ঢাকা, সোমবার 6 November 2017, ২২ কার্তিক ১৪২8, ১৬ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পরও নামপত্তন না পাওয়ায় উচ্ছেদ আতঙ্কে কেশবপুরে ১২ হিন্দু পরিবার

মোল্যা আব্দুস সাত্তার, কেশবপুর (যশোর) সংবাদদাতা : যশোরের কেশবপুর শহরের শ্রীগঞ্জ বাজারে সদর ভূমি অফিসের পাশে বাস্তভিটার ৬২ শতক জমি সর্বোচ্চ আদালতের রায় পেয়েও উচ্ছেদ আতঙ্কে দিনাতিপাত করছে ওই এলাকার ১২ হিন্দু পরিবার। বাস্তুভিটার জমি রক্ষায় দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে আইনি লড়ায়ে রাষ্ট্রের নিন্ম আদালত থেকে সর্বোচ্চ আদালতের রায় পরিবারগুলোর পক্ষে যায়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে ভূমিকর্তা ওই জমির নামপত্তন আটকে রেখেছেন। এ ব্যাপারে প্রতিকার চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষে নিত্যানন্দ দেবনাথ প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। 

জানা গেছে, ১৯৫৭ সালের ১৭ অক্টোবর মৃত কুঞ্জ বিহারী দেবনাথ সাবেক- ৯২৯ ও হাল-১০৯ দাগের ১ একর ১২ শতক জমির মধ্যে উত্তর পাশ থেকে ৬২ শতক জমি মৃত যতিন্দ্র নাথ মিত্রের কাছ থেকে ২৯৯৯ নং কবলা দলিলমূলে ক্রয় করেন। সেই সূত্রে ওই জমির এসএ রেকর্ডও কুঞ্জ বিহারী দেবনাথের নামে হয়। এ সুবাদে তৎকালিন পাকিস্থান কাচারীতে কুঞ্জ বিহারী দেবনাথ খাজনা পরিশোধ করেন। ওই জমিতে কুঞ্জ বিহারী দেবনাথের পরিবারের কার্তিক দেবনাথ, সাধন দেবনাথ, নন্দ কুমার দেবনাথ, নিত্যনন্দ দেবনাথ, নারান দেবনাথ, তপন দেবনাথ, রবিন দেবনাথ শ্যামল দেবনাথ, অমল দেবনাথসহ ১২টি পরিবার বসতবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করে আসছে। 

কুঞ্জ বিহারী দেবনাথের ছেলে কর্তিক দেবনাথ অভিযোগে উলে¬খ করেছেন, তার পিতা ১৯৭৩ সালে কাচারীতে গিয়ে পুনরায় জমির খজনা পরিশোধ করতে গেলে তৎকালিন নায়েব মোটা অংকের টাকা উৎকোচ দাবি করেন। এ উৎকোচ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ওই নায়েব উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমার বাবাকে লাল নোটিস দিয়ে তাদের দখলীয় জমি সরকারের ১নং খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করেন। এরপর ১৯৮৫ সাল থেকে বাস্তভিটা রক্ষায় চলতে থাকে আমার পরিবারের সাথে রাষ্ট্র পক্ষের মামলা। ওই সালেই নায়েবের এ আদেশের বিরুদ্ধে যশোর সাব জজ আদালতে একটি মামলা করা হয়। যার নং- ১৬০/৮৫। শুনানী শেষে এ মামলার রায় আমার বাবা কুঞ্জ বিহারী দেবনাথের পক্ষে যায়। এ রায়ের বিরুদ্ধে তৎকালিন নায়েব জেলা জজকোর্টে একটি আপিল মামলা করেন। যার নং-১৬০/৯৪। এ মামলার রায়ও তার পরিবারের পক্ষে যায়। ১৯৯৪ সালে এ মামলার রায়ের কপিসহ ভূমি অফিসে খাজনা পরিশোধ ও নামপত্তন করতে গেলে তৎকালিন সহকারি কমিশনার (ভূমি) তা অস্বীকার করেন। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক এ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেন। যার নং- ৪৫৯৫/৯৯। ২০০৭ সালে এ মামলার রায়ও আমার পরিবারের পক্ষে যায়। এ রায়ের কপি (আদেশ) পাওয়ার পর পুনরায় জমির খাজনা পরিশোধসহ নামজারির আবেদন করা হয়। যার ডিসপাস নং- ৩৫২/ঢওওও/৭-৮। 

এদিকে, হাইকোর্টের রায়ের পর গত ২০০৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পুনরায় ওই ১২টি পরিবার খাজনা পরিশোধ ও নামজারির আবেদন জানিয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেন। এ আবেদনের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক ২৭৮১ নং স্মারকে কেশবপুর সহকারি কমিশনার (ভূমি) কে বিধিমোতাবেক নামজারির নির্দেশ দিলেও তিনি তা আটকে রাখেন। এরপর পরিবারগুলি হাইকোর্টে ডাইরেকশন চেয়ে ১৯৮৪/৯ নং রিট পিটিশন দাখিল করেন। দীর্ঘ শুনানী শেষে ২০১৫ সালের ২১ মে হাইকোর্ট ৩০ কর্ম দিবসের মধ্যে নামজারির ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু জেলা প্রশাসক হাইকোর্টের এ নির্দেশও অমান্য করে নামজারি আটকে রাখেন। এ সময় পরিবারটির উকিল হাইকোর্টের উক্ত আদেশ মেনে ১৫ কার্য দিবসের মধ্যে ওই পরিবারের নামিয় জমির নামজারি করতে ২০১৫ সালের ৪ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসক ও কেশবপুর সহকারি কমিশনার (ভূমি) কে লিগ্যাল নোটিস প্রদান করেন। এবারও সরকারি কর্মকর্তারা কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।  

ফলে ওই পরিবার বাধ্য হয়ে গত ২০১৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী হাইকোর্টে আদালত অবমাননার অভিযোগ করেন। বিজ্ঞ আদালত ২ সপ্তাহের মধ্যে স্বশরীরে এসে জেলা প্রশাসক ও কেশবপুর সহকারি কমিশনার (ভূমি) কে কেন আদালতের রায় অবমাননা করা হয়েছে তা জনতে চেয়ে নোটিস প্রদান করেন। কিন্তু প্রভাবশালী বিবাদিরা অদ্যাবধি আদালতে গরহাজির থাকেন। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এ মামলার ঘানি টানতে গিয়ে ওই পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। 

এ মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল জেলা প্রশাসক সুপ্রিমকের্টে ১১২০ নং লিভ টু আপিল মামলা দায়ের করেন। গত ২০১৭ সালের ৭ আগস্ট হাইকোর্টের ডিরেকশন এবং সুপ্রিম কোর্টের তৎকালিন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, সৈয়দ মাহমুদ হোসাইন ও মির্জা হুসাইন হায়দার স্বাক্ষরিত লিভ টু আপিল মামলাটি খারিজ করেন। যার আপিল নং-১১২০/১৬। এ সময় ওই হিন্দু পরিবার এ আদেশের কপিসহ পুনরায় নামজারির আবেদন করেন। ঘটনাটি প্রায় ৩ মাস হতে চললেও সহকারি কমিশনার (ভূমি) এখনও দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। এ কারণে উচ্ছেদ আতঙ্কে ওই হিন্দু পরিবারগুলো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তাদের পৈত্রিক জমির নামপত্তন পাওয়ার আবেদন করেছেন। আদালতের নির্দেশ অমান্য করে জেলা প্রশাসকসহ সহকারি কমিশনার (ভূমি) ওই ৬২ শতক জমির নামপত্তন আটকে রাখায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে পরিবারগুলোর অভিযোগ। 

এ ব্যাপারে সহকারি কমিশনার (ভূমি) কবীর হোসেন বলেন, এ সংক্রান্ত কোন কাগজপত্র তিনি পাননি। পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ