ঢাকা, শনিবার 28 October 2017, ১৩ কার্তিক ১৪২8, ৭ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিখ্যাত সিংহাসন

মোঃ জোবায়ের আলী জুয়েল : ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে যুদ্ধের প্রহসন এবং বিশ্বাসঘাতকদের দ্বারা নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলার মৃত্যু বাংলার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক ও শোকাবহ অধ্যায়। ১৭৫৬ সালে তার নানা আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর মাত্র ২৩ বছর বয়সী তরুণ নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা বাংলার মসনদে বসেন। তার শাসনকাল ছিল মাত্র ১৪ মাস ১৪ দিন।
স্ক্রাফটন লিখেছেন, দুর্ভাগ্য সিরাজ তার প্রাণভিক্ষা করে ব্যর্থ হলে শেষবারের মতো অজু করে নামাজ পড়ার সুযোগ প্রার্থনা করেন। তার নিষ্ঠুর হৃদয় ঘাতকরা তার দিকে এক ঘটি পানি ছুঁড়ে মারে এবং তরবারি ও খঞ্জরের আঘাতে তাকে হত্যা করে। তার খণ্ডিত দেহ মীর জাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে হাতির পিঠে নিয়ে মুর্শিদাবাদ শহরময় প্রদর্শন করা হয়। (স্যার পেন্ডারেলমুনের গ্রন্থে উদ্ধৃত পৃষ্ঠা নং-৫৫)।
সিরাজের মৃত্যু হলে তার স্থলাভিষিক্ত হলেন বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর। মীর জাফরের সিংহাসনে অভিষেকের দিন (২৯ জুন ১৭৫৭ খ্রি.) ক্লাইভ সদলবলে মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করেন। বাংলার রাজধানীর বিপুল ঐশ্বর্য দেখে ইংরেজ সেনাপতি দারুণ বিস্মিত হয়ে মন্তব্য করেছিলেন ‘মুর্শিদাবাদ লন্ডনের মতই ধনসম্পদ ভরা, তবে তফাৎ হচ্ছে সেখানে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের যে পরিমাণ ধন-সম্পদ রয়েছে, লন্ডনে তার কানাকড়িও নেই।
মীর জাফরের কাছ থেকে তার ব্যক্তিগত ইনাম তখনকার হিসেবে ১ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড নিয়ে মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করেন রবার্ট ক্লাইভ। সঙ্গে ছিল সঙ্গে ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর জন্য পাঠানো নগদ পাওনা ও উপঢৌকন। স্ক্রাফটন স্মরণ করেছেন, ২০০ নৌকায় বোঝাই করে সে উপঢৌকন নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতায় আর এভাবে বাংলার মানুষের রক্তে ও ঘামে বানানো সড়ক বয়ে ভারতে ইংরেজ উপনিবেশের পত্তন ঘটে।
নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা যে মসনদে বা সিংহাসনে বসে রাজকার্য চালাতেন তার নাম হলো তখ্ত মোবারক। দিল্লীর মোগল সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র শাহজাদা সুজা যখন বাংলার সুবাদার (১৬৩৪ খ্রি.) হয়ে আসেন তখন তিনি তার ব্যবহারের জন্য এই সিংহাসনটি তৈরি করেন। শাহজাহানের পুত্র সুুজার পর একে একে মীর জুমলা, শায়েস্তা খান, আযাম উস শান, ইব্রাহীম খান প্রমুখ সুবাদাররা পর্যায়ক্রমে এটাতে বসেই দৌর্দণ্ড প্রতাপে বাংলা শাসন করেছেন।
চেহেল সেতু নামে পরিচিত পরবর্তীতে মুর্শিদকুলী খাঁ চল্লিশ স্তম্ভের জমকালো প্রাসাদে দরবার তৈরি করেন। মুর্শিদকুলী খাঁ এই দরবারেই গৃহনির্মাণ করেন এবং এর প্রশস্ত হল ঘরে তিনি বাংলার সুবাদারির ঐতিহাসিক ‘মসনদ’ স্থাপন করেন। মসনদের অপর নাম সিংহাসন এবং এটি কালো মার্বেল পাথরে নির্মিত ছিল। আকৃতিতে এটি ছিল গোলাকার এবং এর ব্যাস ছিল প্রায় সাড়ে ৩ হাত। এক হাত অপেক্ষা উঁচু চারটি স্তম্ভের উপর এটি স্থাপিত ছিল। মাত্র একখ- পাথরে সমগ্র মসনদটি খোদিত হয়েছিল। সোনালী ও রূপালী ঝালর বিশিষ্ট একটি গাঢ় রঙের জমকালো চাঁদোয়া দ্বারা এর উপরিভাগ সুন্দরভাবে সুসজ্জিত ছিল। বাংলার শাসনকর্তা থাকাকালে শাহজাদা সুজা কর্তৃক এই রাজকীয় সিংহাসনটি নির্মিত হয়েছিল। মসনদের এক পার্শ্বস্থ একটি উৎকীর্ণ লিপি থেকে জানা যায় যে, খাজা নজর নামক জনৈক শিল্পী এটি তৈরি করেছিলেন। খাজা নজর লাহোরের অধিবাসী ছিলেন এবং তিনি পরে ১০৫৪ হিজরীতে (১৬৪৪ খ্রি.) মুঙ্গেরে বসতি স্থাপন করেন। মসনদটি আগ্রার সম্রাটের সিংহাসনের আদলে পরিকল্পিত হয়েছিল। রাজমহলে শাহজাদা সুজা কর্তৃক ব্যবহৃত এই মসনদ পরবর্তীকালে ঢাকার জাহাঙ্গীরগরে স্থানান্তরিত হয়। অতঃপর মুর্শিদকুলী খাঁ এই রাজকীয় সিংহাসনটি মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করেন। বাংলার সুবাদার ও পরে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর পরে নবাব সুজাউদ্দীন, নবাব সরফরাজ খাঁ, নবাব আলীবর্দী খাঁ প্রমুখ নবাবরা এটাতে বসেই দোর্দ- প্রতাপে বাংলার রাজকার্য পরিচালনা করেছেন। এর নির্মাণকাল ও নির্মাণকারী সম্পর্কে তখ্ত মোবারকে ফার্সী ভাষায় খোদিত ছিল ‘তৈয়ার শোদ তখ্ত মোবারক বতারিখ বিন্ত ওহফ্তম সহর- সাবানুলমন আজ্জাম ১০৫২ ব এত মাস কম তারিনে বান্দাহা খাজা নজরে বোখারী কি মোকামে সুঙ্গের মিন সুবা বেহার’।
বাংলা তরজমায় অর্থাৎ-(এই পরম কল্যাণময় রাজসিংহাসন সুবা বিহারের অন্তর্গত মুঙ্গের শহরে ১০৫২ সালের ২৭শে শাবান (বাংলা) তারিখে দাসানুদাস খাজা নজর বোখারী কর্তৃক নির্মিত।)
এই তখ্ত মোবারক নামক রাজসিংহাসনটি প্রথমে রাজমহলে তারপর ঢাকা এবং সবশেষে মুর্শিদাবাদে নেয়া হয়।
কারণ সুবে বাংলার রাজধানী শাহজাদা সুজার সময় থেকে আরম্ভ করে প্রথমে রাজমহল, পরে ঢাকা এবং আরও পরে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হয়। নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা এই সিংহাসনকে হীরাঝিল প্রাসাদে স্থাপন করেছিলেন। এই সিংহাসনে তিনি বসেছেন মাত্র ১৪ মাস ১৪ দিন। নবাব সিরাজের পর আর কেউ এই সিংহাসনের গৌরব রক্ষার জন্য সচেষ্ট হয়নি।
এই সিংহাসন সম্পর্কে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক শ্রী অক্ষয় কুমার মৈত্র তার ‘মীর কাসিম’ নামক গ্রন্থে লিখেছেন, ‘এই বহু মানাস্পদ মোগল রাজসিংহাসনের সঙ্গে মীর জাফরের কলঙ্ক কাহিনী চিরসংযুক্ত হইয়া রহিয়াছে। কি হিন্দু কি মুসলমান কেহউ মীর জাফরের কথায় বিস্মিত হইতে পারে নাই। পাঁচশত বছর মুসলমানের সম্মুখে কুর্নিশ করিতে করিতে হিন্দু সন্তানের পক্ষে মুসলমান শাসন অভ্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিল। তাহারা কেহ রাজা, কেহ মন্ত্রী, কেহ সেনাপতি হইয়া মুসলমানের দোহাই দিয়া শাসন ও শোষণকার্য হস্তগত করিয়াছিলেন। সিরাজ-উদ্- দৌলা তাহার মূলোচ্ছেদের চেষ্টা করায় সকলে মিলিয়া মীরজাফরের সহায়তায় সিরাজ-উদ-দৌলাকে উচ্ছেদ করেন। মুসলমানরা অনেককালের নবাব। কী ইংরেজ, কী বাঙালি সকলেই সে নবাব দরবারে জান পাতিয়া উপবেশন করিতেন, সিরাজ-উদ্-দৌলার পদভারে মেদিনী কম্পিত হইয়া উঠিত। ইংরেজদের কথা বিশেষভাবে আলোচনা করা নিষ্প্রয়োজন।
বিদেশে বাণিজ্য করিতে আসিয়া যাহার প্রাসাদে এমন স্বর্ণ সিংবাহন কুড়াইয়া পাইয়াছেন, তাহার কথায় ইংরেজগণ কোন লজ্জায় এত অল্পদিনই বিস্মিত হইবেন? মীর জাফর কর্নেল ক্লাইভের হাত ধরিয়া একবার মাত্র এই সিংহাসনে পদার্পণ করিলেন। কিন্তু তাহাতে আর অধিক দিন উপবেশন করিতে পারিলেন না। সেই সময় হইতে এই পুরাতন রাজসিংহাসন অযতেœ অনাদরে পড়িয়া রহিয়াছে।’
নবাব সিরাজের পরবর্তীকালে এই সিংহাসন অনাবৃত অবস্থায় বাইরে পড়ে থেকে রোদে শুকাতো আর বৃষ্টিতে ভিজতো। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, নবাব সিরাজের পর মীরজাফর মাত্র কয়েকদিনের জন্য এই সিংহাসনে বসেছিলেন, তারপর আর কেউ বসেননি। তারা মনে করতেন, এই সিংহাসনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের শত্রু নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার স্মৃতি। তাই এই সিংহাসনটির যতেœর ব্যাপারে পরবর্তী শাসনকর্তাদের ছিল তীব্র অনীহা।
দীর্ঘদিন ধরে রোদ-বৃষ্টি এই সিংহাসনের গায়ে কতকগুলো রেখা চিহ্নের সৃষ্টি করেছিল এবং এই রেখাচিত্র দিয়ে নাকি ফোঁটায় ফোঁটায় পানি ঝরতো। এ ব্যাপারে মুর্শিদাবাদের স্থানীয় বাসিন্দারা বিশ্বাস করতেন সিরাজ-উদ্-দৌলাকে স্মরণ করে সিংহাসনটি এখনও কাঁদে।
তবে সিংহাসনের এই কাঁদার বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইংরেজ ইতিহাসবিদ এইচ বেভারিজ তার ভাষায়, ‘The Stone has reddish stains, due to the presence of iron; And it sometimes swells so much that water trickles over the edge. Then the stone is weeping, according to the natives, for the passing away of the glory of the subahdari.
অর্থাৎ বেভারিজ সাহেবের কথা হচ্ছে, এই সিংহাসনের পাথরে লোহা মিশ্রিত আছে বলেই এখনও তা এতো স্ফীত হয় যে, রেখাচিহ্নের প্রান্ত বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ে। এটা নিশ্চয়ই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। ইতিহাসবিদ বেভারেজ সাহেব ও উপরের মন্তব্যে এই কথাই বলেছেন।
কিন্তু মুর্শিদাবাদের বাসিন্দারা যাদের কাছে অতীতের গৌরব স্মৃতি এই সিংহাসনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তাদের কাছে এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখার বাইরেও কিছু আছে, আর তা হচ্ছে তাদের মনের আবেগ অনুভূতি। তাই জনশ্রুতি আছে যে, নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলার সিংহাসন আজও তার জন্য নীরবে অশ্রু বিসর্জন করে।
এই সিংহাসনটি পরবর্তীকালে লর্ড কার্জনের শাসনামলে মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ভবনে এনে সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমানে সিংহাসনটি সেখানেই বিদ্যমান রয়েছে।
লেখক: গবেষক ও ইতিহাসবিদ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ