ঢাকা, সোমবার 6 November 2017, ২২ কার্তিক ১৪২8, ১৬ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দেশে ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষের  আলামতগুলো স্পষ্ট হচ্ছে

স্টাফ রিপোর্টার : দেশে ’৭৪’র দুর্ভিক্ষের আলামতগুলো স্পষ্ট হচ্ছে মন্তব্য করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৯৩ লাখ। এর মধ্যে হতদরিদ্রের সংখ্যা ২ কোটি ৮ লাখ। দিন দিন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। দিন দিন বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবনে নাভিশ্বাস দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, দেশের মানুষ না খেয়ে থাকলেও লুটপাটে ব্যস্ত ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে লুটপাটের মহোৎসব চলছে। গতকাল রোববার সকালে নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। 

দেশের ব্যাংকিং খাতে নৈরাজ্য ও দুর্নীতি মহামারি আকার ধারণ করেছে মন্তব্য করে রিজভী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় লুটপাটের মহোৎসব চলছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সব বাণিজ্যিক ব্যাংক তথা সোনালী, রূপালি, অগ্রণী, জনতা, বেসিক ব্যাংকের পর কৃষি ব্যাংকে ব্যাপক লুটপাট ও প্রমাণিত ঋণ জালিয়াতির খবরগুলো প্রকাশিত হচ্ছে। সর্বশেষ এনআরবি কমার্শিয়াল, ফারমার্স ব্যাংকের দুর্নীতি ও ঋণ জালিয়াতির খবর প্রকাশিত হওয়ার পর আঁৎকে উঠছেন গ্রাহকরা। এর আগে আওয়ামী স্টাইলে ইসলামী ব্যাংক দখল করে নেয়ায় বিদেশী মালিকরা তাদের পুঁজি সরিয়ে নিচ্ছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। একই কায়দায় দখল করা হয়েছে সোস্যাল ইনভেস্টম্যান ব্যাংক লিমিটেড এসআইবিএলও। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকা লুটপাটের তদন্ত প্রতিবেদন এখনও প্রকাশ করেননি অর্থমন্ত্রী। কয়েক দফা সময় দিয়েও রহস্যজনক কারণে তিনি পিছিয়ে গেছেন। কারণ কী তা দেশবাসী জানেন । 

তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি মিলে দেশে যে ৫৭টি ব্যাংক রয়েছে তার মধ্যে প্রায় ৫৬টি ব্যাংকেই পড়েছে ভোটারবিহীন সরকারের কালো থাবা। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের লুটপাটের সুযোগ করে দিতে যে ঋণ জালিয়াতির ঘটনা এসব ব্যাংকে ঘটেছে তা রীতিমত আঁৎকে উঠার মতো। তারা ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে সে টাকা পাচার করে দিয়ে বিদেশে বাড়ি বানাচ্ছে, গড়ে তুলছে সেকেন্ডহোম আর বেগম পল্লী। শনিবার এক মন্ত্রী বলেছেন, মন্ত্রীরা এখন বিদেশে বাড়ি বানাচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে ভয়াবহ লুটপাটে দেশব্যাপী সাধারণ মানুষের গ্রাহকদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে।

রিজভী বলেন, শুধু ব্যাংকিং সেক্টর নয় বীমা খাতসহ সমস্ত আর্থিক খাতেও চলছে ভয়াবহ নৈরাজ্য। এর আগে আপনারা দেখছেন শেয়ার বাজার লুট করে লাখ লাখ গ্রাহককে কিভাবে পথে বসিয়ে দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা। শেয়ার বাজারে সর্বস্ব হারিয়ে বেশ কয়েকজন যুবক আত্মহত্যাও করেছে। বন্ধুরা, দেশের এমন কোন সেক্টর, এমন কোন খাত আছে যেখানে ক্ষমতাসীনদের থাবায় ক্ষতবিক্ষত হয়নি। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, নিয়োগ বাণিজ্য আর লুণ্ঠিত সম্পদের কাড়াকাড়ি নিয়ে নিজেরা নিজেদের লোককে হত্যার ঘটনা ক্ষমতাসীনদের এখন নিত্যসঙ্গী। লুটের রাজত্ব কায়েম করে গোটা দেশটাকে ভোটারবিহীন সরকার চিবিয়ে গিলে ফেলেছে। আর এর খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, দেশে এখন তিন কোটিরও বেশি মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে বাস করছে। সরকারি পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্টকেও তিনি অগ্রাহ্য করে বানোয়াট কথা বললেন। বাস্তবে এই সংখ্যা অনেক বেশী।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা রয়েছে ৩ কোটি ৯৩ লাখ। হতদরিদ্রের সংখ্যা ২ কোটি ৮ লাখ। দিন দিন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছেই। ভোটারবিহীন সরকারের লোকেরা সমাজের সকল স্তরে যেভাবে দুর্নীতি ছড়িয়ে দিয়েছে, যেভাবে পাল্লা দিয়ে দেশের সব ব্যবসা বাণিজ্য ঠিকা-কন্টাক্ট আওয়ামী লীগের নেতা ও তাদের পরিবার পরিজনরা গ্রাস করে নিচ্ছে। যেভাবে পাল্লা দিয়ে লুটপাট চলছে, যেভাবে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি বন্যার ঢলের মতো সমাজের মধ্যে প্লাবিত হয়েছে, তাতে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়েছে। বন্ধুরা, ক্ষমতাসীন দলের স্তরে স্তরে বিরাজ করছে আদিম বর্বরতা। বিএনপি চেয়ারপারসন, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানসহ বিরোধী দলের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর ওপর চলছে মিথ্যা মামলা দায়েরের হিড়িক। প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ১/১১ এর সময় ১৫টি মামলা মন্ত্র বলে অদৃশ্য হয়ে যায় আর বিএনপি চেয়ারপার্সনের বিরুদ্ধে অভিন্ন মামলাসহ প্রতিনিয়ত মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা হচ্ছে নির্মমভাবে। 

রিজভী বলেন, যেভাবে দিন দিন বেকার সংখ্যা বাড়ছে, যেভাবে বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছেন, যেভাবে রেমিটেন্স প্রবাহ কমছে, গার্মেন্টসসহ সকল রফতানি পণ্যে যেভাবে ধস নামছে, যেভাবে হাজার হাজার প্রবাসী বিদেশ থেকে ফেরত আসছে এ অবস্থা চলতে থাকলে তাতে দেশে মহাদুর্যোগ নেমে আসবে এবং জনগণকে ঠেলে দেয়া হবে বন্যপ্রাণীর স্তরে। গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে খরচের চাপে সঞ্চয় ভেঙ্গে খাচ্ছেন শহরের মানুষ। আরেক পত্রিকায় লিখেছেন ঋণ করে ধার করে চলছে গ্রামের মানুষ। এসব খবরে সেই ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষের আলামতগুলো স্পষ্ট হচ্ছে। কারণ অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ক্রমেই মানুষের ক্রয় ক্ষমতা থেকে  অনেক দূরে সরে গেছে। ভোটারবিহীন সরকারের পতন ছাড়া তাদের হিংস্র আচরণ থেকে জাতি পরিত্রান  পাবে না। তাদের কুশাসন অব্যাহত থাকলে একের পর এক জঘণ্যতম অধ্যায় রচিত হবে।

নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ বিধিমালার গেজেট প্রকাশ নিয়ে আপিল বিভাগের সঙ্গে আইনমন্ত্রীর সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে সরকারের পক্ষে একজন প্রধান আইন কর্মকর্তা আছেন এটর্নি জেনারেল, তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় কাজ করবেন। কিন্তু অ্যাপিলেট ডিভিশনের সাথে আইন মন্ত্রী কথা বলবেন-এটা জনমনে একটা বড় প্রশ্ন তুলেবে। তিনি বলেন, আ্ইনমন্ত্রী যেভাবে নিজেকে তুলে ধরছেন অর্থাৎ সবার উপরে নির্বাহী বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের প্রধান। সেক্ষেত্রে তিনি (আইনমন্ত্রী) বেআইনি যে কাজগুলো করছেন তা দৃষ্টিকটু। তিনি নিজেকে ক্ষমতাশালী মনে করছেন, ক্ষমতাবান মনে করছেন অনেক কিছু- এটা ঠিক নয়। এরজন্য আইনমন্ত্রীকে ‘জনগনের কাছে জবাবদিহি’ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন রিজভী।

আইনমন্ত্রীর ভূমিকার সমালোচনা করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, সবচাইতে বিম্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে- অ্যাপিলেট ডিভিশনের সাথে আইনমন্ত্রী বসবেন। বিচারবিভাগের সবচেয়ে মর্যাদাবান জায়গা হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগ, আমরা আদালতকে সেভাবে সন্মান করি। আর আইনমন্ত্রী হচ্ছে নির্বাহী বিভাগের একটি অংশ। এখন আইনমন্ত্রী নিজেকে চিফ জাস্টিস মনে করছেন কিনা সেটা নিয়ে আলোচনা চলছে মানুষের মধ্যে। যেভাবে প্রধান বিচারপতিকে (সুরেন্দ্র কুমার সিনহা) জোর করে ছুটিতে পাঠানোর ঘটনা থেকে এই ঘটনা পর্যন্ত যেটা মনে হচ্ছে- তিনি (আইনমন্ত্রী) নিজেকে মনে করছেন যে, তিনি প্রধান বিচারপতি বা তার চাইতেও বড়ো কিছু। এটা আমার মনে হয় যে, অ্যাপিলেট ডিভিশন বিষয়টি সেভাবে দেখবেন তাদের মর্যাদা, সর্বোচ্চ আদালতের মর্যাদা- সেটা সুরক্ষিত হোক।

সংসদ ভবনে কমনওয়েথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনে সম্মেলন হলেও জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের দিন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলের নেতা-কর্মীরা শেরেবাংলা নগরে শ্রদ্ধা জানাতে যাবে বলে জানিয়েছেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, এটা একটি জাতীয় দিবস। স্বাধীনতার ঘোষক ওই বিপ্লবের মহানায়কের মাজার। মাজার এলাকায় এমনিতেই সুশৃঙ্খল পরিবেশ থাকে, ভাবগম্ভীর পরিবেশ থাকে এবং যথাযোগ্য মর্যাদায় সেখানে নেতা-কর্মীরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তাদের নেতাকে। আমরা ৭ নবেম্বর যাবো বিএনপি চেয়ারপার্সনের নেতৃত্বে। দলের নেতা-কর্মীরা সকলে প্রস্তুত, তারা সেখানে যাবে। যদি তারা (সরকার) মাজারে যেতে না দেন তাহলে বুঝতে হবে এটা একটা গভীর নীল-নকশার অংশ, গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। ওটার (সিপিএ) অজুহাত দিয়ে যেতে না দেয়া হয় তাহলে এটা বলব যে, এটা সরকারের একটা আক্রমণাত্মক আচরণ হবে।

আগামী ৮ নবেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের জন্য পুলিশের কাছে অনুমতি চেয়ে চিঠি দেয়ার কথা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, ৭ নবেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আগামী ৮ নবেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করবে বিএনপি। সমাবেশের অনুমতি চেয়ে পুলিশ ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষকে ইতোমধ্যে চিঠি দেয়া হয়েছে। সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিএনপিসহ দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রস্ততি গ্রহণ করেছে। আমরা বিশ্বাস করি যে, সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। তারা এই সমাবেশের অনুমতি দেবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ