ঢাকা, রোববার 5 November 2017, ২১ কার্তিক ১৪২8, ১৫ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক নিয়ে কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ

# ১ হাজার ২১৮ কোটি ৮৯ লাখ ৬৯ হাজার টাকার প্রকল্পটি গলার ফাঁস ?

# দায়িত্ব নিতে অনীহা দুই সিটি করপোরেশনের

# প্রাক-সমীক্ষা না করেই দফায় দফায় নকশায় পরিবর্তন 

# উড়াল সড়কে ট্রাফিক সিগন্যাল , তাতেও  জটলা

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : নিত্যযানজটের নগরী ঢাকার যানজট নিরসনে মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক ( ফ্লাইওভার ) নির্মাণের যে প্রত্যাশা ছিল , তাতে এখন ‘গুড়েবালি’ । প্রকল্পটির সৎ উদ্দেশ্য ছিল জনভোগান্তি কমানো । কিন্তু অসৎ উদ্দেশ্যে দফায় দফায় নির্মাণ ব্যয় ও নির্মাণকাল  বাড়িয়ে তিতিক্ষার দীর্ঘ প্রকল্পে রূপ নেয় সেটি । এই উড়াল সড়কটি নির্মাণের আগে কোন প্রকার প্রাক-সমীক্ষাই করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে । তা ছাড়া , প্রকল্পটির নকশায় বারবার নানা অজুহাতে পরিবর্তনও আনা হয়েছে । এত কিছুর মধ্যেই প্রকল্পটির সমাপ্তি টেনে প্রত্যাশা নিয়ে দেড় সপ্তাহ আগে উড়াল সড়কটির সব দ্বার খুলে দেয়ার পরই সকল অনিয়মের চিত্র এক এক করে হাজির হতে শুরু । নতুন নতুন জায়গায় যানজটে হতাশা দেখা দিয়েছে চলতি পথের যাত্রীদের। গণমাধ্যমের আলোচনায় উড়াল সড়কটির ব্যবহার নিয়ে নানা কথা ওঠার পর বাস্তবতার নিরিখে সংশ্লিষ্টদের কপালে পড়েছে দুশ্চিন্তার ভাঁজ । 

রাজারবাগ, শান্তিনগর, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া, ওয়্যারলেস গেইট ও বাংলামোটরে খোলা নতুন র‌্যাম্পগুলো দিয়ে উঠে অন্য কোনো র‌্যাম্প দিয়ে নামার সময়ই পড়তে হচ্ছে যানজটে। যানজট তৈরি হচ্ছে উড়াল সড়কের নিচের সড়কেও। মগবাজার থেকে বাংলামোটর সিগন্যালের পথে এতদিন অফিস ছুটির সময় যানজট দেখা গেলেও উড়াল সড়ক পুরোপুরি খুলে দেওয়ার পর সেখানে সারাদিনই গাড়ির জট লেগে থাকছে। প্রতিক্ষণই বাংলামোটর মোড় থেকে গাড়ির সারি উড়াল সড়কের উপরে অনেকটা পথে যানবাহনকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।

ওই সড়কে নিত্যযানজটের এই চিত্র দেখে সেখানকার বাসিন্দারা বলছেন, মালিবাগ, মৌচাক ও মগবাজারের যানজট উড়াল সড়কে চড়ে এখন চলে আসছে বাংলামটরে।

গত বৃহস্পতিবার সরজমিনে উড়াল সড়কটির বিভিন্ন অংশে ঘোরার সময় যানজটে পড়ে ক্ষুব্ধ অনেকেই নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন । অটোরিকশা চালক আবদুল কাইয়ুম বলেন, “ফ্লাইওভার ( উড়াল সড়ক ) তো আর আমারে জিগায়া বানায় নাই। আমারে জিগাইলে কইতাম ফ্লাইওভারটা বাংলামোটর সিগন্যালটা পার কইরা দিত। হেইপারে নিয়া এট্টা মুখ সোজা সোনারগাঁও রোড আরেকটা মুখ ডানে হোটেল সোনারগাঁওয়ের দিকে দিবার কইতাম। এইপারে আইটকা থাকা লাগত না। এইখানে নামাইয়া কোনো কাম হয় নাই।”

উড়াল সড়কে এসে বাংলামোটরে নামলে যানজটে পড়তে হয় বলে এখন আর উড়াল সড়কে ওঠেন না বলে জানান গোড়ানের বাসিন্দা মোহাম্মদ একরাম উল্লাহ ভূঁইয়া। বাংলামোটরের একটি ব্রোকারেজ হাউজের এই কর্মকর্তা বলেন, “সবগুলো র‌্যাম্পের মুখে সিগন্যাল এ উড়াল সড়কের একটি বড় দুর্বলতা। “আমি যেখানে নামব সেখানেই জ্যাম লাগে, যেদিক দিয়ে উঠব সেখানেও জ্যাম লাগে। এ কারণে উঠি না। এই উড়াল সড়কটার মূল সমস্যা হলো যেসব জায়গায় ওঠা-নামার ব্যবস্থা সেসব জায়গা খুবই ক্রাউডি। নেমেই সিগন্যালে পড়তে হয়।”

উড়াল সড়ক দিয়ে আসা গাড়ির চাপের পাশাপাশি সড়কের পাশের গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকানগুলোতে আসা যানবাহন সড়কে পার্ক করার কারণে এই এলাকায় যানজট বাড়ছে।  বাংলামোটর ও তেজগাঁও থেকে উড়াল সড়কটির ওঠা যানবাহনকে মগবাজার ওয়্যারলেসে নেমেই যানজটে পড়তে হচ্ছে। এখানে সড়কে দুটি ময়লার কন্টেইনার রয়েছে। মধুবাগ থেকে আসা যানবাহন ও রিকশাও সড়কে জটলা তৈরি করে। অনেক সময়ই র‌্যাম্প থেকে নামার পথেই আটকে থাকতে হচ্ছে। এ ছাড়া , দিনের বিভিন্ন সময় ওয়্যারলেসমুখী র‌্যাম্পে যানজট থাকায় উড়াল সড়কের উপরে কিছু যানবাহনকে ঘুরিয়ে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের দিকে নিয়ে যেতে দেখা যায়।

হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল সংলগ্ন র‌্যাম্প দিয়ে নেমেও যানজটে আটকা পড়তে হয়। বেইলি রোড সিগন্যালে আটকে থাকা যানবাহনের সারি চলে উড়াল সড়ক থেকে নামার র‌্যাম্প পর্যন্ত চলে আসে অনেক সময়। রামপুরা ও মগবাজার থেকে এসে রাজারবাগে নেমেও পড়তে হয় যানজটে। রাজারবাগ সিগন্যালের কারণে আটকে যেতে হয়। এই এলাকায়ও ফুটপাতের দোকানপাট, সড়কে রাখা যানবাহন যানজট বাড়িয়ে দেয়। উড়াল সড়কের র‌্যাম্পের কাছেই গ্রিনলাইন পরিবহনের বাস ঘোরানোয় ব্যাহত হয় যান চলাচল।

উঠা-নামার পথের এই প্রতিবন্ধকতায় মৌচাক-মগবাজার উড়াল সড়ক কোনো উপকারে আসছে না বলে মনে করছেন ব্যাংক কর্মকর্তা কাজী মাহমুদ। বলেন, “আগে যানজট তৈরি হত মৌচাকে, এখন রাজারবাগে এসেছে। “বাসাবোয় আমার অফিসে যাওয়ার জন্য মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে এসে বাংলামটর বা তেজগাঁও দিয়ে আমি উড়াল সড়কে উঠি। একবার ওয়্যারলেস নেমে যানজটে পড়তে হয়। আবার রাজারবাগে। ফেরার পথে বাংলামটরের ইস্কাটনে বসে থাকতে হয়।  “আবার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের সামনে থেকে উঠলে সোনারগাঁও হোটেল বা তেজগাঁও যেখানেই নামি, জ্যামে পড়তেই হচ্ছে। আগে দুই-তিনটা সিগন্যালে যদি আধা ঘণ্টা বসে থাকতে হত, এখন এক জায়গায় গিয়ে ৪০ মিনিট বসে থাকতে হচ্ছে।”

হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের পাশ থেকে উড়াল সড়কে ওঠা যানবাহন সোনারগাঁও হোটেলের সামনের র‌্যাম্প হয়ে নামতে গিয়েও আটকে যাচ্ছে। কারওয়ানবাজর সিগন্যাল থেকে যানবাহনের সারি বিজিএমইএ ভবনের সামনে পর্যন্ত চলে আসছে।

 বেইলি রোড থেকে উড়াল সড়কে উঠে বেশ দ্রুততার সঙ্গে তেজগাঁওয়ে পৌঁছানো গেলেও এর পরে পড়তে হচ্ছে যানজটের খাঁড়ায়। প্রতিদিন বিকাল থেকে রাত অব্দি দীর্ঘ যানজট তৈরি হয় তিব্বত, নাবিস্কো এলাকায়। তিব্বত কারখানার সামনে থেকে মহাখালী পর্যন্ত আসতে নিয়মিতই আধা ঘণ্টার বেশি লেগে যায়, আবার কখনও কখনও ঘণ্টা পেরিয়ে যায় তিন কিলোমিটার এই রাস্তায়।

বলাকা পরিবহনের চালকের সহকারী শাহীন আলম বলেন, “আগে মগবাজার, মালিবাগ আটকায়া যাইতাম। কিন্তুক এখন সব গাড়ি তেজগাঁও আইসা আটকায়া যায়। আমরাও জ্যামে পড়ি।” গুলিস্তান ও সায়েদাবাদ থেকে মহাখালীমুখী অনেক বাস-মিনিবাস মগবাজার হয়ে চলাচল করে। তবে শান্তিনগর ও রাজারবাগ থেকে উড়াল সড়কে উঠে তেজগাঁওয়ে নামার সুযোগ তাদের নাই।

এ কারণে উড়াল সড়ক কোনো উপকারে আসছে না বলে মন্তব্য করেন শতাব্দী পরিবহনের চালক শহীদ উদ্দিন। “আমাগো জন্য তো ফ্লাইওভারে উডার সিস্টেম রাখে নাই। থাকলে তো ভালো হইত। আমাগো গাড়ি সিটিং সার্ভিস, আগে যাইতে পারতাম। এই ফ্লাইওভার কইরা আমাগো সুবিধা হইল কই?”

বড় গাড়ি উড়াল সড়ক দিয়ে যেতে না পারায় এটি চালুর পরও মগবাজার, মৌচাক এলাকার সড়কে যানজট থাকছে বলে জানান ওই সড়ক ব্যবহারকারীরা।

গুলবাগ এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বড় বাস উপর দিয়ে যায় না। নিচের সড়কে প্রাইভেটকারও বেশি। এ কারণে মগবাজার এলাকায় যানজট বেশি লাগে। এইটা কইরা আমাদের তেমন উপকার হয় নাই।”

চলাচলকারীদের কাছ থেকে উড়াল সড়কটি নিয়ে হতাশার চিত্র উঠে এলেও ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মো. মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলছেন, “কিছু সমস্যা হলেও উড়াল সড়কটি হওয়ার পর উপকারই বেশি। “এই উড়াল সড়ক চালু হওয়ার পর সড়কে অনেক ‘স্পেস’ তৈরি হয়েছে। নতুন জায়গা তৈরি হওয়ার পর কোনো কোনো জায়গায় যানবাহন হালকা হয়ে গেছে। এটা একটা সুবিধা। তবে উঠা-নামার সময় কিছু কিছু সমস্যা হচ্ছে। এটা বাস্তবতা। এটা থাকবেই।”

উড়াল সড়ক থেকে নামার পর যানজটের কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “উড়াল সড়ক থেকে নামার পর নিচের গাড়ি ওপরের গাড়ি এক হচ্ছে। এছাড়া ইন্টারসেকশনে যাওয়ার কারণে গাড়ির চাপ একটু বেশি থাকায় কিছুটা জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। “তবে আমরা অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ করছি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে। এজন্য আমরা একটা নীতিমালাও করেছি।”

সড়ক ও ফুটপাত দখল করে রাখা স্থাপনার কারণেও যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে জানিয়ে ট্রাফিক পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মফিজ বলেন, এদের উচ্ছেদের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। “বাংলামটরের দোকানের সামনে রাখা যানবাহন রাখায় আমরা প্রতিদিনই মামলা দিচ্ছি। নিচের রাস্তার হকার সরিয়ে দেয়ার পর তারা আবারও বসছে। আমরা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে মিটিং করে বলেছি, এসব হকার তুলে না দিলে জনগণ এই উড়াল সড়কের সুফল পুরোপুরি পাবে না। এজন্য সিটি করপোরেশনে চিঠিও দেওয়া হবে।”

দীর্ঘ চার বছরের প্রতীক্ষার পর ধীরগতিতে শেষ হওয়া বাংলামোটর-মৌচাক-শান্তিনগর-রাজারবাগ ও মালিবাগ আবুল হোটেল উড়াল সড়কটি গত ২৬ অক্টোবর দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর এই উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে ওই দিন থেকেই পূর্ণাঙ্গভাবে (রামপুরা, শান্তিনগর, রাজারবাগ, মগবাজার ওয়ারলেস, কারওয়ানবাজার, সাতরাস্তা, রমনা ও বাংলামটর)  আটটি এলাকার মধ্যে সরাসরি যানবাহনের সংযোগ স্থাপন করে মালিবাগ-মৌচাক উড়ালসড়কটি। এর আগে তিনবারে উদ্বোধন হয়েছিল সাতরাস্তা থেকে ইস্কাটন, এফডিসি মোড় থেকে সোনারগাঁও হোটেল এবং বাংলামোটর থেকে মালিবাগের দিকে এক পাশে যান চলাচল উন্মুক্ত করা হয়।

এই উড়াল সড়কটির নির্মাণ কাজ শুরুর পর থেকেই এটির কার্যকারিতা নিয়ে সংশয়ের কথা বলে আসছিলেন পরিবহন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ। কিন্তু তারা যেসব কথা বলে আসছিলেন, সেগুলো এখন বাস্তবতা। অফিস সময় শুরুর আগে এবং অফিস সময় শেষে কিছু লুপে যানজট বাঁধছে প্রায়ই। অফিস সময় শুরুর আগে হলি ফ্যামিলি, শান্তিনগর লুপ এবং অফিস সময় শেষে বাংলামোটর এবং সোনারগাঁও হোটেলের সামনে নামার পথে যানজট বেঁধে যাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি যানজট বাঁধছে বাংলামোটরের অংশে। বাংলামোটর মোড় থেকে ইস্কাটন পর্যন্তই লেগে যাচ্ছে দীর্ঘ যানজট। মোড়ের আগে লুপ নামানোয় এই সমস্যা হয়েছে বলে মনে করেন উড়ালসড়কটির ব্যবহারকারীরা।

উড়াল সড়কটির প্রকল্প পরিচালক সুশান্ত কুমার পাল বলেন, ‘এতোদিন মৌচাক মোড়ে এসে সব দিকে গাড়ি জমা হতো। এখন  এ অংশে গাড়ি জমতে দেখা যায় না। কোন বাধা ছাড়াই এখন মৌচাকের  সেই অংশে দিয়ে গাড়িগুলো দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে এবং একটা অংশে গিয়ে জমা হচ্ছে। আমরাও বিষয়টি লক্ষ্য করেছি, উড়াল সড়ক থেকে নামার অংশ যেমন: বাংলামোটর-শান্তিনগরের দিকে কিছুটা গাড়ির জটলা বেধে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘একদিনেই তো সব যানজটের সমাধান সম্ভব নয়। বিষয়টি নিয়ে আমরাও চিন্তিত। তাই আমরা ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের সাথে বিষয়টি নিয়ে বসেছি। তারাও সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছে। কিছুটা সময় তো লাগবেই।’

উড়াল সড়কটির দিক নির্দেশনা নতুন ব্যবহারকারীদের কাছে সহজ করার জন্য মোড়গুলোতে শিগগির বিলবোর্ড বসানো হবে বলে জানান সুশান্ত।

উড়াল সড়কে সিগন্যালে জটলা

নগরীর অন্যান্য উড়াল সড়কের চেয়ে এই উড়ালসড়কটি একটু অন্য রকম। এখানে মালিবাগ ও মৌচাক মোড়ের দুই জায়গাতে ট্রাফিক সিগন্যাল রয়েছে। এই সিগন্যালেও জটলা দেখা যাচ্ছে দিনের একটি অংশে। ফলে রামপুরা থেকে শান্তিনগর এবং রাজারবাগ-শান্তিনগর থেকে রামপুরা ও বাংলামোটরের মধ্যে দুই ট্রাফিক সিগন্যালের কারণে রামপুরা থেকে আসা গাড়িগুলোকে ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে। রামপুরা থেকে মগবাজার হয়ে বাংলামোটর যেতে হলে সরাসরি উড়াল সড়ক ধরে আসা যায় না। রাজারবাগ গিয়ে সেখান থেকে ঘুরে আসতে হয়। এ কারণে কিছুটা নাখোশ এই পথ ব্যবহারকারীরা।

‘চাইরটা বছর এই রাস্তাডায় কতো কষ্ট সহ্য করলাম, কিন্তু আজকে দেখেন সেই ফ্লাইওভারের সুফল পাইলাম না। রামপুরা থেকে মগবাজার যাইতে হইলে হয় ফ্লাইওভার দিয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইন নাইমা আবার ঐখান দিয়া ওঠতে হইব, নাইলে মৌচাকের নিচের রাস্তা দিয়া যাইতে হইব। কেন, এই রাস্তা দিয়া কি এই চাইরটা বছর আমরা যাতায়াত করি নাই?’- বলছিলেন রামপুরার এক বাসিন্দা।

আবার মালিবাগ থেকে আসা গাড়িগুলো সাত রাস্তা ধরে চলতে চাইলে সেগুলোকে চলতে হচ্ছে নিচের সড়ক ধরে। অথবা বাংলামোটর দিয়ে ইস্কাটন হয়ে হলি ফ্যামিলির মোড় দিয়ে উঠতে হচ্ছে ফ্লাইওভারে।

এসব বিষয় নিয়ে প্রকল্প পরিচালক সুশান্ত কুমার পাল বলেন, ‘দেখুন, অল্প জায়গায় খুব বেশি কিছু প্রোভাইড (সরবরাহ) করা যায় না। মৌচাকের অংশটিই দেখুন। শান্তিনগর-রাজারবাগ-বাংলামোটরের যে এলাকায়ই যান না কেন, মৌচাক হয়েই যেতে হবে। সে হিসেবে আমদের ট্রাফিক সিস্টেম না দিয়ে আরেকটি তৃতীয় তলা লুপ ও রামপুরা থেকে বাংলামোটরের দিকেও একটি লুপ করা উচিত ছিল। কিন্তু মৌচাকের অংশটি এতোটাই সঙ্কীর্ণ, মানে আশেপাশের বিভিন্ন মার্কেটের কারণে এখানে আরেকটি লুপ করার জায়গা নেই।  এখানে আমরা কী করতে পারি?’।  একই কারণে মগবাজার মোড়েও মগবাজার থেকে সাতরাস্তার দিকে মোড় ঘুরানো যায়নি বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

দায়িত্ব নিতে অনীহা সিটি করপোরেশনের

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়কের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। কিন্তু পরিকল্পনায় ত্রুটি, লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতাসহ নানা কারণ দেখিয়ে এটির দায়িত্ব নিতে অনীহা দেখাচ্ছে সংস্থা দু’টি। ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র বিষয়টি আরও কয়েক দিন পর্যবেক্ষণের কথা বলেছেন। আর উত্তর সিটির প্যানেল মেয়র উড়াল সড়কটি তার সংস্থার মধ্যে নয় বলে জানান। এ অবস্থায় উড়াল সড়কটির দায়িত্ব সিটি করপোরেশনে যাচ্ছে নাকি এলজিইডিতেই থাকছে-এই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আর প্রকল্প পরিচালক বলছেন, ‘মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেই যার যার এলাকা অনুযায়ী দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নকশা অনুমোদনের পর থেকেই মগবাজার মৌচাক-উড়াল সড়ক নিয়ে নানা ত্রুটি দেখা দেয়। এরমধ্যে উড়াল সড়কে ট্রাফিক সিগন্যাল, বাম দিকে স্টিয়ারিং, যানজট লেগে থাকা, ওঠা-নামার র‌্যাম্প জটিলতাসহ নামার লুপে যানজট লেগেই থাকে। বিষয়গুলো বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমেও বিশদভাবে উঠে এসেছে। আর পরিবহন বিশেষজ্ঞরা উড়াল সড়কটিকে ঢাকার ‘বোঝা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সে কারণে এই ‘বোঝা’র দায়িত্ব নিতে চায় না কোনও সিটি করপোরেশনই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই সিটি করপোরেশনের একাধিক প্রকৌশলী বলেন, ‘উড়াল সড়ক নিয়ে এরইমধ্যে নানা জাটিলতা দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন যানজটের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, সেই চিত্রই বলে দিচ্ছে, এই উড়াল সড়ক যানজট নিরসনে কোনও ভূমিকা রাখছে না। বরং যানজটের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া এরইমধ্যে নকশা ত্রুটির কুফলসহ নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। এটি এখন সড়কের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর দায়ভার এলজিইডিকেই নিতে হবে।’  

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ও এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুশান্ত কুমার পাল বলেন, ‘উড়াল সড়কটি শুধু দক্ষিণ সিটি নয়, উত্তর সিটিতেও পড়েছে। উদ্বোধনের পর থেকেই এটি দুই সিটি করপোরেশনের কাছে দ্রুত হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন শুধু ব্যবহারের ম্যানুয়েল তৈরির কাজ চলছে। এরপর মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এলাকা অনুযায়ী দুই সিটি করপোরেশনের কাছে উড়াল সড়কটির দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে।’

প্রায় ৮ দশমিক ৭ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট এ উড়াল সড়কটির সিংহভাগই পড়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে। উত্তর সিটিতে রয়েছে এটির কাওরানবাজার ও সাতরাস্তাসহ কিছু অংশ। শুরুতে পুরো উড়াল সড়কটি দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও শেষ মুহূর্তে দুই সিটি করপোরেশনের কাছেই হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়কের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তিন তলাবিশিষ্ট চার লেনের এই উড়াল সড়কটির দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ৭ কিলোমিটার। এটি ১০ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল। ১ হাজার ২১৮ কোটি ৮৯ লাখ ৬৯ হাজার টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এর প্রতি মিটারে খরচ হয়েছে ১৩ লাখ টাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ