ঢাকা, বুধবার 25 October 2017, ১০ কার্তিক ১৪২8, ৪ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কেমন চলছে আমজনতার জীবন

মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান : ডিজিটাল সুশাসনে কেমন চলছে আম জনতার জীবন? এ সব প্রশ্নের উত্তর দিতেও সম্ভবত জনগণ ভয় পায়। সর্বক্ষণ যাদের আতঙ্ক আর ভয়ের মধ্যে বসবাস, তারা আনন্দ আর বেদনার পার্থক্য যেমন ভুলে গেছে, তেমনি ভুলে গেছে সুখ আর দুঃখের পার্থক্যও। ডিজিটাল মানেই তো ডিজিটে সব কিছু হিসেব করা হবে। এক ছাতার নিচে সব কিছু নিয়ে আসা হবে। বড়ো বিষয়কে ক্ষুদ্র পরিসরে একত্রিত করা হবে। এক ডিজিটে সব তথ্য একত্রে পাওয়া যাবে। বড়ো বড়ো তথ্যকে একটি ক্ষুদ্র চিপসের মধ্যে আবদ্ধ করা যাবে অনায়াসে। মানুষের জীবনও এখন ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হচ্ছে। ডিজিটাল সিস্টেমে সব কিছুই ক্ষুদ্র হয়ে গেছে। মানুষের ইচ্ছে, আবেগ অনুভুতি, চাহিদা, কামনা, বাসনা সবই ক্ষুদ্র আকার ধারণ করেছে। বাড়ছে শুধু প্রয়োজনীয় সব সামগ্রীর মূল্য। কমছে জীবনের মূল্য এবং চাহিদা। মাছে-ভাতে বাঙ্গালী- খুব কমই এখন মাছের স্বাদ গ্রহণ করতে পারছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য যে হারে বেড়েছে- তাতে মাছে-ভাতে বাঙ্গালী শব্দটি কোনো প্রাগৈতিহাসিক শব্দে রূপ ধারণ করেছে নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে। ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানোর কথা বলে ৭০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানো হচ্ছে। যারা মাছ ছাড়াই ভাত খাওয়ার চিন্তা করতো, তাদের হয়তো ভাতের নামও ভুলে যেতে হবে।
২০০২ সালে এক বিশিষ্ট ব্যক্তির সাথে উত্তর বঙ্গে গিয়েছিলাম। তখন তিনদিন ছিলাম দিনাজপুর সার্কিট হাউজে। সেখানে বেয়ারার কাজ করতো এক ছেলে, তার নামটি এ মুহূর্তে ভুলে যাওয়ায় এ লেখা যখন লিখছি, তখন তার একটি ছদ্মনাম দিলাম ‘আবদুল্লাহ’। তিনদিন থাকার সুবাদে যে ছেলেটি আমাদের সার্বক্ষণিক সেবা করেছে, তার সাথে মোটামুটি একান্তভাবে কিছু কথা বলে তার চাহিদা এবং প্রাপ্তির কথা শুনে একজন সুখী মানুষের কথাই বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিলো। ছেলেটির সংসারে মা আছে, ছোটো বোন আছে, নিজের স্ত্রী আর একটি সন্তান আছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে তার নিয়োগ হলেও চূড়ান্ত অনুমোদন না হওয়ায় তখনো তার নিয়োগ বৈধ হয়নি। বিনা বেতনেই সে চাকরি করছিলো। তাকে প্রশ্ন করলাম বিনা বেতনে কেন চাকরি করছে? সে সহজ সরল জবাব দিলো, ডিসি স্যার বলেছেন, মন্ত্রণালয় হতে অনুমোদন হলেই আমার নিয়োগ কনফার্ম হবে। এ আশ্বাসের ভিত্তিতেই তিন বছর যাবৎ ছেলেটি সেখানে বিনা বেতনে চাকরি করছে। প্রশ্ন করলাম সংসার চলে কিভাবে? সহজ সরল জবাব, স্যার আপনাদের মতো যারা আসে- তারা বখশিস হিসেবে যা দেয় তাতেই কোনো রকম চলে। চাল কিনতে পারলে, ভাত তো রান্না করা যাবে, আর ভাত রান্না করতে পারলে লবণ দিয়েও খাওয়া যাবে। সময়ের ব্যবধানে আব্দুল্লাহর হয়তো চাকরি স্থায়ী হয়ে গেছে। এক আব্দুল্লাহর সরকারি চাকরি হলেও আরো হাজারো আব্দুল্লাহ যারা সরকারি চাকরি না পেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, যারা কোনো প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকরি করার পর মাস শেষে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা মাইনে পায়, তারা কি প্রতিদিন বাজার নিয়ে বাসায় যেতে পারে? তারা লবণ দিয়ে মেখে খাওয়ার জন্য চাল কিনতে পারে কি? মাছে-ভাতে বাঙ্গালী শব্দটির সাথে সম্পর্কিত তাদের সম্পর্ক কতটুকু? আজ হাজারো আব্দুল্লাহর ঘরে হয়তো প্রতিদিন বাজার করার কথা কল্পনা করা বিলাসিতা। অনাগত দিনে ভাত খাওয়াও তাদের কাছে বিলাসিতা মনে হতে পারে।
ইংরেজ আমলের একটি কাহিনীর সাথে অনেকেই হয়তো পরিচিত : ইংরেজ শাসনামলে একবার চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিলো, কিন্তু ইংরেজ শাসক আর জমিদারদের করের হার না কমে বরং বেড়ে গিয়েছিলো। তখন করের বোঝা বহন করতে করতে জনগণের ঘরগুলো খাদ্যশূন্য। জনগণ যখন অনাহারে দিন কাটাচ্ছে, এমনি সময় বুভুক্ষু মানুষেরা খাদ্যের দাবিতে মিছিল করে রাজধানী ঘেড়াও করলো। তখন ইংরেজ রাণী এক পেয়াদাকে জিজ্ঞেস করলো ওরা কি চাচ্ছে, শ্লোগান দিচ্ছে কেন? পেয়াদা জবাব দিলো, ওদের ঘরে খাবার নেই, ভাতের দাবিতে মিছিল করছে? রাণী জবাব দিলেন, ভাত না থাকলে বিরিয়ানী খাবে। আজ যারা দেশ পরিচালনা করছে, তারা দেখছে সর্বত্র সুশাসন আর সুনসান নীরবতা। অতএব দেশ ভালোই চলছে। কোথাও কোনো অভাব নেই, কোনো জিনিসের দাম তেমন বাড়েনি। আর বাড়লেও সব কিছু জনগণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আছে। চালের দাম বেড়েছে তো কি হয়েছে? ভাত খেতে না পারলে বিরিয়ানী খাবে! বিনা ভোটের আজব সরকারের এমন আত্মতুষ্টি কি জনগণকে আসলেই শান্তিতে রাখছে। দুঃশাসন যখন চরম আকার ধারণ করে, প্রতিবাদের সকল পথ যখন বন্ধ করে দেয়া হয়, জনগণের মনের আবেগ অনুভূতি প্রকাশের সব জানালা যখন বন্ধ হয়ে যায়, চাওয়া-পাওয়ার কথা বলার মতো সকল দড়জাগুলো যখন খিল মেড়ে দেয়া হয়- তখন অসহায় জনগণ নীরবে সহ্য করেই দিনাতিপাত করে। তারা আরশের অধিপতির কাছে ফরিয়াদ জানায়, হে আমাদের মহান মালিক আমাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নিযুক্ত করো অথবা এই অবস্থা থেকে আমাদের মুক্ত করো। নিপীড়িত অসহায় জনগণের কোনো কথাই মহান স্রষ্টার দরবার হতে ফেরত আসে না, ফরিয়াদীদের সকল রোনাজারী তার দরবারে ঠিক তেমনভাবেই পৌঁছে, যেভাবে পৌঁছা উচিত। তবে যিনি এ বিশ্ব চরাচরের মালিক তার নিজস্ব কিছু নিয়ম এবং নীতি আছে। তিনি সাথে সাথে কোনো ফায়সালা নাজিল করেন না। স্রষ্টার ফায়সালা আসে চূড়ান্তরূপে। এ ফায়সালা যখন আসে তখন কিন্তু ভুল এবং অন্যায়ের প্রায়াশ্চিত্য করার আর কোনো সুযোগ থাকে না। চূড়ান্ত ফায়সালার আগে তিনি দেখতে চান, অন্যায় এবং ভুলকারীরা কোনোভাবে সংশোধন হয় কি না। আমাদের শাসকবর্গ এ সহজ সরল কথা বুঝতে পারেন না কিংবা বোঝার চেষ্টা করেন না বিধায়ই তারা তাদের এ আজব শাসন ব্যবস্থা নিয়ে বড়ো আত্মতুষ্টি সহকারে দাম্ভিকতা এবং বেপরোয়া ভাব দেখাচ্ছেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনের পূর্বে মহাজোটের ইশতেহারে বলা হয়েছিলো ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানো হবে। তখন মোটা চাল কেজি ছিলো ১৬ টাকা, সরু চালের কেজি ছিলো ১৮-২২ টাকা। মোটা চাল এখন পঞ্চাশ টাকা কেজি, মিহি চাল ৭০ টাকা কেজি। নি¤œ আয়ের মানুষ মাছের বাজারে যাওয়ার কথা চিন্তাই করতে পারে না। যে কোনো দেশী মাছ ৫০০- ৭০০ টাকা কেজি, চিংড়ি মাছ ১০০০ টাকা কেজি। যারা মাছ কিনতে পারতো না, তারা সবজি খেতো, কিন্তু এখন বাজারে যে কোনো সবজির কেজি ৮০-১০০ টাকা, সবচেয়ে সস্তায় পাওয়া যায় পেঁপে, যার কেজি ৪০ টাকা, কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ২০০ টাকা, বেগুন ১০০ টাকা কেজি। দুবছর পূর্বেও চিনির কেজি ছিলো ৪০ টাকা, এখন তা ৭০ টাকা, সয়াবিন তেল প্রতি কেজি ১১০ টাকা, দেশী মশুর ডাল ১৫০ টাকা কেজি। এ লেখা যখন লিখছি তার আগের দিন সন্ধ্যায় বাজারে গিয়েছিলাম। তরকারি কিনতে গিয়ে যে জিনিসের দামই জিজ্ঞেস করি না কেন, বিক্রেতা দাম হাকায় ১০০/৮০ টাকা। আমি এক বিক্রেতাকে প্রশ্ন করলাম এতো দাম চাইলে কিনবো কিভাবে? তার সহজ জবাব কোনো কিছুতো অবিক্রীত থাকে না। ১৬ কোটি মানুষের দেশে কোনো কিছুই অবিক্রীত থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সামান্য সবজি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের যে হারে দাম বেড়েছে তাতে কি সাধারণ মানুষের পক্ষে চাহিদা অনুযায়ী এ সব পণ্য কেনা সম্ভব? এর সাথে আরো যে সম্পুরক প্রশ্নটি আমাদের শাসকদের জন্য প্রযোজ্য তা হচ্ছে, বাজারে কি সব দ্রব্য চাহিদার পরিমাণ পাওয়া যায়? দেশে কি কৃষি উৎপাদন সঠিক মাত্রায় হচ্ছে? কৃষক যে দামে তার পণ্য বিক্রি করে একজন ভোক্তা কি আনুপাতিক হারে সে দামে কিনতে পারে? একজন কৃষক কি কৃষি উপকরণ সহজ এবং সুলভ মূল্যে পাচ্ছে? কৃষকের খামার হতে বাজারে আসা পর্যন্ত কোনো দ্রব্য কি স্বাভাবিক এবং সহজ পথে আসতে পারে? উৎপাদনের সমস্যা সমাধানে সরকার কি কোনো উপায় এবং পন্থা গ্রহণ করেছে? কৃষকের খামার হতে পাইকারী বাজার হয়ে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছতে সরকার কি কোনো কার্যকর এবং সহজ পন্থা গ্রহণ করেছে। প্রতিটি পণ্য উৎপাদন হতে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছতে পদে পদে চাঁদাবাজি এবং হয়রানির মাধ্যমে অবশেষে বাজারে আসে। কৃষকের খামার হতে একটি পণ্য বাজারে আসতে সরকারি দলের স্থানীয় নেতা, পাতি নেতা, নতুন নেতা, হাইব্রিড নেতা, উঠতি নেতা, রাস্তার লাইন ম্যান, পুলিশ, চেকার সবাইকে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা পরিশোধের পর অবশেষে ভোক্তার হাতে পৌঁছে। নিম্ন আয়ের যে মানুষটি আগে প্রতিদিন দুই কেজি সবজি কিনতো সে এখন আধা কেজি সবজি কিনে ঘরে ফিরে। কাঁচা মরিচের দাম জিজ্ঞেস করলে বিক্রেতা বলে এক পোয়া ৫০ টাকা। এখন আর কেজির দাম বলে না, ঢেড়সের দাম জিজ্ঞেস করলাম বিক্রেতা বললো, আধা কেজি ৫০ টাকা।
সরকারের খাদ্যমন্ত্রী চালের বাজারের চালবাজি নিয়ে হম্বিতম্বি করে ব্যবসায়ীদের ধমক দিলেন, লাভের জায়গায় কি হয়েছে তা কিছুই বোঝা গেলো না। মিয়ানমার যখন রোহিঙ্গাদের রক্তনদীতে মানবতা এবং মনুষত্যের দাফন সম্পন্ন করেছে তখন আমাদের খাদ্যমন্ত্রী সে রক্তনদী পাড়ি দিয়ে গিয়েছিলেন চাল আনতে। তবে তিনি খালি হাতেই ফিরে এসেছেন। মাছে-ভাতে বাঙ্গালীর দরিদ্র জনগণ মাছ খাওয়ার কথা ভুলে গেছে, সবজির বাজারেও আগুন। চাল নিয়ে চলছে মহা তেলেসমাতি। সরকার এরপর আমাদের প্যাকেজ খাদ্য খাওয়াবেন? শতভাগ ভেজাল জুস উৎপাদনকারী প্রাণ গ্রুপ যেমন আমের নাম দিয়েছে ফ্রুটিকা। তারা একটি বিজ্ঞাপন তৈরি করেছে। আগামী শতকে আমাদের শিশুরা আম চিনবে না, তারা প্রাণের তৈরি আমের জুসকেই আম মনে করবে। বইতে পড়বে যে, এখন বোতলে যে ফ্রুটিকা পাওয়া যায় তা আগে গাছে হতো, এটি একটি ফল, যার আদি নাম ‘আম’। এক সময় গাছেই ফ্রুটিকা হতো, কিন্তু এখন প্রাণ গ্রুপের ফ্যাক্টরীতে তৈরি হয় ফ্রুটিকা বা আম। আমের নাম ভুলিয়ে দিয়ে ফ্রুটিকা খাওয়ালে জনগণের কতটুকু ক্ষতি হবে সে ভাবনা আজকে আমার বিষয় নয়, এ বিষয়ে অন্য সময়ে লেখা যাবে। বর্তমানের ভাবনা হচ্ছে মানুষ অনাহারে, অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। মানুষ বাজারে গিয়ে প্রয়োজন মাফিক পণ্য কিনতে না পেরে এক ব্যাগ বাজারের পরিবর্তে এক রাশ হতাশা নিয়ে ফেরৎ আসছে।
দেশের সব কিছুই তো সরকারের নিয়ন্ত্রণে তবে বাজারের সব কিছুতে আগুন লেগেছে কেন? এখানে সরকারের-সফলতা ব্যর্থতা কতটুকু? তাও হয়তো বর্তমান সরকারের ভাবনার বিষয় নয়। কারণ জনগণের কাছে তারা কোনো বিষয়ে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। কোনো বিষয়ে জবাবদিহি চাওয়ার জনগণের অধিকার অনেক পূর্বেই খতম হয়ে গেছে। লাঠিয়াল বাহিনী আর বাজিকর দিয়ে সরকার সব ঠা-া করতে চায়। একজন সাবেক বিচারপতির ভাষায় বাজিকরদের ভয়াবহ দুঃশাসনে জনগণের আজ ত্রাহি অবস্থা। কিন্তু জনগণের মনের ভাষা বোঝার মতো, মন, মনন, মানসিকতা এবং জ্ঞান কোনোটিই বর্তমান ক্ষমতাসীন মহলের আছে বলে মনে হয় না। দ্রব্যমূল্য জনগণের সকল ক্ষমতা এবং সাধ্যের সীমা অতিক্রম করেছে। ক্ষমতাসীন মহল যেহেতু জনগণের ভোটে নির্বাচিত কোনো সরকার নয়, তাই তারা জনগণের দুঃখ বোঝার কথা নয়। বাস্তবে দেশে কোনো বিরোধী দল নেই, সরকারের গৃহপালিত আজব বিরোধী দলের সদস্যরা একই সাথে সরকারি দলে এবং বিরোধী দলে। কার্যত বিরোধী দল বলতে যাদের বোঝায়, সরকারের চরম দমন পীড়ন আর মামলার জালে পড়ে তারা জনগণের সমস্যার কথা ভুলেই গেছে বলা যায়। তাদের অবস্থা ‘চাচা আপনা পরাণ বাঁচা’। সরকারের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলার সাথে সাথে গ্রেফতার আর মামলার খড়গ নেমে আসে, রাস্তায় নামার সাথে সাথে দেখামাত্র গুলী- বর্তমান ক্ষমতাসীনদের ডিজিটাল সুশাসনের অন্যতম নীতি। সরকারের বিরুদ্ধে কোনো কথা বললে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়ে যায় এক নিমিষে। সরকারের চরম সৌভাগ্যই বলা যায়, আইন-শৃংখলা বাহিনীতে তারা তাদের প্রতি আনুগত্যশীল একদল লোক পেয়েছে। যারা জনগণের যে কোনো প্রতিবাদ বিক্ষোভকে নিমিষে দমন করতে খুব বেশী পারঙ্গম। সাগর রুণী হত্যার চার্জসিট দিতে ৫১ বার সময় নেয়া হলেও বিরোধী দলের কোনো নেতার বিরুদ্ধে মামলা দেয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে চার্জসিট তৈরি হয়ে যায়। গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং পানি সরবরাহ খুবই নাজুক। রাজধানীর অর্ধেক এলাকায় গ্যাস থাকে না, কিন্তু জনগণকে গ্যাস বিল ঠিকই পরিশোধ করতে হয়। বিদ্যুৎ কখন আসবে আর কখন যাবে তা নির্ভর করে সরবরাহকারীদের বদান্যতার উপর। মৌলিক কোনো দাবি নিয়ে প্রতিবাদ এবং কথা বলার মতো কোনো স্পেস সরকার খালি রাখেনি। ছাত্রদের পরীক্ষার তারিখ চেয়ে করা বিক্ষোভে গুলী করে পুলিশ অত্যন্ত সক্ষমতার সাথে গুলী করে দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিয়ে চির জীবনের জন্য পরীক্ষার্থী করে দিয়েছে অসহায় পরিবারের আশার প্রদীপ ছিদ্দিকুরকে। ‘বেশী উন্নয়ন কম গণতন্ত্র’ আইউব খানের থিওরী অবলম্বনে দেশে যে তুঘলকী শাসন ব্যবস্থা চলছে এটা আইউব খানের দুঃশাসনের চেয়েও ভয়ংকর। তখন সরকারি দলের পরিচয়ে চাঁদাবাজির এতো ব্যাপকতা ছিলো না, রাস্তাঘাটের এমন বেহাল দশা ছিলো না, দেখামাত্র গুলী করা হতো না, যখন তখন মামলা দেয়া হতো না। বর্তমান সরকারের উন্নয়নের শ্লোগান মুখের ফাঁকা বুলী বৈ কিছুই নয়। ঢাকা শহরের অধিকাংশ রাস্তাঘাটে বড়ো বড়ো গর্ত। সামান্য বৃষ্টিতে সমগ্র শহর ডুবে যায়। ঢাকার নি¤œাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘ চার মাস যাবৎ পানিবন্দী, যা দেখার কেউ নেই।
সরকার কথায় কথায় ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে। আজ এ দুটি অধিকারই জনগণের নাগালের বাইরে। ইংরেজ আমলে ভাতের দাবিতে বিক্ষোভ করা গেলেও এখন সে দুঃসাহস খুব কম লোকই দেখাতে পারে। জনগণ বরং মনে করে গুলী খাওয়ার চেয়ে দুবেলা না খেয়ে থাকা অনেক ভালো। আইউব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভ হয়েছে, তার পতনের দাবিতে আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু এখন গণতন্ত্র বন্দুকের নলের মাথায় বাঁধা। পেটে যাদের ভাত নেই, অথচ দুমুঠো ভাতের জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করতে হচ্ছে। ঘরে বৃদ্ধা মা, স্ত্রী যার অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় শোয়া, শিশুটি যার রাতের খাবার না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে- এ অসহায় মানুষটি ভাবে, তিন বেলা না হোক এক বেলা তো পারছি। মাছ তরকারি না হয় না খেলাম, দু মুঠো ভাত যাতে খেতে পারি। এ আশায় বেঁচে থাকা আমজনতার হৃদয়ে দ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। কিন্তু জনগণের সহ্য এবং ধৈর্য যখন সকল সীমা এবং পরিসীমা অতিক্রম করে খোদার আরশ কাঁপিয়ে তুলবে তখন কিন্তু আর কিছুই করার থাকবে না। অসহায়ের চোখের পাণিতে বহু শাসকের কামানের গোলা ভিজে অকেজো হওয়ার ইতিহাস পৃথিবীতে নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রতিবাদ-প্রতিরোধহীন সরকারের তাই হুশ ফেরা উচিত।
দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরার যেন কেউ নেই। সরকার দায়-দায়িত্বহীন। ব্যবসায়ী এবং সরকারের যুক্তি-পাল্টা যুক্তিতে কোনো সমাধানের সম্ভাবনার আশা শূন্য। সরকার ব্যবসায়ী আর সিন্ডিকেটের ত্রিমুখী চাপে জনগণ পিষ্ট হচ্ছে। সংসদে বিরোধী দল হিসেবে পরিচয়ধারীরা না ঘরকা না ঘটকা- এরা মূলত সরকারেরই ফটোকপি। সুশীল সমাজ নামে যারা আছে, তাদেরও বিবেক সম্ভবত ভোতা হয়ে গেছে। প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি আপন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে সর্বস্বান্ত। তবে সকল রাজনৈতিক শক্তি এবং বুদ্ধিজীবীদের ভালোভাবে বোঝা উচিত জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ ও লড়াইয়ে সর্বাগ্রে থাকতে না পারলে সে রাজনীতি এবং নীতি কথা মূল্যহীন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ