ঢাকা, বৃহস্পতিবার 2 November 2017, ১৮ কার্তিক ১৪২8, ১২ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শাহজাদপুরের অর্ধ লক্ষাধিক তাঁত শ্রমিকের মানবেতর জীবনযাপন

এম এ জাফর লিটন, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) : সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার অর্ধ লক্ষাধিক তাঁত শ্রমিক ৩ মাস ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছে বলে জানা গেছে। বন্যার পর থেকে তাঁত ফ্যাক্টরি মালিকরা শ্রমিকদের পিচ প্রতি ২০ টাকা মজুির কমিয়ে দেয়ার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে শ্রমিকরা জানিয়েছে।
শ্রমিকরা জানায় সারা দিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে ৩/৪টি শাড়ি বা লুঙ্গী বুনোন করা হয়। পাওয়ারলুমের মজুরি পিচ প্রতি ১০০ টাকা আর হ্যান্ডলুমে ১২০ টাকা মজুরির পরিবর্তে ৮০ টাকা আর ১০০ টাকা করে মজুরি দেয়া হচ্ছে। এ দিকে বন্যার ওজুহাতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য ২/৩ গুণ বেড়ে যাওয়ায় তারা চরম বেকায়দায় পড়েছে। ফলে তাঁতশিল্প সমৃদ্ধ সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক তাঁত শ্রমিকের দিন কাটছে অর্ধাহারে অনাহারে।
তাঁত ফ্যাক্টরী মালিকরা জানান, বন্যার পর থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যর উর্ধ্বগতির সাথে সাথে তাঁতবস্ত্র উৎপাদনের সাথে সকল প্রকার কাঁচামাল ও উপকরণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু, পাইকারি বাজারে তাঁতবস্ত্রের দাম ও বেচা-বিক্রি কমে গেছে। সপ্তাহের ৪ দিন শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে কাপড় নিয়ে দিন ভর বসে থেকে কাংখিত বেঁচা-বিক্রি না হওয়ায় ব্যাংক, সমিতি ও এনজিও থেকে নেয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। ফলে পুঁজি হারিয়ে তাঁত ফ্যাক্টরি বন্ধের উপক্রম হয়েছে। এ অবস্থায় বেচে থাকার তাগিদে এবং তাঁত ফ্যাক্টরি চালু রাখার স্বার্থে শ্রমিকদের মজুির কমিয়ে দিতে আমরা বাধ্য হয়েছি। ফলে শ্রমিকরা কিছুটা মজুরি কম পেলেও একেবারে বেকার হয়ে পড়ার হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে।
এ ব্যাপারে স্থানীয় তাঁত শ্রমিক নেতারা জানান, বন্যার সময় এলাকার দুস্থদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও বন্যা পরবর্তী বাজার মন্দা, দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি নিয়ন্ত্রণ ও তাঁত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার সরকারি ব্যবস্থা না থাকায় তাঁত শ্রমিকরা চরমভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ বছর বন্যার কারণে এলাকার প্রায় ৩৫ ভাগ তাঁত বন্ধ হয়ে  গেছে। এতে হাজার হাজার তাঁত শ্রমিক বেকার হয়ে অতিকষ্টে জীবন যাপন করছে।
জানা গেছে, শাহজাদপুর সহ বেলকুচি, চৌহালি,কামারখন্দ, উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ সদর, বেড়া, সাথিয়া ও পাবনা সদর এ ৯টি উপজেলার অর্থনৈতিক অবস্থা এই তাঁত শিল্পের উপর নির্ভরশীল। তাঁতবস্ত্রের বাজার পড়ে যাওয়ায় চরম অর্থনৈতিক মন্দাভাব চলছে এ সব উপজেলায়। অপর দিকে শাহজাদপুর ও টাঙ্গাইল অঞ্চলের কাপড়ের হাট থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বেশকিছু এলাকায় তাঁতের তৈরী শাড়ি, লুঙ্গী, গামছা ও থ্রী-পিচ রপ্তানি হয়ে থাকে। সে রপ্তানিও কমে অর্ধেকে নেমে যাওয়ায় তাঁত ব্যবসায় চরম ধ্বস নেমে এসেছে। ফলে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র তাঁত মালিক তাঁত ব্যবসায় চরম লোকসানের মুখে পড়েছে। এর প্রভাবে তাঁত শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি তেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে।
শাহজাদপুর তাঁত শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ওমর ফারুক ও সাধারণ সম্পাদক আল-মাহমুদ জানিয়েছেন, ‘বৃষ্টি-বন্যাসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন উর্ধ্বগতিতে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার সার্বিক ব্যয় বৃদ্ধি, ন্যায্য মজুরি প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত, ঋণের কিস্তির ঘানি টানাসহ বহুবিধ সমস্যায় জর্জড়িত হয়ে পড়েছে শাহজাদপুর উপজেলার তাঁতশ্রমিকরা। তারা আরো বলেন, ইতিমধ্যেই পুঁজি সংকট শাহজাদপুরের প্রায় ৩৫ ভাগ তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হয়ে পড়েছে হাজার হাজার শ্রমিক। ফলে তাঁত শ্রমিকদের অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে এ এলাকার প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক তাঁত শ্রমিক চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
শাহজাদপুর তাঁত শ্রমিক ইউনিয়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, শুধু শাহজাদপুর উপজেলায় রয়েছে ৬২ হাজার তাঁত শ্রমিক। এদের মধ্যে স্থানীয় শ্রমিকের সংখ্যা ৪২ হাজার। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের মঙ্গাপীড়ির এলাকার তাঁত শ্রমিক এখানে এসে কাজে নিযুক্ত আছেন প্রায় ২০ হাজার। ওই সব শ্রমিকের প্রতিদিন গড় মজুরি প্রায় ২৪০ থেকে ৩০০ টাকা।
বর্তমানে চাল, ডাল, পিঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, ভোজ্যতেলসহ সকল প্রকার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন উর্ধ্বগতির কারণে প্রয়োজন হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। এ অবস্থায় শ্রমিকরা সংসার চালাতে ধারদেনা অথবা চড়া সুদে এনজিও বা সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে তা সময় মত পরিশোধ করতে না পেরে ভিটেমাটি সহ সর্বস্ব খোয়াচ্ছে।
অপর দিকে, তাঁতবস্ত্র উৎপাদনের কাঁচামালসহ সকল প্রকার উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। এতে উৎপাদিত কাপড়ের উৎপাদন ব্যয়ও আগের চেয়ে ২/৩ গুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু সে হারে উৎপাদিত কাপড়ের দাম বাড়েনি। ফলে তাঁত মালিকরাও লোকসান গুণছে। এ লোকসান পোষাতে তারা তাঁত শ্রমিকদের মজুরি কমিয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া হাটে বেচা-বিক্রি কম হলে শ্রমিদের বিল আটকে দিচ্ছে। ফলে তাঁত শ্রমিকরা দিনের পর দিন খেয়ে না খেয়ে মানবেতর দিন যাপন করছে।
শাহজাদপুর উপজেলা নি¤œাঞ্চল এলাকা হওয়ায় এখনও বন্যার পানি মাঠ থেকে পুরোপুরি নামেনি। তাই কৃষি কাজও পুরোপুরি শুরু হয়নি। ফলে তাঁতের কাজ ছাড়া তাদের হাতে আর কোন বিকল্প কর্মসংস্থানও নেই। অপর দিকে শাহজাদপুরে বিদ্যুৎ চালিত পাওয়ার লুমের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এ কারণে শ্রমিক ছাটাই মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে গেছে। ফলে অসংখ্য শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে।
আবার অনেকেই ন্যায্য মজুরি না পেয়ে পেটের দায়ে রিক্সা চালনা অথবা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। ফলে শাহজাদপুর উপজেলার প্রায় অর্ধলক্ষাধিক তাঁত শ্রমিক বেকার হয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে চরম মানবেতর জীবন যাপন করছে। সরকারের এ দিকে নজর না থাকায় দিন দিন তাঁত শ্রমিকদের বেকারত্ব বেড়েই চলেছে। তাই তাঁত শ্রমিকরা এ ব্যাপারে দ্রুত সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ