ঢাকা, বৃহস্পতিবার 2 November 2017, ১৮ কার্তিক ১৪২8, ১২ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলা

বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে মঙ্গলবার আবারও হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থানে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের আশ্রয় শিবির পরিদর্শন এবং তাদের মধ্যে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের কর্মসূচি শেষ করে খালেদা জিয়া যখন ঢাকায় ফিরছিলেন তখন ফেনীর মহিপাল এলাকায় হঠাৎ তার গাড়ি বহরের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। দুর্বৃত্তরা শুধু গাড়ি ভাঙচুর করেনি, গাড়ি লক্ষ্য করে পেট্রল বোমাও নিক্ষেপ করেছে। সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে গেছে দুটি বড় বাসসহ রাস্তার উভয় পাশের কয়েকটি যানবাহনে। দুর্বৃত্তদের সশস্ত্র আক্রমণেও অনেকে আহত হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন আগুন নেভাতে সক্ষম হলেও অগ্নিদগ্ধ হয়েছে কয়েকজন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে বাসের চালকসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘটনায় আসলে কারা জড়িত সে ব্যাপারে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার জন্য জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে গাড়ি বহর আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও নিরাপত্তার কারণে বেগম খালেদা জিয়া তার গাড়ি থামাননি। সন্ধ্যার পর তিনি নিরাপদে গুলশানের বাসভবনে পৌঁছেছেন।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবারই প্রথম নয়, গত শনিবার বিএনপি নেত্রী যখন চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন তখনও একই ফেনী এলাকায় তার গাড়ি বহরের ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয়েছিল। সেদিনের উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর হামলা। বিএনপির নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সেদিন আক্রান্ত হয়েছিলেন বিশেষ করে বিভিন্ন বেসরকারি টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার ও ক্যামেরা পারসনরা। সব মিলিয়ে সেদিন ২৫ জনের বেশি সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মী আহত হয়েছিলেন। কয়েকজনের ক্যামেরাও কেড়ে নিয়েছিল দুর্বৃত্তরা। প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, সরকার সমর্থক হিসেবে পরিচিত টেলিভিশনের রিপোর্টার ও ক্যামেরা পারসনদেরও রেহাই দেয়া হয়নি। বরং ‘একাত্তর-মেকাত্তর বুঝি না, ভিডিও করলি কেন?’ ধরনের বক্তব্য সহযোগে প্রকাশ্যে মারধোর করা হয়েছে গণমাধ্যম কর্মীদের। বেশ কয়েকজন গুরুতররূপে আহত হয়েছেন। ওদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার পাশাপাশি ভিডিও ফুটেজেও দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরাই আক্রমণ চালিয়েছিল। এদের মধ্যে ফেনীর কোনো এক ইউনিয়ন শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের কথা বলেছেন সকলেই। তার ভয়ংকর আক্রমণাত্মক কর্মকান্ড দেখে সাধারণ মানুষও ভীত-সন্ত্রস্ত না হয়ে পারেনি। অন্যদিকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতা ও মন্ত্রীরাও এক সুরে আক্রান্ত বিএনপির ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করেছেন। ফলে কোনোরকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি এমনকি সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিতজনদের বিরুদ্ধেও। বলা হচ্ছে, মূলত সে কারণেই দুর্বৃত্ত ও সন্ত্রাসীরা প্রশ্রয় পেয়েছে এবং মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরের ওপর দ্বিতীয় দফা আক্রমণ চালিয়েছে।
আমরা এই হামলাকে ন্যক্কারজনক এবং সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য অত্যন্ত বিপদজনক বলে মনে করি। আমাদের আপত্তির কারণ, বেগম খালেদা জিয়া দলীয় কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে যাননি। তিনি গিয়েছিলেন গণহত্যা ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের অবস্থা দেখতে এবং তাদের মধ্যে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করতে। বিষয়টি সম্পূর্ণরূপেই ছিল মানবতার জন্য। তাছাড়া একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের নেত্রী হিসেবেও যে কোনো স্থানে যাওয়ার এবং দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার একশ ভাগ অধিকার তার রয়েছে। এটাই গণতন্ত্রের নির্দেশনা। অন্যদিকে এমন একটি মানবিক কার্যক্রমে অংশ নেয়ার পথেও তাকে ভয়ংকর পন্থায় বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ সকল রাজনৈতিক দল দু’দিনের এই হামলার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। বিএনপি বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। খালেদা জিয়া নিজেও বলেছেন, ‘সরকারের বর্বর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই’ তার গাড়ি বহরের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। স্মরণ করা দরকার, মাত্র দু’দিন আগেই খালেদা জিয়া রোহিঙ্গাকেন্দ্রিক সংকটে সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার সমালোচনা করেছেন। তিনি সেই সাথে অভিযোগ তুলে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের পাশে সরকারের যেভাবে দাঁড়ানো উচিত ছিল সরকার সেভাবে দাঁড়ায়নি। যারা দাঁড়াতে ও সাহায্য করতে চাচ্ছে সরকার তাদেরকে সমর্থন দেয়ার ও সহযোগিতা করার পরিবর্তে উল্টো বাধাগ্রস্ত করছে। ক্ষমতাসীন দলের গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর সশস্ত্র হামলা পর্যন্ত চালাচ্ছে।
খালেদা জিয়া তার ওই বক্তৃতায় রোহিঙ্গাদের কারণে সৃষ্ট দেশ ও জাতির কঠিন দুঃসময়ে এ ধরনের কর্মকান্ড বন্ধ করার জন্যও সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়ার দাবি ও আহ্বানে ইতিবাচক সাড়া দেয়ার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনরা সম্পূর্ণ পরিপন্থী অবস্থান নিয়েছেন বলেই ঘটনাপ্রবাহের কারণে মনে করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে দু’জন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতার সাম্প্রতিক উস্কানিমূলক বক্তব্যের বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রকাশ্যেই আলোচনা চলছে। তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, উচিত যেখানে ছিল খালেদা জিয়ার সফরকে নিরাপদ করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া, ক্ষমতাসীনরা সেখানে উল্টো হিংসা ও সন্ত্রাসকে উসকে দিয়েছেন। তারা এমনকি প্রমাণিত হওয়ার পরও সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। মূলত সে কারণেই মঙ্গলবার দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানোর সাহস পেয়েছে দুর্বৃত্তরা।
আমরা গাড়ি বহরের ওপর উপর্যুপরি দু’দিনের সশস্ত্র হামলা এবং পেট্রল বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মানুষ হত্যার ভয়ংকর চেষ্টার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং মনে করি দুর্বৃত্তদের প্রশ্রয় ও সমর্থন দেয়ার পরিবর্তে সরকারের উচিত দেশের রাজনীতিতে সুষ্ঠু ও গণতন্ত্রসম্মত পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। আমরা একই সাথে হামলায় জড়িত দুর্বৃত্তদের খুঁজে বের করার এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার দাবি জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ