ঢাকা, শনিবার 4 November 2017, ২০ কার্তিক ১৪২8, ১৪ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দারুস সালাম মাদরাসা : আলোর পথে আরও এক ধাপ

ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমাদ : আমার শিক্ষা গুরু ও বাবা শহীদ আলী আহমাদকে সবাই মুন্সী বলে ডাকতো। অশিক্ষিত চাষী ও সবজির ব্যবসায়ীকে এভাবে মুন্সী ডাকতো তার কারণ তিনি ছিলেন নিয়মিত নামাযী। চাল-চরিত্র ছিল তার খুবই চমৎকার। তিনি ছিলেন সবার সেরা এক মানুষ। তিনি সবার আগে মসজিদে চলে যেতেন। সময়মত আযান দিতেন। ইমামতিও করতেন।
ফজরের নামাযের পর কাজে বের হবার আগে তিনি নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করতেন তার নিজ ঘরে বসেই। বাবার পড়া সেই কুরআন মজিদটি আজও সেই ঘরে সযত্নে রক্ষিত আছে। দীর্ঘদিন পর বাবার সেই  ঘরেই সেই কুরআনের সুবাসে কায়েম হল দারুস সালাম মাদরাসা ও ইয়াতীমখানা। ২০১৭ইং সালের জানুয়ারীতে আমার বয়স যখন প্রায় ৬৫ বছর তখন এই মাদ্রাসার শুভ যাত্রা। আমাদের মনে আনন্দের জোয়ার বয়ে চলছে। বহুদিন আগের লালিত স্বপ্ন আজ বাস্তবে পেয়ে আমি মহান আল্লাহর সিজদায় লুটিয়ে পড়ি।
শহীদ বাবার থেকে পাওয়া কুরআনের পথ বেয়ে সেই শিশুকাল থেকে এ পর্যন্ত এসেছি। কুরআনের আলোকে নিজেকে, পরিবারকে ও সমাজকে আলোকিত করার সংগ্রাম করে করেই এ পর্যন্ত এসেছি। অথচ সেই কুরআন শিক্ষালাভের কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারিনি। ফলে সারাদেশের মত আমার গ্রামের গণ-মানুষের সন্তানদের অন্ধকারে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।
শয়তান কিন্তু বসে নেই। এসব সন্তানদেরকে তাদের বাবা মায়ের সাথে অজ্ঞতা পাপাচার আর অপকর্মের মধ্যে পড়ে দোজখের পথে নিয়ে যাচ্ছে। ইসলামের পথ যেন তাদের কাছে অনেক কঠিন। কুরআন থেকে তারা অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। দুনিয়া আর আখেরাত তাদের জন্য হয়ে উঠছে অশান্তির মহা আখড়া। গভীর সেই আযাব থেকে তাদেরকে ফিরিয়ে আনতে এবার সুযোগ পেলাম। সাহস করে এগিয়ে চললাম। সব বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করলাম। শুরু হল কুরআনের কারখানা। আল্লাহর রহমত ও বরকতে কিছু ইসলামী চিন্তাবিদ ও দাতার সহযোগিতা পেলাম। পেলাম সেরা ক্বারী, হাফেজ ও আলেম সফিউল্লাহ এবং আরো শিক্ষকদেরকে। সবার সহযোগিতা ও পরামর্শে দারুস সালাম মাদরাসা ও ইয়াতিমখানায় কিছুদিনের মধ্যেই ১০ জন ইয়াতীম সহ ৭০ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়মিত কুরআন শিক্ষার ক্লাস করে চলেছে। সুদক্ষ ক্বারী ও হাফেজদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় পাতিরা ভূঁইয়া পাড়ায় এখন পবিত্র কুরআনের আওয়াজে সরগম ভাব। সারাক্ষণ এখানে উচ্চস্বরে কুরআন তেলাওয়াতের ধুম চলছে। এ পাড়ায় কেউ এলে শিশু থেকে শুরু করে কিশোর-কিশোরী, তরুন-তরুনী সবাই বলে আস্সালামু আলাইকুম।  অথচ আগে এখানে এরূপ শান্তির সম্ভাষণ ছিল না। আল্হামদুল্লিাহ বলে এলাকার বড়রা, ছোটরা, গরীবেরা, ধনীরা সবাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে লাগলো। শিশুরা যখন তাদের বাবা মাকে সালাম দেয় তখন তাদের মনের মাঝে মহা আনন্দের ঢেউ খেলে। অশ্রু ভেজা চোখে নিষ্পাপ শিশুদের বুকে জড়িয়ে ধরে। দারুন শান্তিতে তাদের আত্মা সঞ্জীবনী শক্তি ফিরে পায়। ভূঁইয়া পাড়ায় এখন অভাবী নেই। তারা আবাসিক ছাত্রদের খাবার দেয়। ঘরে ঘরে লজিং চলে। সবাই যেন কোরআনের হাফেজ আলেম আর তাদের শিক্ষকদের খাবার খাওয়াতে নিজেদের ভাগ্যবান মনে করে। ইয়াতীম ছাত্রদের লালন পালন করছে তারা নিজের সন্তানের মত। যারা আগে নামায পড়তো না তারা এখন নামায পড়ে। শিশু সন্তানদের বেলা উঠার আগেই তারা তুলে দেয়। মাদ্রাসায় দিনে পাঁচবার আযান হয়। আযানের মধুর আওয়াজে শয়তান দৌড়ে পালায়। চারদিকে যেন আল্লাহ্ আর পরকালের সুগন্ধ বয়ে চলে। মনের আনন্দে ভাই নান্নু মিয়া তার একটি ঘর সহ বাথরুম অজুখানা ছাত্রদের জন্য ছেড়ে দেয়। মরহুম তাহাজ উদ্দিন মুন্সী ছিলেন আমার এক মামা। তারই ছেলে এই নান্নু। নান্নুর বাড়ী এখন হাফেজিয়া মাদরাসার আবাসিক প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন এখানে হাফেজীখানার ছাত্র ইয়াতীমগণ কুরআন শিখে। আবাসিক শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে তাদের  সুশৃংখল ও পরিপাটি জীবন পরিচালনা সহ কুরআনের চর্চা এগিয়ে চলেছে আরো সুন্দরভাবে। তাতে মাদ্রাসার কলেবর আরো বেড়ে গেল। শিশুদের মায়েদের মনেও দারুণ আনন্দ। আঁধার চিরে আলোর পথ পেয়ে নারী পুরুষ সবাই যেন জীবনের সঠিক পথ ফিরে পেল। রমযান মাসের শুরু থেকেই মহিলারা ক্বারী সাহেবের ইমামতিতে তারাবীহ্র নামাযে এসে দলে দলে কাতারবন্দী হলো।
দারুন উৎসাহে তারা মাসব্যাপী শিক্ষক ও ছাত্রদের ইফতার ও খাবার বিতরণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যে সব মহিলারা কোন দিন ঈদের জামায়াতে শরিক হবার সুযোগ পায়নি তারা এবার মাদ্রাসায় এসে ঈদের জামায়াতে শরিক হয় আনন্দের সাথে। ঈদুল ফিতর আর ঈদুল আযহার ঈদের জামায়াত মহিলাদের নিয়ে সুন্দর ভাবে আদায় করা হয়। ফলে এ পাড়ায় মহিলাদের মাঝে যেন নতুন করে জান্নাতী সুবাস বইতে শুরু করেছে।
আমাদের এ পাড়ায়  আরেক চাচা ছিলেন আবেদ আলী মুন্সী। তিনিও ছোট খাটো ইমাম সাহেব হিসেবেই সুপরিচিত ছিলেন। তার ওয়ারিশদের মাঝেও ধর্মকর্মের জজবাহ বিরাজমান। এ পাড়া আসলে মুন্সিপাড়া। এই মুন্সিপাড়ায় এখন সকাল সন্ধ্যায় কুরআন তিলাওয়াতের মহা আয়োজন চলছে। দারুস সালাম মাদরাসার এসব মহা আয়োজন এলাকাবাসীর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের মহা আলামত। ইতিমধ্যেই এ মাদরাসার উদ্যোগে শুরু হয়েছে বয়স্কদের নিয়ে কুরআন শিক্ষার আয়োজন। নূরানী পদ্বতিতে পবিত্র কুরআন শিক্ষা দানের জন্য সেরা শিক্ষক জনাব ক্বারী মোঃ সালাউদ্দিন সাহেবের তত্তাবধানে প্রতিদিন বাদ মাগরিব বয়স্কদের নিয়ে নিয়মিত ক্লাস চলে। উৎসাহিত যুবকদের নিয়ে কুরআন শিক্ষার আরেক অধ্যায় চলছে। এভাবেই কুরআনের এই কারখানায় আল্লাহ্র রহমত আর জান্নাতের দরজা খুলে গেল। যারা এদিকে পা বাড়াবে তারাই পাবে আল কুরআন আর হাদীসের জান্নাতী সুবাস।
শহীদ আলী আহমাদ মুন্সী, তাহাজ উদ্দিন মুন্সী আর আবেদ আলী মুন্সীদের কবর, তাদের পূর্ব-পুরুষদের কবর, তাদের ওয়ারিশদের কবর, মহা শান্তিতে ভরে উঠবে দারুস সালাম মাদ্রাসার গতিপ্রবাহে ইনশাআল্লাহ। সাদকায়ে জারিয়ার এ কারখানার সাথে যারা সংযুক্ত হবে, যারা কুরআন পড়াবে, যারা সহযোগিতা করবে, যারা পাশে থাকবে তারা সবাই মহা পুণ্যবান হবে। আল্লাহ্র রহমত আর দয়া দ্বারা তারা সবাই হয়ে উঠবে ধন্য ও ভাগ্যবান। তাই মহান আল্লাহ্ পাকের শুকরিয়া জ্ঞাপনের ভাষা আমাদের জানা নেই। আল্লাহর অপার মহিমা প্রকাশ করে লাখো কোটিবার সিজদায় লুটিয়ে পড়ি।
মহান আল্লাহ্র দরবারে প্রতিদিন হাত তুলে আর সিজদায় পড়ে প্রান খুলে দোয়া করি যেন আমরা সবাই তারই সন্তোষ ভাজন হতে পারি। দুনিয়ায় আমরা চাই পরম শান্তি। আর পরকালে হতে চাই জান্নাতের অধিবাসী। আমাদের পূর্ব-পুরুষ আর উত্তর পুরুষ সবাই যেন জান্নাতবাসী হয়। এই দারুস সালাম মাদরাসা ও ইয়াতীমখানা যেন কিয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকে। ইহার কলেবর, সম্মান, সুখ্যাতি, সমৃদ্ধি আর অগ্রগতি যেন দিনের পর দিন বেড়েই চলে। এ মাদ্রাসা থেকে যেন লাখো কোটি ছাত্র-ছাত্রী আল-কুরআনের আলোকে আলোকিত হয়ে দেশ ও জাতিকে জান্নাতের পথ দেখাতে পারে সেটাই আমাদের বড় কামনা। ওগো আল্লাহ্ পাক আমাদের এই আকুল কামনা কবুল করো। আমিন, ছুম্মা আমিন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ