ঢাকা, সোমবার 6 November 2017, ২২ কার্তিক ১৪২8, ১৬ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দুদক দুর্নীতিমুক্ত নয় ॥ গণশুনানিতে ৭৩% অভিযোগের বিচার হয় না 

স্টাফ রিপোর্টার : দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুর্নীতিমুক্ত নয়। স্বাধীন এ সংস্থাটি সবক্ষেত্রে প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে কাজও করতে পারে না। এছাড়া দুদকে গণশুনানিতে ৭৩ শতাংশ অভিযোগের সমাধান হয় না। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে রায় আসলেও পরবর্তী মনিটরিং না থাকায় দুদকের প্রতি অভিযোগকারীর আস্থা কমে যাচ্ছে।

দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত গবেষণায় এমন তথ্য ওঠে এসেছে। গতকাল রোববার সকালে টিআইবি’র ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে ‘দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পরিচালিত গণশুনানি: কার্যকরতা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এ গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে প্রারম্ভিক বক্তব্য ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবি’র সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. ওয়াহিদ আলম ও ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. শহিদুল ইসলাম। এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র উপদেষ্টা- নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান, প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. রেযাউল করিম প্রমুখ। 

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া এ গবেষণা কার্যক্রমে দুদক পরিচালিত ২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়কালে আয়োজিত মোট ১৩টি গণশুনানির তথ্য ব্যবহৃত হয়েছে। সেবাখাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদকের গণশুনানির ভূমিকা পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে পরিচালিত এ গবেষণায় সুনির্দিষ্টভাবে হয়রানিবিহীন ও দুর্নীতিমুক্ত সেবাপ্রদানের ক্ষেত্রে গণশুনানির ভূমিকা, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহে এর প্রভাব, এর কার্যক্রম আয়োজন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় চ্যালেঞ্জসমূহ চিহ্নিত করার পাশাপাশি গণশুনানির কার্যকরতা বৃদ্ধিতে আট দফা সুপারিশ করা হয়েছে টিআইবি’র পক্ষ থেকে। দুদকের গণশুনানিগুলো টিআইবি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি (দুপ্রক) যৌথভাবে পরিচালনা করে। যার সফলতা নিয়েই গবেষণা চালিয়েছে টিআইবি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমরা গবেষণা চালাতে গিয়ে দেখেছি, দুদক সম্পূর্ণ ক্লিন তা বলা যাবে না। তাদের কর্মকর্তারাও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। আমাদেরকে (টিআইবি) প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে দুদকের যেসব কর্মকর্তা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকবেন, তাদের বিরুদ্ধে শুধু বিভাগীয় ব্যবস্থা নয়, আইনগত ব্যবস্থাও নেবে।

দুদকের সক্ষমতার বিষয়ে টিআইবি নির্বাহী পরিচালক বলেন, ব্যাংকিং সেক্টর, রিয়েল এস্টেট কোম্পানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাবমুক্ত হয়ে দুদক সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছে; একথা বলা যাবে না। সবার জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তারা করতে পারছে না। কিন্তু আইনের চোখে সবাই সমান। দুদককে এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। তবে দুদক চেষ্টা করছে। দুর্নীতি নির্মূল দুদকের একার পক্ষে সম্ভব নয়। 

তিনি বলেন, গণশুনানিতে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে রায় আসলেও দুদকের পরবর্তী মনিটরিং না থাকায় তা চাপা পড়ে যাচ্ছে। এতে অভিযোগকারীর দুদকের প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে। যারা গণশুনানিতে অংশগ্রহণ করছেন তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ প্রক্রিয়া দুদকের একটি হাতিয়ার হলেও অনেক সময় দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা প্রভাবিত হয়ে রায় দিচ্ছেন। এতে করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।

প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, গণশুনানির মাধ্যমে সেবাপ্রদানকারী ও সেবাগ্রহণকারীদের সংযুক্ত করার মাধ্যমে জনসাধারণেকে ক্ষমতায়িত করার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসনের ঘাটতিসমূহ দূর করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এছাড়া গণশুনানিতে উত্থাপিত অভিযোগ সমাধানকল্পে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি মোতাবেক পদক্ষেপ গ্রহণের হারও উল্লেখযোগ্য। তবে অধিকাংশ অভিযোগকারী গবেষণার তথ্য সংগ্রহকালীন সময় পর্যন্ত কাক্সিক্ষত সমাধান পাননি। এর কারণ হিসেবে গণশুনানি পরবর্তী ফলোআপের ক্ষেত্রে ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে পুনরায় সেবা নিতে গিয়ে অভিযোগকারী অনিয়মের শিকার হয়েছেন। তাই শুনানি পরবর্তীতে অভিযোগকারীদের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক সমাধান দেয়া হচ্ছে কিনা তার ফলোআপে ঘাটতির বিষয়টি গণশুনানির সাফল্যের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আবার শুনানির পর প্রায় সব প্রতিষ্ঠান সেবার মান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করা সত্ত্বেও কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে সেবাপ্রদানে পেশাদারিত্বের ঘাটতিও লক্ষণীয়। এছাড়া গণশুনানি আয়োজনে দুদক ও আয়োজক প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, যেমন -জনবল, লজিস্টিকস ও অর্থবরাদ্দের ঘাটতি রয়েছে বলেও গবেষণার পর্যবেক্ষণে উঠে আসে। 

গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, গণশুনানি চলাকালে দুই-তৃতীয়াংশের অধিক (৭৮%) অভিযোগকারী অভিযোগ সমাধানের প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন। অভিযোগ সমাধানের প্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষের সাড়া প্রদানের বিষয়ে এটি একটি ইতিবাচক চিত্র। কিন্তু পরবর্তীতে ২৭ শতাংশ অভিযোগকারী চূড়ান্তভাবে অভিযোগের সমাধান পেলেও প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অভিযোগকারী (৭৩ শতাংশ) টিআইবি’র জরিপকালীন সময় পর্যন্ত অভিযোগের কোন সমাধান পাননি। নানাভাবে হয়রানির কারণে ৬ শতাংশ অভিযোগ উত্থাপন করা সম্ভব হয় না। অভিযোগকারীদের মতামত অনুযায়ী অভিযোগের সমাধান না পাওয়ার অন্যতম কারণগুলো হলো- কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতা (৬৯ শতাংশ), নিয়ম-বহির্ভূত অর্থ দাবি (২৭ শতাংশ), উদ্যোগের অভাব (২৪ শতাংশ) ইত্যাদি। 

সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয়, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সেবার মান উন্নয়নে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে দুদক এর উদ্যোগে বিভিন্ন সেবা খাতের উপর আয়োজিত গণশুনানিতে যে সব খাতের উপর অভিযোগ উঠেছে সেগুলো হলো- উপজেলা ভূমি অফিস, সাব- রেজিস্ট্রি অফিস, সেটেলমেন্ট অফিস, পল্লী বিদ্যুৎ, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ইত্যাদি।  গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ, হয়রানি, দায়িত্বে অবহেলা, খারাপ আচরণ ও প্রতারণার অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। আর ভূমি খাতে প্রতারণার মাধ্যম ভূমি আত্মসাৎ, ভূমি দখল, সঠিক কাগজপত্র ছাড়া জমি দখল, পেশী শক্তি ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। 

গবেষণায় দেখা যায়, গণশুনানিতে তিন পর্যায়ে যথা- আয়োজন, গণশুনানি চলাকালে ও গণশুনানি পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষসহ অন্যান্য অংশীজনকে নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখী ন হতে হয়। যার মধ্যে আয়োজন পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জসমূহ হল গণশুনানি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, সেবা সম্পর্কে ধারণা ও পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাব, প্রান্তিক অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর কম অংশগ্রহণ, অভিযোগ জমা দিতে দ্বিধা ও উত্থাপনে বাধা, সরকারি কর্মকর্তাদের একাংশের অনাগ্রহ ও অনুপস্থিতি এবং  দুদকের জনবল, লজিস্টিকস ও অর্থবরাদ্দের ঘাটতি। গণশুনানি চলাকালে বিলম্বে অনুষ্ঠান শুরু হওয়া ও অতিথিদের দীর্ঘ বক্তৃতা এবং গণশুনানি-পরবর্তীতে কর্মকর্তাদের বদলি ও অবসরজনিত সমস্যা, প্রতিশ্রুতির ফলো-আপ না হওয়া ইত্যাদি চ্যালেঞ্জ পরিলক্ষিত হয়।

এই গবেষণার পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে টিআইবি’র পক্ষ থেকে গণশুনানিকে আরো কার্যকর করার লক্ষ্যে আট দফা সুপারিশ করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে: প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযোগের সমাধান নিশ্চিতকল্পে দুদকের ফলো-আপসহ অভিযোগ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা, গণশুনানির জন্য নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ, অধিকতর প্রচারণা, অভিযোগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি, প্রতিষ্ঠান/খাতভিতিক আলাদা গণশুনানির আয়োজন, গণশুনানিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং সময়মতো গণশুনানি শুরু করা। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ