ঢাকা, শনিবার 28 October 2017, ১৩ কার্তিক ১৪২8, ৭ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হজরত হোসাইন (রা.)-এর শাহাদতের ঐতিহাসিক পটভূমি ও শিক্ষা

মনসুর আহমদ : আল্লাহর পথে মানুষের প্রিয়তম জীবন বিলিয়ে দেয়া যেমন সব চেয়ে গৌরবের ও পুণ্যের কাজ তেমনি তা অসীম সাহসিকতাও পুণ্য কাজ। যারা আল্লাহর পথে শাহাদত বরণ করেন তাঁদের মর্যাদা আল্লাহর কথায় “যে সব লোকেরা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত মনে কর না; বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত আছে ; তার পুরস্কার উপভোগ করছে। আল্লাহ নিজের অনুগ্রহ থেকে তাদের উপর যা দান করেছেন তাতে তাঁরা সন্তুষ্ট। তাদের যে সব সঙ্গী সাথী এখন পর্যন্ত দুনিয়াতে আছে, তাদের পেছনে তাদের জন্য তারা আনন্দ প্রকাশ করে। কারণ তাদের কোন ভয়ভীতিও নেই এবং কোন চিন্তা ভাবনাও নেই।” (আলে ইমরান-১৬৯- ১৭০)
শাহাদতের ইতিহাস অত্যন্ত দীর্ঘ ইতিহাস। রসুল (স.) -এর পূর্ব যুগেও বিভিন্ন নবী ও তাঁদের সাথীদেরকে আল্লাহর পথে জীবন দিতে হয়েছে। আসহাবুল উখদুদেরকে (সূরা বুরুজ) জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। হাদিসে এসেছে-হজরত ঈসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গী সাথীদেরকে করাত দিয়ে চিড়ে ফেলা হয়েছে, শূলে চড়ান হয়েছে। (আল মু’জিমুছ ছগীর) ইসলাম প্রচার শুরু হলে রসুল (স.)-এর সঙ্গী সাথীদেরকে শহিদ করে দেয়া হয়েছে। বদর, ওহুদ যুদ্ধে হজরত হামযা (রা.) সহ শহিদ হয়েছেন অনেক সাহাবী। যুদ্ধের ময়দান ছাড়াও শহীদ হয়েছেন অনেক সাহাবী। আনসারদের মধ্য থেকে ৭০ জন কোরআনের আলেমকে একই সময় রাস্তায় শহিদ করা হল। তারা বলেছিলেন, ‘কাবার প্রভুর কসম, আমি সফলতা লাভ করেছি।’ এ ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কালে আল্লাহর রাহে জীবন বিলিয়ে দিয়ে তারা সীমাহীন মর্যাদা লাভ করেছেন। তাঁদের শাহাদত ছিল দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পথে এক বিরাট সাহসী পূর্ণ মর্যাদার পদক্ষেপ। দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেও ইসলামী শক্তিকে দুর্বল করার চক্রান্ত থেমে থাকেনি।
ইসলামকে দুর্বল করার চক্রান্ত শুরু হল খোলাফায়ে রাশেদার তৃতীয় খলিফা হজরত ওসমান (রা.)-এর খেলাফত কাল থেকে। সে চক্রান্তের ধারা আজও শেষ হয়ে যায়নি। সেই চক্রান্তের ধারাকে নস্যাৎ করার জন্য হজরত হোসাইন (রা.) শাহাদত বরণ করে দ্বীন রক্ষার আন্দোলনে শহিদ হওয়ার এক সমুজ্জ্বল আদর্শ প্রতিষ্ঠা করলেন; প্রজ্বলিত করলেন শাহাদতের তামান্নার পবিত্র আলোকধারা। যে আলোয় প্রজ্জ্বলিত হৃদয় যুগ যুগ ধরে অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জীবন বিলিয়ে দিতে আনন্দ অনুভব করে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে।
হজরত হোসাইন (রা.)-এর শাহাদত কি ছিল উচ্ছল আবেগের পরিণতি? তা কি ছিল পার্থিব স্বার্থ উদ্ধারের সংগ্রামের ফল? উত্তরে বলতে হবে - না, তবে কেন তিনি এ পথ বেছে নিয়ে ছিলেন? তার উত্তর পেতে আমাদেরকে দৃষ্টি দিতে হবে অতীত ইতিহাসের পাতায়, ফিরে যেতে হবে কিছু পেছনে।
হজরত হোসাইন (রা.)-এর শাহাদতের ,মূল কারণ অপ্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত রয়েছে হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর শাহাদতের সঙ্গে। তাঁর শাহাদত ছিল নিছক একটি প্রতিহিংসার ফল। মুগীরা ইবনে শোবা (রা.)-এর জনৈক পারসী গোলামের নাম ছিল ফিরোজ। তার ডাক নাম ছিল আবু লুলু। সে তার প্রথম প্রভুর বিরুদ্ধে হজরত ওমরের নিকট এই বলে মামলা দায়ের করে যে, তার প্রভু তার কাছে অত্যধিক পরিমাণ অর্থ দাবি করে। তার এ অভিযোগ যথার্থ ছিল না বলে হজরত ওমর (রা.) তার অভিযোগে কর্ণপাত করেননি। এর ফলে লুলু এত অসন্তুষ্ট ও উত্তেজিত হয়ে পড়ে যে খলিফার ফজরের নামাজ আদায় কালে সে তাঁর উপরে ছয়টি ছুরিকাঘাত করে। এ আঘাতে হজরত ওমর (রা.) মরণাপন্ন হয়ে পড়েন। উপস্থিত লোকদের পীড়াপীড়িতে তিনি খেলাফতের জন্য ছয়জন সাহাবীকে মনোনয়ন দিলেন যার অন্যতম ছিলেন হজরত ওসমান (রা.)। হজরত ওমর (রা.)-এর দাফন কার্য শেষ হবার পর তৃতীয় দিনে বিভিন্ন পরামর্শ শেষে হজরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) হজরত ওসমানের(রা.) হাতে বাইয়াত গ্রহণ করলেন। অতঃপর হজরত আলী, এবং এর পর উপস্থিত জনতা একযোগে হজরত ওসমান (রা.)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করার জন্য এগিয়ে এলেন। এ ভাবে ২৪ হিজরীর ৪ঠা মহররম হজরত ওসমান (রা.) সর্বসম¥তিক্রমে খিলাফতের পদে অধিষ্ঠিত হলেন। তবে খলিফা নির্বাচনের ব্যাপারে মিশর, বসরা, কুফা ও ইরাকবাসীদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আলাদা, যা পরবর্তীতে প্রকাশ পেয়েছিল।
হজরত ওসমানের দ্বাদশ বছরের খেলাফত কালের প্রথম ছয় বছর পূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। একের পর এক দেশ জয়, গণিমতের মালের প্রাচুর্য, বেতন ও ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি, কৃষি ও বাণিজ্যে উন্নতি এবং উন্নত রাষ্ট্রীয় শাসন শৃঙ্খলা সারাদেশে ঐশ্বর্য প্রাচুর্য সমৃদ্ধি ও আরাম আয়েশের বন্যা বইয়ে দেয়। হজরত ওসমান (রা.)-এর খেলাফতের আমলের শেষের দিকে যে ফিতনা ও বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল তার মূল কারণ স্বরূপ বলা যায়,বিত্তশালিতা ও সম্পদের প্রাচুর্য মুসলমানদের মধ্যে এমন সব অনিষ্টকারিতা জন্ম দিয়েছিল যা স্বভাবতই এ অবস্থায় বিভিন্ন জাতির মধ্যে দেখা দেয় এবং যার ফলে অবশেষে তারা দুর্বলতা ও অধঃপতনের শিকারে পরিণত হয়। সমৃদ্ধি ও সম্পদের প্রাচুের্যর অপরিহার্য ফল স্বরূপ সমগ্র জাতির স্বার্থের মোকাবেলায় প্রত্যেক দল ও ব্যক্তি নিজ দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে শুরু করে। এ থেকে হিংসা ও বিদ্বেষ জন্ম নেয়, জাতীয় ঐক্যের গ্রন্থি গুলি শিথিল হয়ে পড়ে এবং জাতির পতন শুরু  হয়ে যায়।
হজরত ওসমান (রা.)-এর খেলাফত কালে মরক্কো থেকে কাবুল পর্যন্ত সমগ্র এলাকা ইসলামী জাহানের অন্তর্ভুক্ত হয়। বিজিত এ সব দেশের বিভিন্ন জাতির মনে স্বভাবতই মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগ্রত ছিল, কিন্তু মুসলমানদের শক্তির মোকাবেলায় তারা নিজদেরকে অসহায় মনে করতো। কাজেই তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে চক্রান্তের জাল বিস্তার শুরু করল। পার্শীরা বিপ্লব সৃষ্টি করে রাষ্ট্র ক্ষমতা এমন একটি খান্দানের হাতে তুলে দিতে চাচ্ছিল যাদের কাছ থেকে তারা নিজেদের জন্য অধিকতর সুযোগ সুবিধা আদায় করতে পারতো। ইহুদীরা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে মুসলমানদের শক্তি চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিতে চাচ্ছিল। এ ছাড়াও বনি হাশেম কখনো বনি উমাইয়ার উন্নতি ও উত্থান পছন্দ করতো না। তারা খিলাফতের পদ ও মর্যাদা সমূহের জন্য নিজদেরকে অধিকতর যোগ্য মনে করতো।
ষড়যন্ত্রের সব চেয়ে বড় কেন্দ্র ছিল মিসর। আবদুল্লাহ ইবনে সাবা নামক ইহুদী বংশোদ্ভুত জনৈক নও মুসলিম তার বিস্ময়কর চক্রান্ত মূলক ক্ষমতার সাহায্যে বিভিন্ন চিন্তার অধিকারী ফিতনাবাজ দল গুলিকে এক কেন্দ্রে একত্রিত করে ফেলেছিল।
বিশৃঙ্খলাকারীর দল মদীনাতেও ছিল। কিন্তু নেতৃস্থানীয় সাহাবাগণ হযরত ওসমানের সহযোগী ছিলেন বিধায় বিশৃঙ্খলাকারীর দল প্রকাশ্যে কোন কর্মসূচি গ্রহণ করতে সক্ষম হয়নি। এ ভাবে বিভিন্ন দল মিথ্যা দোষারোপ, কুৎসা রটনা ও অপপ্রচারেরর মাধ্যমে হজরত ওসমান (রা.)-এর বদনাম করার চেষ্টা করছিল। তাঁর বিরোধিতায় শত্রুরা আকাশ মাথায় তুলে নিয়েছে। এক সময় চক্রান্তকারীরা হজরত উসমানের নিকট খেলাফতের দায়িত্ব থেকে ইস্তেফা দিবার দাবি জানাল। জবাবে তিনি জানালেন, : যে পোশাক আমাকে পরিধান করিয়েছেন, প্রাণ থাকতে তা কোন দিন আমি নিজ হাতে খুলে ফেলবো না। এবং নবী করীম সঃ)-এর অসিয়ত অনুযায়ী আমি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সবর করবো।
হজরত ওসমান (রা.) ইস্তেফা দিতে অস্বীকার করায় বিদ্রোহীরা তাঁর গৃহ অবরোধ করলো। এই অবরোধ অনবরত চল্লিশ দিন স্থায়ী ছিল। এ ভাবে বিদ্রোহীরা যখন দেখলো হজ্জের মওসুম আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং এর পর লোকেরা মদীনার দিকে আসতে থাকবে ফলে সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে যাবে। তখন তারা হজরত ওসমানকে হত্যা করার পরামর্শ করতে লাগল। এক সময় বিদ্রোহীরা খলিফার গৃহ আক্রমণ করলো। এ সময় দোর গোড়ায় বিপুল সংখ্যক সাহাবা ও সাধারণ মুসলমান উপস্থিত ছিলেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়ের (রা.) ছিলেন তাঁদের নেতা। তিনি খলিফার কাছে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়তে অনুমতি চাইলেন। খলিফা জবাবে বললেন, ‘তোমাদের একজনও যদি লড়াইয়ের আকাঙ্খা পোষণ করে থাক তা হলে আমি তাকে দোহাই দিচ্ছি সে যেন আমার জন্য রক্ত প্রবাহিত না করে।”
হজরত হাসান (রা.) ও হোসাইন (রা.) খলিফার দ্বার রক্ষক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। হজরত হাসান বিদ্রোহীদেরকে বাধা দিতে গিয়ে আহত হলেন। কিনানা ইবনে বাশার অগ্রসর হয়ে খলিফার কপাল মোবারকে ডান্ডা মারলো। এত জোরে মারলো, যার ফলে তিনি পাশের দিকে পড়ে গেলেন। তখনও তিনি “বিসমিল্লাহ তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ” উচ্চারণ করছিলেন। সুদান ইবনে হামরান মুরাদী দ্বিতীয় আঘাত হানলো। এ আঘাতে রক্তের নদী বয়ে গেল। আমর ইবনুল হাসাক তাঁর বুকের উপরে চড়ে বসলো এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে বর্শা দ্বারা নয়টি আঘাত করলো। আর এক নরাধম অগ্রসর হয়ে তরবারির আঘাত হানলো। খলিফার প্রিয়তমা পত্নী হজরত নায়েলা (রা.) পাশে বসা ছিলেন। তিনি নিজ হাত দিয়ে তরবারির আঘাত রুখতে চাইলেন। ফলে তাঁর তিনটি অঙ্গুলি কেটে আলাদা হয়ে গেল। তরবারির এই আঘাতে হজরত ওসমানের (রা.) জীবন প্রদীপ নির্বাপিত হল। হজরত আলী ( রা.)-এ খবর জানতে পেরে ভীষণ মর্মাহত হলেন এবং যারা রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত ছিলেন তাদের উপর ক্রোধ প্রকাশ করলেন এমনকি হাসান ও হোসাইন (রা.)-কে প্রহার করলেন।
হজরত ওসমান (রা.)-এর রক্ত ভেজা জামা ও হজরত নায়েলার কর্তিত অঙ্গুলি সিরিয়ার আমীর হজরত মুয়াবিয়ার নিকট পৌঁছে গেল। সাধারণ জনতার সামনে যখন সেই জামা উন্মুক্ত করা হলে এবং অঙ্গুলি গুলি ঝুলিয়ে দেয়া হল সেখানে তখন এক মাতমের সাগর উথলে পড়ল। জনতা হাহাকার করে উঠল এবং ‘প্রতিশোধ চাই’ ধ্বনি উত্থিত হল।
হজরত ওসমান (রা.)-এর শাহাদতের পর তিন দিন পর্যন্ত খেলাফতের আসন শূন্য ছিল। এই সময় লোকেরা হজরত আলী (রা.)-কে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগল। তিনি প্রথমে এই দায়িত্বভার বহন করতে অস্বীকার করেন। কিন্তু অবশেষে মুহাজির ও আনসারগণের চাপে বাধ্য হয়ে এ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। হজরত ওসমানের শাহাদতের তৃতীয় দিনে ২১ জিলহজ্জ, সোমবার, মসজিদে নববীতে হজরত আলীর (রা.) বাইয়াত অনুষ্ঠিত হল। ঐতিহাসিক ভাবে প্রমাণিত যে জাজিরাতুল আরব, ইরাক এবং মিশর তাঁর আদর্শানুগত ছিল। সিফফিনের যুদ্ধের পর পর্যন্ত গোটা জাজিরাতুল আরব এবং শাম এর পূর্ব পশ্চিমে উভয় দিকে ইসলামী সাম্রাজ্যের প্রতিটি প্রদেশে হজরত আলী (রা.)-এর বাইয়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। হজরত মুয়াবিয়ার প্রভাবাধীন হওয়ার কারণে কেবল শাম প্রদেশ তাঁর আনুগত্য বহির্ভুত ছিল।
হজরত মুয়াবিয়া (রা.) হজরত ওমর (রা.)-এর সময় ৪ বছর ধরে দামেস্কের শাসনকর্তার পদে নিয়োজিত ছিলেন। হজরত ওসমান (রা.) হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-কে ক্রমাগত দীর্ঘদিন ধরে একই প্রদেশের গভর্ণর পদে বহাল রাখেন। তিনি আইলা থেকে রোম পর্যন্ত এবং আল জাজিরা থেকে উত্তরমহাসাগর পর্যন্ত গোটা এলাকা তাঁর আওতাধীন করে গোটা শাসন কালে ১২ বছর ধরে তাঁকে এই প্রদেশেই বহাল রাখেন। হজরত মুয়াবিয়া (রা.) এ প্রদেশের শাসন কার্যে দীর্ঘ দিন নিয়োজিত থেকে এমন করে আসন গেড়ে বসেন যে তিনি আর কেন্দ্রের আওতায় ছিলেন না ,বরং কেন্দ্রই ছিল তাঁর দয়া ও অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল।
হজরত ওসমান (রা.)-এর শাহাদতের পর হজরত নোমান ইবনে বশীর (রা.) খলিফার রক্তমাখা জামা, তাঁর স্ত্রী নায়েলার কর্তিত অঙ্গুলি দামেশকের রাস্তায় প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখার ফলে শাম বাসীদের ভাবাবেগকে ভীষণ ভাবে নাড়া দেয়। এ সময় মুয়াবিয়া (রা.) শাম প্রদেশের গভর্ণর হিসেবে হজরত ওসমান (রা.)-এর খুনের প্রতিশোধ গ্রহণের দাবি উত্থাপন করেন। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের আনুগত্য উপেক্ষা করে নিজ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য গভর্ণরীর ক্ষমতা প্রয়োগ করে ওসমানের হত্যাকরীদেরকে তাঁর হাতে সোপর্দ করার দাবি জানান। এ দাবিটি ছিল ইসলামী যুগের সুশৃঙ্খল সরকারের পরিবর্তে ইলাম পূর্ব যুগের গোত্রীয় বিশৃঙ্খলার সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাম প্রদেশের জনগণ হজরত আলী (রা.)-এর বাইয়াত কবুল করতে অস্বীকৃতি জানান।
হজরত আলী (রা.) খেলাফত ও দায়িত্ব গ্রহণের পর ৩য় হিজরীর মহররম মাসে হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-কে শাম দেশ থেকে বরখাস্ত করে তাঁর স্থানে হজরত সাহাল ইবনে হানীকে নিযুক্তি প্রদান করেন। হজরত আলী (রা.) তাঁর খেলাফতকে মেনে নিতে অনুরোধ জানিয়ে দূত পাঠান। কিন্তু মুয়াবিয়া (রা.) আনুগত্যের কথা বাদ দিয়ে হজরত ওসমান হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করার জন্য ৬০ হাজার লোক উন্মুখ হয়ে আছে বলে জানান। এ অবস্থায় শামকে আনুগত্যে বাধ্য করার জন্য হজরত আলী (রা.) শাম আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু করেন। হিজরী ৩৬ সালের জমাদিউস সানী মাসে হজরত আলী পুনরায় হজরত জরীর ইবনে আবদুল্লাহ আল বাজালীকে একখানা পত্র দিয়ে মুয়াবিয়ার কাছে পাঠান। এর মাধ্যমে তাঁকে বুঝাবার চেষ্টা করা হয় যে উম্মত তাঁর খেলাফতের ব্যাপারে একমত হয়েছে, অতএব তাঁর উচিত তাঁর (আলীর) আনুগত্য করা, দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিভেদ সৃষ্টি করা নয়। মুয়াবিয়া (রা.) এ কথায় কর্ণপাত না করে হজরত আমর ইবনুল আসের পরামর্শক্রমে ফয়সালা গ্রহণ করেন যে হজরত আলী (রা.)-কে হজরত ওসমানের হত্যার জন্য দায়ী সাব্যস্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে।
এর পর হজরত আলী (রা.) ইরাক থেকে এবং মুয়াবিয়া (রা.) শাম থেকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে পরস্পরের দিকে অগ্রসর হন এবং ফোরাতের পশ্চিম প্রান্তে আর রাক্কার নিকট অবস্থিত সিফফীন নামক স্থানে উভয় পক্ষ মুখোমুখী হয়।
জিলহজ্জ মাসের প্রথম দিকে যথারীতি যুদ্ধ শুরু করার আগে হজরত আলী (রা.) হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর নিকট প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি জবাব দেন : আমার নিকট থেকে চলে যাও। আমার এবং তোমাদের মধ্যে তরবারি ব্যতিত কিছু নেই।
চুক্তি মোতাবেক ৩৭ হিজরী সালের মহররম মাসের শেষ পর্যন্ত কিছু দিন যুদ্ধ বন্ধ রাখা হয়। এ সময় হজরত আলী (রা.) পুনরায় আলী ইবনে হাতেম (রা.)-এর নেতৃত্বে মুয়াবিয়া (রা.)-এর কাছে একটি প্রতিনিধি দল পাঠান। এর উত্তরে মুয়াবিয়া (রা.)-এর পক্ষ থেকে হজরত আলী (রা.)-কে খেলাফতের পদ থেকে ইস্তেফা দিতে বলা হল যা ছিল একটি অন্যায় প্রস্তাব।
এ অবস্থায় মহররম মাস শেষ হবার পর সফর মাস থেকে চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধের শুরুতে হজরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.) যিনি হজরত আলী (রা.)-এর সেনাবাহিনীতে ছিলেন হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর বাহিনীর সাথে যুদ্ধে শহিদ হন। হজরত আম্মার (রা.)-এর শাহাদতের দ্বিতীয় দিন ১০ই সফর তুমুল যুদ্ধ শুরু হয় এবং হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর সেনা বাহিনী পরাজয়ের দ্বার প্রান্তে উপনিত হয়। এ সময় হজরত আমর ইবনুল আসের পরামর্শক্রমে মুয়াবিয়া (রা.)-এর সেনাবাহিনী বর্শার অগ্রভাগে কোরআন শরীফ তুলে ধরে। তাদের অগ্রভাগে দামেশকের পাঁচটি বৃহদায়তনের কোরআন শরীফ পাঁচটি নেজায় বাঁধা ছিল এবং পাঁচ ব্যক্তি উঁচু করে ধরের ছিল। এর ফলে ইরাকী লোকদের পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ করে হজরত আলী (রা.) হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর সাথে সালিশ চুক্তি করতে বাধ্য হন। হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর পক্ষ থেকে আমর ইবনুল আসকে সালিশ নিযুক্ত করা হয় এবং অনেক বাদানুবাদের পর আলী (রা.)-এর পক্ষ থেকে সালিশ নিযুক্ত হন আবু মুসা আশয়ারী ( রা.)।
সালিশ চুক্তিতে খেলাফত সম্পর্কে প্রথমে আল্লাহর কিতাব অতঃপর রসুল (স.)-এর ন্যায়ানুগ সুন্নাহর ভিত্তিতে এর মীমাংসা করার দায়িত্ব তাঁদের উপর অর্পিত হয়। কিন্তু উভয় বুজুর্গ আলোচনা কালে এ সমস্ত বিষয় ভুলে গিয়ে খেলাফতের ব্যাপারে কি ভাবে একটি সমাধানে আসা যায় এ নিয়ে তাঁরা মাথা ঘামাতে থাকেন। এক পর্যায় আবু মুসা আশয়ারী ঘোষণা করেন, “আমি ও আমার বন্ধু একটি বিষয় একমত হয়েছি। তা এই যে, আমরা আলী (রা.) ও আমীর মুয়াবিয়াকে বাদ দেবো এবং জনগণ পরামর্শক্রমে যাকে খুশি আমীর নিযুক্ত করবে। সুতরাং আমি আলী(রা.) ও মুয়াবিয়াকে বরখাস্ত করছি। এখন নিজেদের ব্যাপার আপনারা নিজেদের হাতে নিয়ে নিন এবং যাকে যোগ্য মনে করেন আমীর নিযুক্ত করুন।”
অতঃপর আমর ইবনুল আস দাঁড়িয়ে বললেন, “ইনি যা বলেছেন তা আপনারা শুনলেন। তিনি নিজের লোককে বরখাস্ত করেছেন। তার মতো আমিও তাঁকে বরখাস্ত করেছি এবং আমার নিজের লোক হজরত মুয়াবিয়াকে বহাল রেখেছি। কারণ তিনি ওসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর বন্ধু এবং তাঁর রক্তের দাবিদার। উপরন্তু তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য সব চাইতে যোগ্য ব্যক্তি।” হজরত আবু মুসা (রা.) এ কথা শুনেই বলে উঠলেন, “তুমি কি করলে? আল্লাহ তোমাকে সুযোগ দিবেন না। তুমি প্রতারণা করেছ এবং চুক্তির বিরোধিতা করেছ।”
দুমাতুল জুন্দুলের এ ঘটনা সবটুকু ছিল সালিশি চুক্তির সম্পূর্ণ পরিন্থী। এ কারণে হজরত আলী (রা.) তাদের ফয়সালা প্রত্যাখ্যান করেন। অতঃপর তিনি কুফায় পৌঁছে পুনরায় শাম আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু করেন। কিন্তু ইতিমধ্যে ইরাকের লোকেরা মনোবল হারিয়ে ফেলেছিল। অন্য দিকে মুয়াবিয়া (রা.) এবং হজরত আমর ইবনুল আসের কৌশল অবলম্বন করেন যার ফলে মিশর এবং উত্তর আফ্রিকার অধিকাংশ তাঁর হাত ছাড়া হয়ে যায় এবং মুসলিম জাহান কার্যত দুটি সংঘর্ষশীল সরকারে বিভক্ত হয়ে পড়ে। অবশেষে হজরত আলী (রা.)-এর শাহাদত এবং হজরত হাসান (রা.)-এর সমঝোতা ময়দানকে হজরত মুয়াবিয়ার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়।
ক্ষমতার চাবিকাঠি হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর হস্তগত হওয়াই ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের খেলাফত থেকে স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের দিকে প্রত্যাবর্তনের অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়। দূর দৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিরা এ পর্যায়েই অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে. এখন তারা রাজতন্ত্রের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার সম্মুখীন। ঐতিহাসিকগণ মনে করেন, “এখন ‘খিলাফত আলা মিনহাজিন নবুওয়ত’ বহাল করার একটি মাত্র পথ অবশিষ্ট ছিল। তা ছিল হজরত মুয়াবিয়া (রা.) তাঁর অবর্তমানে কাউকে এ পদে নিয়োগ করার ভার মুসলমানদের পারস্পরিক পরামর্শের উপর ছেড়ে দিতেন, অথবা বিরোধ নিরসনের উদ্দেশ্যে তাঁর জীবদ্দশায়ই স্থলাভিষিক্তদের ব্যাপারটি চূড়ান্ত করা প্রয়োজন মনে করলে মুসলমানদের সৎ ও ইসলামী জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিদের সমবেত করে উম্মতের মধ্য থেকে যোগ্যতম ব্যক্তিকে বাছাই করার স্বাধীনতা ক্ষমতা দান করতেন। কিন্তু স্বীয় পুত্র ইয়াযিদের স্বপক্ষে ভয়ভীতি ও লোভ লালসা দেখিয়ে বাইয়াত গ্রহণ করে তিনি এ সম্ভাবনার সমাপ্তি ঘটালেন।
হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনামলে রাজনীতিকে দ্বীনের ঊর্ধ্বে স্থান দান এবং রাজনীতিক স্বার্থে শরিয়তের ধারা লংঘন শুরু হয়েছিল। এই ধারা হজরত মুয়াবিয়ার নিজের নিয়োজিত উত্তরাধিকারী ইয়াযিদের শাসন কালে আরও নিকৃষ্ট পর্যায়ে পৌঁছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তি লাভের আকাঙ্খায় উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল গোটা মুসলিম জাহান। মুক্তির আন্দোলনে এগিয়ে এলেন হজরত হোসাইন (রা.)। ইরাকের জনগণের আহ্বানে ইয়াযিদের সিংহাসন ভেঙ্গে খান খান করার উদ্দেশ্যে কোন সেনা বাহিনী ছাড়াই কুফা রওয়ানা হলেন। তাঁর সাথে ছিল তাঁর ছেলে মেয়ে পরিবার পরিজন; আর ছিল ৩২ জন অশ্বারোহী ও ৪২ জন পদাতিক। কিন্তু তাঁর যাত্রা পথে বাধা প্রদান করতে ওমর ইবনে সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে কুফা থেকে ৪ হাজার সংখ্যার একটি বাহিনী পাঠান হল। তারা হজরত হোসাইন (রা.) ও তাঁর সঙ্গী সাথীদেরকে ঘিরে ফেললো। হজরত হোসাইন এ অবস্থায় রক্তপাত এড়াতে বললেন, “আমাকে ফিরে যেত দাও, অথবা কোন সীমান্তের দিকে চলে যেতে দাও অথবা ইয়াযিদের নিকট নিয়ে চল। ” কিন্তু ইমামের কোন একটি প্রস্তাব গ্রহণ না করে তাকে কুফার গভর্ণর ওবায়েদুল্লাহ ইবনে যিয়াদের নিকট আত্মসমর্পণের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। তিনি তাতে রাজি না হওয়ায় যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের ময়দানে হজরত হোসাইনের সাথীদের মধ্যে ৭২ ( বাহাত্তর) জন শহিদ হন, ভয়ঙ্কর রণ ময়দানে তিনি একা মাত্র দাঁড়িয়ে রইলেন। এক পর্যায়ে তিনি আহত হয়ে জমিনে লুটিয়ে পড়লে তাঁকে জবাই করা হয়। এমকি তাঁর লাশ থেকে পোশাকাদিও খুলে ফেলা হয়। এর পরও তাঁকে ঘোড়ার পায়ে পিষ্ট করা হয়। শুধু তাই নয়, শত্রুরা তার অবস্থান লুট করে এবং সম্মানিত মহিলাদের গায়ের চাদরও ছিনিয়ে নেয়। এর পর তাঁর এবং কারবালায় অন্য সকল শহিদদের মস্তক বিচ্ছিন্ন করে কুফায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। তার পর সকল বিচ্ছিন্ন মস্তক দামেস্কে ইয়াযিদের নিকট পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং ইয়াযিদ জমজমাট দরবারে সে গুলির প্রদর্শনী করেন।
হজরত হোসাইন (রা.) -এর ইয়াযিদের বিদ্রোহী হওয়া ছিল ঈমানের কঠিন দাবি। তাঁর এ বিদ্রোহ অবৈধ ছিল, তিনি একটি হারাম কাজ করতে যাচ্ছিলেন এমন কথা তাঁর জীবদ্দশায় বা জীবনাবসানের পরে কোন একজন সাহাবী বা তাবেয়ী বলেছেন এমন কোন প্রমাণ নেই। হজরত ওমর ইবনে আবদুর রহমান ,হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসসহ সাহাবীদের মধ্যে যারা তাঁকে কুফা যাত্রায় নিষেধ করেছিলেন, তারা তা করেছিলেন এই জন্য যে দূরদর্শীতার বিচারে তা তাঁদের কাছে ঠিক মনে হয়েছিল না।
হজরত হোসাইন (রা.)-এর শাহাদতের পেছনে রাজ্য ক্ষমতা অর্জনের উদ্দেশ্য ছিল না বরং ছিল -তওহীদের দাবি মুসলমান আল্লাহ ব্যতিত কারো আব্দ বা গোলাম নয়, এ সত্য প্রতিষ্ঠা করা।  কবি ইকবালের ভাষায়-
‘মদ আয়েশ সুলতানাত বুদে আগার,
খোদ নাগরদে বা চিনিঁ সামান সফর।’

রাজ্য যদি লক্ষ্য হতে কখনো তাঁর ,
এমন রসদ নিয়ে হয় না কভু পথের বার।
মুসলিম খোদা ভিন্ন কারো বান্দা নয় ,
ফির’আউন পদে মস্তক তার ন্যস্ত নয়।

‘মাসো আল্লাহ রা মুসলমান বান্দ নিস্ত ,
পেশ ফেরউনে সরস আফগান্দাগহ নিস্ত।’
এক কথায় খেলাফতে রাশেদাকে কাইসার ও কিসরার অনুসৃত পথে চলার স্বাধীনতা দানের চেয়ে নিজের ও পরিবার-পরিজনদের জান কোরবানি করাই হজরত হেসাইন (রা.) -এর নিকট অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। খেলাফতে রাশেদার ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবনের অসীম আবেগে তিনি এমন একটি কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে মুসলিম জাতির জন্য শাহাদতের অতলান্ত তামান্নার নির্ঝর হয়ে রইলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ