ঢাকা, শনিবার 28 October 2017, ১৩ কার্তিক ১৪২8, ৭ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মুসলিম শিশু-কিশোরদের নৈতিক শিক্ষা ও অনুশীলন

অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান : পৃথিবীতে সভ্য সমাজ বিনির্মাণের প্রাণকেন্দ্র হলো মানুষ। মানুষের প্রাণকেন্দ্র হলো শিক্ষা ও সংস্কৃতি। দেহ মন ও আত্মার উন্নতি সাধনই শিক্ষা। আর সংস্কৃতি হলো জীবনাচরণের দর্পণ। শিক্ষা আর সংস্কৃতির প্রথম শিক্ষক হলো মাতা-পিতা। শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হলো ভালমানের সৎ-যোগ্য আদর্শ শিক্ষক।
শিক্ষালয়-শিক্ষা-শিক্ষক-শিক্ষার্থী-পরীক্ষা-অনুশীলন শব্দগুলো একটি অপরটির সাথে সম্পৃক্ত। আজকের শিশু-কিশোররাই যেহেতু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, কাজেই তাদের সুস্থ-সবল প্রাণবন্ত দেহ ও ফুলের মত পবিত্র জীবন গঠনে নৈতিক শিক্ষা ও অনুশীলন বিষয়ে সাধারণ জ্ঞান লাভ করা অতীব জরুরি।
শিক্ষা মূলত দুই প্রকার: ১) সাধারণ শিক্ষা ২) ধর্মীয় শিক্ষা।
সাধারণ শিক্ষা: যা অর্জনে বা প্রয়োগে আমাদের জাগতিক উন্নতি ও কল্যাণ সাধন হয়।
ধর্মীয় শিক্ষা: ধর্মীয় শিক্ষা আমাদের উন্নত, নৈতিকতা, মানবতাবোধ জাগ্রত করে, জাগতিক এবং পারলৌকিক জীবনে শান্তি আনয়ন করে। উভয় ধরনের শিক্ষা অর্জন সবার ভাগ্যে জোটে না। যাদের ভাগ্যে জোটে তারাই স্বার্থক। কবি বলেন, ‘একটি প্রদ্বীপ জ্বললে পরে হাজার প্রদ্বীপ জলে।
একটি মানুষ মানুষ হলে বিশ্ব মানুষ টলে’ সুতরাং মানুষের মত মানুষ হতে হলে উভয় জ্ঞানের প্রয়োজন। যাবতীয় পরিস্থিতি আর প্রশ্নের জবাব দিতে পারে জ্ঞানীরাই। জীবন সায়াহ্নে পুরস্কৃত হয় জ্ঞানীরাই। জান্নাতে প্রবেশ করবে প্রথমে জ্ঞানীরাই। মহানবী (সা.) বলেন, ‘জ্ঞানীর ঘুম মুর্খের এবাদতের চেয়ে উত্তম, জ্ঞানী ব্যক্তি আকাশে চন্দ্র সদৃশ্য।
ইবনে-মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট থেকে কোন আদম সন্তানের দু’খানা পা তাকে ৫টি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
জিজ্ঞাসাবাদের বিষয় ৫টি হলো:
১. সমগ্র জীবন সম্পর্কে, অর্থাৎ কি কাজে জীবনকে অতিবাহিত করেছে?
২. যৌবনকাল সম্পর্কে, অর্থাৎ কি কাজে সে যৌবনকাল নিঃশেষ করেছে?
৩. ধন-সম্পদ উপার্জন, অর্থাৎ কি উপায়ে সে উপার্জন করেছে, উপার্জনের উৎস কি?
৪. উপার্জিত অর্থ ব্যয় সম্পর্কীয়, অর্থ ব্যয়ের খাতসমূহ কি?
৫. অর্জিত জ্ঞান ও আমল, অর্জিত জ্ঞানের অনুশীলন বিষয়ক জিজ্ঞাসাবাদ।
এ প্রশ্ন ৫টির উত্তর দিতে হলে আমাদের সকলকে-
আল্লাহ্র আনুগত্য রাসূলের আনুগত্য ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের আনুগত্য করা ফরয।
যেহেতু দুনিয়ার কৃত-কর্মের উপরই আখিরাতের ফলাফল নিশ্চিত করা হবে, কাজেই শিশু-কিশোরসহ আমাদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কারণ উভয় শিক্ষার্জনের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করলে নিজে যেমন উপকৃত হওয়া যায়, তেমনি পরিবার, বংশ, জাতি ও দেশের এমনকি বিশ্বের সকল মানুষ লাভবান হতে পারে।
শিশু-কিশোর বিষয়ক নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা আমাদের যা শেখায়:
* শিশুর সুন্দর নাম, বিশুদ্ধ ভাষায় শিক্ষার অধিকার বিষয়ক জ্ঞান।
* শিশুর অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিতকরণে অভিভাবকদের বিবেক জাগ্রত করার জ্ঞান।
* শিশুর বিশুদ্ধ আকিদা, সতর্কতা, নিরাপত্তা, আদব, শিষ্ঠাচার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ খাদ্য ও পানীয় বিষয়ে সতর্কতামূলক জ্ঞান লাভে শিশু অধিকার বিষয়ক জ্ঞান।
ও পুরস্কার প্রদান করে শিশুদের মনন বিকাশে সহায়তা বিষয়ক জ্ঞান।
শিশু-কিশোরদের যা করণীয়: ১. সালাম বিনিময়, সম্বোধন, কুশলাদি বিনিময় করে কথা বলা। ২. দৈনন্দিন মাসুনুন দোয়া মুখস্থ করণ ও অনুশীলন। ৩. বিনয়, ন¤্রতা, ভদ্রতা, শিষ্টাচার, আদবের অনুশীলন। ৪. তাওহীদ রিসালাত, আখিরাত বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞানার্জন। ৫. অপরিবত্রতা থেকে নিরাপদে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পবিত্রতা অর্জন করা। ৬. কথা বলা, বসা, চলাফেরার আদব রক্ষা করা। ৭. পিতা-মাতা, শিক্ষক-গুরুজনদের শ্রদ্ধা করা। ৮. কোমল ব্যবহার ও হাসিসুখে কথা বলার অভ্যাস। ৯. সহপাঠী-বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, কাজের লোকের সাথে অমায়িক আচরণ করা। ১০. নিয়মিত ক্লাসের পাঠ মুখস্থকরণ ও লেখা সুন্দর এবং লাইন সোজা ও শুদ্ধ করে লেখার অভ্যাস করা। ১১. নিয়মিত নামায আদায় যতাযসম্ভব মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামায পড়া। ১২. নামাযে পাঠকৃত আয়াত বুঝে পড়া ও অনুশীলন করা। ১৩. খেলাধুলা, উপস্থিতি বক্তৃতা, রচনা প্রতিযোগিতা, সাধারণজ্ঞান প্রতিযোগিতা, ইসলামী সঙ্গীত চর্চা ও শ্রবণ, ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন ও স্বার্থক মানুষের জীবনী পাঠ করা। ১৪. নিয়মিত কোরআন অর্থসহ পাঠ করা, টিভি-তে ভাল অনুষ্ঠান দেখা ও পত্র-পত্রিকা পাঠ করা। ১৫. প্রাথমিক স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক জ্ঞানার্জন করা। ১৬. ভোরে ঘুম থেকে উঠে দাঁত মুখ পরিস্কার করে ধোয়া। ১৭. দৈনন্দিন আত্মসমালোচনা করার অভ্যাস করা।
শিশু-কিশোরদের যা বর্জনীয়: করা, অহংকার করা, রাগ করা, জিদ বা বায়না করা, ধৃণা করা, হিংসা করা, সন্দেহ করা, গীবত করা, চোগলখুরী করা, অশ্লীল বা গালি গালাজ করা, ঝগড়া-বিবাদ করা, পরনিন্দা করা, প্রতারণা করা, উপহাস করা, কাউকে উপনামে ডাকা, শিশুদের সাথে খেলার ছলে মিথ্যা বলা ও ভয় দেখানো, অশ্লীল ছবি, টিভি ও বা ভিসিআরে অশ্লীল ছবি দেখা, অশ্লীল বই বা ম্যাগাজিন পড়া, খারাপ দুশ্চরিত্র বন্ধু-বান্ধবদের থেকে নিরাপদে থাকা। ছেলে হোক মেয়ে হোক বয়োসন্ধিকালে এক বিছানায় শোয়া বা রাত্রী যাপন করা হস্তমৈথুন করা। যিনা করা দুশ্চিন্তা পরিহার করা, যাবতীয় নেশা দ্রব্য বা মাদকদ্রব্য পরিহার করা। অন্যের ব্যবহার করা খাদ্যদ্রব্য গ্রহণকালে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা, হারাম দ্রব্য বা মূর্তির চরণে বা কোন দরবারে পেশকৃত খাবার, মাযার কিংবা কবরে সিজদাহ বা কিছু কামনা করা ইত্যাদি। ছাদে খেলাধুলা বা ঘুড়ি উড়ানো। সকল কাজেই তাড়াহুড়া করা। ক্লাসে বিলম্বে উপস্থিত ও নামাজে উদাসীনতা। ব্যবহৃত রেড, সুঁচ-সিরিঞ্জ বা দূষিত রক্ত গ্রহণ করা।
শিশু-কিশোরদের যা জানা প্রয়োজন: ১. তওবা-গুনাহ ধ্বংস করে। ২. শিরক-ঈমান ধ্বংস করে। ৩. দীন-গোমরাহি ধ্বংস করে। ৪. রাগ-বুদ্ধি ধ্বংস করে। ৫. অহংকার-্ঞান ধ্বংস করে। ৬. মিথ্যা-আস্থা ধ্বং করে। ৭. চিন্তা-জীবন ধ্বংস করে। ৮. পরনিন্দা-আমল ধ্বংস করে। ৯. ন্যায় বিচার-জুলুম ধ্বংস কের। ১০. সদকাহ-মুছিবত ধ্বংস করে। ১১. নেশা-শরীর ধ্বংস করে। ১২. অশ্লীলতা-চরিত্র ধ্বংস করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ