ঢাকা, বৃহস্পতিবার 2 November 2017, ১৮ কার্তিক ১৪২8, ১২ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কথা

এডভোকেট আব্দুস ছালাম প্রধান : ভূমিকা : ইসলাম শব্দটি একটি মতে মূল আরবী “সিলমুন” শব্দ হতে উদ্ভূত। যার অর্থ আত্মসমর্পণ। আর একটি মতে “সালামুন” শব্দ থেকে উদ্ভূত। যার অর্থ শান্তি। শান্তি শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ Peace. ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় ইসলাম শব্দটির ভাবার্থ প্রকাশ করা যায় এভাবে, আল্লাহ্র নাযিলকৃত কিতাব আল-কোরআন এবং সর্বশেষ নবী মুহম্মদ (দ:) এর ৪০ বৎসর বয়সে নবুয়ত লাভের পর তাঁর ইন্তেকাল পর্যন্ত তিনি মানব জীবন পরিচালনার বিষয়ে যে সমাধান দিয়ে গেছেন তা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে কর্মজীবনে বাস্তবায়ন করে, ইহকাল এবং পরকালে শান্তি অর্জন। সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ইসলামী দ্বীন বা ইসলাম ধর্ম মূল অর্থগত দিক থেকেই একটি শান্তির ধর্ম। বিশ্বমানবতাকে সকল ধরনের জুলুম, শোষন, পরাধীনতা ও দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে উদ্ধার করে শুধুমাত্র মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রব্বুল আলামিনের বান্দা বা গোলাম হিসাবে পৃথিবীর মুক্ত আলো বাতাসে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিচরনের এক সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করাই হচ্ছে ইসলাম ধর্মের মহান উদ্দেশ্য। পৃথিবীর মানুষ শুধুমাত্র এক আল্লাহর গোলামীর জীবনই বেছে নেবে। আল্লাহ ছাড়া সকল শক্তির গোলামীর শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হবে।
সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গিবাদ বলে কোন শব্দ পবিত্র কোরআন এবং প্রসিদ্ধ বা অপ্রসিদ্ধ হাদিস গ্রন্থ সমূহে দেখতে পাওয়া যায় না। জং শব্দটি ফারসী ভাষার একটি শব্দ। যার অর্থ যোদ্ধা। জঙ্গি শব্দের অর্থ যোদ্ধা। সন্ত্রাসবাদ শব্দটি ইংরেজি terrorism এর বাংলা প্রতিশব্দ। এই শব্দটি প্রাচীন আরবী ভাষায় অনুপস্থিত। আধুনিক আরবী ভাষায় ইরহাব বা হুকমুল ইরহাবী শব্দ দুটি সন্ত্রাসবাদের পরিচিতি শব্দ হিসাবে ব্যবহ্নত হচ্ছে। যার অর্থ ভীতি প্রদর্শন বা ভীতির পরিবেশ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী। কোরআন এবং হাদীসে এধরনের শব্দের উল্লেখ নাই। তবে কোরআন হাদীসে ফাসাদ নামে একটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ্ তাআলা কোরআনে বলেছেন “ঐ সমস্ত মানুষ যারা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করে এবং পৃথিবীতে শান্তি স্থাপন করে না।” সূরা শুরা, আয়াত ১৫২। পবিত্র কোরআনের ফাসাদ ফিল আরদ বা পৃথিবীর বুকে অশান্তি সৃষ্টি বা শান্তি বিপর্যস্ত করার বিষয়ে আল্লাহ্ তায়ালা ফাসাদ শব্দের উল্লেখ করেছেন। কোরআন হাদিসে এ বিষয়ে আর একটি কাছাকাছি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হচ্ছে জুলম। যার অর্থ অত্যাচার ও নির্যাতন। আরো দু’টি শব্দ পবিত্র কোরআন হাদীসে সন্ত্রাস এর কাছাকাছি শব্দ হিসাবে ব্যবহ্নত হয়েছে। যথা “ইয়াতায়াদ্দা” এবং “মোসরিফ”- যার অর্থ সীমা লঙ্ঘন। যেহেতু সন্ত্রাসীরা শরীয়তের জায়েজ-নাজায়েজ ও হালাল-হারামের সীমারেখা মানে না, তাই ওরা জালিম বা ফাসাদ সৃষ্টিকারী এবং সীমালঙ্ঘনকারী। পবিত্র কুরআন মজীদ এর সুরা হুজরাত এর ৯ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন “যদি মুমিনদের দুটি দল যুদ্ধে বা কলহে লিপ্ত হয় তাহলে তোমরা তাদের বিবাদ মীমাংসা করে দেবে। এর পরও যদি কোন দল অপর দলের উপর চড়াও হয় তবে আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে তোমরা লড়াই করবে। যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে তবে ন্যায়ানুগ পন্থায় তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিবে এবং ফয়সালার ক্ষেত্রে ইনসাফ করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন।” এই আয়াতে আমরা একধরনের সন্ত্রাসবাদীর সন্ধান পাই, যারা প্রথমতঃ একদল মুসলমানদের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়। তারা কোরআন হাদীসের ভিত্তিতে শান্তির পথে আসতে অস্বীকৃতি জানায়। তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া বা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু সন্ত্রাসী দলটি যদি পরবর্তীকালে শান্তির পথে আসতে চায় তাদেরকে সেই সুযোগ প্রদানেরও অবকাশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনের সুরা নিসার ৭৪,৭৫ নং আয়াতে বলেন “কাজেই যারা পৃথিবীর জীবন পরকালের জীবনের বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়, তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। বস্তুতঃ যারা আল্লাহ্র পথে লড়াই করে তারা কোন একপর্যায়ে মৃত্যুবরন করে কিংবা বিজয় অর্জন করে, আমি তাদের বিরাট প্রতিদান প্রদান করবো। তোমাদের কি হলো যে তোমরা আল্লাহ্র পথে লড়াই করছ না? অথচ অসহায় দুর্বল নারী, পুরুষ, শিশু, যারা নির্যাতিত হয়ে আর্তনাদ করে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছে আর বলছে হে আমার পালনকর্তা আমাদিগকে এই অত্যাচারীদের জনপদ থেকে বের করে নিয়ে যাও। আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী এবং আমাদের পক্ষাবলম্বনকারী নেতা পাঠাও”। অপরদিকে যারা তাগুতের পথে অর্থ্যাৎ সীমা লঙ্ঘনকারীদের পক্ষে লড়াই করে তারা মুলতঃ শয়তানের পক্ষে লড়াই করে। তোমরা জিহাদ করতে থাক শয়তানের বিরুদ্ধে। শয়তানের পরিকল্পনা খুবই দুর্বল”। উদ্ধৃত আয়াতে “জিহাদ” শব্দটি আরবি জাহাদা ইওজাহিদু শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। যার অর্থ চেষ্টা অবিরাম পরিশ্রম বা উদ্দেশ্য পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোন কাজে বা কর্মসূচীর পিছনে লেগে থাকা। আর কিতাল শব্দের অর্থ হচ্ছে অস্ত্র ব্যবহার করে যুদ্ধ করা। আল্লাহ সুরা-সফ্ এ বলেন যে, “তোমরা জিহাদ চালিয়ে যাও আল্লাহর পথে তোমাদের জীবন ও সম্পদ দিয়ে”। এখানে জীবন অর্থ জীবনের সময় এবং সম্পদ। ইসলাম কায়েমের প্রয়োজনে যদি জীবনের সময় বা জীবন কুরবানী দেওয়ার প্রয়োজন হয়, সে ধরনের ত্যাগ বা কুরবানীর জন্য একজন মুমিন সদা সর্বদা প্রস্তুত থাকবে। এটাই ইসলাম একজন মুমিন এর নিকট দাবী করে। ইসলামী রাষ্ট্র বা আদর্শ কায়েমের ক্ষেত্রেই শুধু নয় বিশ্বের অনেক দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের যুদ্ধে বা রাষ্ট্রের সীমানা ও সার্বভৌমত্ব আক্রান্ত বা হুমকির সম্মুখীন হলে বিশ্বের যেকোন ধর্মমতের বা ধর্মহীন আদর্শের মানুষ এধরনের জীবন উৎসর্গ করাকে একটি পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে করে। এধরনের আত্মোউৎসর্গকারী ব্যক্তিরা একটি ধর্ম মতের বা জাতির কৃতি সন্তান হিসাবে গণ্য। সূরা নিসার ৭৪, ৭৫ নং আয়াতে দেখা যায় যে, কোন জনপদের অসহায় নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধরা যদি জালিমদের অত্যাচারে নিষ্পেষিত হয়, তাদের উদ্ধারের জন্য বা তাদেরকে জালিম বা অত্যাচারীদের কবল থেকে মুক্তির জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। যেভাবে মক্কা নগরীতে মদিনায় হিজরতকারী মুসলমানদের আত্মীয়স্বজন ও দাস শ্রেণির মানুষরা কুরাইশ কুফরী শক্তির দ্বারা বর্বর জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। তাদের উদ্ধারের বিষয়ে সূরা নিসার উদ্ধৃত আয়াতগুলি নাজিল হয়েছে। মহানবী (দ.) মক্কা নগরীতে সরাসরি সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হন নাই। বরং মক্কার অসহায় মানুষদের উদ্ধারে জনমত গড়ে তোলার জিহাদ করেন। এক সময় কুরাইশদের সাথে হুদাইবিয়ার সন্ধি করেন। মক্কাবাসী সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করায় বিনা রক্তপাতে ৮ম হিজরী সনে মক্কা বিজয় করেন। মহানবী (দ:) মক্কা বিজয়কালে শত শত অপরাধীকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। পবিত্র কোরআনের নির্দেশনার আলোকে কোন জনপদেই প্রিয় নবী (দ:) এবং সাহাবায়ে কেরাম কর্তৃক হঠাৎ করে অস্ত্র সজ্জিত হয়ে জবরদস্তিমূলক ভাবে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া বা সেই জনপদ দখল করে সে দেশের জনগণকে জবরদস্তিমূলকভাবে ইসলামে দীক্ষিত করা বা তাদের উপর ইসলামী আইন চাপিয়ে দেওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ (দ:) কিংবা খোলাফায়ে রাশেদ্বীনের আমলে কোন নুতন জনপদে অভিযানের প্রাক্কালে সেনাপতিদের প্রতি নির্দেশ দেয়া ছিল যে, তোমরা কোন জনপদ আক্রমণের আগে ঐ দেশের সরকার ও অধিবাসীদের প্রতি ইসলাম গ্রহণের জন্য আহ্বান জানাবে। তারা যদি সে আহ্বান গ্রহণ করে তাহলে তারা এবং তোমরা ভাই। তাদের জানমাল নিরাপদ। যদি তারা ইসলাম গ্রহণ না করে তাহলে ইসলামী রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করে যদি প্রতিরক্ষা কর দিতে স্বীকৃত হয়ে জিম্মি বা নিরাপত্তা প্রাপ্ত নাগরিক হওয়ার মর্যাদা গ্রহণের জন্য দাওয়াত দিতে হবে। যদি তারা সে দাওয়াত গ্রহন করে তাহলে তাদের উপর সশস্ত্র আক্রমণ হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। যদি ইসলাম গ্রহণ না করে বা জিজিয়া দিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রাপ্ত নাগরিকত্বের মর্যাদা গ্রহণ না করে সে ক্ষেত্রেই কেবল সশস্ত্র হামলা বৈধ করা হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের সশস্ত্র হামলা একটি বৈধ ইসলামী রাষ্ট্রই কেবল করতে পারে। কোনো বিশেষ সশস্ত্র গোষ্ঠীর এ ধরনের হামলা করার কোন দায়িত্ব গ্রহণ ইসলামে অবৈধ বা হারাম। ইসলামী রাষ্ট্র প্রথমত: হামলার সক্ষমতা অর্জন করবে। তারপর হামলা বা অভিযানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। নতুবা রাষ্ট্রটি আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে থেকে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের নাগরিকদের সৎ চরিত্র বা আল্লাহ ভীরু এবং ইসলামের আলোকে একটি রাষ্ট্র গড়ার কারিগর হিসাবে তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকবে। আল্লাহ্ পবিত্র কোরআনের সূরা হজ্জের ৩৯ নং আয়াতে বলেন “যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে যাদেরকে অন্যায়ভাবে নিজেদের ঘর বাড়ী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে; কারণ তারা এই ঘোষণা দিয়েছিল আল্লাহ্ই তাদের পালনকর্তা বা রব। আল্লাহ যদি মানব জাতির একটি দলকে দিয়ে অপর দলকে দমিয়ে না রাখতেন তাহলে নাসারাদের গীর্জা, ইহুদিদের ইবাদত খানা ও মসজিদ সমূহ (হামলাকারীদের দ্বারা) বিধ্বস্ত হয়ে যেত। “আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদের সাহায্য করেন যারা আল্লাহ্কে সাহায্য করে।” নিশ্চয়ই আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী ও মহাশক্তিধর” এই আয়াতে দেখা যায় যে যদি কোন ধর্মে বিশ্বাস আনার কারণে অন্য ধর্মের কোন অত্যাচারী জালিম গোষ্ঠী কোন ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর উপর চড়াও হয়, বা তাদের উপাসনালয় গুলোতে হামলা চালাতে চায়, সে ক্ষেত্রে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা শসস্ত্র আক্রমণ বৈধ করা হয়েছে। কিন্তু সেটাও হতে হবে একটি বৈধ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে কোন সশস্ত্র দলকে এ ধরনের যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হয় নাই। পবিত্র কোরআনের সূরা তাওবার ৪ নং আয়াতে আল্লাহ্ বলেন “তোমরা যেসব মুশরীক (অংশীবাদী) দের সাথে চুক্তিবদ্ধ। যারা তোমাদের সাথে চুক্তি পালনে ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কোন শক্তির সহায়তা করেনি, তাদের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তি মেয়াদকাল পর্যন্ত পালন কর। আল্লাহ নিশ্চয়ই সাবধানীদের পছন্দ পছন্দ করেন।” এই আয়াতে মুশরীকি মতবাদ অনুযায়ী পরিচালিত রাষ্ট্র বা জনগণের সাথে সন্ধি চুক্তি করাকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। সেই সাথে মেয়াদ পর্যন্ত চুক্তি পালন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে আল্লাহ্ তায়ালা মুসলমান নামধারী কোন গোষ্ঠিকে ইসলামের নামে হঠাৎ করে কোন জনপদে সশস্ত্র আক্রমণ করা বা তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করা বা তাদেরকে হত্যা করার কোন অনুমতি দেন নাই। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন সূরা মায়েদার ৩২ নং আয়াতে বলেন “এ কারণেই আমি বনী ইসরাঈল জাতির প্রতি লিখিত নির্দেশ দিয়েছি যে প্রাণের বদলায় প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ বা বিপর্যয় (ফাসাদ) সৃষ্টি ব্যতিত যদি কেউ কাউকে হত্যা করে সে যেন গোটা মানব জাতিকে হত্যা করলো। আর যে ব্যক্তি কারো জীবন রক্ষা করলো সে গোটা মানব জাতিকেই রক্ষা করলো। তাদের কাছে আমার রসুল প্রকাশ্যে নির্দেশনা নিয়ে এসেছেন। এর পরও তাদের অনেক গোষ্ঠী পৃথিবীতে সীমা অতিক্রম করে”। উদ্ধৃত আয়াতে দেখা যায় যে, পৃথিবীর বুকে অশান্তি বা বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের বিরদ্ধে অভিযানকালে মানুষ হত্যা করা সীমিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য সাময়িকভাবে বৈধতা পায়। বিপর্যয় বা ফ্যাসাদ বন্ধ হলে কোন মানুষ হত্যার বৈধতা থাকে না। আর একটি ক্ষেত্রে মানুষ হত্যা করা যায়, তাহলো কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি কোন নিরপরাধ মানুষকে বিনা কারনে হত্যা করে, তবে তাকে বৈধ আদালতের বিচারে সাজা ঘোষণার পর হত্যা বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যাবে। তাছাড়া কোন মানুষকে তার ধর্ম বর্ণ যাই হোক না কেন তাকে হত্যা করার কোন অনুমতি বা কর্তৃত্ব কাহাকেও আল্লাহ্ তাআয়ালা প্রদান করেন নাই। উল্লিখিত আয়াতগুলি ছাড়াও পবিত্র কোরআনের সূরা আল বাকারার ২৭ ২০৪-২০৬, ২৫১- ২৫৬ সূরা: আল-মায়েদার ৩৪, ৬৪ সূরা: আল-আরাফের ৫৬, ১০৩, ১৪২ সূরা আল আনফালের ৭৩, সূরা ইউনূসের ৪০, ৮১ সূরা হুদ এর ৮৫, সূরা রাআদের ২৫, সূরা বনী ইসরাঈলের আয়াত ৮৮, সূরা আন কাবুতের ২৯-৩০, সূরা রুম এর ৪১, সূরা হাশরের ৩৫, সূরা নামলে ১৩, ১৪, ৩৪,৪৮-৫০, সূরা কাসাসের ৮৩, সূরা ফজরের ৬-৭ নম্বর আয়াতসমূহে ফাসাদ বা দুনিয়ার বুকে যেসব বিষয়ে অশান্তি ও হানাহানির সৃষ্টি হয় সেসব বিষয়ে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করা আছে।
উল্লেখিত আয়াতগুলির বিশ্লেষণে যেসব বিষয় আমরা জানতে পারি তাহলো-১। পৃথিবীর বুকে ফাসাদ বা অশান্তি সৃষ্টির মূল কারণ আল্লাহ্র সাথে র্শিক হয় এমন মতবাদের অনুসরণ ২। আল্লাহ্র আইন বাদ দিয়ে মানুষ যখন নিজেরাই আইন তৈরি করে, সেই আইনের অধীনে সমাজ বা একটি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে থাকে তখন অশান্তি বা ফাসাদ সৃষ্টি হয়। ৩। প্রকৃত সত্য ও কল্যাণের পথ মানবজাতীর সামনে উন্মোচিত হবার পরেও যদি মানুষ সত্য ও কল্যাণের পথ বাদ দিয়ে অসত্য এবং অকল্যাণের পথ বেছে নেয়, তখন ফাসাদ বা অশান্তির সৃষ্টি হয়। ৪। দস্যূতা, চুরি, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ, মানুষের জন্মগত অধিকার হরণ করার মতো অপরাধে মানুষ লিপ্ত হলে একটি জনপদে ফাসাদ বা অশান্তি সৃষ্টি হয়। ৫। সত্য প্রচার ও প্রকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হলে ফাসাদ বা অশান্তির সৃষ্টি হয়। ৬। পরিমাপ বা ওজনে কম দেয়া, খাদ্যে ভেজাল দেয়া, ঘুষ গ্রহণ বা ঘুষ প্রদানে কোন মানুষকে তার পাওনা হইতে বঞ্চিত করা এবং অবৈধভাবে লাভবান হওয়া একটি সমাজ ও রাষ্ট্রে ফাসাদ বা অশান্তি সৃষ্টির কারন হিসাবে গণ্য হয়। ৭। লাগামহীন জীবন-যাপন এবং যেকোন কৌশলে নিজের অভিলাষ পূরণে মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়লে তার মাধ্যমে একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের অশান্তি সৃষ্টি হয়। ৮। সম্পদ পুঞ্জিভূত করে রাখা এবং ঐ সম্পদ মানুষের কল্যাণে না আসা, অনেক সময় অনেক জনপদের ফাসাদ সৃষ্টির কারন হিসাবে গণ্য হয়। ৯। রাষ্ট্র বা সমাজের কর্তৃত্ব পাওয়ার পর তা ব্যবহার করে সমাজ ও রাষ্ট্রের জনগণকে অত্যাচার করা, তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া ফাসাদ সৃষ্টির কারণ হিসাবে গণ্য হয়। ১০। একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ মান থাকা অবস্থায় ইচ্ছাপূর্বক নানা ধরনের হাঙ্গামা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে নিরীহ শান্তি প্রিয় নাগরিকদের শান্তি ও নিরাপত্তায় বিঘœ সৃষ্টি ফাসাদের কারণ হয়। ১১। সৃষ্টিকর্তার সাথে বিদ্রোহ ঘোষনা করা বা তার প্রেরিত আদেশ নিষেধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া, পৃথিবীর বুকে ফাসাদ সৃষ্টির কারণ হিসাবে গণ্য হয়। আল্লাহ তাআলা উল্লিখিত পন্থায় যারা পৃথিবীর বুকে ফাসাদ বা অশান্তি সৃষ্টি করে তাদেরকে অভিযুক্ত করে কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিয়াছেন। এ প্রসঙ্গে বিশ্ব নবী (দ:) এর একটি হাদিস উদ্ধৃত করছি। “হযরত আবু হোরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত দুই ব্যক্তি একে অপরকে গালি দিয়েছিল। তাদের একজন ছিল মুসলমান, আর একজন ছিল ইহুদি। মুসলমান ব্যক্তিটি বলল আল্লাহর কসম সমস্ত জগতের উপর আল্লাহ মুহম্মদ (দ:) কে ফজিলত দ্বারা ধন্য করেছেন। ঐ কথা শুনে ইহুদি ব্যক্তিটি বলল সেই স্বত্বার কসম যিনি মুসা (আঃ) কে সমস্ত জগতের উপর সম্মান দান করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে মুসলমান ব্যক্তিটি দাঁড়িয়ে ইহুদি ব্যক্তিটির মুখে একটি চড় মারে। লোকটি রাসূলুল্লাহ (দ:) এর নিকট গিয়ে তাকে চড় মারার বিষয়ে অভিযোগ দেন। রসুলুল্লাহ (দ:) ঐ সাহাবীকে ডেকে ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। ঐ সাহাবী রাসূলুল্লাহ (দ:) এর নিকট ঘটনা খুলে বলল। ঘটনা শুনে রাসূলুল্লাহ (দ:) বললেন তোমরা আমাকে মুসা (আঃ) উপর প্রাধান্য দেয়ার কথা বলো না। কারণ হাশরের দিন সমস্ত মানুষ বেহুঁশ হয়ে পড়বে। সবার আগে আমি হুঁশ ফিরে পাব। তখন দেখবো যে, মূসা (আঃ) আল্লাহর আরশের এক পা ধরে রয়েছেন। আমি জানিনা যে, তিনি বেহুঁশ হয়ে আমার আগে হুঁশে এসেছেন নাকি আল্লাহ তাকে বেহুঁশ হওয়া থেকে রেহাই দিয়েছেন। বুখারী হাদীস নং-২২৫৪।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ