ঢাকা, বুধবার 25 October 2017, ১০ কার্তিক ১৪২8, ৪ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হাওরের পানিতে তেজষ্ক্রিয়তার প্রভাব সম্পর্কে আজও অন্ধকারে দেশবাসী! 

সাদেকুর রহমান : চলতি বছরের মার্চে হাওর অঞ্চলে অতি বৃষ্টি ও উজানের ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানিতে তেজষ্ক্রিয়তার প্রভাব সম্পর্কে আজও অন্ধকারে দেশবাসী। ওই সময় আকষ্মিক বন্যায় বিস্তীর্ণ হাওরের ফসলহানির পর মাছ, হাঁস ও গবাদিপশু মৃত্যুতে সরকারের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো নড়েচড়ে বসে। বিজ্ঞানী-গবেষকরা দফায় দফায় দিনের পর দিন মাঠ পর্যায়ে পানি পরীক্ষা করার পর বিষক্রিয়া সম্পর্কে অধিকতর নিশ্চিত হওয়ার জন্য নমুনা ঢাকায় নিজ নিজ ল্যাবে নিয়ে আসা হলেও আদৌ তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে কিনা বা হলেও ফলাফলে কী পাওয়া গেলো- সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বিষয়টি একদমই চেপে যাচ্ছে। 

অথচ তখন হাওরের পানিতে উজানে অবস্থিত খনি থেকে ইউরেনিয়ামসহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ থাকার আশংকা করেছিলেন দেশীয় ও ভারতীয় বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীরা। ভুক্তভোগী হাওরবাসীও ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ওপেনপিট ইউরেনিয়াম খনির দিকে আঙ্গুল তুলেছিলেন। এ বছর হাওরের ওই বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বন্যা চলে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত হাওরবাসী কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি। 

মার্চে আকস্মিক বৃষ্টি ও মেঘালয় থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে ধান পাকার আগেই তলিয়ে গেছে ফসল এবং এতে বিপুল জনগোষ্ঠী অর্থৈনৈতিক অনিশ্চয়তায় পড়ে। এ বন্যায় বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণার হাওর অধ্যুষিত হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি বিনষ্ট হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলবীবাজার, ও সিলেট জেলাতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পানিতে বিষক্রিয়ায় মরে গেছে শত শত টন মাছ। এর সাথে ব্যাঙ, মাছ ও গবাদিপশুর মড়ক হাওরবাসীর আতঙ্ককে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন সময়ে অকাল বন্যায় হাওরের ধান তলিয়ে গেলেও মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণির মৃত্যু হয়নি কখনো। 

এ অবস্থায় পানিতে বিষক্রিয়ার কারণ এবং এশিয়ার দুটি বৃহৎ পানির আধার হাকালুকি ও টাঙ্গুয়ার হাওরের জলজপ্রাণির মৃত্যুর সঙ্গে ভারতের ওপেনপিট ইউরেনিয়াম খনির কোন সম্পর্ক রয়েছে কী না তা খতিয়ে দেখা অনিবার্য হয়ে পড়ে। ওই সময় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ, মৎস্য অধিদফতরের বিজ্ঞানী-গবেষকরা দুর্যোগকবলিত হাওর এলাকা পরিদর্শন এবং বিষাক্ত পানি ও মৃত প্রাণির নমুনা পরীক্ষা করে তাৎক্ষণিক বিষক্রিয়ার প্রমাণ পায়। অধিকতর নিশ্চিত হওয়ার জন্য বা ইউরেনিয়াম তথা তেজষ্ক্রিয়তার অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য পানি ও মৃত প্রাণির নমুনা ঢাকায় ল্যাবে আনা হয়। কিন্তু কেউই পরীক্ষার ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে রয়েছে ওপেনপিট ইউরেনিয়াম খনি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ইউরেনিয়ামের বিষক্রিয়ায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত ‘রামসার সাইট’-খ্যাত টাঙ্গুয়ার হাওরের পানিতে জলজপ্রাণির এমন অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটতে পারে। মেঘালয়ের রানীকোর এলাকার ইউরেনিয়াম খনির নিকটবর্তী নদী থেকে বরছড়া এলাকা দিয়ে রক্তি এবং আরেকটু পশ্চিমে জাদুকাটা নদী বাংলাদেশে ঢুকেছে। তাছাড়া বৃষ্টির সময় অজ¯্র পাহাড়ী ঝর্ণা ও ছড়া বেয়ে জল নেমে আসে টাঙ্গুয়াসহ আশেপাশের অন্যান্য হাওরগুলোতে। এছাড়া বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া ভারতে কয়লা ও চুনাপাথরের খনি রয়েছে। প্রায় প্রতিবছরই সেখানে কয়লাখনি থেকে সালফার দূষণে হাওরে মাছ মরার কথা জানান স্থানীয় অধিবাসীরা।

হাওরের বন্যার পানিতে ইউরেনিয়ামের তেজষ্ক্রিয়তার ব্যাপারে অনেকটাই নিশ্চয়তা প্রদান করে খোদ মেঘালয়ের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আন্দোলন-প্রতিবাদ। গত বছরের ডিসেম্বরে মেঘালয়ের স্থানীয় খাসি জনগোষ্ঠী সেই এলাকার রানিকর নদীর পানির রঙ নীল থেকে বদলে সবুজ হয়ে যেতে দেখেন। এর প্রেক্ষিতে, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি খাসি স্টুডেন্ট ইউনিয়ন (কেএসইউ) একটি সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। সংগঠনটি সেই নদীর মাছ মরে যাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করে। এমনকি, জলজপ্রাণিহীন নদীটি এখন মৃত-প্রায় বলেও সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয়। খাসি নেতা মারকনি থঙনি সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের সন্দেহ ইউরেনিয়াম খনি খননের ফলে এর থেকে নিঃসৃত ইউরেনিয়াম পানিতে মিশে নদীর পানির রঙ বদলে গেছে এবং নদীর মাছ মরে গেছে।

ওই সময় পরিদর্শনে এসে মৎস্য অধিদফতরের একটি দল হাওর অঞ্চলের পানিতে বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি দেখতে পান যা জলজপ্রাণির জন্যে ক্ষতিকর। তবে কিভাবে এই পানি বিষাক্ত হয়েছে সে বিষয়ে তারা তা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও মৃত প্রাণির দেহ সংগ্রহ করে তা পরীক্ষার জন্যে ঢাকায় পশুসম্পদ গবেষণা ইন্সটিটিউটের গবেষণাগারে পাঠান। কিন্তু সেসব নমুনা আদৌ পরীক্ষা করা হয়েছে কিনা তা কেউ জানে না। 

সুনামগঞ্জের হাওরে মাছ এবং জলজ প্রাণির মড়ক লাগার ঘটনায় তেজস্ক্রিয়তার কোনো প্রভাব আছে কিনা তা পরীক্ষা করের সংস্থাটির চেয়ারম্যান (চলতি দায়িত্ব) ড. দিলীপ কুমার সাহার নেতৃত্বে বাংলাদেশ পরমানু শক্তি কমিশনের তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল। পর্যবেক্ষণের প্রাথমিক ফলাফলের কথা জানিয়ে ড. দিলীপ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আপনারা যেটা আশঙ্কা করছিলেন, যে এখানে ইউরেনিয়াম বা তেজস্ক্রিয় কোনো পদার্থের ইফেক্টের জন্য এই মাছগুলো মারা গেছে। আমরা রেডিও অ্যাকটিভি পরিমাপের যে মিটার, সেটা নিয়া আসছি। আমরা খুব ক্লোজলি, পানি ও কচুরিপানার খুব কাছ থেকে সেই সার্ভে মিটার দিয়ে রেডিও অ্যাকটিভিটি পরিমাপের চেষ্টা করেছি। তাতে আমরা যেটা দেখেছি, বাংলাদেশের নরমাল যে ব্যাকগ্রাউন্ড লেবেল, রেডিও অ্যাকটিভিটির মিনিমাম যে ব্যাকগ্রাউন্ড থাকার কথা, তার থেকেও অনেক পরিমাণের লেবেল এখানে পাওয়া গেছে। এর অর্থ হলো, এখানে কোনোভাবেই ইউরেনিয়াম বা অন্য কোনো রেডিও অ্যাকটিভির জন্য এখানে মাছগুলো মরেনি। পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে ০.২০ মাত্রার তেজস্ক্রিয়তা থাকে। সেক্ষেত্রে হাওরে রয়েছে ০.১০, যা প্রায় অর্ধেক। হাওরের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে যথেষ্ট পরিমাণের নমুনা, যেমন- পানি, মরা মাছ, মরা হাঁস, কচুরিপানা, সেডিমেন্টের নমুনা অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করা হয়েছে উল্লেখ করে দিলীপ কুমার আরো জানিয়েছিলেন, এসব নমুনা আরো কয়েক জায়গায় পাঠানো হবে। 

কয়েক মাস পার হয়ে গেলেও নমুনাসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে কিনা বা কোন অবস্থায় রয়েছে তা জানা যাচ্ছে না পরমানু শক্তি কমিশন থেকে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য পরমাণু শক্তি কেন্দ্রের রসায়ন বিভাগের প্রধান ড বিলকিস আরা বেগম গতকাল মঙ্গলবার দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, বিষয়টি তো অনেক পুরনো। নমুনাসমূহ পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে কিনা বা ফলাফল কী তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে শুধু বললেন, ওই পানিতে রেডিয়েশন পাওয়া যায়নি। বিস্তারিত জানতে ড. দিলীপ কুমার সাহার সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।

অন্যদিকে, বন্যায় হাওরের মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও নিরূপিত হয়নি সরকারিভাবে। বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন দফতর ও বেসরকারি তথ্য মতে, এবার হাওরে কমপক্ষে দুই লাখ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। মরে ও ভেসে গেছে প্রায় দেড় হাজার মেট্রিক টন মাছ এবং প্রায় ৪ হাজার হাঁস মারা গেছে। মারা গেছে বেশ কিছু গবাদিপশুও। এছাড়া ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৫ হাজার ৮২ কোটি টাকার সমান ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন। 

ওই সময়ে হাওরের প্রাণবৈচিত্র্য নিয়ে কমর্রত গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, ভারতের পশ্চিম খাসিয়া পাহাড়ের ইউরেনিয়াম খনির বর্জ্য দূষণে এবারের মাছের মৃত্যু ঘটছে কি না এটিও খতিয়ে দেখা জরুরি। তবে আমরা কোনো দূষণকে সন্দেহের বাইরে রাখছি না। ইউরেনিয়াম দূষণ হলে সেটি ভয়াবহ হবে। সেটি শুধু হাওরবাসীর জন্যই নয়, সারাদেশের জন্যই ভয়াবহ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় পাহাড়ে রয়েছে অপরিকল্পিত নানা খনি এলাকা। কয়লাখনি, চুনাপাথর খনি থেকে শুরু করে রয়েছে ইউরেনিয়াম খনিও। কয়লাখনির সালফারসহ বর্জ্য পানিতে সীমান্তবর্তী হাওরের মাছ ও জলজজীবের মৃত্যু প্রায়ই ঘটে থাকে। সীমান্ত অঞ্চলের মানুষর ত্বকের রোগসহ নানা রোগ হয়। সেখানকার ইউরেনিয়াম খনির বিরুদ্ধে উত্তর-পূর্ব ভারতের পরিবেশবাদী ও নৃ-জনগোষ্ঠীর সংগঠনগুলো আন্দোলন করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ