ঢাকা, বুধবার 25 October 2017, ১০ কার্তিক ১৪২8, ৪ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

‘পিঙ্ক হোয়েল’ ব্লু-হোয়েল গেম থেকে বাঁচতে শেখায়

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : প্রযুক্তির কল্যাণে ‘ব্লু-হোয়েল চ্যালেঞ্জ’ এখন এক আতঙ্ক। দেশময় ছড়িয়ে পড়া এই নব আতংকের ছাপ অভিভাবকদের চেহারাতেও টান লাগিয়েছে। উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের নিয়ত নানা চিন্তার মধ্যে এটি এখন নতুন করে ঠাঁই নিয়েছে। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অনলাইন গেম খেলার যে প্রবণতা, তার মধ্যেই ছোবল মেরেছে ‘ব্লু-হোয়েল।’ আর এতে করে ঘটে যাচ্ছে একের পর এক ভয়ঙ্কর সমস্ত ঘটনা-দুর্ঘটনা। ব্লু-হোয়েল চ্যালেঞ্জ নামে ওই অনলাইন গেমের ফাঁদে নিজেদের প্রাণ শেষ করে দিচ্ছে ছোট ছোট কিশোর-কিশোরীরা।

চার বছর আগে ডার্কওয়েব-ভিত্তিক আত্মঘাতী যে ভিডিও গেম ‘ব্লু-হোয়েল’ বা নীল তিমি খেলার জন্ম, সেটি এখন এ দেশের তরুণ-তরুণীদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়েছে প্রযুক্তির জোয়ারেই। সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রাণ সংহারী খেলায় মেতেছে তারা। এ্যাডভেঞ্চার জাতীয় এ খেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আত্মহত্যার যে সকল ঘটনা ঘটছে , তা থেকে রেহাই মেলেনি এ দেশের কিশোর-কিশোরী ,তরুণ-তরুণীদের। ফলে তারা ওই গেমের ফাঁদে পড়ে আত্মঘাতী হয়ে উঠছে। সম্প্রতি বাংলাদেশেও একাধিক কিশোর-কিশোরীর মৃত্যুর জন্য ব্লু-হোয়েলকে দায়ী করা হচ্ছে। গত একমাসের ব্যবধানে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই গেমে আসক্ত হয়ে প্রাণ গেছে ৫ জনের। এ ছাড়া আহত হয়ে হাসপাতালে ঠাঁই হয়েছে অনেক আসক্তের।

কিন্তু এসবের মধ্যেই জানার বাইরে রয়ে গেছে, ব্লু-হোয়েল চ্যালেঞ্জের মতো আরো একটি অনলাইন গেম রয়েছে ইন্টারনেটে। তার নাম পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ। কী এই পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ? এও কি কোনো মারণ খেলা?

ব্লু-হোয়েল চ্যালেঞ্জের একেবারে বিপরীত এই পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ। একদিকে যখন ব্লু-হোয়েল চ্যালেঞ্জের কারণে ছোট ছোট শিশুর প্রাণ যাচ্ছে, নিজেদের প্রাণ নিজেরাই শেষ করে দিচ্ছে, তখন অন্যদিকে পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ একইরকম অনলাইন গেমের মাধ্যমে শেখাচ্ছে কীভাবে জীবনে খুশি থাকতে হয়।

পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জেও রয়েছে বেশ কিছু টাস্ক। হাত কাটা নয়, সেখানে হাতে লিখতে বলা হচ্ছে, আপনি আপনার প্রিয়জনকে কতটা ভালোবাসেন। নিজেকে শেষ করে দেয়া নয়, পিঙ্ক হোয়েল গেম বলছে নিজেকে ভালোবাসার কথা। তাই এই অনলাইন গেমটি নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই বলেই মনে করা হচ্ছে। সুতরাং ,এক কথায় বলা চলে পিঙ্ক হোয়েল বাঁচতে শিখায়।

‘ব্লু-হোয়েল’ গেমের শুরুটা

বৃটেনের জনপ্রিয় ইংরেজি দেনিক দ্য সান জানায়, বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যার গেম হিসেবে পরিচিতি পাওয়া 'ব্ল-ু হোয়েল' গেমটি মূলত তৈরি করা হয়েছিল হতাশাগ্রস্ত মানুষের পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় করে দেওয়ার জন্য। নির্মাতার সেই উদ্দেশ্য অনুযায়ী হতাশ, বিষণœতা যাদের নিত্যসঙ্গী তারাই এখন এই গেমের প্রধান শিকার।

গত কয়েক মাসে সারা বিশ্বের শত শত কিশোর-কিশোরীর আত্মহত্যার জন্যে দায়ি সেই ‘ব্লু-হোয়েল’ গেমটির উদ্ভাবক রাশিয়ার ফিলিপ বুদেকিন (ফক্স) নামের এক রাশিয়ান তরুণ। ২০১৩ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে এফ-৫৭ নামে একটি গ্রুপ তৈরি করেন তিনি। যা সামাজিক মাধ্যম 'ভিকে' তে খোলা হয়েছিল। আর এই গ্রুপ থেকে প্রথমে বুদেকিন ও তার অন্যান্য অ্যাডমিনদের মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত হতাশাগ্রস্ত এবং দুর্বলচিত্তের টিনএজারদের শনাক্ত করত। এরপর নিজের পাতানো ফাঁদে ফেলে তাদের আত্মহত্যার পথে এগিয়ে নিয়ে যেত।

বুদেকিন সেইন্ট পিটার্সবার্গ এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি তার উদ্ভাবিত খেলার মধ্য দিয়ে সমাজের 'শুদ্ধিকরণ' করছেন। তিনি গর্বের সাথে বলেন, হতাশাগ্রস্ত মানুষের পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই, তাদের পৃথিবী থেকে বিদায় দেওয়াই তার লক্ষ্য।

যা শুনে বুদেকিনের মানসিক সুস্থতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে পুলিশ। তবে, ব্লু হোয়েল গেমের মাধ্যমে যে সরাসরি আত্মহত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়- সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বুদেকিন। তিনি বলেন, এই গেমে কাউকে আত্মহত্যার জন্য অনুপ্রাণিত করা হয় না। তার দাবি, গেইমটির সঙ্গে পাল্লা দিয়েই ইউজাররা নিজে থেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

কিন্তু বুদেকিন শুধু কি সমাজের 'শুদ্ধিকরণ' করতে চেয়েছিলেন, নাকি এই গেমের পেছনে তার অন্য কোনো কারণ ছিল? বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বুদেকিনের কৈশোর অন্য দশটা রাশিয়ান কিশোরের মত ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তাকে তার মা বাবার নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। তার একটা কারণ রয়েছে এই গেমটি তৈরির পেছনে। অন্যদিকে, বুদেকিন নিজেও মানসিকভাবে কিছুটা বিকারগ্রস্ত ছিল বলে জানিয়েছে রাশিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

বুদেকিনের সৃষ্টি করা এই গেইমটি একবার কারো মোবাইলে ডাউনলোড হয়ে গেলে তা আর কোনোভাবেই আনইনস্টল করা যায় না। তখন খেলতে না চাইলেও অনবরত নোটিফিকেশন আসতে থাকে। তখন এক পর্যায়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিশোর-কিশোরীরা গেমটি খেলতে শুরু করে। প্রথম দিকে গেমটি আপনার ফোনের সিস্টেমে ঢুকে আপনার আই পি এড্রেস, মেইলের পাসওয়ার্ড, ফেসবুক পাসওয়ার্ড কনট্যাক্ট লিস্ট, গ্যালারী ফটো এমনকি আপনার ব্যাংক ইনফর্মেশান! আপনার লোকেশানও তারা জেনে নেবে। এভাবে আপনাকে কৌশলে এমনভাবে পরিচালনা করবে যে আপনি আর গেমটি থেকে বের হয়ে আসতে পারবেন। কিংবা আসতে চাইলেও তারা বিভিন্নভাবে আপনাকে ক্ষতি করার হুমকি দিতে থাকবে। আর সেই পথে আপনাকে নিতে পারলে গেমটি শেষ ধাপ অর্থাৎ ৫০তম স্টেপে আপনাকে আত্মহত্যার করার কথা বলা হবে। আর এর মধ্য দিয়েই শেষ হবে গেমটি।

'ভিকে' নামক ওই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ব্লু-হোয়েল সুইসাইড গেম’ নামের পেজের অ্যাডমিন ছিলেন বুদেকিন নিজেই। সেই সূত্র ধরেই বেশ কিছুদিন তদন্ত চালিয়ে বুদেকিনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর গত মে মাসে এক গোপন বিচারের মাধ্যমে তাকে ৩ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। বর্তমানে তিনি সাইবেরিয়ার একটি কারাগারে কারাভোগ করছেন বলে জানিয়েছে ডেইলি মেইল। তবে বুদেকিন গ্রেফতার হলেও তার সৃষ্টি করা এই গেইম সারাবিশ্বে ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে আগের মতই ছড়িয়ে পড়ছে।

গুগল ট্রেন্ডিংয়ে শীর্ষে বাংলাদেশ

ব্লু-হোয়েল গেম নিয়ে এ দেশের মানুষের আগ্রহ সব সীমানাকে ছাড়িয়ে গেছে। গুগল ট্রেন্ডিং রিপোর্ট অনুসারে ,গত ৩০ দিনের মধ্যে ব্লু-হোয়েল লিখে সার্চের শীর্ষে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এর পরেই রয়েছে দক্ষিন এশিয়ার আরেক দেশ পাকিস্তান। ওই গেম নিয়ে নানা রকম তথ্য ও সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়াতে দক্ষিন এশিয়ার মানুষ বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ব্লু-হোয়েল শব্দটি সার্চ টার্মে খুঁজতে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তান, ইরান, মরিশাস ও শ্রীলংকা রয়েছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত সার্চ ডেটার ভিত্তিতে এই অবস্থান। 

গুগল ট্রেন্ডিং রিপোর্ট অনুসারে, গত মে মাস থেকে এই তথ্য খোঁজার হার বেড়েছে। ভারতীয় মিডিয়াতে এই গেম সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশের পরে ওই আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ