ঢাকা, রোববার 29 October 2017, ১৪ কার্তিক ১৪২8, ৮ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পায়জামা

খালীদ শাহাদাৎ হোসেন : রাজপাট হাইস্কুল সংলগ্ন প্রাইমারী স্কুলের থার্ড মাস্টার আঃ হক মোল্লা। তবে এলাকায় তিনি হক সাহেব নামেই অধিক পরিচিত। জনশ্রুতি আছে তিনি সাতবার ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ফেল করে শেষে জিটি পাস করে স্কুল শিক্ষকতা শুরু করেন। রাজপাট একটি বড় ও প্রসিদ্ধ গ্রাম। বহু সম্ভ্রান্ত লোকের বাস এই গ্রামে। দীর্ঘদিন একই স্কুলে শিক্ষকতা করায় হক সাহেবের অনেক ছাত্র দেশের সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদ অলংকৃত করেছেন। স্কুলের সাথেই মস্ত বাজার, তাছাড়া সেখানে শত্রু ও মঙ্গলবার হাট বসে। বহু লোকের সমাগম হয় ঐ হাটে। প্রতি হাটেই এই স্কুলের প্রাক্তন দুই-চারজন ছাত্রের সাথে হক সাহেবের দেখা হয়। সেই ছাত্ররা যখন স্যারের পায়ে হাত দিয়ে তাঁকে সালাম করতো আবেগে তিনি তাদেরকে জড়িয়ে ধরে প্রাণভরে দোয়া করতেন।
আগেই বলেছি হক সাহেবের পুঁথিগত লেখাপড়ায় পাশ সার্টিফিকেট ছিল না। তবে দাপ্তরিক লেখাপড়ায় বেশ দখল ছিলো। যে কোন অনুষ্ঠানে বাংলা-ইংরেজিতে অনর্গল বক্তৃতা দিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করতে পারতেন। ইংরেজিতে পিটিশন লেখায় পটুতা ছিল অসাধারণ। একবার থানা শিক্ষা অফিসারকে কোন এক বিষয়ে বাংলা না ইংরেজিতে দরখাস্ত লিখতে হবে জানতে চাওয়া হলে পারলে ইংরেজিতে লেখেন মন্তব্য করেন। হক সাহেব পকেট থেকে কাগজ-কলম বের করে সেই কলম না তুলে এমনভাবে লেখা শুরু করলেন যে তা দেখার জন্য টিইও সাহেব নাকি চেয়ার তেকে দাঁড়িয়ে তার ইংরেজি লেখা দরখাস্ত দর্শন করেছিলেন। হক সাহেব একবার একুশে ফেব্রুয়ারির আলোচনা সভায় ইংরেজিতে বক্তৃতা শুরু করেন। শ্রোতাদের আপত্তির কারণে দুঃখ প্রকাশ করে বাংলায় সারগর্ভ আলোচনা পেশ করেন।
অন্যদের তুলনায় হক সাহেবের কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি কাউকে টাকা ধার দিয়েছেন না দিয়েছেন মনে রাখতে পারতেন না। স্কুলে যেখানে ছাতা রাখা হতো যাবার সময় ছাতার দিকে না তাকিয়ে হাতের কাছে যেটা পেতেন ওটা নিয়েই চলে যেতেন। রাস্তায় চলার সময় একা একা কথা বলতেন।
দাবি-দাওয়া সংক্রান্ত গোছানো ভালো বক্তৃতা দেয়ার যোগ্যতার কারণে থানা শিক্ষক সমিতি তাকে সেক্রেটারি প্রদের দায়িত্ব প্রদান করে। প্রতিমাসে একবার সমিতির সভায় হক সাহেবকে উপস্থিত হতে হতো। রাজপাট হতে থানার দুরুত্ব প্রায় সাত-আট মাইল। রাসাতা ভাল নয়, ধানক্ষেত-পাটক্ষেত, খাল-বিল পাড়ি দিয়ে মাদামাটির সরু পথেই হেঁটে যেতে হতো। অনেক সময় পরনের কাপড়ে কাদা লেখে ময়লা হতো।
কোন একবার হক সাহেব থানা প্রাইমারী শিক্ষক সমিতির সভায় উপস্থিত হওয়ার জন্য খুব ভোরেই রওনা দিলেন। নিশি ও শিশির ভেজা রাস্তা পাড়ি দিতে তিনি পায়জামা না পরে লুঙ্গি পরেই সেদিন যাত্রা করলেন।
আর ভাঁজ করা পায়জামা বোগলচাপা দিয়ে তার স্বভাপবসুলভ অভ্যাসে আজ কি কি বিষয়ে বলবেন সেই বক্তৃতা দিতে দিতে পথের দুই পাশের ধানক্ষেত, পাটক্ষেতের মধ্যদিয়ে হেঁটে থানার সি.ও অফিসের সামনে শানবান্ধা বড় পুকুর পাড়ে এসে থামলেন। ভাল করে পা ধুয়ে পাজামা পরার জন্য বোগলে হাত দিয়ে দেখেন সেখানে পাজামা নেই। তিনি ঠাহর করতে পারেন নাই রাস্তায় বক্তৃতা দেয়ার সময় কোন ফাঁকে কোথায় তিনি সেই পায়জানা হারিয়েছেন। হক সাহেব অবাক দৃষ্টিতে চারদিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে মন্তব্য করলেন: ‘বোগল তো চেপেই রেখেছি, পায়জামা গেল কই?”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ