ঢাকা, সোমবার 30 October 2017, ১৫ কার্তিক ১৪২8, ৯ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার অভিমুখে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর॥ পথে পথে জনতার ঢল

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওয়ানা করেন বেগম জিয়া। পথে পথে জনতার ঢল নামে তাকে স্বাগত জানাতে -সংগ্রাম

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, কক্সবাজার থেকে : রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করার উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাবার পথে বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারদের সশস্ত্র হামলার মাধ্যমে নেতাকর্মীদের মাঝে যে ভীতির সঞ্চারের চেষ্টা হয়েছিল, বন্দর নগরী চট্টগ্রামে তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। শনিবার রাতেই লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী বেগম জিয়াকে চট্টগ্রামে স্বাগত জানান। নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের এমন ভালোবাসা পেয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। গতকাল রোববারও বীর চট্টলার মানুষ বেগম জিয়াকে ভালোবাসায় সিক্ত করেছেন। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ থেকে নগরীর কর্ণফুলি ঝুলন্ত ব্রীজ পর্যন্ত এই যাত্রাপথে লাখো নেতাকর্মী বেগম জিয়াকে স্বাগত জানান। তারা ফেনীতে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীর ক্যাডারদের হামলার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসেন। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ যাত্রাপথে জনতার ¯্রােত দেখা গেছে। রাস্তার দুইপাশে ছিল নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি। তাদের শ্লোগানে ছিল প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ। নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের প্রতিধ্বনি ছিল একটাই ‘খালেদা জিয়ার ভয় নাই রাজপথ ছাড়িনাই, খালেদা জিয়ার কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’। দীর্ঘ এই রাস্তায় নেতাকর্মীদের ঢল উপেক্ষা করে রাত ৮টার দিকে কক্সবাজার সার্কিট হাউজে এসে পৌঁছান বেগম জিয়া। আজ সোমবার তিনি উখিয়ায় ৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন ও দশ হাজার রোহিঙ্গা পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করবেন। এজন্য বিএনপির পক্ষ থেকে সার্বিক প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হয়েছে।

এদিকে ফেনীতে গাড়ি বহরের হামলার ঘটনায় বিএনপি চেয়ারপার্সন ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা বেগম খালেদা জিয়া বিস্মিত হয়েছেন, ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছেন। শনিবার ঘটনার পর চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে উপস্থিত নেতাদের কাছ থেকে হামলার বর্ণনা শুনে অবাক হন। বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে খালেদা জিয়ার এই মনোভাবের কথা জানা গেছে। রাতে এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। 

চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস বলেন, হামলার খবর শোনার পর বেগম জিয়া চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন। শনিবার হামলার ঘটনার পর সন্ধ্যায় ফেনী সার্কিট হাউজ এবং পরে চট্টগ্রাম নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন খালেদা জিয়া। এ সময় তিনি হামলার ঘটনা কারা ঘটিয়েছে তা জানতে চান। ফেনী নেতারা এ ঘটনা কারা ঘটিয়েছে তাদের পরিচয় দেন। 

বেগম জিয়ার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, হামলা কিংবা বাধার উদ্দেশ্য একটাই, তা হলো বেগম জিয়াকে জনগণের কাছে যেতে বাধা দেওয়া। তারপরও তিনি অনড়। জনগণের ভালোবাসাই তার পাথেয়। সেই মনোবল নিয়েই তিনি সব বাধা উপেক্ষা করে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখতে উখিয়া যাবেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান বলেন, এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলার কথা শুনে বেগম জিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ বিতরণের কার্যক্রমে যাওয়ার পথে এই ধরনের হামলা হীন উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। 

গতকাল রোববার সকালে আহত সাংবাদিকদের দেখতে চট্টগ্রামের একটি হোটেলে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, হামলাকারীরা চিহ্নিত। তারা ক্ষমতাসীন দলের চিহ্নিত সন্ত্রাসী। পত্রিকায় তাদের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। 

এ পরিস্থিতির মধ্যেও গতকাল রোববার কক্সবাজার সফরের দ্বিতীয় দিনেও বেগম জিয়া পথে পথে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হয়েছেন। পথে লোক সমাগম দেখে অভিভূত হন তিনি। কক্সাবাজারের উদ্দেশে দুপুর ১২ টা ২০ মিনিট চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ থেকে রওনা হন। সার্কিট হাউজের গেইট থেকে হাজার হাজার নেতা-কর্মী তাকে অভ্যর্থনা জানান। নগরির নিউমার্কেট থেকে কর্ণফুলি ব্রীজ পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য ছিল। শহর পার হতেই এক ঘণ্টা পার হয়ে যায়। নেতা-কর্মীদের ভিড় ঢেলে রাত ৮টায় কক্সাবাজার পৌঁছান। আজ সকালে তিনি উখিয়া যাবেন। সেখানে ১০ হাজার রোহিঙ্গা পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করবেন। তিনি উখিয়ার বালুখালী-২, ময়নারগোনা ৪টি রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন ও তাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করবেন। সেখানে ড্যাবের মেডিক্যাল ক্যাম্পও পরির্দশন করবেন। 

সর্বশেষ ২০১২ সালের জুন মাসে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ পল্লীতে হামলা ও ভাংচুরের পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে কক্সবাজারে যান খালেদা জিয়া। তখনও তিনি ঢাকা থেকে সড়কপথে প্রথমে চট্টগ্রাম এবং পরে সেখান থেকে কক্সবাজার যান।

গতকাল সন্ধ্যায় কক্সবাজার পৌঁছালে সার্কিট হাউজে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, আব্দুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, জেলা সভাপদি শাহজাহান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক শামীম আরা স্বপ্না, সাবেক সাংসদ লুৎফর রহমান কাজল, সালাহউদ্দিন আহমেদের স্তী হাসিনা আহমেদসহ জেলা নেতৃবৃন্দ তাকে অভ্যর্থনা জানান। কক্সবাজার প্রবেশ পথ থেকে খালেদা জিয়ার গাড়ি মোটর শোভাযাত্রাসহকারে নেতা-কর্মীরা সার্কিট হাউজে নিয়ে আসে। 

ব্যাপক শোডাউন: চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের ১৭০ কিলো মিটারের পথে পথে অর্থাৎ কর্ণফুলী ব্রিজ, বোয়ালখালী, পটিয়া, চন্দনাইশ, দোহাজারী, সাতকানিয়া, লোহাগড়া, রামু প্রভৃতি স্থানে হাজার হাজার নেতা-কর্মী রাস্তার দুই ধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে মুহুর্র মুহুর্র করতালি ও স্লোগান দিয়ে তাদের নেত্রীকে শুভেচ্ছা জানায়।

কর্ণফুলীর সেতুর কাছে দক্ষিণ জেলা সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, কর্নফুলী ব্রিজ সংলগ্ন পুরাতন ফিসারিজ মার্কেট সড়কে চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন, ফিরিঙ্গি বাজারে স্থানীয় নেতা শামসুল আলম ও এরশাদ উল্লাহ এবং বোয়ালখালীতে সাবেক সাংসদ সারোয়ার জামাল নিজাম, সাতকানিয়ায় মজিবুর রহমান, চন্দনাইশে মহসিন জিল্লুর, মঞ্জুর আলম তালুকদার, মিজানুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে নেতা-কর্মী-সমর্থকরা বিশাল শোডাউন করে। এসব স্থান দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের গাড়িবহর এগিয়ে নিতে নিরাপত্তা কর্মীদের বেশ বেগ পেতে হয়।

পটিয়ার দুইটি হাতিকে সাজিয়ে খালেদা জিয়াকে শুভেচ্ছা জানায় চট্টগ্রাম জেলা দক্ষিণের সহসভাপতি এনামুল হক এনামসহ নেতা-কর্মীরা। এরপর পটিয়া বাজারে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক গাজী মোহাম্মদ শাহজাহান জুয়েলসহ হাজার হাজার নেতা-কর্মীর মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে তাদের নেত্রীকে শুভেচ্ছা জানায়।

বান্দরবন থেকে আসা উপজাতীয় নারীরাও সাতকানিয়ার কেরানী হাটের আগে মিসেস সা চিং পুরো জেরি ও চকোরিয়ার লামাবাজারে জেলা সভাপতি ম্যা মা চিং ও সাধারণ সম্পাদক জাবেদ রেজার নেতৃত্বে বান্দরবনের উপজাতীয় নেতা-কর্মীরা রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়াকে শুভেচ্ছা জানায়।

ভারতে চিকিৎসাধীন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের পক্ষ থেকে চকোরিয়া পৌরসভা সড়ক ও আজিজনগরে নেতা-কর্মীরা দুই পাশে দাঁড়িয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনকে শুভেচ্ছা জানায়। কক্সাবাজার আসার পথে লোহাগড়ায় খালেদা জিয়াকে বহনকারী গাড়ির টায়ার পাংচার হয়। পরে তা মেরামত করে তিনি আবার যাত্রা করেন। 

এদিকে সকালে গণমাধ্যমের আহত সাংবাদিকদের দুইটি হোটেলে দেখতে গিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত পত্রিকায় দেখলাম, ছবিতে দেখলাম, এরা চিহ্নিত। খুব পরিস্কার করে বুঝা যাচ্ছে যে, এরা সরকারি দল আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগ অথবা যুব লীগের ক্যাডার। এই ছাত্রলীগ-যুব লীগের ক্যাডাররা যে এটা করেছে, এটা পত্র-পত্রিকায় এসেছে। তাদের আইডেনটিটি এসে গেছে। তারা (সন্ত্রাসীরা) চিহ্নিত। সরকারের উচিৎ হবে অবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আপনাদের (গণমাধ্যম) ওপর আক্রমণ, ম্যাডামের ওপর আক্রমণ হলো, আমরা ওপরও আক্রমণ হয়েছিলো- তাহলে তো আর কিছুই বাকী থাকলো না।

গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আপনারা গণমাধ্যমের কর্মীরা সব সময় নিরপেক্ষ থাকেন। কাজ করেন, সবরকম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন, আপনাদের কোনো দল নেই, আপনারা সত্যকে তুলে ধরতে চান। সেই ক্ষেত্রে যদি আপনারা সেই অধিকারটুকু হারিয়ে ফেলেন তাহলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা তো আমরা দেখতে পারছি না।

রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিতরণে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের কথা উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেখবেন আমাদের এবার গাড়িবহর খুবই ছোট। ইচ্ছা করেই আমরা মানা করছি যে, বেশি গাড়ি না যেতে যাতে যানজট সৃষ্টি না হয়। যানজট যতটুকু সৃষ্টি হয়েছে ম্যানেজমেন্টের দুর্বলতার কারণে হয়েছে। পত্র-পত্রিকায় দেখেছেন কতগুলো তাও বলেছেন। দিস ইজ দ্যা মিনিমাম। আগে আমাদের এক হাজার গাড়ি যেতো- আপনারা দেখেছেন। আমরা এটা সচেতনভাবে এবার বহরে গাড়ির সংখ্যা কম রেখেছি। আমরা চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যেতে নেতা-কর্মীদের মানা করেছি যাতে ওখানে কোনো সমস্যা না হয়।

তিনি বলেন, পত্রিকায় চলে এসছে, ছবি এসছে, কে স্থানীয় ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট বা সেক্রেটারি সেসব তো চলে এসেছে- এই যে মোটর সাইকেল নিয়ে আছে, তারা লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখন বুঝাই যাচ্ছে যে, সরকারি দলের লোকজন এটা করেছে।

পুলিশের ভূমিকার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে তারা মোটামুটি ভালো কাজ করেছে। কিন্তু নিরাপত্তার ব্যাপারে যেমন সাংবাদিকদের ওপর যখন আক্রমণ করলো তখন তো তারা দাঁড়িয়েছিলো। তারা তো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কয়েকটা জায়গায় তাদের রেসপন্সও পাওয়া যায়নি। ফেনীতে যখন আক্রমণ হলো আমরা বার বার করে এসপিকে বলেছি, ওসিকে বলেছি- আপনারা এগুলো দেখেন। তারা বলেছে আমরা দেখছি। যখন সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ হওয়ার পর আমরা ঢাকাতেও কথা বলেছি।

খালেদা জিয়ার সফরে নিরাপত্তার বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শকের নিশ্চয়তার বিষয়টি উল্লেখ করেন বিএনপি মহাসচিব।

আওয়ামী লীগ বলেছে নিজের কোন্দলে এই আক্রমণ হয়েছে- এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ফখরুল বলেন, আপনি সত্যকে যদি অস্বীকার করেন এটা হচ্ছে ক্রাইম। ওই ক্রিমিনালদেরকে পার্টি থেকে এক্সপেল করা, পার্টি থেকে বহিষ্কার করা উচিৎ ছিলো যদি তারা (ক্ষমতাসীন) আন্তরিক হতেন। ডিফেন্ড করার অর্থ হচ্ছে যে তারা সন্ত্রাসকে প্রশ্রয়-আশ্রয় দিচ্ছেন, সন্ত্রাসকে লালন করছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিতে যাচ্ছেন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এটা নিয়ে আমরা কোনো রাজনীতি উদ্দেশ্যে না, পুরোপুরি ত্রাণ দেয়ার উদ্দেশ্যে তিনি যাচ্ছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ