ঢাকা, শনিবার 28 October 2017, ১৩ কার্তিক ১৪২8, ৭ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ বিজয়

সুহৃদ আকবর : যে সকল ব্যক্তি তাদের বীরত্ব, কর্ম দক্ষতা আর সাহসের জন্য আজো পৃথিবীতে অমর হয়ে আছেন তাদের মধ্যে ইখতিয়ারউদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী অন্যতম। তিনিই বাংলা বিজয়ের প্রথম নায়ক। বখতিয়ার খিলজী তার অবদানের জন্য বাংলার মানুষদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন শত শত বছর। তার কাছে বাংলার জনগণ বিশেষভাবে ঋণী। তিনি উদ্যোগী হয়ে সেন রাজাকে পরাজিত করে বাংলাকে স্বাধীন না করলে এ জাতির ভাগ্যে আরো কত যে দুর্গতি ছিল তা আল্লাহ্পাকই জানেন। তার এ অপোরশোধিত ঋণ শোধ করার জন্য আমাদের উচিত এ বীর পুরুষটির জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করা। বর্তমানে বাংলাদেশের যে অবস্থা সে অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আল্লাহ্পাক বাংলার বুকে যেন আরেকজন বখতিয়ার খিলজীকে পাঠান। দেশের সর্বত্রই এখন ধ্বনিত হচ্ছে মজলুম মানুষদের আর্তচিৎকার। এই মহান বীর মনীষী সম্পর্কে নিচে যৎসামান্য আলোচনা করছি।
মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ বিজয় উপমহাদেশের ইতিহাসে বিশেষ করে বঙ্গদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ বিজয়ের মধ্য দিয়েই এ দেশে এক নবযুগের সূচনা হয়। এ বিজয়ের মধ্য দিয়েই বঙ্গদেশে প্রাচীন যুগের অবসান এবং মধ্যযুগের আরম্ভ হয়। অন্য কথায় হিন্দুযুগের অবসান ঘটিয়ে বখতিয়ার খিলজি এদেশে মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন।
মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি জাতিতে ছিল তুর্কি। আফগানিস্তান ছিল তার জন্মস্থান। গরমশির শহরে এ মহান পুরুষ বসবাস করতেন। জীবনের এক পর্যায়ে দ্রাবিড় পীড়নে তিনি দেশ ত্যাগে বাধ্য হন। কে জানতো দেশ ত্যাগী সেই ছেলেটিই একদিন ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে যাবে। আল্লাহ্ মনে হয় এভাবেই যুগে যুগে তার কুদরতী ক্ষমতা মানুষের সামনে দৃষ্টান্ত  হিসেবে পেশ করেন। তবুও মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে না। বখতিয়ার খিলজী জীবিকা এবং ভাগ্যের অন্বেষণে এক সময় ভারতে চলে আসেন। প্রথমে সে মুহাম্মদ ঘোরী এবং কতুবউদ্দীনের অধীনে সামান্য একজন সৈনিকের চাকরি পেতে চেষ্টা চালান এবং সে চেষ্টায় তিনি ব্যর্থও হন। তবুও তিনি দমে যাননি। শুধু সাহস ও নিজের কর্মশক্তির উপর নির্ভর করেই বখতিয়ার খিলজী এদেশে আসেন। দেখতে খর্বদেহ, দীর্ঘবাহু, বিশ্রী চেহারা ছিল তার। অপরদিকে মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি ছিল অসীম সাহস আর তীক্ষè বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। মূলত তীক্ষè বুদ্ধিমত্তা, সাহস এবং কর্মদক্ষতার গুণেই তিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হয়েছিলেন। যখন বখতিয়ার খিলজী ভারতে আসেন সে সময় অযোধ্যার শাসনকর্তা ছিলেন হুসাম উদ্দিন।
মুহাম্মদ ঘোরী বখতিয়ার খিলজীকে অবহেলার চোখে দেখলেও হুসাম উদ্দিন ঠিকই বখতিয়ারকে চিনতে পারেন এবং তার অধীনে একজন সাধারণ সৈনিকের চাকরি দেন। এ সামান্য চাকরি থেকেই বখতিয়ার তার ভাগ্য গড়ার পথ করে নেন।
অল্পকিছুদিনের মধ্যেই সে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম হন। এ সেনাবাহিনী দ্বারাই তিনি আশেপাশের ছোট ছোট সব হিন্দুরাজ্য দখল করে প্রচুর ধন সম্পদের মালিক হন। এরপর একদিন সে প্রচুর উপঢৌকনসহ দিল্লীর সুলতান কুতুবউদ্দীনের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ইতোমধ্যে বখতিয়ারের বীরত্বের কথা চারদিকে প্রচার হয়ে পড়েছিল। কুতুবউদ্দীন বখতিয়ারকে পূর্বদিকের রাজ্য জয়ের নির্দেশ দেন।
এ সময় বখতিয়ারের সৈন্য সংখ্যা আরো বাড়তে লাগল। এরপর সে এদন্তীপুর বিহার বিনা প্রতিরোধে দখল করেন। বিহারের যে এলাকা দখল করা হয় তা ছিল একটা বৌদ্ধবিহার বা বৌদ্ধ ধর্মপীঠ। বখতিয়ার এর নাম দেন বিহার শরীফ। বিহার নামক নামটি নাকি ঐ বিহার থেকেই এসেছে। দিল্লীর সুলতানের কাজী মিনহাজউদ্দীন বখতিয়ারের বঙ্গ বিজয় সম্পর্কে বিস্তারিত লিখে গেছেন।
মিনহাজের ঐ বিবরণী থেকেই আমরা বখতিয়ারের বঙ্গ বিজয় সম্পর্কে জানতে পারি। মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী বিহার থেকে তার অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে ঝাড়খ-ের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে অতিদ্রুত নদীয়ার রাজা লক্ষণ সেনের প্রসাদে এসে হাজির হন। বখতিয়ার খিলজী এত দ্রুত অশ্ব চালনা করেন যে তার সাথে মাত্র আঠারো জন সৈন্য আসতে সক্ষম হয়েছে।
বখতিয়ার যখন প্রাসাদ আক্রমণ করেন তখন বৃদ্ধ রাজা লক্ষ্মণ সেন মধ্যাহ্ন আহারে রত ছিল। রাজা খাবার অসামপ্ত রেখেই পেছনের দরজা দিয়ে পলায়ন করে।
নদীয়ার পর মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি লক্ষ্মণাবতী বা গৌড় দখল করেন এবং গৌড়তেই তার রাজধানী স্থাপন করেন। বখতিয়ারের বঙ্গ বিজয়ের সময় সম্পর্কে দ্বিমত রয়েছে। তবে তা ১২০৩ বা ১২০৪ খ্রিস্টাব্দ হবে।
পৃথিবীর ইতিহাসে যে সকল মহান ব্যক্তি তাদের মেধা, কর্মতৎপরতা, সাহস এবং দেশপ্রেমের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন বখতিয়ার খিলজী তাদের মধ্যে অন্যতম।
তাইতো এত বছর পরও আমরা বখতিয়ার খিলজীকে নিয়ে আলোচনা করছি। তার জীবনী পাঠ করছি। শিক্ষা নিচ্ছি। এখানেই মনে হয় বখতিয়ার খিলজীর জীবন সার্থক হয়ে উঠেছে।
- লেখক : সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ