ঢাকা, শুক্রবার 3 November 2017, ১৯ কার্তিক ১৪২8, ১৩ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে টিআইবি

শুধু ত্রাণ সামগ্রী ও আর্থিক সাহায্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের পক্ষে রোহিঙ্গা সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সúারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গত বুধবার নিজেদের রোহিঙ্গা সংক্রান্ত জরিপ রিপোর্ট প্রকাশনা উপলক্ষে ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির পক্ষ থেকে আরো বলা হয়েছে, চীন, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় ও শক্তিশালী দেশগুলোর দ্বিমুখী নীতির কারণেই একদিকে রোহিঙ্গা সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে সংকট দিন দিন আরো প্রকট হয়ে উঠছে। চলে যাচ্ছে বাংলাদেশের নাগালের বাইরে। বাংলাদেশ সেই সাথে ভয়াবহ বিপদের মধ্যে পড়ছে। 

এমন মন্তব্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে টিআইবি বলেছে, বড় দেশগুলো একদিকে রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করার পাশাপাশি মুখে ত্রাণ সাহায্য দেয়ার ঘোষণা দিচ্ছে, অন্যদিকে তারাই আবার মিয়ানমারের কাছে অস্ত্রশস্ত্র বিক্রি করছে। এর ফলে মিয়ানমার উল্টো প্রশ্রয় পাচ্ছে এবং উৎসাহিত হচ্ছে, যার ফলে দেশটি বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফেরৎ নেয়ার ব্যাপারে কোনো চাপ বা তাগিদই বোধ বা অনুভব করছে না। বড় দেশগুলোর এই দ্বিমুখী নীতি ও ভূমিকার কারণে জাতিসংঘের পক্ষেও বাংলাদেশের সংকট কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।  

এমন অবস্থায় সংকট সমাধানের যেমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না, তেমনি বাংলাদেশের জন্য বিপদ ও ঝুঁকি কেবল বেড়েই চলেছে। এ প্রসঙ্গে নিজেদের আশংকার কথ্য ব্যক্ত করতে গিয়ে টিআইবি বলেছে, রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে সমতা রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। আর এই সমতা রক্ষা করা এবং সকলকে সমানভাবে সন্তুষ্ট করা না গেলে শরণার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়বে এবং পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটবে। টিআইবি আরো মনে করে, রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশের সমাজেও সংঘাত-সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ, কক্সবাজারের যে এলাকাগুলোতে শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে সেখানে বাংলাদেশিদের সংখ্যা চার লাখ ৭৫ হাজারের কাছাকাছি। অন্যদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা এরই মধ্যে ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। সমস্যার সমাধান না করা গেলে বাংলাদেশিদের সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দ্বন্দ্ব ও সংঘাত ক্রমাগত বেড়ে চলবে এবং এক সময় নিজেদের দেশে বাংলাদেশিদেরই অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। শুধু তা-ই নয়, এই দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়বে এবং সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ড শুরু করবে। এতে রোহিঙ্গারা তো বটেই, বাংলাদেশিরাও জড়িয়ে পড়তে পারে। 

এ ধরনের আশংকার পরিপ্রেক্ষিতেই ত্রাণ ও সাহায্যকেন্দ্রিক তৎপরতা চালানোর পরিবর্তে সংকটের স্থায়ী সমাধান অর্জনের লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটি প্রসঙ্গক্রমে মিয়ানমারের ব্যাপারে বড় বড় দেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীতি ও কার্যক্রমের সমালোচনা করে বলেছে, রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে দমন-নির্যাতন ও হত্যার অভিযান চালালেও দেশটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে উল্টো সকল পন্থায় মিয়ানমারকে সাহায্য-সহযোগিতা করা হচ্ছে। মিয়ানমারকে এমনকি শান্তি মিশনেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। মূলত সে কারণেই মিয়ানমার একদিকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্মূল করার অভিযান চালানোর সাহস পেয়েছে, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘসহ কারো আহ্বানেই সাড়া দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছে না। এমন অবস্থায় বাংলাদেশ সরকারকেই জোর কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সংকটের সমাধান অর্জনের জন্য সচেষ্ট হতে হবে বলে মন্তব্য করেছে টিআইবি। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, রোহিঙ্গাকেন্দ্রিক কোনো একটি বিষয়েই টিআইবি অযৌক্তিক কিছু যেমন বলেনি, তেমনি করেনি সামান্য অতিরঞ্জনও। বিশ্ব ইতিহাসের পর্যালোচনা করলেও দেখা যাবে, এ ধরনের শরণার্থী সংকটে অনেক দেশে এমনকি ভৌগোলিক পরিবর্তন পর্যন্ত ঘটেছে। সাম্প্রতিককালের জার্মানি এবং ইউরোপের অন্য কয়েকটি দেশ এর বড় উদাহরণ। বর্তমান পর্যায়ে ভয়ের প্রধান কারণ হলো, টিআইবি সঠিকভাবেই চীন, ভারত, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় ও শক্তিধর দেশগুলোর দ্বিমুখী নীতি ও কার্যক্রমের কথা তুলে ধরেছে। এসব দেশ মিয়ানমারকে শুধু অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করছে না, দেশটির সেনাবাহিনীকেও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তাছাড়া মিয়ানমারে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পুঁজির বিনিয়োগও বাড়িয়ে চলেছে। এসবের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হচ্ছে, বাংলাদেশকে সংকটের কবল থেকে মুক্ত করার ব্যাপারে বড় দেশগুলোর কোনো আগ্রহ নেই। তারা বরং অঘোষিতভাবে মিয়ানমারের পক্ষই নিয়েছে। চীন ও রাশিয়া তো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার বিরোধী যে কোনো প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভেটো প্রয়োগের হুমকি পর্যন্ত দিয়ে রেখেছে। 

এভাবে সব মিলিয়ে বলা যায়, বড় ও শক্তিধর দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের আশা করার কিছু নেই। বাংলাদেশকে তাই নিজের যোগ্যতায় সংকটের সমাধান করতে হবে। আর এজন্য জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর কোনো বিকল্প নেই। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত টিআইবির মূল্যায়ন ও বক্তব্যকে যথোচিত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া এবং ত্রাণ ও অর্থনৈতিক সাহায্যের দিকে মনোযোগ দেয়ার পরিবর্তে কূটনৈতিক তৎপরতাকে জোরদার করা। এ ব্যাপারে জাতিসংঘের পাশাপাশি তুরস্ক ও জর্ডানসহ মুসলিম দেশগুলো বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়াতে পারে বলে আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ