ঢাকা, শনিবার 4 November 2017, ২০ কার্তিক ১৪২8, ১৪ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এ প্রজন্মের আধুনিকতম বিদ্যাপীঠ

ইফতেখার হোসাইন : দেশের বিদ্যমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) দ্রুততার সঙ্গেই এগিয়ে চলছে। উপকূলীয় জেলা নোয়াখালীতে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টি নোয়াখালীবাসির জীবনধারায় বহুমাত্রিক গতিবেগ সঞ্চারের পাশাপাশি দেশের প্রযুক্তি সেক্টরের সম্প্রসারণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিকে বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা অবকাঠামোগতভাবে উন্নত, একাডেমিকভাবে আধুনিক ও গবেষণাবান্ধব করে গড়ে তুলতে দক্ষ হাতে পরিচালনা করছেন এর উপাচার্য  প্রফেসর ড. এম অহিদুজ্জামান। তিনি বিশ্বাস করেন ‘নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হবে উন্নত আধুনিকতম বিশ^বিদ্যালয়, এ প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ’। উপাচার্য হিসেবে ২০১৫ সালের জুন মাসে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই তিনি নোবিপ্রবিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের কাজ করে চলছেন। যুগোপযোগী শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রী পিএইচডি, এমফিল, এমএস ও পোস্টডকধারী শিক্ষকদের এখানে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। প্রায় পাঁচ হাজার মেধাবী শিক্ষার্থীর পাঠদানে ২১৫ জন শিক্ষক রয়েছেন। এর মধ্যে ৫০ জনই আছেন পিএইচডিসহ উচ্চতর ডিগ্রীধারী। নোবিপ্রবিতে বর্তমানে ৫টি অনুষদ, ২৪টি বিভাগ ও ২টি ইনস্টিটিউট নিয়ে একাডেমিক কার্যক্রম চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে উপকূলবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সমুদ্রসম্পদ কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে উচ্চতর পাঠদান ও গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে এখানে খোলা হয়েছে ওশানোগ্রাফি বিভাগ। বর্তমান বিশে^র চাহিদা অনুযায়ী তথ্য ও প্রযুক্তির শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে এখানে খোলা হয়েছে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ। পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনায় উজ্জ্বল বাংলাদেশ; আর এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চালু করা হয়েছে ট্যুরিজম এ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারের প্রতি লক্ষ্য রেখে নতুন খোলা হয়েছে ব্যাচেলর অব এডুকেশন (অনার্স), ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস এবং সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ। এখানে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মেসি, কৃষি, লাইব্রেরী সায়েন্স, আইআইটি বিষয়েও পড়ানো হয়। চলতি শিক্ষাবর্ষে (২০১৭-১৮) ২৪টি বিষয়ে ১২০০ আসনে শিক্ষার্থীরা নোবিপ্রবিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবে। ভর্তি পরীক্ষা আগামী ৩ এবং ৪ নভেম্বর ২০১৭ অনুষ্ঠিত হবে। এখানে উল্লেখ্য, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত। ডিজিটাল পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমেই তা সম্ভব হয়েছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সকল বিভাগের কোর্স কারিকুলামকে ঢেলে সাজানো হয়েছে যাতে এখান থেকে শিক্ষার্থীরা উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে-বিদেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করতে পারে।
উল্লেখ করার মতো বিষয় নোবিপ্রবিতে থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি সরকারের এ্যাডমিন, পররাষ্ট্র, কৃষি, মৎস্য, শিক্ষাসহ অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিসমূহে সুনামের সঙ্গে দেশসেবায় নিয়োজিত। বললে অত্যুক্তি হবে, এখানকার শিক্ষার্থীই পৃথিবীখ্যাত মাইক্রোসফটের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় টিমের সদস্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছে।
এছাড়াও নোবিপ্রবির ছাত্র-ছাত্রীরা আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ইউরোপের নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএস, পিএইচডি ও ফেলোশিপ কোর্সে অধ্যয়নরত। শিক্ষার্থীরা যাতে করে আরো বেশি পরিমাণে বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালসমূহে অধ্যয়নের সুযোগ পায় সে বিবেচনায় চেক প্রজাতন্ত্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ বোহেমিয়া, যুক্তরাজ্যের গ্লাডিয়া এঙ্গলিয়া রাসকিন, স্টারলিং এবং নর্থ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষা সমন্বয় কার্যক্রম চালু করেছে নোবিপ্রবি কর্তৃপক্ষ। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহেই জাপানের কুমামোতো বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শাকুরা একচেঞ্জ প্রোগ্রাম ইন সায়েন্স’ এর জন্য মনোনীত হয়েছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই দুই শিক্ষার্থী।
একাডেমিক সাফল্যের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন অনেকদূর এগিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বাঙ্গীন উন্নয়নে ২৩৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকার প্রকল্পের নানামুখী উন্নয়ন কাজ যেমন- শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুম, উন্নতমানের বহুতল গ্রন্থাগার, সেমিনার রুম, রিডিং রুম, ওয়াইফাই ও ইন্টারনেট সুবিধা, ক্যান্টিন, পরিবহন সুবিধা, পূর্বের ২টি সহ আরো নতুন ৩টি হল নির্মাণ ও ল্যাব ফ্যসিলিটি ইতিমধ্যেই বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ভবনসমূহের ঊর্ধ্বমূখী সম্প্রসারণ কাজ, নতুন নতুন প্রকল্প নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন, আইসিটি ল্যাব, মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠা, মসজিদ ও উপাসনালয় নির্মাণসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা, যেন একখণ্ড জমিও চাষের বাহিরে না থাকে। তদানুযায়ী নোবিপ্রবির খালি জায়গাকে চাষাবাদের আওতায় আনা হয়েছে। ভৌত সুবিধা বৃদ্ধির চেষ্টার অংশ হিসেবে বর্তমানে নোবিপ্রবিতে বাংলাদেশের বৃহত্তম ৪ লাখ ৩৮ হাজার দুই’শ বর্গফুট আয়তনের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাডেমিক কাম ল্যাব ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ১০ তলা কোয়ার্টার নির্মাণের টেন্ডার কাজও সম্পূর্ণ হয়েছে। যেখানে শিক্ষক কর্মকর্তাদের জন্য ৮০টি আধুনিক ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি কর্মচারীদর জন্য ৮০টি ফ্ল্যাট সমৃদ্ধ একটি সুবিশাল ভবন নির্মাণের কাজও হাতে নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি নোবিপ্রবি’র শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বাড়ি নির্মাণ, জমি ও ফ্ল্যাট ক্রয় এর সুবিধার্থে অগ্রণী ব্যাংক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে ৫০ কোটি টাকার কর্পোরেট হোলসেল ঋণচুক্তি সম্পাদন করা হয়।
ফলে নোবিপ্রবি পরিবারের সদস্যদের গৃহনির্মাণ ঋণ নেয়ার পথে আর কোনো বাধা থাকলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় অভ্যন্তরীণ কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের পাশাপাশি দেশের জাতীয় বিপর্যয় মোকাবেলায়ও এগিয়ে রয়েছে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যাকবলিতদের সহায়তায় সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে নোবিপ্রবি পরিবার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীবৃন্দের একদিনের বেতনের সমপরিমাণ অর্থসহ মোট ৬ লাখ টাকা বন্যাদুর্গতদের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনার ত্রাণ তহবিলে প্রদান করা হয়। শুধু তাই নয় মিয়ানমারের নির্যাতিত জাতিগোষ্ঠী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তায় ‘ত্রাণ তহবিল সমন্বয় কমিটি’ গঠন করা হয়েছে।  এ বছরের ৩০ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের জন্য ৪৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকার রাজস্ব বাজেট ঘোষণা করা হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণা খাতেই বরাদ্দ সর্বোচ্চ ৪৩ লাখ টাকা রাখা হয়। গবেষণায় একটি বিশ্বমানের পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে ভবিষ্যৎ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সমুদ্র ও সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ইনস্টিটিউট’।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরেই ৮৭৫ একর জায়গায় এ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা  হবে। যা হবে বিশ্বে প্রথম কোনো একক ইনস্টিটিউট যেখানে শিক্ষার্থী ও গবেষকরা জন্য সমুদ্র বিজ্ঞান, সামুদ্রিক সম্পদ, ডেল্টা গঠন, এনভায়রনমেন্টাল ইকোলজি এবং মহাকাশ বিষয়সমূহে গবেষণা করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে সময়োপযোগী শিক্ষাদানের পাশাপাশি মনস্তাত্বিক বিকাশ ও শারীরিক সক্ষমতা অর্জনের বিষয়টিকে অধিক প্রাধান্য দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের হলসমূহে খেলাধুলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। বিদ্যমান সাংস্কৃতিক কমিটিগুলোকে উৎসাহিত করে শক্তিশালী করার মাধ্যমে ক্যাম্পাসে নানাধরনের  সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বাঙ্গীন কর্মকা- তুলে ধরা ও জনমত গঠনে  নোবিপ্রবি ‘জনসংযোগ ও  প্রকাশনা’ বিভাগকেও যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মযজ্ঞ পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক মিডিয়াবান্ধব (প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক) হয়েছে। এর গুরুত্ব বুঝে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয়ভাবেই এর পৃষ্ঠপোষকতা করছে। নোবিপ্রবির এগিয়ে চলা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এম অহিদুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত ২০৪১ সালের একটি উন্নত ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্পের যথাযথ সফল বাস্তবায়নের সঙ্গে সাথী হয়ে এ লক্ষ্য পূরণে কাজ করে যাচ্ছি। আমার চার বছরের মেয়াদকালের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি আধুনিক ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের উপযোগী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ