ঢাকা, সোমবার 30 October 2017, ১৫ কার্তিক ১৪২8, ৯ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার নেপথ্য নায়ক ওবায়দুল কাদের -রিজভী

স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেছেন, দলীয়  চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার নেপথ্য নায়ক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি এই কাজ করেছেন। বেগম জিয়া সড়ক পথে যাওয়ায় আওয়ামী লীগ নেতাদের সমালোচনার জবাবে রিজভী বলেন, সড়ক পথ সবচেয়ে নিরাপদ। প্রশ্ন রেখে রিজভী বলেন, সড়ক পথে ওবায়দুল কাদের সাহেবরা যান না? তার নেত্রী যান না? হাজার হাজার দৃষ্টান্ত আছে। আজকে এই কথা আসে কেন? প্রধানমন্ত্রী যখন বিদেশ থেকে আসেন, তখন জোরজবরদস্তি করে স্কুল-কলেজ ছুটি দিয়ে, রাস্তাঘাট বন্ধ করে ভোগান্তি তৈরি করেন। তখন তো আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবীরা কিছু বলেন না। গতকাল রোববার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে এ অভিযোগ করেন রিজভী।
সরকারি দলের নেতাদের সমালোচনা করে রিজভী বলেন, পথ দিয়েই মানুষ যায়। খাল-বিল দিয়ে তো মানুষ যায় না। সড়ক পথ দিয়ে খালেদা জিয়া যাবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। এগুলো বিভ্রান্তি ছড়ানোর উপায় ছাড়া কিছু নয়।
আওয়ামী লীগকে গভীর ষড়যন্ত্রকারী উল্লেখ করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, জনদৃষ্টিকে অন্য দিকে সরানোর জন্য সড়ক পথের কথা বলা হচ্ছে। এটা একেবারেই বিভ্রান্তিকর, অপপ্রচারমূলক এবং এরা হচ্ছে গভীর ষড়যন্ত্রকারী। গোটা দেশকে তারা ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের মধ্যে ফেলেছে। তিনি বলেন, মিয়ানমারের হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে এ দেশে এসেছে, অথচ সরকার মিয়ানমারের কাছে কোনো প্রতিবাদ করতে পারেনি। সেখানে সরকার একটি হুমকি দিতে পারেনি। উল্টো মিয়ানমারের কাছে চাল চাইতে যায়।
লিখিত বক্তব্যে রিজভী বলেন, গণমাধ্যম এখন আওয়ামী সন্ত্রাসীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। যে কোন দেশে দুঃশাসন যখন ভয়াল রূপ ধারণ করে তখন গণমাধ্যমকে তারা টার্গেট করে এবং তাদের ওপর দলন ও নিষ্ঠুর নিপীড়ন চালানো হয়। বর্তমান ভোটারবিহীন সরকারের দুঃশাসন যখন মহামারি আকার ধারণ করেছে তখন তারাও গণমাধ্যমকে স্তব্ধ করে দিতে মরিয়া। অবশ্য মিডিয়ার মুখ বন্ধ করার ইতিহাস, সংবাদপত্র বন্ধ করার ইতিহাস আওয়ামী লীগের পুরানো ঐতিহ্য। ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগ মাত্র ৪টি পত্রিকা রেখে সকল সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিল। বর্তমান সরকারও সত্যপ্রকাশের প্রতিশোধে আমার দেশ, দিগন্ত টেলিভিশন, চ্যানেল ওয়ান, ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ করে দিয়েছে। গণমাধ্যমের ওপর অলিখিত সেন্সরশীপ আরোপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। শুধুমাত্র বর্তমান আওয়ামী সরকারের আমলে সারাদেশে অর্ধশতাধিক সাংবাদিক হত্যাকান্ড ও গুমের শিকার হয়েছেন। এখন পর্যন্ত বর্তমান সরকারের হাতে সহস্রাধিক সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মিথ্যা মামলা দিয়ে জেল-জুলুম ও দলন-নিপীড়ন তো চলছেই।
 রিজভী উল্লেখ করেন, শনিবার পরিকল্পিতভাবে সরকারের নির্দেশেই সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। সশস্ত্র হামলাকারী আওয়ামী সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যেই সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলে বেড়িয়েছে তোরা আসছিস কেন। উপরের নির্দেশ আছে তোদের ওপর হামলা করার। সংবাদ সংগ্রহের তোদের শখ মিটিয়ে দেবো। এই বলে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা সশস্ত্র অবস্থায় অতর্কিত হামলা চালিয়ে লোহার রড বেধড়ক মারপিট করে সাংবাদিকদের ক্যামেরাও ছিনিয়ে নেয়। এসময় সাংবাদিকদের বহনকারী গাড়িসহ বহরের গাড়িগুলোতে তান্ডবলীলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। এধরণের ন্যক্কাজনক হামলার নিন্দা জানানোর ভাষাও আমাদের নেই।
বিএনপির সিনিয়র এই নেতা বলেন, ভীতু ও কাপুরুষ সরকার জনতার ঢল যাতে মানুষ দেখতে না পায় সেজন্য সকল টেলিভিশন ও রেডিও-তে বেগম জিয়ার খবর লাইভ সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। শনিবার রাতে সকল বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও রেডিও কর্তৃপক্ষকে সরকারের লোকজন হুমকি দিয়ে বেগম জিয়াকে অভ্যর্থনা জানাতে রাস্তায় লাখো মানুষের ঢলের দৃশ্যের লাইভ সম্প্রচার বন্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। এমনিতেই তো ভয়াবহ দুঃশাসন ও লুটপাটের কবলে পড়ে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, তার উপর গণমাধ্যমের ওপর এই নিষ্ঠুর ও ঘৃন্য হামলায় সরকারের নোংরা চরিত্রেরই চরম বহি:প্রকাশ ঘটেছে। সাংবাদিকদের ওপর এই ঘৃন্য ও হৃদয়বিদারক হামলার ঘটনায় দেশ-বিদেশ জুড়ে দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরের সঙ্গে নিউজ কাভারেজের জন্য কক্সবাজার যাবার পথে ফেনীতে গণমাধ্যমের বেশ কয়েকটি গাড়িতে কাপুরুষোচিত হামলায় গুরুতর যারা আহত হয়েছেন তারা হলেন-৭১ টিভির সিনিয়র রিপোর্টার শফিক আহমেদ, যায়যায় দিন পত্রিকার সাংবাদিক হাসান মোল্লা, নয়াদিগন্তের সাংবাদিক মঈন উদ্দিন খান, প্রথম আলোর সাংবাদিক সেলিম জাহিদ, ফটো সাংবাদিক আশরাফুল আলম, ডেইলী স্টারের সাংবাদিক মাসুম, যুগান্তর পত্রিকার সাংবাদিক হাবিবুর রহমান হাবিব, বিডি নিউজ অন লাইন পত্রিকার সাংবাদিক সুমন মাহমুদ, কালের কন্ঠ পত্রিকার সাংবাদিক শফিক শাফি, বৈশাখী টিভির রিপোর্টার গোলাম মোর্শেদ,  দৈনিক সংগ্রামের সাংবাদিক জাফর ইকবাল, ইউএনবির আব্দুর রহমান জাহাঙ্গীর, সাংবাদিক হাসান শিপলু প্রমুখ। এছাড়া ফেনীর বারইরহাটে এনটিভির সিনিয়র রিপোর্টার হাসান মাহমুদ, ক্যামেরাম্যান অজিত আইচ তাপস এবং ব্রডকাষ্ট টেকনিশিয়ান মো: সাঈদ, ডিবিসি টেলিভিশনের ক্যামেরাম্যান আপন আহমেদ সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন। তাদের গাড়ি ভাংচুর করা হয় এবং সেখানে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। হামলায় ৭১ টিভির রিপোর্টার শফিক আহমেদ গুরুতর আহত হয়েছেন, তাঁকে নির্দয়ভাবে মারধর করার জন্য তিনি এখন মুমূর্ষ অবস্থায় রয়েছেন। এছাড়াও গতকাল বিএনপি চেয়ারপার্সনের গাড়িবহরে হামলার সময় বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ডা: ফরহাদ হালিম ডোনার এর গাড়িতে হামলা চালানো হয়, হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। এছাড়া নোয়াখালীর সেনবাগে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা বিএনপি নেতাকর্মীদের গাড়ি ভাংচুর করে এবং ফেনীর সিলুনিয়াতে গাড়ির চালকসহ নোয়াখালী বিএনপি নেতাদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায়। ফরিদপুরে বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে পুলিশ গ্রেফতারের জন্য সাঁড়াশী অভিযান চালাচ্ছে। সেখানে গ্রেফতার করা হয়েছে ফরিদপুর শহর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মিরাজ, জেলা যুবদল সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া স্বপন এবং জেলা ছাত্রদল সভাপতি বেনজীর আহমেদ তাবরীজসহ ৭ জন নেতাকর্মী।
রিজভী আরও বলেন, গণমাধ্যমে সাংবাদিকদের ওপর সরকারি মদদে এই হামলার কু-নজীর পৃথিবীতে বিরল। আপনারা জানেন কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহর ও ম্যাডামকে অভ্যর্থনা জানাতে পথে পথে জনতার ব্যাপক ঢল দেখে ইর্ষান্বিত হয়ে পড়ে সরকার। এটি সরকারের জঘন্য মানসিকতা ও হিংসাত্মক চরিত্রের চরম বহিঃপ্রকাশ। সরকার বর্তমানে পুরোপুরি জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে দ্বিগবিদিক জ্ঞান শুণ্য হয়ে ভাল ও মন্দের মধ্যে তফাৎ অনুধাবন করতে পারছে না, যার ফলে সন্ত্রাস সৃষ্টিকেই নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার ভাল উপায় হিসেবে গণ্য করছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা চালিয়ে নেতাকর্মীসহ মিডিয়ার গাড়িতে হামলা করে সাংবাদিকদেরকে যেভাবে আহত করা হয়েছে তাতে ইতিহাসে আওয়ামী লীগ আবারো গণধিকৃত রাজনৈতিক দল হিসেবে চিহ্নিত হলো।
বিএনপির এই মুখপাত্র বলেন, পথে পথে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের আক্রমণ, ভাংচুর, বোমা বিস্ফোরণ, গুলিবর্ষণসহ বেপরোয়া বাধাদানের পরেও অপ্রতিরোধ্য দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল সমস্ত বাধা অতিক্রম করে রাত্রের প্রথম প্রহরে বীর চট্টলায় পৌঁছান দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এই সেই চট্টলা যেখান থেকে দেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এই সেই ভূমি যেটি রক্ত¯œাত হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার রক্তে। সেই চট্টগ্রামবাসী বেগম জিয়াকে বরণ করেছেন বিপুল সমাগমের মাধ্যমে অভূতপূর্ব আন্তরিকতায়। যত বাধাই দেয়া হোক দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ত্রান নিয়ে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ, কোন বাধাই সেই পথকে আটকাতে পারবেনা। ছমছমে আধো অন্ধকারে কাপুরুষের মতো আওয়ামী সন্ত্রাসীরা যতোই গাড়ি ভাংচুর এবং সাংবাদিকদের ওপর সন্ত্রাসী আক্রমণ সংঘটিত করুক না কেন, লাখো জনতার মহাসমূদ্রে সকল ষড়যন্ত্র ভেসে যাবে।
রিজভী জানান, পল্টন থানা পুলিশ বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, যুবদল সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতি শফিউল বারী বাবু, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির ভুইয়া জুয়েল, ছাত্রদল সভাপতি রাজিব আহসান, সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাবিবুর রশীদ হাবিব, ছাত্রদল নেতা এনামুল হক এনামসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে যুবদল নেতা আলতাফ, সেন্টু, শাহীন এবং শ্রমিক দল নেতা কামালউদ্দিনকে। আমি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র পক্ষ থেকে বর্ণিত নেতৃবৃন্দের মিথ্যা মামলা দায়েরের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জোর দাবী করছি। গ্রেফতারকৃত যুবদল ও শ্রমিক দলের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে তাদের নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবী জানাচ্ছি।
সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন-বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা তৈমুর আলম খন্দকার, আতাউর রহমান ঢালী, জহিরুল হক শাহাজাদা মিয়া, মীর সরফত আলী সপু, মো: মুনির হোসেন প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ