ঢাকা, বুধবার 8 November 2017, ২৪ কার্তিক ১৪২8, ১৮ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চেষ্টা থাকলেই সব কিছু সম্ভব!

জাফর ইকবাল : মানুষের অসাধ্য বলে কিছু নেই। এই প্রবাদটি যুগযুগ ধরে প্রমাণিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এমন কিছু ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনায় আসছে যেগুলো আসলেই অসাধ্য। চেষ্টা থাকলেই সব কিছু সম্ভব। এবারের আলোচনায় এমন কিছু তুলে ধরা হলো।
তিন বছর নারকেল গাছে : গিলবার্ট সানচেজ। ফিলিপাইনের আগুসান দে সার প্রদেশের লা পাজ শহরের এই ব্যক্তি গত তিন বছর ধরে ষাট ফুট উঁচু একটি নারকেল গাছের উপর বসবাস করছেন। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭, এই তিন বছরে তিনি একদিনের জন্যও নিচে নামেননি। খাওয়া, ঘুম থেকে শুরু করে যাবতীয় প্রাকৃতিক কাজ তিনি সারেন গাছের উপর বসে। চলতি মাসে তাকে গাছ কেটে জোর করে নিচে নামানো হয়েছে। ঘটনার শুরু ২০১৪ সালের গোড়ার দিকে। স্থানীয় এক গোলযোগ চলাকালীন সানচেজের মাথায় বন্দুকের গুলি এসে লাগে। মারাত্মক আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান তিনি। সুস্থ হওয়ার পর সারাক্ষণ একটি ভয় তাকে তাড়া করে ফিরতো। সে মনে করতো কেউ তাকে প্রাণে মেরে ফেলতে চাইছে। এই মৃত্যু ভয় থেকে বাঁচতে তিনি নারকেল গাছে উঠে পড়েন।
সানচেজের মা উইনিফ্রিদা সানচেজ থেকে শুরু করে পাড়া-প্রতিবেশী সবাই তাকে গত তিন বছরে বহুবার বহুভাবে বুঝিয়ে নিচে নেমে আসার জন্য অনুরোধ করেছেন। কিন্তু কোনো অনুরোধেই তিনি কর্ণপাত করেননি। প্রবল ঝড় বৃষ্টি কিংবা পোকামাকড়ের কামড় কোনো কিছুই তাকে নারকেল গাছ থেকে নামাতে পারেনি। এমনকি বাবা হওয়ার সংবাদ শুনেও তিনি নিচে নেমে আসেননি। ফলে বাধ্য হয়ে তার মা একটি দড়িতে বেঁধে তার খাবার, কাপড়-চোপড় ও সিগারেট উপরে পাঠিয়ে দিতেন যাতে সে বেঁচে থাকতে পারে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে লাপাজ পৌর কর্তৃপক্ষ সানচেজকে নিচে নামানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এরপর পঞ্চাশ সদস্যের একটি উদ্ধারকারী দল গাছ কেটে তাকে নিচে নামিয়ে আনে। নিচে নামার পর সানচেজের শরীরের দিকে তাকিয়ে সবাই চমকে ওঠেন। দীর্ঘ দিন অযতœ-অবহেলা আর পোকামাকড়ের কামড়ে তার শরীরে বড় বড় ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া তার পা অনেকটা বেঁকে গেছে। বর্তমানে ডাক্তারের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তার দিন কাটছে।
ছয় হাজার গাছের পাতা দিয়ে গাউন : প্রকৃতিতে বইছে শীতের আগমনী বার্তা। শীতের পরেই বসন্ত। আসছে পাতা ঝরার দিন। সেই ঝরা পাতা আমরা অবলীলায় পা দিয়ে মাড়িয়ে যাই। কিন্তু এই তুচ্ছ পাতা দিয়েও যে অভিনব কিছু করা যায় প্রমাণ করলেন চীনের কয়েকজন শিক্ষার্থী। কোনো রকম যন্ত্রের সাহায্য না নিয়ে শুধুমাত্র হাতের সাহায্যে ঝরে পড়া ছয় হাজার পাতা দিয়ে সুন্দর একটি গাউন তৈরি করেছেন তারা। চীনের পূর্বাঞ্চলীয় হিফেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের চারজন শিক্ষার্থী তাদের ক্লাস প্রজেক্ট হিসেবে এই কাজ শুরু করেন। তাদের প্রজেক্টের বিষয় ছিল প্রাণী অথবা গাছের যে কোনো অংশ ব্যবহার করে অভিনব কিছু তৈরি করা। অনেক ভেবে তারা এই প্রজেক্ট গ্রহণ করেন। দুইজন ছাত্র এবং দুইজন ছাত্রীর সমন্বয়ে গড়া এই দলটি দীর্ঘ ছয় মাস পরিশ্রম করে এই প্রজেক্টটি বাস্তবায়ন করেছেন। অনেক ধৈর্য এবং সংযমের পরিচয় দিতে হয়েছে তাদের। কারণ পোশাক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পাতা তারা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে সংগ্রহ করলেও বেশ কিছু পাতার জন্য তাদের পাহাড়ে চড়তে হয়েছে। তাছাড়া সংগৃহীত পাতা সংরক্ষণেও তাদের বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। কারণ পাতা দ্রুত শুকিয়ে যায়। শুকিয়ে যাওয়া রোধে তারা ক্ষার ও সোডিয়াম দ্রবণের সহায়তা নিয়েছেন। এরপর এই পাতা দিয়ে দীর্ঘ ছয় মাস পরিশ্রম করে একটি গাউন তৈরি করেছেন। সম্প্রতি গাউনটি তারা জনসম্মুখে প্রকাশ করেছেন। গাছের পাতা দিয়ে তৈরি পোশাকটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
চা-পানি পান করে ষাট বছর পার : একবেলা ভাত খেয়ে আরেকবেলা না খেলেই অনেকে কাতর হয়ে পড়েন। কিন্তু ভারতের সরস্বতী বাই গত ছয় দশক ধরে একবারের জন্যও ভাত খাননি। তবে যারা ভাবছেন ভাত না খেয়ে উনি হয়ত রুটি বা অন্য কিছু খাওয়ার অভ্যাস করে বেঁচে আছেন, তাদের জন্য বিস্ময়ের শেষাংশ এখনো বাকি। কারণ মধ্যপ্রদেশের সুন্দ্রাইল গ্রামের পঁচাত্তর বছর বয়সি এই নারী গত ষাট বছরে ভাত তো দূরের কথা কোনো ধরনের শস্য জাতীয় ও কঠিন খাবারও মুখে তোলেননি। এই দীর্ঘ সময়ে শুধুমাত্র চা এবং পানি পান করে বেঁচে আছেন তিনি। তবে তিনি জন্ম থেকেই যে এভাবে চা-পানি পান করে বেঁচে আছেন তা নয়, ঘটনার শুরু ১৯৫৭ সালে। সরস্বতীর বয়স তখন মাত্র পনের বছর। বিয়ের পর সবেমাত্র প্রথম সন্তানের মা হয়েছেন। এমন সময় টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হন।  পাকস্থলীতে তীব্র ব্যথা অনুভব করার কারণে তিনি তখন কিছুই খেতে পারতেন না। বেশ কিছুদিন এভাবে যাওয়ার পর তিনি যখন সুস্থ হলেন তখন দেখলেন খাবারের প্রতি তার কোনো রুচি নেই। তখন থেকেই দিনে শুধুমাত্র কয়েক বার চা এবং পানি খেয়ে তিনি বেঁচে আছেন। তবে মাঝে মাঝে তিনি একটি করে কলা খান। তাও সপ্তাহে একটি আবার কোনো সপ্তাহে একদমই না।
এই ধরনের অদ্ভুত খাদ্যাভ্যাস নিয়ে যেখানে সরস্বতীর হাসপাতালের বিছানায় থাকার কথা সেখানে তিনি বেঁচে আছেন বেশ সুস্থ স্বাভাবিকভাবে। একে একে পাঁচ সন্তানের মা হয়েছেন। সন্তানের লালন-পালন থেকে শুরু করে কৃষি কাজে স্বামীকে সাহায্য করা- কোনোটাই বাদ দেননি তিনি। এবং পঁচাত্তর বছর বয়সেও তিনি দিনে পাঁচ ঘণ্টা কাজ করেন। নিজের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন সরস্বতী। অসংখ্য ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েছেন। কিন্তু কোনো কিছুতেই যখন কিছুই হয়নি তখন এভাবে বেঁচে থাকাটাকেই বেছে নিয়েছেন। সরস্বতীর স্বামী দরকাপ্রসাদ বলেন, আমরা অনেক চেষ্টা করেছি তাকে খাওয়ানোর। কিন্তু তাকে কোনোভাবেই খাওয়ানো যায় না। সে শুধু চা এবং পানি খেয়ে দিব্যি সুস্থ আছে।
শরীরের ভেতর কাচের গ্লাস : সম্প্রতি এক এক্সরে রিপোর্ট বিস্মিত করেছে, দক্ষিণ চীনের গুয়াংঝাউ প্রদেশের হাসপাতালের চিকিৎসকদের। এক ব্যক্তির এক্সরে রিপোর্টে তারা দেখতে পান, ৮ সেন্টিমিটারের একটি কাচের গ্লাস আটকে রয়েছে ওই ব্যক্তির পশ্চাৎদেশের ভেতর। চিকিৎসকরা তার পরিচয় প্রকাশ করেননি। তবে তারা জানিয়েছেন, অবর্ণনীয় ব্যথায় ভোগা ব্যক্তিটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসার পর, তার এক্সরে রিপোর্টে অবিশ্বাস্য এ দৃশ্য দেখা গেছে।
চিকিৎসকরা অবশ্য অস্ত্রোপচার করে তাকে এই বেকায়দা অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে সক্ষম হয়েছেন। ৮ সেন্টিমিটার লম্বা ও ৭ সেন্টিমিটার চওড়া কাচের গ্লাসটি অভঙ্গুর অবস্থাতেই বের করা গেছে। তবে কাচের গ্লাস বের করার উপায় নিয়ে চিকিৎসকরা শুরুতে দ্বিধায় পড়েছিলেন। প্রথমে তারা ঠিক করেছিলেন প্রাকৃতিক উপায়ে গ্লাসটা বের করে আনবেন। তাই প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে ওই ব্যক্তির স্নায়ু শান্ত রেখেছিলেন। কিন্তু যেকোনো সময় গ্লাসটি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। ভেঙে গেলে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে শরীরের অভ্যন্তরে। যে কারণে শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকরা। তবে কাচের গ্লাসটি কেন এবং কীভাবে সেখানে পৌঁছাল, তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান ওই ব্যক্তি। এর আগে এ বছরের জুনে ইতালির এক ব্যক্তির পশ্চাদ্দেশ থেকেও অস্ত্রোপচার করে কাচের গ্লাস উদ্ধার করেছিলেন মিলানের চিকিৎসকরা।
চকলেটের মোড়কের তৈরি পোশাক : যতটা আগ্রহ নিয়ে আমরা চকলেট খেয়ে থাকি এর প্যাকেট বা মোড়ক ঠিক ততটাই অবজ্ঞাভরে ছুড়ে ফেলি। কিন্তু এই তুচ্ছ জিনিসটাকেও যে কাজে লাগানো যায় সে কথাই প্রমাণ করলেন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার এক নারী। এমিলি সিলহেমার নামের এই নারী চকলেটের মোড়ক জমিয়ে তৈরি করেছেন চমৎকার একটি জামা। তবে এই মোড়কগুলো সংগ্রহ করতে তার অনেক সময়ও লেগেছে। এমিলি যখন কলেজে পড়তেন তখন থেকেই চকলেটের মোড়ক সংগ্রহ শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালের গন্ডি পেরিয়ে এখন তিনি বিবাহিত। মাঝের সময়টা প্রায় ৬ বছরের। আর এই দীর্ঘ সময় ধরে তিনি একটি একটি করে নানা রংয়ের প্রায় ১০ হাজার স্টারবার্স্ট চকলেটের প্যাকেট জমিয়ে জামাটি তৈরি করেছেন।
কিন্তু এতো কিছু থাকতে চকলেটের ফেলে দেওয়া মোড়ক দিয়ে জামা তৈরির মতো অদ্ভুত ধারণা তার মাথায় কীভাবে এলো? এবিসি নিউজের করা এক প্রশ্নের জবাবে এমিলি জানান, ‘আমার স্বামী ম্যালাচি। সে স্টারবার্স্ট চকলেট খুব পছন্দ করে। কলেজে পড়ার সময়ে প্রথম পরিচয়ের দিন ম্যালাচি আমাকে এক প্যাকেট স্টারবার্স্ট চকলেট উপহার দেয়। এরপর থেকে যখনই আমরা দেখা করতাম ম্যালাচি আমার জন্য চকলেট নিয়ে আসতো। কিছুদিন পর চকলেটের সুন্দর পানি নিরোধক মোড়কগুলো থেকে জামা তৈরির পরিকল্পনা করি। এরপর থেকে আমার স্বামী প্রতি সপ্তাহে আমার জন্য ব্যাগভর্তি চকলেটের প্যাকেট নিয়ে আসতো। এভাবে স্বামী, বন্ধু ও কাছের আত্মীয়দের কাছ থেকে মোড়ক সংগ্রহ করেছি। তবে প্যাকেট সংগ্রহ থেকে জামা তৈরি পর্যন্ত নানা বিড়ম্বনার কথাও তিনি স্বীকার করেছেন। কারণ চকলেটের মোড়কগুলো সাধারণ সুতার মতো নরম নয়। ফলে মোড়কগুলোকে ইলাস্টিকের সুতা দিয়ে সেলাই করতে হয়েছে। তাছাড়া প্যাকেটের রং মিলানো ছিল অত্যন্ত ধৈর্যের কাজ। কারণ দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যে স্টারবার্স্ট কোম্পানি তার চকলেটের প্যাকেটের রং অনেকবার পরিবর্তন করেছে। তখন তাকে অত্যন্ত পরিশ্রম করে একই রংয়ের মোড়কগুলো সংগ্রহ করতে হয়েছে। ইতিমধ্যে এমিলির তৈরি জামাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভালো সাড়া ফেলেছে। অনেকেই এরকম তুচ্ছ জিনিস ফেলে না দিয়ে তা দিয়ে ভিন্ন কিছু তৈরির ব্যাপারে উৎসাহিত হয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ