ঢাকা, বুধবার 8 November 2017, ২৪ কার্তিক ১৪২8, ১৮ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ব্যবসায়ীদের ১৭ হাজার কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতির দায় কে নেবে?

এইচ এম আকতার : সাভারে ট্যানারি পল্লীর কাজ শেষ না করে কারখানা স্থানান্তরে পুরান ঢাকার হাজারিবাগের ট্যানারি মালিকদের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। এতে বেকার হয়েছে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক। ১৫ হাজার কোটি টাকার রফতানি অর্ডার বাতিল হওয়াতে আন্তর্জাতিক বাজার হারিয়েছে বাংলাদেশ। অনেকে সাভারে প্লট না পেয়ে ব্যবসা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এসব ক্ষতির দায় কে নেবে। সাভারে ট্যানারি স্থনান্তরে সময় একনেক বৈঠকে আরও দুই বছর বৃদ্ধিতে এমন প্রশ্ন করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
 ঢাকার হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে স্থানান্তরের প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বেড়েছে। তৃতীয়বারের মতো সংশোধনী এনে আগামী ২০১৯ সালে এ প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০০৩ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পটি ১৫ বছরেও শেষ করতে না পেরে এখন আরও সময় নেওয়া হল। তবে এবার প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হয়নি। দ্বিতীয় সংশোধনীর মতো এর ব্যয় প্রায় এক হাজার ৭৯ কোটি টাকাই রাখা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ প্রকল্পের সংশোধনীসহ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের মোট আট প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শেরে বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকের পর সাংবাদিক সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, অনেক ব্যবসায়ী এখানে (হাজারীবাগে) ৫০-৬০ বছর ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। তাছাড়া চামড়া শিল্প সরানো একটি জটিল প্রক্রিয়া, তাই সহজে এক জায়গা থেকে অন্য একটি জায়গায় স্থানান্তর এত সহজ নয়। হাজারীবাগের ব্যবসায়ীদের সাভারের নতুন শিল্পনগরীতে যাওয়ার দেরি হচ্ছে। ২০১৯ সালের মধ্যে ‘অবশ্যই এ প্রকল্প’ শেষ করা হবে, বলেন মন্ত্রী।
সূত্র জানায়,বিসিক ১৬ সালের মার্চ মাসে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে রিপোর্ট দেয় এখনই কারাখানা স্থানান্তরের উপযুক্ত হয়েছে। প্রকল্পের একভাগ কাজ শেষ হয়েছে। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইসিপি) কাজ শেষ হয়েছে। এখন আর হাজারিবাগে ট্যানারি রাখার কোন দরকার নেই। বিসিকের এমন রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী এবং শিল্পমন্ত্রী আল্টিমেটাম দেয়। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। বাধ্য হয়ে কোর্টে যায় সরকার। স্থানান্তরে সময় বেধে দেয় আদালত। এ সময়ের মধ্যে না গেলে তাদের জরিমানা করা হবে।
 সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে কারখানা স্থানান্তরে গড়িমসি করায় পরিবেশ দূষণ অব্যাহত থাকায় গত ১৬ই জুন হাজারীবাগের ১৫৪টি ট্যানারি কারখানাকে প্রতিদিন ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন হাইকোর্ট। পরে কারখানা মালিকদের আপিল আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ১৮ জুলাই কারখানা প্রতি দৈনিক ১০ হাজার টাকা করে জরিমানার আদেশ দেন আদালত। এরপর শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে কারখানা মালিকদের কাছে লিখিত নির্দেশ যাওয়ার পর গত ১১ আগস্ট থেকে শিল্প সচিব বরাবর সোনালী ব্যাংক- শিল্প মন্ত্রণালয় শাখার মাধ্যমে জরিমানা দেয়া শুরু করেন ট্যানারি মালিকরা।
গত ছয় মাসে কয়েক কোটি টাকা জরিমানা জমা হয়েছে। শিল্প সচিব বলছেন, জরিমানাই শেষ কথা নয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর করতে হবে। তবে ট্যানারি মালিকদের সংগঠন- বিটিএ বলছে, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর বন্ধ হয়ে গেছে ৫০টির বেশি কারখানা।
আদালতের নির্দেশে জরিমানা আদায়ও করা হয়। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। এর শুরু হয় বল প্রয়োগের পালা। সরকার ৮ এপ্রিল  গ্যাস,বিদ্যুৎ পানির লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তারা হাজারিবাগ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু তাতে কিলাভ হলো। এতে ট্যানারি মালিকদের ক্ষতি হলো প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। রফতানি অর্ডার বাতিল হলো প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার।
গুদামের মাল স্থানান্তরে আরও ক্ষতি হয়েছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। বেকার হয়ে পড়েছে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক। যারা কোন প্লট বরাদ্দ পায়নি তাদের ব্যবসা ছেড়ে দিতে হয়েছে। তাদের ব্যাংক ঋণের বোঝাও তাদের টানতে হয়েছে।
কিন্তু ৬ মাস পরে প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে সরকার প্রমাণ করলো বিসিকের রিপোর্ট ছিল ভুল। এ ক্ষতির জন্য সরকারই দায়ী। কি কারণে তাদের জরিমানা করা হলো। আর কি কারণে প্রকল্প শেষ না হওয়ার  আগে কেন তাদের স্থানান্তরে বাধ্য করা হলো। এসব প্রশ্নের জবাব তাদের কে দেবে। আর ক্ষতি পূরণ কে দেবে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানিতে মোট আয় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ কমেছে। রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ৩ হাজার ৭০০ কোটি মার্কিন ডলারের স্থলে আয় হয়েছে ৩ হাজার ৪৮৩ কোটি ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২১৭ কোটি ডলার কম। এ ছাড়া ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট ৬১টি পণ্যের মধ্যে ৩৮টির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। রপ্তানি আয় হ্রাস পাওয়ার কারণ এবং এ থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে আমাদের সময়কে বলেছেন বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা।
রপ্তানি আয়ের অর্ধেকের বেশি আসে তৈরি পোশাক ও চামড়াজাত পণ্য খাত থেকে। উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও সাভারে বিসিকের প্লটে ট্যানারি কারখানাগুলো স্থানান্তরিত করা হয়েছে। এতে চামড়া শিল্প থেকে গত অর্থবছরে রপ্তানি আয় কম হয়েছে। যার পুরো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে।
চামড়া অর্ডার বাতিল হওয়ার কারণে ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে এখাত। এতে করে বাতিল হওয়ার অর্ডার চলে যাচ্ছে প্রতিবেশি দেশে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন,দীর্ঘদিন ধরেই চামড়া শিল্পকে ধ্বংস করতে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই ট্যানারি স্তানান্তর করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ বুড়িগঙ্গা নদীকে বাচানোর অজুহাতে সাভারে ট্যানারি স্থনান্তর করা হলো। অথচ এখনও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইসিপি) কাজ শেষ না হওয়ার কারণে বাধ্য হয়ে ট্যানারি মালিকরা বর্জ্য এখন ধলেশ^র নদীতে ফেলছেন। প্রশ্ন হলো তাহলে নদী কি বাচলো না মরলো। ধলেশ^র নদীর মৃত্যু হলে এর দায়ভার কে নিবে।
 অথচ এ খাতে রপ্তানি আয় বাড়াতে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। রপ্তানিতে বাংলাদেশের চেয়েও বেশি নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে। তাই এ খাতে রপ্তানি আয় বাড়াতে হলে যত দ্রত সম্ভব সাভারের ট্যানারি নগরীতে গ্যাস সংযোগ দিতে হবে।
ট্যানারি-মালিকদের অভিযোগ, হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্পনগরী পুরোপুরি প্রস্তুত না করেই হাজারীবাগের কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর পেছনে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কোনো ষড়যন্ত্র আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) পক্ষ থেকে আদালতে মিথ্যা তথ্য দেয়া হয়েছে।
চামড়া শিল্পনগরীতে গ্যাস সংযোগ না দিয়েই বিসিক আদালতে জানায় যে, হেমায়েতপুরে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ দেয়া হয়েছে। এ ধরনের মিথ্যা তথ্য দেয়ার পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলেও অভিযোগ মালিকদের।
তারা বলছেন, বিসিক আদালতে আরও জানায় যে, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইসিপি) দু’টি মডিউল প্রস্তুত রয়েছে। ট্যানারি-মালিকরা সাভারে না যাওয়ায় মেশিনগুলো নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দেয়া হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে সাভারে ৫০টি কারখানার শোধনও সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি অপরিশোধিত তরল বর্জ্যগুলো ধলেশ্বরী নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর পানি দূষিত এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে যোগ করেন ট্যানারি-মালিকরা।
বাংলাদেশ ট্যানারি এসোসিয়েশনের(বিটিএ) সভাপতি শাহিন আহমেদ দৈনিক সংগ্রামকে বলেন,রফতানি অর্ডার বাতিল,কারখানা স্থানান্তর,প্লট বরাদ্দ,ব্যাংক ঋণসহ প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়াও বেকার হয়ে পড়েছে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক। প্লট বরাদ্দ না পেয়ে ব্যবসা ছাড়তে হয়েছে প্রায় ৫৪ টি ট্যানারি মালিককে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমরা সর্ব শেষ সরকারের কাছে এক বছর সময় চেয়ে ছিলাম। আমরা সরকারকে জানিয়েছিলাম এখনও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। কিন্তু সরকার আমাদের কথা না শুনের বিসিকের কথা হাজারিবাগ থেকে কারখানা উচ্ছেদ করে। এখনও ৮ মাস পরে এসে সরকার প্রকল্পের মেয়াদ দু বছর বাড়িয়ে প্রমাণ করলো আমাদের কথাই সত্য। বিসিক ভুল তথ্য দিয়ে দেশের ক্ষতি করলো। এতে করে ট্যানারি শিল্প আন্তর্জাতিক বাজার হারালো। এ ক্ষতির দায় ভার কে নেবে। আমরা সরকারে কাছে ক্ষতি পূরণ দাবি করবো।
তিনি আরও বলেন,ট্যানারি নিয়ে যে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলছে তা আজ প্রমাণিত। তা না হলে কিভাবে একটি ভুল রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আদালত রায় দেয়। এবং সে রায়ের ওপর ভিত্তি করে ট্যানারি উচ্ছেদ্দ করে সরকার। আর এখন বলছে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে আরও দু বছর সময় লাগবে। তা হলে কেন একটি রফতানিমুখী শিল্পকে গলা টিপে হত্যা করা হলো। এর দায় ভার কে নেবে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বর্তমানে দেশের ট্যানারি খাত কঠিন সময় পার করছে। এ পরিস্থিতি থেকে চামড়া শিল্প রক্ষা করতে হলে নগদ প্রণোদনা দিতে হবে। চামড়া শিল্পনগরীতে জমি রেজিস্ট্রির পাশাপাশি দ্রত গ্যাস সংযোগও দিতে হবে। বিসিকের মিথ্যা রিপোর্টের কারনে যে ক্ষতি হয়েছে তা সরকারকেই দিতে হবে।
সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, গার্মেন্টসের কাছাকাছি যদি কোনো খাত রফতানি আয় করতে পারে, সেটি চামড়াশিল্প। সাভারে পুরোপুরিভাবে ট্যানারি কার্যক্রম চালানো গেলে এ খাত থেকে রফতানি আয় অনেক বেড়ে যাবে। কিন্তু‘ শিগগিরই ব্যবস্থা না নিলে রফতানি-ই বন্ধ হয়ে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ