ঢাকা, বুধবার 25 October 2017, ১০ কার্তিক ১৪২8, ৪ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গাহত্যা বৃহৎ শক্তিগুলোর মুসলিম নিধনের অংশমাত্র

জিবলু রহমান : [দশ]
১৯৯২ সালে জেনারেল থান শোয়ে ক্ষমতা গ্রহণের আগেই রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল। বর্বরতা, গণতন্ত্রহীনতা আর সামরিক শাসনের কারণে মিয়ানমারের ২০ লক্ষাধিক নাগরিক মূলত প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ড, লাওস, ভারত ও বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। সামরিক সরকার নির্যাতনে হাজার হাজার মিয়ানমারের আরকান এলাকার প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্ত এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলার নাইক্ষ্যংচড়ি সীমান্ত দিয়ে এ দেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার নাগরিকদের শরণার্থীর মর্যাদা দিয়ে টেকনাফের নয়াপাড়া, উখিয়ার কুতুপালং ও নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম এলাকায় শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় দেয়। এ সুযোগে প্রত্যাবাসনের দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারে কার্যক্রম শুরু করে জাতিসংঘের প্রত্যাবাসন বিষয়ক হাই কমিশন ইউএনএইচিআর। ইউএনএইচিআর এ শর্তে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে যে, তারা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাসস্থান, খাদ্য ও চিকিৎসাসুবিধা দেয়ার পাশাপাশি তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে উদ্বুদ্ধ করবে। তাছাড়াও যেসব শরণার্থীকে মিয়ানমার সরকার গ্রহণ করবে না তাদের তৃতীয় কোন দেশে (কোন অবস্থায়ই বাংলাদেশে নয়) প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করবে।
সেমতে ২০০৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ২ লাখ ৩৫ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা হলেও ২০০৫ সালের জুলাইয়ের পর থেকে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক বছর আগে সরকারি ও জাতিসংঘের হিসাবে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ২০ হাজারের মত হলেও বাস্তবে অনেক বেশি সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। কোনো কর্তৃপক্ষের আওতায় রেজিষ্ট্রিকৃত না হওয়ায় তারা শরণার্থীর মর্যাদা পায়নি। তবে তারা আছে। এ ধরনের রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ২ থেকে ৫ লাখের মধ্যে হবে। নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান না থাকায় সঠিক সংখ্যা নিরূপণ কঠিন। মিডিয়া তো বটেই, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ের কোনো কোনো নেতার (এদের মধ্যে সংসদ সদস্যও আছেন) অভিযোগ, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের সর্বনাশ করছে। বিশেষ করে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য রোহিঙ্গারা দায়ী।
অনেকে বলেছিলেন-আরাকানে তাদের ওপর অত্যাচার হওয়ার কথা সত্য নয়। তারা আসলে সুযোগের সন্ধানে, রিলিফ পাওয়ার আশায় বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। স্থানীয় লোকজনের কাছে মেয়ে বিয়ে দিয়ে, স্থানীয় মেয়ে বিয়ে করে তারা বাংলাদেশের নাগরিকদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। তারা অবৈধ মাদক ব্যবসা আর অস্ত্র ব্যবসা করছে। রোহিঙ্গারা গাছপালা কেটে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাচ্ছে; চুরি-চামারি, ছিনতাই, ডাকাতি, খুনখারাবি ইত্যাদি হরেক অপকর্মের সঙ্গে রোহিঙ্গারা জড়িত। বাংলাদেশ আর মিয়ানমারের মধ্যে ব্যাপক চোরাচালানের জন্য রোহিঙ্গারাই দায়ী। চট্টগ্রামে, কক্সবাজারে, নাইক্ষ্যংছড়িতে, ‘রোহিঙ্গাদের রাজত্ব’ কায়েম হয়েছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়, রোহিঙ্গারা ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গিদের দোসর। তারা বাংলাদেশের জঙ্গিদের ট্রেনিং দিচ্ছে, জঙ্গি তৎপরতায় নিজেরা অংশ নিচ্ছে ভবিষ্যতে আরো জঙ্গি তৎপরতা চালানোর জন্য তক্কে তক্কে আছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি চক্রের সঙ্গে তাদের আছে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউএনএইচিআরের পক্ষাবলম্বন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে স্থায়ী করার প্রস্তাব দিয়েছিল। ২২ আগস্ট ২০০৬ কক্সবাজার আসেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা, শরণার্থী ও অভিবাসন বিষয়ক সহকারী সেক্রেটারি এলেন সারভ্রেরি। তিনি ওইদিন কক্সবাজারের টেকনাফে নয়াপাড়া শরণার্থী শিবির ও উখিয়ায় কুতুপালং শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন। পরদিন ২৩ আগস্ট সকালে তিনি কক্সবাজারে কর্মরত বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনার মোঃ শোয়েবুর রহমান ও কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলামের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করেন। তিনি দু’জনকেই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে স্থায়ী করার প্রস্তাব দেন।
আরআরআরসি মোঃ শোয়েবুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, ইউএনএইচিআর কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্তাব বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে তাদের আর্টিকেল অব মেমোরেন্ডামের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের যে চুক্তি রয়েছে তাতে বলা হয়েছে, যেসব রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মিয়ানমার সরকার গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক তাদের তৃতীয় কোনো দেশে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করবে ইউএনএইচসিআর, বাংলাদেশে নয়।
অপরদিকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম জানান, মার্কিন এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারী মানবিক দিক বিবেচনার কথা বলে রোহিঙ্গাদের এদেশে বসবাস করার সুযোগ করে দেয়ার কথা বলেন। তিনি বলেন, মিয়ানুমারের সামরিক সরকার হওয়ায় ওখানে রোহিঙ্গারা নিরাপদ নয়। ওখানে গণতন্ত্র ফিরে না আসা পর্যন্ত যেন রোহিঙ্গাদের সব সুযোগ-সুবিধা দিয়ে এদেশে বসবাস করার ব্যবস্থা করা হয়।
জেলা প্রশাসক আরো জানান, মার্কিন মন্ত্রীকে আমাদের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, বাংলাদেশ জনবহুল ক্ষুদ্র ও দরিদ্র দেশ। এদেশে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী করার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া রোহিঙ্গারা আমাদের দেশের বনজ সম্পদ, মৎস্য সম্পদ ধ্বংস করেছে। সৃষ্টি করেছে সামাজি নানা অনাচার। এমনকি রোহিঙ্গা এদেশের সামাজিক শিষ্টাচার বিনষ্ট করছে।
তিনি মার্কিন সহকারী সচিব এলেন সারভ্রেরিক জানিয়েছেন, শরণার্থী শিবিরে অবস্থানরত রোহিঙ্গারাই বৈধ শরণার্থী। এছাড়া যারা অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাস করছে তাদের তো বাংলাদেশ সরকারের উচিত আটক করে জেলে নিয়ে যাওয়া। অথচ বাংলাদেশ সরকার মানবিক কারণে তা করছে না এখন যদি বৈধ রোহিঙ্গাদের এদেশে সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয় তখন দলে দলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করবে। তখন মানবিক বিপর্যয় রোধ সম্ভব হবে না। তিনি শর্তানুযায়ী এদের তৃতীয় কোনো দেশে প্রত্যাবাসনের পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে ইউএনএইচিআর ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আরো কয়েকটি পক্ষ রোহিঙ্গাদের এদেশে স্থায়ী করার চক্রান্ত শুরু করেছে। তারই অংশ হিসেবে সীমান্তবিহীন চিকিৎসক দল হিসেবে প্রচারিত মেডিসিন ক্যাম্প ফ্রন্টিয়ারকে আবারো রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে কাজ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। অথচ এদেরই শরণার্থী প্রত্যাবাসন বিরোধী কর্মকান্ড চালানোর অভিযোগে শরণার্থী শিবির থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এবার এনজিও ব্যুরো এই সংস্থাটিকে শরণার্থী শিবিরে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, চিহ্নিত এই সংস্থাটিকে অনুমতি দেয়ার আগে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে কোনো তথ্য নেয়া হয়নি। সরকারের পলিসির বিরুদ্ধে এনজিও ব্যুরো কীভাবে এরকম একটি সংস্থাকে শরণার্থী শিবিরে কাজ করার অনুমতি দিল তা জানা নেই। আরআরআরসি শোয়েবুর রহমানও এমএসএফ (হল্যান্ড) এনজিও ব্যুরো অনুমতি দেয়ার খবর শুনেছেন। তবে তার কাছে কাগজপত্র আসেনি। তিনি জানান, এমএসএফ (হল্যান্ড) শরণার্থী শিবিরে এখনো কাজ শুরু করেনি, তবে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ