ঢাকা, বুধবার 8 November 2017, ২৪ কার্তিক ১৪২8, ১৮ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অন্যদেখা : জাতীয় চিড়িয়াখানা

ডা. জিয়াউর রহমান সেলিম : জাতীয় চিড়িয়াখানায় চাকরির অভিজ্ঞতার আলোকে ভিন্নধর্মী পর্যবেক্ষণমূলক এই প্রবন্ধটি লেখার চেষ্টা করেছি। কেউ যদি লেখা না-ও মনে করেন, আমি কি-ই বা করতে পারি!
জাতীয় চিড়িয়াখানায় দর্শক নামের কিছু মানুষ সেখানে থাকা বন্যপ্রাণীদের সাথে প্রতিদিনই যেমন উল্টাপাল্টা ব্যবহার করেন, তাতে অবাক হয়েছি-ব্যথা পেয়েছি। প্রায়ই মনে হয়েছে রক্ত-মাংসের মানুষ হয়ে বন্যপ্রাণীদের সাথে এই নিষ্ঠুর ব্যবহার সহ্য করে আছি কিভাবে? শুধুই কি চাকরির শিকল, নাকি আমি কেনো ঠান্ডা রক্তের প্রাণীতে পরিণত হচ্ছি। আমি এ কথাগুলি বলে মহান সাজার প্রয়াস চালাচ্ছি তা ভাবার কোন কারণ নেই। কথা সোজা সাপ্টা; যা-যাদের জন্য প্রযোজ্য, তা না বলে শান্তি পাচ্ছিনা দীর্ঘদিন।
চিড়িয়াখানার সদর গেটের সামনে পুতুল, মাটির বাঘ-সিংহ, ইত্যাদি বিক্রি করে বিক্রেতারা। আমদানি করা ময়ূয়ের পাখাও বিক্রি হয় সেখানে। অনেক ক্রেতা-দর্শক তা ক্রয় করে সুযোগ বুঝে বণ্যপ্রাণীদের উদ্ভক্ত করতে কাজে লাগান অথচ সেখানে সচেতনতামূলক বিল বোর্ড সাইন বোর্ড আছে। কে শোনে কার কথা? বাচ্চারা থাকে বড়দের সাথে ও বুড়োদের সাথে। বাচ্চারাতো ভুল করবেই-দুষ্টামীও করবে। কিন্তু সেয়ানাদের বেলায়? স্যরি! বুঝতে পারিনি বললেই সব খালাস? খাঁচায় থাকা কিছুটা অসহায় বন্য প্রাণীদেরকে, সেই পাখা দিয়ে গুতো মেরেই এদিক ওদিক যখন তারা তাকান এবং ধরা পড়ে যান, তখন আর কি বলি! কিছু জীবন-যাপনের বেহায়াপনা প্রকাশ হয়ে পড়ে হয়তো এবং একটু অন্যভাবে।
বাঘ, সিংহ, ভাল্লুকের খাঁচায় পাথর ছুঁড়তে হবে কেন?বাঘ সিংহের জীবনাচার হচ্ছে চব্বিশ ঘণ্টায় তারা সতের-আঠারো ঘণ্টা ঘুমাবে বা তন্ত্রাচ্ছন্ন থাকবে। বাড়ির বিড়ালটার সাথে মিলিয়ে দেখুন, এই ছবিটা চোখে ভাসবে। বাঘ আর সিংহ হচ্ছে বড় বিড়াল।
সকাল দশটার মধ্যে মাংস দেবার পর বেলা দু’তিনটার দিকে যখন তারা আয়েশ করে ঘুমায়; এ ওর শরীরের উপর পা দিয়ে বা তাদের নানা ভঙ্গিতে ঘুমানোর চিত্র দেখা যায়, ঠিক তখন শুরু হয় অপর্যাপ্ত গার্ডের চোখ ফাঁকি দিয়ে, চুপচাপ টুপটাপ বৃষ্টির মতো ঢিল ছোঁড়া। বেচারা গার্ড-আনসাররাই বা তাল সামলাবে কি করে? ওদিকে শার্ট প্যান্ট পরা উঁচু তলার ‘ভদ্দর লোক’ এরা। পোষাক-ভাষাসহ তাদের ক্ষমা চাইবার ভঙ্গি দেখলেও করুণা হয়। এদের লেখাপড়ার স্তর বেশ উপরে যা মনে করেও শিউরে উঠি।
এ এক ক্রুর আনন্দ। বাঘকে হালুম করতে হবে। সিংহকে ডাক দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে, সে সিংহ। দশ টাকার বিনিময়ে মনে হয় চিড়িয়াখানা তাদের পৈতৃক সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। এই জাতীয় দর্শক মনে করেন যা ইচ্ছে তা-ই করবো, ঐসব কর্মকর্তা কর্মচারী আমার কেনা গোলাম। অনেকে বলেন-এসব আমরা জানবো কি করে, বাঘ কতোক্ষণ খায়-ঘুমায় এসব! এর জবাবে বলি- এতো সব জানার খায়েশ কেন? আমি আপনার বাড়িতে-গ্রামে গেলে কি মনে হয় অভদ্র-নালায়েক? যা ঐ ছোট্ট বাচ্চাটাও বোঝে, তার অন্তত সিকিটুকু আপনি বোঝেন না কেন?
বিভিন্ন ধরনের চকলেট মুখে নিয়ে বহু আপাতত সুন্দরীদের দেখেছি ফুস করে মুখ থেকে ঢিল মারার স্টাইলে প্রাণীদের খাঁচায় ছুঁড়ে মারতে। তারপর ঐ পরিচিত কাচুমাচু ভাব-বুঝতে পারিনি, ছিছি কেন যে এমন করতে গেলাম, ইত্যাদি। দাঁত দিয়ে নখ কাটা শুরু হয়। হাবভাব দেখে মনে হয়-অস্কার না পেলেও এদেরকে অন্ততঃ মনোনয়ন দিতে অসুবিধা কোথায়?
গন্ডার কাদা পানিতে থাকতে ভালবাসে। গন্ডারের ঘরটা উপর থেকে নিচুভাবে এমনভাবে বানানো যে, কাদা পানি সব সময় থাকে এখানে। একদিন শুনি সংশ্লিষ্ট কোথঅয় টেকার যখন ঘরে ঘাস রাকতে এসেছে, এ সুযোগ ঘড়ি ও শার্ট-প্যান্ট পরা এক দর্শক, একটি অর্ধেক ইট গন্ডারের উপর ছেড়ে দিয়েছে। ঐ দর্শক গন্ডারের নচাচড়া দেখতে চেয়েছিলো। সাথে তার স্ত্রী ও বাচ্চা। তাকে আনসার দিয়ে ধরেনিয়ে আসা হলো। নানাজন বহু শাস্তি বাতলাচ্ছে তখন। শেষে বাচ্চাকে একটু আড়ালে রেখে, স্ত্রীর সামনে কান ধরে দু’বার উঠ-বস করানোটা সর্বনি¤েœর শ্রেষ্ঠ শাস্তি বলে মনে হয়েছিল।
শিম্পাঞ্জির খাঁচায় উৎপাত হয় তুলনামূলক অনেক বেশি যে জন্য, ওখানে সার্বক্ষণিক গার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। একটি খাঁচার জন্য একজন গার্ড। আবার দেখেছি প্রচণ্ড ভীড়ে এনিম্যাল কেয়ার টেকার, গার্ড-আনসার মিলেও পেরে উঠছেনা। এমনও দিন যায় এক সাথে তিন চার শত দর্শকের হৈ-চৈ চিৎকার আর উৎপাতে অস্থির একমাত্র শিম্পাঞ্জিটি যা শুধু দুর্লভই নয়, টাকা হলেও সংগ্রহ করার ব্যবস্থা করা বেশ কষ্টসাধ্য। একদিন শুনি ভিড়ের সুযোগে শিম্পাঞ্জিটিকে একজন জলন্ত সিগ্রেটে টান মারতে দিয়েছে। তা দেখে কিছু দর্শক হৈ-চৈ করছে আর হেসে কুল পাচ্ছে না। এক ভদ্রলোক দুষ্টলোকটিকে আইডেন্টিফাই করেন। এবং সেই স্বীকারও করে। তাকে পরে থানায় দেয়া হয়েছিল। বিষাক্ত ধোঁয়া আর যন্ত্রের শহর রাজধানী ঢাকায় বসবাসরত মেকি অনেকের মতো ঐ লোকটির মন বিষাক্ত হবে-এ আর নতুন কি!
ষোলঘর বলে যে অঞ্চলটি রয়েছ, সেখানকার বাসিন্দা বনের জাতীয় প্রাণী। দিনে এরা বলা চলে বিপদে থাকে সারাটা সময়। ভয়ার্ত-অসহায় মুখগুলো শুধু মায়াভরা নয়, মনে হয় আমি কতো অসহায় ওদের চেয়ে। কাকে কি বলবো! চমৎকার শার্ট প্যান্ট পরা ভদ্রলোক, দামী শাড়ি গহনা পরা ভদ্রমহিলা যারা সাথে প্রাইভেটকার নিয়ে আসে, এদেরকে আমি কি শেখাতে পারি? উল্লুক যেহেতু সারাদিনে পনের বিশ মিনিট পরপর হুপ হুপ শব্দ করতে থাকে, ফলে সেখানেও ভীড় কম হয় না। চিত্র একই। উল্লুকেরা ভালই জানে, ভীড়ের মধ্যে থাকা কিছু মানুষ কতো বড় অধম।
রাস্তা দিয়ে শত হাজার মা-বোন-পরিবার হেঁটে যাচ্ছে। এরা সবাই দর্শক। এই রাস্তা থেকে তিন-চার ফুট দূরে একদিন মাঠে, বিকেলে চারটার দিকে প্যান্টের চেন খুলে দাঁড়িয়ে যায় একজন। প্রাকৃতিক কাজ সারছেন তিনি। কাজ শেষ হওয়া মাত্রই তার সাথে কথা হয়।
এটা কি হলো?
কোনটা?
এই কিছুক্ষণ আগে যা করলেন। অপরপক্ষ ভাবলেসহীন, যেন কিছুই হয়নি।
ওহ। একটু প্রসাব করলাম আর কি। দাঁত কেলিয়ে হাসেন তিনি।
এটা কি একটু প্রসাব করার জায়গা হলো?
স্যরি ভাই বুঝতে পারিনি।
কি বুঝতে পারেননি-ভদ্রতা, প্রস্রাব করা নাকি আমাকে?
জি। ভুল হয়েছে। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ