ঢাকা, সোমবার 30 October 2017, ১৫ কার্তিক ১৪২8, ৯ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

‘ছবি তুলেই ত্রাণ কেড়ে নেয় মিয়ানমারের সেনারা’

ত্রাণ নিয়ে মিয়ানমারের সেনাদের প্রতারণার কথা বলছেন এক রোহিঙ্গা

সংগ্রাম ডেস্ক : ত্রাণ নিয়ে মিয়ানমারের সেনাদের প্রতারণার কথা বলছেন এক রোহিঙ্গা। ‘মিলিটারিরা মাঝে মাঝে মংডুর বিভিন্ন পাড়ায় এসে ত্রাণ দেওয়ার কথা বলে। ত্রাণ সংগ্রহের সময় এবং স্থান তারাই ঠিক করে দেয়। আমরা ত্রাণ সংগ্রহের জন্য ওই স্থানে গেলে তারা আমাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলে। আবার ত্রাণের বস্তা হাতে দিয়েও ছবি তোলে। কিন্তু ছবি তোলা শেষ হওয়ার পর ত্রাণগুলো আবার তারা কেড়ে নেয়। পরে আমাদের সামান্য পরিমাণ ত্রাণ দিয়ে তাড়িয়ে দেয়।’মোবাইল ফোনে এই কথাগুলো জানান মিয়ানমারের মংডু এলাকার সিকদারপাড়ার বাসিন্দা বশির আহমেদ। বাংলাট্রিউন।

বশির বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য মংডুর দংখালী চরে গত এক সপ্তাহ ধরে অবস্থান করছেন। বশির আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ত্রাণ দেওয়ার ছবি তুলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বিশ্বের কাছে প্রমাণ করতে চাইছে তারা রোহিঙ্গাদের সাহায্য করছে। যাতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাইরের দেশগুলো মিয়ানমারের ওপর চাপ দেওয়া বন্ধ করে দেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘তারা আসলে আমাদের তেমন কোনও ত্রাণ দেয় না, সামান্য পরিমাণ এক-দেড় কেজি চাল দেয়। কিন্তু এই সামান্য ত্রাণের বিপরীতে তারা বড় বড় ত্রাণের বস্তা আমাদের হাতে দিয়ে ছবি তুলে নেয়।’

বশিরের মুঠোফোন থেকে এসময় কথা হয় বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য দংখালী চরে অবস্থান করা আরেক রোহিঙ্গা জাকির মিয়ার সঙ্গে। মিয়ানমারের বুথিডং এলাকার বাসিন্দা জাকির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মিলিটারিরা বাসায় এসে বলে গিয়েছিল ত্রাণ নিতে ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমরা ত্রাণ সংগ্রহের জন্য যাইনি। যারা কিছুদিন আগেও আমাদের গুলি করে হত্যা করতো, তাদের কাছ থেকে ত্রাণ নেওয়ার কোনও ইচ্ছে আমাদের নেই। তারা মূলত বিশ্ববাসীকে বোকা বানানোর জন্য ত্রাণ দেওয়ার নামে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে বালুখালী ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া নতুন আসা একাধিক রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা হয়। বৃহস্পতিবার (২৬ অক্টোবর) রাতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে শুক্রবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে বালুখালী ক্যাম্প-১ এ এসে আশ্রয় নিয়েছেন বুচিডং এলাকার বাসিন্দা জাফর আলম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুই মাসের মতো ঘরবন্দি ছিলাম। শেষ দিকে এসে যখন বাসায় মজুদ করা চাল-ডাল ফুরিয়ে যায়, তখন অনেকদিন না খেয়ে থেকেছি। কিন্তু মিয়ানমারের সেনাদের কাছ থেকে কোনও ত্রাণ পাইনি। তাই বাধ্য হয়ে শুক্রবার বাংলাদেশে চলে এসেছি।’

জাফর আলম বলেন, ‘শুনেছি যারা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের কিছু চাল দেওয়া হয়। তবে এই ত্রাণ পরিমাণে অনেক কম। আমার এক প্রতিবেশী সেনাদের কাছ থেকে ত্রাণ পেয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, সরকারের লোকজন ত্রাণ দেওয়ার ছবি তুলে সেগুলো আবার কেড়ে নিয়ে যায়। পরে অল্প কিছু ত্রাণ দেয়।’

একই অভিযোগের কথা জানিয়েছেন শুক্রবার আসা আরেক নতুন রোহিঙ্গা রেহানা। তিনিও পরিবারের সঙ্গে এসে বালুখালী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। রেহানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুরুর দিকে মিলিটারিরা পুরুষদের ধরে নিয়ে হত্যা করলেও এখন আর তা করছে না। নারীদের ওপর জুলুমও অনেক কমেছে। সরকারের লোকজন এসে আমাদের মিলিটারিদের খোলা ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়ার জন্য বলেছে। কিন্তু আমরা আশ্রয় নেইনি। ওইসব ক্যাম্পে নিয়মিত খাবার দেওয়া হয় না। মাঝে মধ্যে ত্রাণ দিলেও সেটা অনেক কম। অনেক সময় একই ত্রাণের বস্তা কয়েকজনের হাতে দিয়ে ছবি তুলে পরে সবার মাঝে ওই বস্তা ভাগ করে দিচ্ছে।’

প্রসঙ্গত, গত ২৪ আগস্ট পুলিশ চেকপোস্টে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (এআরএসএ) হামলার অভিযোগে রাখাইন রাজ্যে অভিযানে নামে সেই দেশের সেনাবাহিনী। অভিযানে মংডু, বুথিডং, রাথিডং এলাকার শত শত রোহিঙ্গাকে গুলি করে হত্যা ও আগুনে পুড়িয়ে মারা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সেনাবাহিনীর অব্যাহত নির্যাতনে মিয়ানমার ছেড়ে ছয় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে আর্ন্তজাতিক অঙ্গণেও কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়ে মিয়ানমার। আর্ন্তজাতিক চাপের মুখে সম্প্রতি তারা মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করে। তবে গত ২ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার সরকারের চাপে রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে ত্রাণ সরবরাহ স্থগিত করার ঘোষণা দেয় জাতিসংঘ। সেই সময় নিরাপত্তাজনিত সংকটকে কারণ দেখিয়ে সংস্থাটি ত্রাণ সরবরাহ বন্ধের ঘোষণা দিলেও পরবর্তীতে জানা যায়, মিয়ানমার সরকারই তাদেরকে কাজ করার অনুমতি না দেওয়ায় সংস্থাটি ত্রাণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। আর্ন্তজাতিক চাপের মুখে সম্প্রতি রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় জাতিসংঘকে আবারও ত্রাণ তৎপরতার সুযোগ দিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার।

রোহিঙ্গাদের ধান কেটে নিচ্ছে সরকার : মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা ফসলি জমি থেকে ধান কেটে নিতে শুরু করেছে দেশটির কৃষি অধিদফতর। শনিবার মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম দ্য গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমারের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, রাখাইনের মংডু অঞ্চলের ৭১ হাজার একর জমি থেকে ধান কেটে নেওয়ার সরকারি আদেশ পেয়ে ধান কাটতে শুরু করেছে কৃষি অধিদফতর। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি’র পক্ষ থেকেও ধান কাটার খবরটি নিশ্চিত করা হয়েছে। এই ধান দিয়ে কী করা হবে, তা নিয়ে কিছু জানা যায়নি। তবে এই কর্মকাণ্ড মানবাধিকার কর্মীদের হতাশ করেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা সু চির দেওয়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি সংশয়ের মুখে পড়েছে।গত আগস্টের শেষের দিকে শুরু হওয়া সহিংসতায় মিয়ানমারের এই সীমান্ত অঞ্চলের বেশির ভাগই এখন জনমানবশূন্য। সহিংসতা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে প্রায় ৬ লাখ রোহিঙ্গা। দেশটির বেসামরিক সরকারের নেতা অং সান সু চি রাখাইনের উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের কাজে দেখভাল করার জন্য একটি কমিটি গঠন করার পর ধান কাটার এই উদ্যোগ নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, শনিবার রাখাইনের মংডুর ৭১ হাজার একর জমির ধান কাটতে শুরু করেছে সরকার। ব্যাপক সহিংসতায় মংডুর অধিকাংশ এলাকা থেকে পালিয়েছে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা।বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে ডাকা হয়। মংডু কৃষি বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা থেইন ওয়েই বলেন, আমরা আজ থেকে মিও থু জি গ্রামের জমি থেকে ধান কাটতে শুরু করেছি। আমরা বাঙালিদের কিছু ধানক্ষেত কাটতে যাচ্ছি; যারা বাংলাদেশে পালিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের অন্য এলাকা থেকে ধান কাটার জন্য শ্রমিকদেরকে নিয়ে আসা হবে। তবে ওই ধানের কী হবে সে ব্যাপারে জানতে মিয়ানমারের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে এএফপি। এএফপি বলছে, মিয়ানমার সরকারের এই পদেক্ষেপের ফলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় পালিয়ে যাওয়া ৬ লাখের বেশি রোহিঙ্গার রাখাইনে ফেরা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক ব্যাপক চাপের মুখে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবসনের অঙ্গীকার করেছে। যারা সেদেশের বাসিন্দা হিসেবে প্রমাণ দেখাতে পারবেন শুধুমাত্র তাদেরকেই ফেরত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অং সান সু চি । প্রত্যাবাসনের এই পরিকল্পনা এখনো আঁধারেই রয়েছে। দেখা দিয়েছে বেশ কিছু প্রশ্নের; কে তাদেরকে ফেরার অনুমতি দেবে, তাদেরকে কীভাবে ফেরত নেয়া হবে এবং কীভাবে তারা ওই অঞ্চলে বসবাস করবেন তার যথাযথ উত্তর নেই। এরইমধ্যে রোহিঙ্গাদের ফসল কাটতে শুরু করেছে তারা।রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করতেই একাজ করা হচ্ছে বলে মিয়ানমার সরকারের ব্যাপক সমালোচনা করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ফিল রবার্টসন বলেছেন, ফসল কাটায় সরকারি কর্মকর্তার নেতৃত্ব দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যে রোহিঙ্গারা এসব জমিতে বীজ বপন করেছিলেন সেটার চেয়ে ফসল কাটতেই বেশি মনযোগী মিয়ানমার সরকার। তিনি মনে করেন, এসব বলপ্রয়োগের অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের রাখাইন থেকে বার্তা দেয়া হচ্ছে যে, ‘তোমাদের যা ছিল; এখন তা আমাদের এবং তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে না।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ