন বলেই ধরে নেয়া হচ্ছে।
ওদিকে রোহিঙ্গা প্রশ্নেও সুষমা স্বরাজ কোনো আশার কথা শোনাননি। প্রচন্ড দমন-নির্যাতনের মুখে অসহায়ভাবে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের তিনি মুসলিম দূরে থাকুক, এমনকি রোহিঙ্গা বলেও উল্লেখ করেননি। পরিবর্তে তাদের এমনভাবেই ‘বাস্তুচ্যুত’ বলেছেন, যা শুনে মনে হতে পারে যেন বন্যা বা প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগে বসত-বাড়ি হারিয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে! বলা দরকার, নির্বাচনের প্রশ্নে বিরোধী দলগুলোকে নিরাশ করার পাশাপাশি ‘বাস্তুচ্যুত’ বলার মধ্য দিয়ে সুষমা স্বরাজ শেখ হাসিনার সরকারকেও নিরাশ ও ক্ষুব্ধ করেছেন। কারণ, গত আগস্টের শেষ সপ্তাহে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর গণহত্যার ভয়াবহ অভিযান শুরু হওয়ার পরপর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অনেকটা লাফিয়ে গিয়ে মিয়ানমার সরকারের এই জঘন্য কর্মকান্ডের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এসেছিলেন। এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে তো বটেই, খোদ ভারতেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। সেই থেকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নরেন্দ্র মোদির তথা ভারত সরকারের নীতি ও অবস্থান ব্যাপকভাবে নিন্দিত ও সমালোচিত হয়ে এসেছে।
সে কারণে ধারণা করা হয়েছিল, মোদির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সুষমা স্বরাজ সম্ভবত ভুল স্বীকার করবেন এবং বিশ্ব জনমতের প্রতি সম্মান দেখিয়ে রোহিঙ্গা মুসলিমদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্যোগ নেবেন। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ বক্তব্য রাখবেন। অন্যদিকে সুষমা স্বরাজ শুধু এটুকু বলেই থেমে গেছেন যে, রাখাইন রাজ্য থেকে ‘বাস্তুচ্যুত’ ব্যক্তিদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার মধ্যেই রয়েছে সমস্যার সমাধান। তিনি সেই সাথে কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার প্রতিও ভারতের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। অথচ জাতিসংঘের বিরামহীন চাপ সত্ত্বেও এই কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ব্যাপারে মিয়ানমার সরকার এখনো প্রতারণাপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করে চলেছে। অর্থাৎ রোহিঙ্গা মুসলিমদের ব্যাপারে সুষমা স্বরাজ সামান্য আশ্বাসও দেননি, বাংলাদেশের পক্ষেও তিনি কোনো শব্দ উচ্চারণ করেননি। তার মাধ্যমে মিস্টার মোদির বিজেপি সরকার আসলে আরো একবার মিয়ানমারের সরকার ও সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের অভিযানের প্রতিই সমর্থন ঘোষণা করেছে। 
লেনদেনের  আলোচনা ক্ষেত্রে বৈঠকে তিস্তা চুক্তির মতো কোনো বিষয়কে তিনি এমনকি উত্থাপন পর্যন্ত হয়নি। ঢাকায় নিজ দেশের চ্যান্সারি ভবন এবং ভারতের ঋণ ও আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন ১৫টি প্রকল্পের উদ্বোধন করার বাইরে অন্য কোনো কাজেও তাকে অংশ নিতে দেখা যায়নি। তা সত্ত্বেও সুষমা স্বরাজের এই সফর দুটি বিশেষ কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবেÑ
১. তিনিই ভারতের প্রথম একজন মন্ত্রী, যিনি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে হিন্দি ভাষায় বক্তব্য রেখেছেন, যেভাবে ভারতীয় নেতা ও মন্ত্রীরা সাধারণত ভারতের কোনো রাজ্যের রাজধানী বা মহানগরীর অনুষ্ঠানে রেখে থাকেন;
২. আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীকে তিনি ‘এক্সিলেন্সি’ বলার পরিবর্তে ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করেছেন। মাহমুদ আলীও তাকে নাকি ‘দিদি’ ডেকেছেন!
অথচ আন্তর্জাতিক কূটনীতির রীতি, নিয়ম ও আইন হলো, ব্যক্তিগত যতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই থাকুক না কেন, এক দেশের মন্ত্রী অন্য দেশের মন্ত্রী বা প্রতিপক্ষকে ‘এক্সিলেন্সি’ বলবেন। তারা যদি একই দেশের কেন্দ্র ও রাজ্যের মন্ত্রী হন তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা! কারণ, ভারতের বাংলাদেশ সংলগ্ন রাজ্য পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনেকেই ‘দিদি’ শুধু নয়, ‘দিদিমনি’ পর্যন্ত ডেকে দেখেছেন। কিন্তু বহু বছর ধরে ডাকার পরও জবাবে কিছুই পাওয়া যায়নি। তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে মমতাই বরং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ