ঢাকা, বৃহস্পতিবার 9 November 2017, ২৫ কার্তিক ১৪২8, ১৯ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ক্রিকেটকে আরও আকর্ষণীয় করতে আসছে নতুন ফরম্যাট

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ক্রিকেট খেলাটাকে আরও বেশি জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে চলছে নানান আয়োজন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) এটা নিয়ে নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে না চালিয়ে কিভাবে এটাকে জনপ্রিয় করা যায় তা নিয়েই মূলত আইসিসি কাজ করে চলেছে। এক সময় ওয়ানডে ছিল স্বল্প পরিসরের খেলা। পরে এটাকে কমিয়ে করা হয়েছে টি-২০। এখন এটাকে আরো ছোট করে টি-১০ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে খেলার সিডিউলও ঘোষণা হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের তিন তারকাও অংশ নেবেন। চার-ছক্কায় ঢেউয়ে এবার আরও বেশি করে ভাসবে দর্শক টি-টেন লিগে। এছাড়া টেস্ট নিয়েও চলছে নানা পরিকল্পনা। এটাকে চারদিনে করা যায় কিনা তা নিয়ে চলছে চূলছেরা বিশ্লেষন। এর আগে এটাকে দিবারাত্রির ম্যাচ করা হয়। রঙ্গিণ বলের পরিবর্তে সাদা বলও ব্যবহার করা হয়েছে।  কম সময়ে শেষ হওয়ার কারণে এখন টি-২০ ফরমেট আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া সব মাধ্যমেই দারুণ আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অধিকাংশ টেস্ট খেলুড়ে দেশেই এই ফরমেটে লীগের আয়োজন হচ্ছে। বাংলাদেশেও টি-২০ ফরমেটে এখন বিপিএল চলছে। এবার সেটিকে আরও খাটো করে টি-১০ ক্রিকেট লীগ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৪ ডিসেম্বর থেকে। মাত্র চারদিনেই শেষ হওয়া এ টুর্নামেন্টে খেলবে ৬ দল। দুবাইয়ের লোটাস ইয়টে হওয়া প্লেয়ার্স ড্রাফটে বাংলাদেশের তিন তারকা ক্রিকেটারকে ভিন্ন তিন ফ্র্যাঞ্চাইজি দলে ভিড়িয়েছে। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে কেরালা কিংস, কাটার মাস্টার মুস্তাফিজুর রহমানকে বেঙ্গল টাইগার্স এবং পাখতুনস তামিম ইকবালকে দলে নিয়েছে। আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিতব্য এই প্রথম টি-১০ আসর ১৭ ডিসেম্বর শেষ হবে। টি-১০ ক্রিকেটের ধারণাটা আরব আমিরাতই এনেছে এবং তারাই আয়োজন করতে যাচ্ছে। ক্রিকেটকে আরও জনপ্রিয় আর আকর্ষণীয় করে তোলার লক্ষ্যেই এই ক্ষুদ্রতম ফরমেট প্রথমবারের মতো বিশ্ব ক্রিকেটে যোগ হচ্ছে। সম্প্রতি আসরের খেলোয়াড় নিলাম অনুষ্ঠিত হয় দুবাইয়ে। আর সেখানে দল পেয়ে গেলেন সাকিব, মুস্তাফিজ ও তামিম।
দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে গিয়ে এবার ইনজুরিতে পড়েন তামিম ও মুস্তাফিজ। সে কারণে চলমান বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ (বিপিএল) টি-২০ খেলতে পারছেন না এ দুই তারকা। তামিম মাঝপথে খেলায় ফিরবেন ইনজুরি কাটিয়ে, তবে মুস্তাফিজের ফেরার সম্ভাবনা একেবারেই কম। আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হবে বিপিএল। এরপরই টি১০ উত্তেজনা। শারজা ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ১৪ থেকে ১৭ ডিসেম্বর মাত্র ৪ দিনেই শেষ হয়ে যাবে আসর। এ আসরে অংশ নেবে ৬ দল- কলম্বো লায়ন্স, বেঙ্গল টাইগার্স, কেরালা কিংস, পাঞ্জাবি লিজেন্ডস, মারাঠা এ্যারাবিয়ান্স এবং পাখতুনস। সাকিবের দল কেরালা কিংসে আছেন ইয়ন মরগান, কাইরন পোলার্ড, ওয়াহাব রিয়াজ, সোহেল তানভীর, লিয়াম প্লাঙ্কেটরা। এ দলটির কোচ হিসেবে থাকছেন কিংবদন্তি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটার ব্রায়ান চার্লস লারা। মুস্তাফিজের বেঙ্গল টাইগার্সে আছেন সরফরাজ আহমেদ, সুনিল নারাইন, ড্যারেন সামি ও আন্দ্রে ফ্লেচাররা। তিনি কোচ হিসেবে পাবেন সাবেক পাকিস্তানী পেসার ও কোচ ওয়াকার ইউনুসকে। তামিমের পাখতুনসে আছেন শহীদ আফ্রিদি, ফখর জামান, ডোয়াইন স্মিথ, আহমেদ শেহজাদ, জুনাইদ খান ও মুহাম্মদ ইরফানরা।
এদিকে টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার শেষ নেই খেলাটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি’র (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল)। ইতোমধ্যে ফ্লাডলাইট ও গোলাপী বলে ডে-নাইট টেস্ট ম্যাচের প্রচলন হয়েছে। আগামী ২৬ ডিসেম্বর বক্সিং ডে’ তে দক্ষিণ আফ্রিকা-জিম্বাবুইয়ের মধ্যকার টেস্টটিকে চার দিনের টেস্টের স্বীকৃতি দিয়েছে আইসিসি।
অনেকে বলছেন, ঐতিহ্যের টেস্ট ক্রিকেট তাতে আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। অনেকে আবার এর বিরোধিতাও করছেন। বর্তমান তারকা ক্রিকেটারদের মধ্যে বিরোধিতাকারীর সংখ্যাই বেশি। টেস্টের আসল স্বাদ ধরে রাখতে আগের মতো পাঁচ দিনের টেস্ট ম্যাচের পক্ষে তারা। তাদের মধ্যে আছেন ত্রিকেটের প্রভাবশালী দেশ অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ, দক্ষিণ আফ্রিকা ক্যাপ্টেন ফ্যাফডুপ্লেসিসসহ অনেকেই। বর্তমান সময়ের ‘ফ্যান্টাস্টিক ফোর’এর সেরা ব্যাটসম্যান স্টিভেন স্মিথ চার দিনের টেস্টের বিপক্ষে। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক বলেছেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি পাঁচ দিনের টেস্ট পছন্দ করি এবং আমি টেস্ট ক্রিকেট পাঁচ দিনেই রাখার পক্ষে। ঐতিহ্যগতভাবে যেভাবে টেস্ট ক্রিকেট হয়ে আসছে সেটা ধরে রাখাই ঠিক হবে। একটা টেস্ট ম্যাচ যখন পঞ্চম দিনে যায় এবং দিনের শেষ ঘণ্টায় লড়াই হয় তখন বোঝা যায় টেস্ট ক্রিকেট সব থেকে উপভোগ্য ফরম্যাট। এটা গুরুত্বপূর্ণ যে আমাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হবে। কিন্তু চার দিনের টেস্ট পরীক্ষামূলকভাবে আসছে। দেখা যাক পরীক্ষার ফল কি দাঁড়ায়।’
দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক ফাফ ডুপ্লেসিস বলেছেন, ‘আমি পাঁচ দিনের টেস্টের ভক্ত। আমি বিশ্বাস করি, টেস্ট ক্রিকেটের সেরা ম্যাচগুলো পাঁচ দিনের শেষ ঘণ্টায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটাই টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্য, বিশেষত্ব। পুরো পাঁচ দিন লড়াই করে আপনাকে জয়ের সুযোগ তৈরি করতে হয়। বোলারদের অনেক বেশি বল করতে হয় এবং ব্যাটসম্যানদের লম্বা ইনিংস খেলতে হয়। পাঁচ দিনের টেস্ট কেন প্রয়োজন জানেন? একটি দিন বৃষ্টিতে কিংবা দুই-তিনটি সেশন খেলা না হলে পঞ্চম দিনে ফল পাওয়া যাবে। আমি পাঁচ দিনের টেস্টের পক্ষে এবং তাতেই সন্তুষ্ট।’ নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন বলেছেন, ‘চার দিনের টেস্ট বা পাঁচ দিনের টেস্ট নিয়ে কী বলব? আমার ধারণা, চার দিনের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট কারও কাছেই অজানা নয়। আমি মনে করি, ক্রিকেট বিশ্বের সবাই চার দিনের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলেছে। সময়ই বলে দেবে চার দিনের টেস্ট কতটুকু কার্যকর হয়। তবে পাঁচ দিনের টেস্ট সব সময়ই বেশি কার্যকর। আমরা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ভাল ফল পেয়েছি এবং ক্রিকেটের ব্র্যান্ড-ভেল্যুও বৃদ্ধি পাচ্ছে। চার দিনের টেস্ট নিয়ে এখনই বড় কোন মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। আমি মনে করি, যেভাবে চলছে চলতে দাও, খেলাটাই মূল বিষয়। তাহলেই উন্নতি সম্ভব।’
অস্ট্রেলিয়ার সহ-অধিনায়ক ও ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার চার দিনের টেস্টের বিপক্ষে। কোনভাবেই পাঁচ দিনের কম টেস্টকে মানতে পারছেন না ওয়ার্নার। বলেছেন, ‘চার দিনের টেস্ট নিয়ে আমার কোন আগ্রহ নেই। টেস্ট ক্রিকেটে অনেক কিছুর সংযোজন থাকে। যেমন পাঁচ দিনের টেস্টে একদিন বৃষ্টির কারণে প হলে পরবর্তী দিনগুলোতে ম্যাচের ফল পাওয়া যায়। আবার অনেক ম্যাচ তিনদিনেই শেষ হয়ে যায়। টেস্ট ক্রিকেট বড় দৈর্ঘ্যরে খেলা। এটি খেলায় নিয়ে আসে পূর্ণতা। টেস্ট ক্রিকেটের চরিত্র এমন যে আপনাকে পাঁচ দিনই মাঠে থাকবে হবে। টাইমলেস টেস্টের কথা ভাবুন। এটাই মূলত বেঁচে থাকা, ফিট থাকার যোগ্য উপাদান।’ চলতি বছর সাদা পোশাকে ২০ ইনিংসে ১০৯৭ রান করা ডিন এলগার চার দিনের টেস্ট নিয়ে বেশ চটেছেন। এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, ‘আমি পাঁচ দিনের টেস্ট বিশেষজ্ঞ নই, কিন্তু আমার মতে এটা এভাবেই চলা উচিত। আমার মতে আপনার এমন কিছু নাড়াচাড়া করা উচিত না; যেটা ভাঙেনি। আপনি যদি পুরো ক্রিকেট বিশ্ব ঘুরে দেখেন টেস্ট ক্রিকেট এখনও সর্বজনীন স্বীকৃত। আপনি যদি অস্ট্রেলিয়ায় খেলেন, আপনি যদি ইংল্যান্ডে খেলেন কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকায় বড় কোন দলের বিপক্ষে খেলেন; তাহলে আপনি প্রচুর দর্শক মাঠে দেখতে পাবেন। অন্য ফরম্যাটগুলোতেও পরীক্ষা হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি না টেস্ট ক্রিকেট কেন ভুক্তভোগী হবে। আমি খুবই প্রকৃতিবাদী। টেস্ট ক্রিকেটকে জগাখিঁচুড়ি বানাবেন না। আশা করছি, টেস্ট ক্রিকেট পাঁচ দিনেই রূপ পাবে।’
ইংল্যান্ডের এ্যাশেজ জয়ী অধিনায়ক মাইকেল ভন ডেইলি টেলিগ্রাফে নিজ কলামে লিখেছেন, ‘আমার ধারণাটি পছন্দ হয়েছে। কোন সন্দেহ নেই ভবিষ্যতে লিগগুলো চার দিনেই অনুষ্ঠিত হবে। টেস্টে ম্যাচের এখনকার গড় ৩৩১ ওভার। এটা সত্যি টেস্ট ক্রিকেটে আমাদের পঞ্চম দিনে দারুণ কিছু মুহূর্ত রয়েছে। সম্প্রতি পঞ্চম দিনের শেষ বিকেলে দারুণ কিছু নাটকীয় মুহূর্ত আমরা পেয়েছি। বিশেষ করে হেডেংলিতে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে শেষ মুহূর্তে টেস্ট জেতে উইন্ডিজ। কিন্তু অধিকাংশ ম্যাচ চার দিনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। চার দিনের টেস্ট হলে দলগুলোকে একটু ভিন্নভাবে খেলতে হবে। আমি জানি অনেকেই বলছেন, টেস্ট ক্রিকেট এখনও সেরা ফরম্যাট; কারণ একমাত্র এ ফরম্যাটেই পাঁচ দিন পর্যন্ত খেলা হয়।’ অনেককেই বলতে শুনেছি, ‘পঞ্চম দিনের অর্থ জলে গেল।’ সাধারণের হয়ে চিন্তা করুন, তাহলে হয়তো ভিন্ন কিছু ভাবতেও পারবেন।’
সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান ও দেশটির বর্তমান কোচ লেহম্যান বলেন, ‘আমি চার দিনের টেস্টের ট্রেইলার দেখতে চাই। কেন যেন মনে হচ্ছে এটা হওয়া উচিত। আমি ঐতিহ্যবাদী। আমি পাঁচ দিনের টেস্ট ভালবাসি। কোচ হিসেবেও আমি পাঁচ দিনের টেস্ট ভালবাসি। কিন্তু চার দিনেই যদি ফল পাওয়া যায়, তাহলে আরও একটি ম্যাচ আয়োজন করা যায়।
নতুন করে সিডিউল করে টুর্নামেন্ট করা যায়। কিছু কিছু দেশে তো পাঁচ দিনের টেস্ট আয়োজন করার খরচ অনেক বেড়ে যায়। অস্ট্রেলিয়া খুব ভাল অবস্থানেই আছে। আমরা সেদিক থেকে অবশ্যই উতরে যাব। ইংল্যান্ডও পারবে, ভারতও পারবে। কিন্তু এভাবেই যদি চলতে থাকে তাহলে কিছু দেশ আছে যারা অর্থনৈতিকভাবে স্ট্রাগল করবে।’ বর্তমান জিম্বাবুইয়ের প্রধান কোচ ও দেশটির সাবেক অধিনায়ক বলেছেন, ‘আমি চার দিনের টেস্টের ভক্ত। আমি প্রতি সেশনে অতিরিক্ত দশ মিনিট বেশি করে খেলানোর পরামর্শ দেব। ফলে চার দিনে অতিরিক্ত আধা ঘণ্টা করে খেলার সুযোগ পাওয়া যাবে। অতিরিক্ত ত্রিশ মিনিটে সাত কিংবা তার বেশি ওভার খেলানোর সুযোগ থাকবে। ৯৭ ওভার হলে কেমন হয়? রোমাঞ্চ ছড়াতে পারে। অতিরিক্ত এ সময়টুকু ফল নিয়ে আসতে পারবে এবং এটা ম্যাচের জন্য ভাল হবে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ