ঢাকা, বৃহস্পতিবার 2 November 2017, ১৮ কার্তিক ১৪২8, ১২ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খুলনায় গাছের সাথে বেঁধে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা ॥ চারজন গ্রেফতার

খুলনা অফিস : চাঁদার টাকা না দেয়ায় খুলনায় ব্যবসায়ী নিয়ামুল করিমকে (৩৬) পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনায় রূপসা থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহতের পিতা  শেখ সাইদুল করিম বাদি হয়ে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হান্নানসহ ১৩ জনের নামে এ মামলা দায়ের করেন। পুলিশ এ ঘটনায় উক্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে নাদিম, সাইফুল, মনিরুল ও খায়রুল নামের চারজনকে গ্রেফতার করেছে।
এদিকে রূপসা উপজেলার দেয়াড়া গ্রামের খেজুরতলা সংলগ্ন জুনায়েদের ডকইয়ার্ডে একটি গাছের সঙ্গে পিঠমোড়া দিয়ে দুই হাত বেঁধে লোহার রড, লাঠিসোঁটা দিয়ে মারপিট করে জখম করা হয়। এক পর্যায়ে তারা নিয়ামুলকে পার্শ্ববর্তী একটি বটগাছে রশি দিয়ে বেঁধে রাখে। ঘটনাটি এলাকার অর্ধ-শতাধিক লোক দাঁড়িয়ে থেকে প্রত্যক্ষ করলেও কেউই হান্নান বাহিনীর ভয়ে প্রতিবাদ করতে সাহস পাননি। পরে নিয়ামুলের পিতা সাইদুল করিম ও তার মা কাকুতি মিনতি করে হান্নান ও তার বাহিনীর কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিয়ামুল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে  মারা যায়। এর আগে গত মে মাসে হান্নানসহ তার বাহিনী একই এলাকার ফায়েজুল ইসলাম এবং সরদার রফি আহম্মেদের ছেলে সরদার শুভকে নির্যাতন করে উক্ত বটগাছে ঝুলিয়ে রাখে। পরবর্তীতে শফি এবং ফায়েজুরের পিতা-মাতার অনুরোধে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। এ ব্যাপারে হান্নানসহ তার বাহিনীর বিরুদ্ধে থানায় মামলা রয়েছে।
স্থানীয় ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রূপসা উপজেলার দেয়াড়া গ্রামের কথিত জমি ব্যবসায়ী আব্দুল হান্নানের ম্যানেজার ছিলেন একই গ্রামের নিয়ামুল করিম। টাকা-পয়সা লেনদেন নিয়ে নিয়ামুলের সঙ্গে হান্নানের বিরোধ সৃষ্টি হয়। এরই জের ধরে সোমবার বিকেল ৪টার দিকে হান্নানের সহযোগী ১০/১৫ জন যুবক নিয়ামুলকে বাড়ি থেকে ডেকে ভৈরব নদের পাড়ে জুনায়েদের ডকইয়ার্ডের পাশে খেজুর বাগানে নিয়ে যায়। সেখানে হান্নানের নেতৃত্বে তার লোকজন নিয়ামুলকে গাছের সঙ্গে পিঠমোড়া দিয়ে দুই হাত বেঁধে নির্যাতন করে। সন্ধ্যায় নির্যাতনের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে নিয়ামুলের পিতা ও মাতা হান্নান এবং তার সহযোগিদের কাছ থেকে কাকুতি-মিনতির পর তারা নিয়ামুলকে ছেড়ে দেয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাত ৯টার দিকে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নিয়ামুল মারা যায়।
নিহত নিয়ামুল করিমের ছোট ভাই শেখ এনামুল করিম লিপু বলেন, সোমবার বিকেল ৪টার দিকে তারা একসঙ্গে বাড়িতে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। এ সময় জিয়াদ, মিরাজ, শামীম, নূর জামান ও মিজানুরসহ ১০/১৫ জন গিয়ে হান্নানের নাম উল্লেখ করে বলে, ‘সাহেব তোকে ডাকে, নদীর ঘাটে চল’। এ সময় তারা কারণ জানতে চাইলে বলে, ‘সাহেব কথা বলবে, কথা বলেই ছেড়ে দেবে’। এ কথা বলে তার ভাইকে ডেকে ভৈরব নদের পাড়ে জুনায়েদের ডকইয়ার্ডের পাশে খেজুর বাগানে নিয়ে যায়। পরে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে খবর পান তার ভাইকে মারধর করা হচ্ছে। এ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন নিয়ামুল করিম পড়ে রয়েছে। তাকে ধরে বাড়িতে নিয়ে গেলে সে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে মঙ্গলবার মারা যায়। তিনি অভিযোগ করেন, হান্নান তার ভাইয়ের কাছে ২ লাখ টাকা পাবে বলে তাদের জানায়। কিন্তু এর কোন প্রমাণ সে দিতে পারেনি। এরপরও তাকে ৭০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি টাকাও পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। কিন্তু সে ওই টাকার জন্যই তার ভাইকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। তিনি এ হত্যার সঙ্গে জড়িতদের কঠিন শাস্তি দাবি করেন।
নিয়ামুলের বোন রাখি বেগম জানান, তার ভাই দীর্ঘদিন ধরে হান্নানের ব্যক্তিগত ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতো। হান্নান তার ভাই নিয়ামুলের নিকট কিছু টাকা পেতো এবং টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে হান্নানসহ তার লোকেরা নিয়ামুলকে হত্যা করেছে। অভিযোগ রয়েছে হান্নান উক্ত এলাকায় অবৈধ জমিজমার ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য নিয়ামুলকে সব সময় কাছে রাখতো। এই সুযোগে নিয়ামুল হান্নানের কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার কারণে তার নিকট থেকে টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে নিয়ামুলকে মারধর করা হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কথিত জমি ব্যবসায়ী আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে জমি জালিয়াতি, প্রতারণা, মাদক ব্যবসা ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু পুলিশের সঙ্গে সখ্যতা থাকার কারণে তাকে এলাকার কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হান্নান ও তার বাহিনী আইচগাতী ইউনিয়নের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্পটে অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। সে নদী পথে নিজস্ব কার্গোর মাধ্যমে অস্ত্র আমদানি করে বলে এলাকাবাসী পোস্টারিং করেছে। তাছাড়া সে ভৈরব নদে নৌ পথে জাহাজ ও লঞ্চ থেকে তেল চুরি, ডাকাতি এবং বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইলেক্ট্রনিক খুঁটি চুরি করে বিপুল অর্থ ভান্ডার তৈরি করেছে বলে পোস্টারিং করা হয়েছে। রূপসা উপজেলার আব্দুলের মোড়, শহীদের মোড়, শিরগাতীর মোড়, সেনের বাজার, পথের বাজার, রাজাপুরসহ আইচগাতী ইউনিয়নের সর্বত্র উক্ত পোস্টার এখনো শোভা পাচ্ছে। চলতি বছরের মে মাসে হান্নানসহ তার বাহিনী একই এলাকার ফায়েজুল ইসলাম এবং সরদার রফি আহম্মেদের পুত্র সরদার শুভকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করে ওই বটগাছে উপুড় করে ঝুলিয়ে রাখে। পরবর্তীতে শফি এবং ফায়েজুরের পিতা-মাতার অনুরোধে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। এ বিষয়ে হান্নানসহ তার বাহিনীর বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে।
রূপসা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, নিহত নিয়ামুল করিম স্থানীয় ফরেন মার্কেট এলাকার শেখ সাইদুল করিমের ছেলে। সে বিভিন্ন এলাকা থেকে চিংড়ি মাছ কিনে রূপসা পাইকারী বাজারে বিক্রি করতেন। তার একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে নিয়ামুল সবার বড়। তিনি বলেন, পোস্ট মর্টেম শেষে মঙ্গলবার বিকেলে নিহতের লাশ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সন্ধ্যায় নিহতের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হলে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের পিতা বাদি হয়ে ১৩ জনের নামে মামলা দায়ের করেছে। হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওসি (তদন্ত) আব্দুর রহমান বলেন, হত্যাকান্ডের সময় ভিডিও চিত্রে যাদের দেখা গেছে তাদের মধ্যে মামলার এজহারভুক্ত আসামী নাদিম, সাইফুল, মনিরুল ও খায়রুলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে আনা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ