ঢাকা, সোমবার 30 October 2017, ১৫ কার্তিক ১৪২8, ৯ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এনআরবিসহ দু’টি ব্যাংকের অনিয়ম তদন্তের সুপারিশ

সংসদ রিপোর্টার: সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক অধিক পরিমাণে এগ্রেসিভ লোন দিচ্ছে। ইসলামী ব্যাংকের এই অস্বাভাবিক এগ্রেসিভ লোনের বিষয়ে ব্যাংককে সতর্ক করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে দশম জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ২১তম বৈঠকে এ সতর্ক করা হয়। কমিটির সভাপতি ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক এর সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কমিটি সদস্য অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম,এ, মান্নান, নাজমুল হাসান, মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী, ফরহাদ হোসেন, মোঃ শওকত চৌধুরী এবং আখতার জাহান।
কমিটির বৈঠকে দেওয়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফারমার্স ব্যাংক আর্থিক খাতে ‘সিস্টেমেটিক রিস্ক’ সৃষ্টি করছে। সরকার দলীয় সংসদ সদস্য মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মালিকানাধীন এই ব্যাংকটির দায় পরিশোধের সক্ষমতা নেই। এটি সাধারণ আমানতকারী ও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে উচ্চসুদে অর্থ নিয়ে চলছে। এ কারণে ব্যাংকটির ওপর আমানতকারীদের আস্থা নষ্ট হতে পারে  বলে মনে করে অর্থ মন্ত্রণালয়। ফারমার্স ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা না মেনে নতুন করে ঋণ দিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ও ফারমার্স ব্যাংকের অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা শেষে কমিটি ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান দু’টির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফারমার্স ব্যাংক ২০১৩ সালে তাদের কার্যক্রম শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই ব্যাংকটির ঋণ নিয়মাচার অনুসরণ ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শিথিলতা দেখা দেয়। তারা নীতিমালা অনুসরণ না করে গ্রাহকদের ঋণ দিয়েছে। এ সময় অস্তিত্ববিহীন/সাইন বোর্ড সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ঋণ নিয়মাচার লঙ্ঘন করে নিজ ব্যাংক ও অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দিয়েছে। অপর্যাপ্ত/ত্রুটিপূর্ণ জামানতের বিপরীতে ঋণ দিয়েছে। এক ঋণগ্রহীতার সর্বোচ্চ ঋণসীমার অতিরিক্ত ঋণ সুবিধা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত একবছর যাবত ফারমার্স ব্যাংকে তারল্য সংকট রয়েছে। বর্তমানে তা তীব্র আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত নগদ জমা  (সিআরআর) সংরক্ষণে ব্যাংকটি ক্রমাগতভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। সর্বশেষ গত অক্টোবর ১৭ তারিখে ব্যাংকটির গ্রাহক আমানত ৫ হাজার ১২৫ কোটি টাকা ও আন্তঃব্যাংক আমানত ৫৩৫ কোটি টাকা।
নতুন ঋণ মঞ্জুরি ও ঋণসীমা বাড়ানোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ফারমার্স ব্যাংক তা অনুসরণ করছে না উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়,  জুন, ২০১৭ ত্রৈমাসিকে ঋণ প্রবৃদ্ধি আমানত প্রবৃদ্ধির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় ঋণ-আমানত হার দাঁড়িয়েছে ৮৮ দশমিক ৭০ শতাংশ। ব্যাংকটির ওপর দ-সুদ ও জরিমানা পরিমাণ গত এক বছরে দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকটির মোট ৫৪টি শাখার মধ্যে ২৮টি শাখাই লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে বৈঠকের পর সংসদীয় কমিটির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেন, ‘ব্যাংকগুলো যেসব অনিয়ম করেছে পড়লেই গা শিউরে ওঠে। এসব অনিয়মের দায় বোর্ডকে নিতে হবে। তারা দায় এড়াবে কিভাবে?’
প্রভাবশালী চেয়ারম্যানের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফারমার্স ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভয় পায় কিনা, জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ড. রাজ্জাক বলেন, কিছুটা তো পায়ই।’  তিনি বলেন, ‘বেসরকারি ব্যাংক হলেও এখানে পাবলিক প্রতিষ্ঠান। সরকারের আইনি কাঠামোর মধ্যে ও জনগণের টাকায় চলে। সে জন্য কমিটি এ বিষয়ে আলোচনা করেছে।’
ফারমার্স ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম শামীম সংকট কিছুটা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন বলে মন্তব্য করেন কমিটির সভাপতি। তিনি বলেন, ‘আজকের বৈঠকে একেএম শামীম উপস্থিত ছিলেন। এমডি হিসেবে তিনি আসার আগে এসব ঘটনা হয়েছে। এখন তারা সংশোধনের চেষ্টা করছেন।’
এদিকে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বোর্ড সভায় অনুপস্থিত পরিচালকদের স্বাক্ষর জাল করে উপস্থিতি দেখিয়ে পর্ষদ সভার কার্যবিররণী করা হয়েছে। নিয়ম ভেঙে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চেয়ারম্যানের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছে। ব্যাংকটি গঠনের সময় মূলধন আনায় অনিয়ম, অনিবাসীদের পরিবর্তে বেনামে বাংলাদেশে বসবাসকারী ব্যক্তিকে দিয়ে  ব্যাংকের শেয়ার কেনা হয়েছে। বিধি বহির্ভূতভাবে ঋণ দেওয়াসহ  ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। এরসঙ্গে পর্ষদ সদস্য ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানি আইনের বিধান ও ব্যাংকের আর্টিক্যালস অব অ্যসোসিয়েশনের সংশ্লিষ্ট ধারা লঙ্ঘন করে ব্যাংকের একজন পরিচালকের অনুপস্থিতিতে তার শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়ে পর্ষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া নিয়ম না মেনে ৬ জন পরিচালকের শেয়ার বাজেয়াপ্তকরণ ও ৩ জন পরিচালককে অপসারণ করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ডিসেম্বর ২০১৬ প্রান্তিকে প্রায় ১৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু জুন ২০১৭ প্রান্তিকে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ১৭২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১৯১ কোটি ৬৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। যা মোট ঋণের ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ। নতুন স্থাপিত ব্যাংকগুলোর মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের হারের বিবেচনায় ব্যাংকটির অবস্থান দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ফারমার্স ব্যাংক রয়েছে প্রথম অবস্থানে।
এদিকে, বৈঠকে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে সভাপতি  বলেন, আমরা যেটা দেখেছি সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক এগ্রেসিভ লোন দিচ্ছে। এ বিষয়টি আমরা সতর্ক করেছি।
সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ও ফারমার্স ব্যাংক পরিচালনায় অনিয়ম ও দুর্নীতি সম্পর্কে অধিকতর তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করে ব্যাংকগুলোকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়।
বৈঠকে জানানো হয় এবি ব্যাংকের যোগসাজশে অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা সিঙ্গাপুরে পাচার হওয়ার বিষয়ে বাংলদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইউনিট ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন করে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ৪টি বিদেশি ফিন্যান্সিয়াল ইউনিটকে তথ্য দেওয়ার অনুরোধ করেছে যার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়ে আগামী বৈঠকে কমিটিকে জানানো হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ