ঢাকা, সোমবার 6 November 2017, ২২ কার্তিক ১৪২8, ১৬ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সহায়তা গুটিয়ে নিচ্ছে বেসরকারি সংস্থা!

খুলনা অফিস : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সহায়তা গুটিয়ে নিচ্ছে বেসরকারি সংস্থা! বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ ঘোষণাকে অর্জন হিসেবে দেখলেও, আয় বৈষম্য কমছে না। আগামীতে বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ভিত্তিক সহযোগিতা গুটিয়ে যাবে। এনজিও থেকে আর সহায়তা পাবে না দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও উপকূলীয় দুর্যোগ কবলিতরা। একই সাথে বেকার হতে পারেন এনজিও-তে কর্মরত বিপুল সংখ্যক জনশক্তি। ফলে মধ্যম আয়ের দেশ ঘোষণায় মর্যাদায় এগিয়ে গেলেও নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের।
প্রসঙ্গত, গেল বছর নতুন তালিকায় বাংলাদেশ, কেনিয়া, মিয়ানমার ও তাজিকিস্তান এ চারটি দেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের তালিকায় নতুন করে ঢুকেছে। সার্কভুক্ত ভারত ও পাকিস্তান নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে অন্তর্ভুক্ত। সব মিলিয়ে এখন নিম্ন আয়ের দেশ ৩১টি, নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ ৫১টি, উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ ৫৩টি এবং উচ্চ আয়ের দেশ ৮০টি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপকূলীয় জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের বিশাল জনগোষ্ঠী এনজিও’র দীর্ঘমেয়াদী সুবিধাভোগী। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে এনজিও’র সহায়তা পাওয়া যাবে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়, সিডর, আইলা, মহসেনসহ জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, বেড়িবাঁধ ভাঙনের পর ত্রাণ সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো এনজিও। এছাড়া স্যানিটেশন, বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি ও শিক্ষা সম্প্রসারণসহ নানান উন্নয়নমুখী কাজ করছিল সংস্থাগুলো। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এনজিও’র সাথে খুলনার স্থানীয় এনজিও রূপান্তর, নবলোক, আশা, প্রদীপন, সুন্দরবন এডিপি ওয়ার্ল্ড ভিশন, এ্যাডামস, ওয়েভ ফাউন্ডেশন, হ্যাপি সমাজ কল্যাণ সংস্থা, লাইট বাংলাদেশ, কনসেন্স, সোসাইয়টি ফর এন্টিপোলিউশন, আপন ও আশ্রয় ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন কাজ করেছে। এসব এনজিও‘তে নির্বাহী প্রধান থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের তৃণমূল পর্যন্ত কর্মরত হয়েছেন কয়েক হাজার কর্মী। দেশী-বিদেশী অনুদান/সহায়তা না পেয়ে এনজিও বন্ধ হলে বেকার হয়ে পড়বে বিশাল এ জনগোষ্ঠী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ২০১৫ সালের ১ জুলাই বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত তালিকায় বাংলাদেশকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ ঘোষণা করা হয়। প্রতিবছর এসময়ে বিশ্বব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় অনুসারে দেশগুলোকে চারটি আয় গ্রুপে ভাগ করে। যাদের মাথাপিছু জাতীয় আয় এক হাজার ৪৫ ডলার বা তার নিচে, তাদের বলা হয় নিম্ন আয়ের দেশ। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে এ তালিকাতেই ছিল। মূলতঃ এক হাজার ৪৬ ডলার থেকে শুরু করে যেসব দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১২ হাজার ৭৩৬ ডলার, তারা মধ্যম আয়ের দেশের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে আবার আয় এক হাজার ৪৬ ডলার থেকে শুরু করে ৪ হাজার ১২৫ পর্যন্ত হলে তা হবে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ এবং আয় ৪ হাজার ১২৬ ডলার থেকে শুরু করে ১২ হাজার ৭৩৬ ডলার হলে দেশগুলোকে বলা হয় উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ। এর চেয়ে বেশি মাথাপিছু জাতীয় আয় হলে সেই দেশগুলোকে বলা হয় উচ্চ আয়ের দেশ। বিশ্বব্যাংক ‘এটলাস মেথড’ নামের বিশেষ এক পদ্ধতিতে মাথাপিছু জাতীয় আয় পরিমাপ করে থাকে। একটি দেশের স্থানীয় মুদ্রায় মোট জাতীয় আয়কে (জিএনআই) মার্কিন ডলারে রূপান্তরিত করা হয়। এ ক্ষেত্রে তিন বছরের গড় বিনিময় হারকে সমন্বয় করা হয়, যাতে করে আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের ওঠা-নামা সমন্বয় করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় এক হাজার ৩১৪ ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সেটা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬০২ মার্কিন ডলারে। বিশ্বব্যাংকের পদ্ধতি অনুযায়ী তা এখন ১ হাজার ৪৫ ডলারকে ছাড়িয়ে গেছে। এ কারণেই নতুন তালিকায় মধ্যম আয়ের দেশ হতে পেরেছে বাংলাদেশ।
তবে আয় বৈষম্যের কারণে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী আরও পিছিয়ে পড়ছে। যারা এনজিও’র উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিল। তারা আগামীতে এনজিও’র সুবিধা বঞ্চিত হতে পারে।
রূপান্তর’র নির্বাহী পরিচালক স্বপন গুহ বলেন, ‘দাতা সংস্থাগুলো বলছে তোমাদের নিজেদের সামর্থ্য বেড়ে গেছে, এখন আর আমরা অর্থায়ন করবো কেন? এখনি এর প্রভাব পড়া শুরু করেছে। আমাদের যে সকল প্রকল্পগুলো ছিল এমডিজি (মিলেমিয়াম ডেভলপমেন্ট গোল) অর্জনে ২০১৫ পর্যন্ত টার্গেট ছিল। তারপর ২০১৬ থেকে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে যেতে সরকারও চেষ্টা করেছে। সেখানে যেতে পরিসংখ্যানগুলো হালনাগাদ করেছে দাতাগোষ্ঠীরা। এই হালনাগাদ করতে গিয়েই ২০১৭ সালে তাদের আর্থিক সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে। এখন এসডিজি (সাস্টেনেবল ডেভলপমেন্ট গোল) অর্জনে বিদেশী দাতা সংস্থাগুলো সহায়তা করবে সরকারকে। সেই সহযোগিতাগুলো বেশিরভাগ-ই হবে শিক্ষা ক্ষেত্রে, সামাজিক বিষয়সমূহ, নিরাপত্তা, শান্তি, শিশু বিবাহ রোধ, লিঙ্গ বৈষম্য নিরসনসহ প্রভৃতি বিষয়ে। তবে সেগুলো হবে সরকারিভাবে। সে সহযোগিতাটা খুব বেশি হবে না। দাতাসংস্থাগুলো সরকারকে অর্থায়ন করবে, সরকার সেই কাজগুলো করবে। যেটা আমাদের জন্য, এনজিওদের জন্য খুব-ই ভয়ঙ্কর অবস্থা। রূপান্তরে চাকরিরত সহস্রাধিক কর্মী ইতোমধ্যে বেকার হয়েছেন বলে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।
আশ্রয় ফাউন্ডেশনের পরিচালক মমতাজ খাতুন বলেন, ‘দশ এগিয়ে যাক, সকলেই সাবলম্বী হোক এটা আমরা সকলেই চাই। তবে আয় বৈষম্যের মধ্যে বিস্তর ফারাক রেখে, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায় না। মধ্য আয়ের দেশ ঘোষণা দেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেরই প্রতিফলন ও স্বীকৃতি। জাতি হিসেবে এটি আমাদের জন্য অবশ্যই একটি বড় অর্জন ও মাইলফলকও বটে। এটির মনস্তত্ত্বিক প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনি বাস্তবেও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তির বিষয়টি হয়েছে। সে সাথে রয়েছে সীমাহীন চ্যালেঞ্জও।’
কয়েকজন এনজিও কর্মী জানান, ‘উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর ক্যারিয়ার গড়তে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় চাকরি নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। সরকারি চাকরির বয়সসীমাও অতিক্রম করেছে; এখন এনজিওগুলোর বিভিন্ন প্রকল্প বন্ধ ও গুটিয়ে নেয়ায় বেকার হয়ে পড়ছেন তারা। দ্রব্যমূল্যের বাজারে চাকরি হারিয়ে পথে পথে ঘুরছেন অনেকেই! তবে এসব ব্যাপারে এনজিও ব্যুরো খুলনা এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কোন কর্মকর্তা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ