ঢাকা, শনিবার 28 October 2017, ১৩ কার্তিক ১৪২8, ৭ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অস্তিত্ব হুমকির মুখে রাখাইন জনগোষ্ঠী

এম এস শহিদ : অস্তিত্ব হুমকির মুখে রাখাইন জনগোষ্ঠী। পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার উপকূলবর্তী এলাকায় যুগ যুগ ধরে বসবাসরত রাখাইন জনগোষ্ঠী ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে বহুকষ্টে টিকে আছে। তবে এখন তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে। ভূমিদস্যুদের কবলে পড়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে তারা। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে পটুয়াখালী ও বরগুনার জেলার উপকূলবর্তী এলাকার ২৪২ টি রাখাইন গ্রামের ১৯৫ টিতে রাখাইনদের বসতি কমে গেছে। বিগত ২০০ বৎসরে গড়ে ওঠা রাখাইন গ্রামগুলোতে ৮১ ভাগই এখন বাঙালিরা বসবাস করছে। রাখাইনদের জনসংখ্যা হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৯০ ভাগ। ভাষা সংস্কৃতি ও ধর্ম বিশ্বাসের মূল ধারা থেকে রাখাইনরা আলাদা এবং একইসাথে তাদের খাদ্য বস্ত্র এবং বাসস্থানও কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।
পালতোলা নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দেয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে সমুদ্র উপকূলে বসতি নির্মাণের নানা কলা কৌশলের রুপকার তারা। সমুদ্র উপকূলে বসবাসরত রাখাইনরা এখন কঠোর সংগ্রাম করে বেঁচে আছে। ক্রমশ তাদের ঘরবাড়ি, ফসলের জমি, শ্মশান মন্দির, সমুদ্রগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এখন তাদের অবস্থা হয়েছে নিজ বাসভূমিতে পরবাসীর মতো। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৭৮৪ সালের দিকে কয়েকটি রাখাইন পরিবার পটুয়াখালীর রাঙাবলী এলকায় বসতি স্থাপন করে। পরবর্তীতে এখান থেকে তাঁরা পটুয়াখালী ও বরগুনার বিস্তীর্ন উপকূলে ছড়িয়ে পড়ে। জঙ্গল কেটে তারা চাষাবাদের জমি ও বসতভূমি গড়ে তোলে। রাখাইনদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও গবেষক মং তাহান বলেন, ১৯০০ সালের দিকে পটুয়াখালী বরগুনার উপকূলীয় অঞ্চলে ৫০ হাজারের বেশি রাখাইন বসবাস করতো ১৯৪৭ সালের পর রাখাইনদের এই সংখ্যা হ্রৃাস পেয়ে হয় ৩৫ হাজার। ক্রমস এ সংখ্যা হ্রৃাস পেয়েছে। দাঁড়িয়েছে আড়াই হাজারের মতো।
তবে ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্রাচার্য রাখাইনদের জনসংখ্যা সম্পর্কে তাহানের দেয়া তথ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন সত্তরের নির্বাচনে ওই এলাকার ন্যাপের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন উসুয়ে হাওলাদার। সত্তরের ওইনির্বাচনে  সারাদেশে মতো উপকূলীয় এ অঞ্চলেও ছিল আওয়ামী জোয়ার। ওই নির্বাচনে রাখাইন নেতা উসুয়ে পেয়েছিলেন ২০ হাজারের মতো ভোট। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে অবদানের রাখার জন্য তিনি বাঙালিদের কিছু ভোটও পেয়েছিলেন। তবে ওই অঞ্চলে বেশির ভাগ ভোটারই ছিলো রাখাইন। র্দীঘদিন ধরে উপকূলবর্তী ওইসব অঞ্চলে পঙ্কজ ভট্রাচার্যের যাতায়াত ছিল। তিনি তার র্দীঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, মূলত সাতচল্লিশের পর থেকে রাখাইনরা দেশ ত্যাগ শুরু করে এবং দেশ স্বাধীনের পরও তা চলতে থাকে। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের পর রাখাইনদের দেশ ত্যাগের হিড়িক পড়ে যায়। উসুলে হাওলাদারের পুত্র টেনসুয়ে বলেন, সত্তরের নির্বাচনে তার বাবা ২০ হাজারের কিছু কম ভোট পেয়েছিলেন। উসুয়ের নির্বাচনী এলাকার আওতায় ছিল পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও বরগুনার আমতলী। পরে কলাপাড়া ও আমতলী ভেঙে যথাক্রমে রাঙাবালী ও তালতলী নামে দুটি উপজেলা হয়েছে। বর্তমানে কলাপাড়া ও তালতলীতে রাখাইনদের কিছ ুগ্রাম বিদ্যমান রয়েছে। সত্তরের নির্বাচনের সময় ওই এলাকার ৪০ হাজারের বেশি রাখাইন ছিল। যে রাঙাবালী থেকে রাখাইন জনপদের উত্থান ঘটেছিল সেখানে বর্তমানে চারটি পাড়ায় ৩০ টি রাখাইন পরিবারের অস্তিত্ব রয়েছে। যাদের জনসংখ্যা ১৫০ জনের মতো। পাড়াগুলো হলো ছাতিয়ান,কাটাখালী, কানকুনি, ও ২৯ পাড়া। টেনসুয়ে বলেন বর্তমানে তারা কলাপাড়ায় বসবাস করলেও তাদের আদি নিবাস ছিল রাঙাবালীতে। রাঙাবালীতে এখনো তাদের জমিজমা রয়েছে। রাঙাবালী উপজেলার বাইশদিয়া ইউনিয়নের ছাতিয়ানপাড়া মৌজায় ওইসব জমি অবস্থিত। কিন্তুু সরকার ওইসব জমি ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত করে বাঙালীদের বন্দোবস্ত দিয়েছে যা ৯৭-ক ধারা মোতাবেক বিধিসম্মত নয়।
রাখাইনরা দেশ ত্যাগ করা শুরু করে সত্তরদশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বই দশকের শুরু পর্যন্ত। ১৯৯০ সালে সমগ্র এলাকার চার হাজারের মতো রাখাইন ছিল বলে জানা গেছে। ২০১৪ সালে কারিতাসের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে পরিচালিত সমীক্ষায় জানা গেছে, বর্তমানে উপকূলীয় এলকায়  দুই হাজার ৫৬১ জনের মতো রাখাইন বসবাস করছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা কারিতাসের রাখাইন বিষয়ক ওই প্রকল্পের সমন্বয়ক মেইনথিন প্রমিলা জানান জনসংখ্যা জরিপের সময় পটুয়াখালী ও বরগুনা অঞ্চলের প্রবীন রাখাইদের সাথে আলাপ করে তারা ২৪২ টি রাখাইন গ্রামের সন্ধান পেয়েছে- যেগুলোর মধ্যে ১৯৫ টিতে রাখাইনদের অস্তিত্ব নেই। বর্তমানে এসব গ্রামে বাঙালিরা বাস করছে।
পটুখালী কলাপাড়ায় ২৮ টি ও রাঙাবালী উপজেলায় চারটি রাখাইন গ্রাম আছে। সেই সাথে বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলায় ১৩ টি রাখাইন গ্রাম রয়েছে। গতো ২০০ বৎসরে ৮১ ভাগ রাখাইন গ্রাম বেদখল হয়ে রাখাইন শূন্য হয়েছে। রাখাইন সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৯০ ভাগ। রাখাইন পরিবারের মেয়ে মেইনথিন প্রমিলা ক্ষোভের সাথে বলেন, রাখাইন জনগোষ্ঠীর ওই অন্যায় উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে অভিযোগ দায়ের করলেও আমরা উল্লেখ করার মতো ন্যায়বিচার পাইনি। প্রমিলা আরও বলেন এভাবে চলতে থাকলে উপকূলে বসবাস রত রাখাইনদের খুঁজে পাওয়া যাবে না।
কলাপাড়ার ছআনিপাড়ার ৮০ বৎসরের প্রবীণ বৃদ্ধা প্রুমাইয়ে তার ফেলে আসা অতীত দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলনে, ১২ কী ১৩ বৎসর বয়সে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিনি যখন ছঅনিপাড়ায় স্বামীর ভিটায় আসেন তখন এ গ্রামে রাখাইন পরিবারের সংখ্যা ছিল ৬৫টি।এ গ্রামে সেসময় রাখাইন ছাড়া অন্য কোনো মানুষ ছিল না।
এ গ্রামের রাখাইনরা লম্বরু, চাপিলাই, কাউনিয়া, সুরমাসহ নানাজাতের ধান চাষ, নদীতে মাছ শিকার, জঙ্গলে পশু শিকার করে জীবন নির্বাহ করতো। এমনকি তার নিজেরাই লবণ তৈরি করে নিতেন। পায়রা বন্দর সংলগ্ন ছঅনি গ্রামে ৭০ বৎসর আগে ৬৫ টি রাখাইন পরিবার ছিল। এখন সেখানে ১২টি পরিবারের অস্তিত্ব রয়েছে। ওই গ্রামের গণসে মাতব্বরের ছেলে চিং দামো বলেন, ১০ টি পরিবার বাস করে সাতটি ঘরে এবং সব মিলিয়ে তাদের সংখ্যা ২৮। এ দশটি পরিবারের অধীনে জমি রয়েছে ১০ একর। তবে বর্তমান সরকার পায়রা বন্দরও বন্দর সংযোগ সড়কের জন্য ওই ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে।
নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গণসে মাতব্বর রাখাইন গ্রামটির কার বারি অথ্যাৎ গ্রাম প্রধান বলে পরিচিতি থাকবেন। তবে বয়োবৃদ্ধ গণসের হয়ে তার ছেলে চিংদামো কারবারির দায়িত্ব পালন করবেন। চিংদামো ক্ষোভের সাথে জানালেন, রাখাইনদের ১০ একর জমির মধ্যে ৭.৬৯ একর জমি ভূমিদস্যু বাঙালিরা নিজেদের বলে দাবি করে আদালতে মামলা করেছে। ফলে অধিগ্রহণ হয়ে গেলে রাখাইনরা মামলাধীন জমির ক্ষতি পূরণ থেকে বঞ্চিত হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ