ঢাকা, সোমবার 6 November 2017, ২২ কার্তিক ১৪২8, ১৬ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু  কারাবাসের বিরুদ্ধে  রিভিউ আবেদন

 

স্টাফ রিপোর্টার : যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাস বলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দেয়া রায় পুনর্বিবচেনার (রিভিউ) আবেদন করা হয়েছে। গতকাল রোববার আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিভিউ আবেদনটি দাখিল করেছেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রিভিউ আবেদনকারী আতাউর রহমান মৃধার পক্ষে তিনি এটি দাখিল করেছেন। 

এই মামলায় শুনানি করবেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। আজ সোমবার এ ব্যাপারে সাংবাদিক সম্মেলনে কথা বলবেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন।

আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ২০১৩ সালে একটি মামলার রায়ে আপিল বিভাগের বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার নেত্বত্বে চার সদস্যের বেঞ্চ এই সিদ্ধান্ত দেন যে, যাবজ্জীবন সাজা মানেই ২২ বছর ছয় মাস। বেঞ্চের অপর সদস্যরা ছিলেন বিচারপতি মো. ইমান আলী, আনোয়ার উল হক ও হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। তিনি আরো জানান, এ ছাড়া ২০১৭ সালে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেত্বত্বে চার সদস্যের অন্য বেঞ্চ একটি মামলায় সিদ্ধান্ত দেন যে, যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাদন্ড। 

তিনি বলেন, আপিল বিভাগের সমসদস্য বিশিষ্ট দুটি বেঞ্চ যদি পরস্পরবিরোধী রায় দেন তাহলে কোনটি প্রাধান্য পাবে? এটি জানতে চেয়ে রিভিউ করেছি। এখন সুপ্রিম কোর্টকে বলতে হবে যাবজ্জীবন মানে কত বছর? রায় কোনটি থাকবে।

শিশির মনির আরো বলেন, এ ছাড়া উভয় রায় দেশের প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেননা জেলকোড এবং দন্ডবিধির ৫৭ ধারা, প্রিজন অ্যাক্টের ৫৯ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন মানে হলো ৩০ বছর। আর যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু হলে ফৌজদারি ৩৫ (ক) অকার্যকর।

গত ২৪ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাস বলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দেয়া ৯২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ এ রায় প্রকাশ হয়। এর আগে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত রায় দেন। তখন প্রধান বিচারপতি মৌখিক আদেশে বলেছিলেন, যাবজ্জীবন মানে, ‘ন্যাচারাল লাইফ ডেথ’।

২০১৬ সালের জুন মাসে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার পরিদর্শনের সময় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা বলেছিলেন, যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত আসামী বলতে আপনারা মনে করেন ৩০ বছর। প্রকৃত পক্ষে এটার অপব্যাখ্যা হচ্ছে। যাবজ্জীবন অর্থ হল একেবারে যাবজ্জীবন, রেস্ট অফ দ্য লাইফ।

২০০১ সালে গাজীপুরে জামান নামের এক ব্যক্তিকে গুলী করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় পরের দিন নিহতের বাবা সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে গাজীপুর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা  করেন। পরে গাজীপুরের দ্রুত বিচার আদালত ২০০৩ সালে তিনজনকে মৃত্যুদন্ড দেন। দন্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে দুজন আনোয়ার হোসেন ও আতাউর রহমান মৃধা আপিল করেন। অপর আসামী কামরুল পলাতক থাকায় আপিলের সুযোগ পাননি। পরে হাইকোর্ট তাদের দুইজনের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখেন। হাইকোটের এ রায়ের বিরুদ্ধে আসামীরা আপিল করলে সর্বোচ্চ আদালত তাদের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন রায় দেন। এই রায়ে বলা হয় যাবজ্জীবন সাজা মানে আমৃত্যু কারাবাস।

সংক্ষিপ্ত রায়ের দিন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছিলেন, রায়ের সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাস। তখন আমি এর প্রতিবাদ করেছি। আমি বলেছি, দন্ডবিধির ৫৭ ধারায় যাবজ্জীবন কারাদন্ডের অর্থ ৩০ বছর। এ ছাড়া যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামীরা কারাগারে রেয়াত পেয়ে দন্ড আরও কমে আসে। যদি আমৃত্যুই হয়ে থাকে, তাহলে তাদের রেয়াতের কি হবে? আমি আরও বলেছি, প্রধান বিচারপতির এ মন্তব্য যেন মূল রায়ে না থাকে। তবে যদি থাকে, তাহলে সব আসামীর ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হবে।

পরবর্তীতে পুর্নাঙ্গ রায়ে আদালত বলেন, দন্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী দোষী ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হবে এটাই বিধান। এ ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদন্ডটা হচ্ছে ব্যতিক্রম। যখন এ ধরনের পরিস্থিতিতে কাউকে মৃত্যুদন্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন দেয়া হয়, তখন এর কারণ অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়। দন্ডবিধির ৫৩ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদন্ডের অর্থ ৪৫ ধারার সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে হবে। সেক্ষেত্রে দেখা যায় যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাদন্ড।

আদালত আরও বলেন, যদি হাইকোর্ট বিভাগ বা এ আপিল বিভাগ মৃত্যুদন্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করেন এবং নির্দেশ দেন যে, তার স্বাভাবিক মৃত্যু পর্যন্ত এ দন্ড ভোগ করবে, তখন এ ধরনের মামলায় সাজা কমানোর আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না। আদালতের এ রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত অপরাপর আসামীর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইজি প্রিজনকে বলা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ