ঢাকা, রোববার 12 November 2017, ২৮ কার্তিক ১৪২8, ২২ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পাগলাপীরে গণগ্রেফতার চলছে আটক ৫৩॥ এলাকা পুরুষ শূন্য

রংপুর অফিস: পাগলাপীরের ঠাকুরটারিতে মুসল্লীদের বিক্ষোভে পুলিশের গুলী টিয়ারশেলে একজন নিহত ও ১১ জন গুলীবিদ্ধ হওয়া এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ১০ টি ঘর ও দুটি মন্দিরে আগুন ও ভাংচুরের ঘটনায় আতংকে ঘর ছেড়েছে গ্রামের পুরুষরা। এ পর্যন্ত ৫৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশ বাদি হয়ে দুটি মামলা করেছে। এদিকে দোষীদের শাস্তি এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে মানববন্ধন করেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন।
রংপুর সহকারী পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) সাইফুর রহমান সাইফ জানিয়েছেন, এ ঘটনায় গঙ্গাচড়া ও কোতোয়ালী থানায় পুলিশ বাদি হয়ে দুটি মামলা করেছেন। এখন পর্যন্ত ৫৩ জনকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, মানবন্ধনকারীরা চলে যাওয়ার পর রংপুরের সব উপজেলা থেকে বিভিন্ন এলাকার মানুষ জড়ো হয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ  ভাংচুর চালিয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে যে কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন,  পীরগঞ্জ উপজেলা জামায়াত আমীর মাওলানা গোলাম মোস্তফা, সেক্রেটারি খায়রুল আযম বিএসসি. এই উপজেলার বহিষ্কৃত সেক্রেটারি মোকছেদ আলী, চৈত্র কৈল ইউনিয়ন সভাপতি কারি গোলাম মোস্তফা, বদরগঞ্জ গোপালপুর ইউনিয়ন সভাপতি রুহুল আমীন, রোকন জয়নাল আবেদীন, কর্মী আব্দুল মান্নান, তারাগঞ্জ সয়ার ইউনিয়ন সেক্রেটারি সামসুল হুদা. পীরগাছার ইসরাফিল আলম, শলেয়াশাহ জামে মসজিদের খতিব মাওলানা সিরাজুল ইসলাম, কাজল প্রমুখ।
এ ঘটনায় গ্রেফতার আতংকে ওই গ্রামের আশেপাশের সকল গ্রামের পুরুষরা আতংকে বড়ি থেকে পালিয়ে গেছেন। এলাকাবসীর অভিযোগ পুলিশ যাকেই পাচ্ছে তাকেই  গ্রেফতার করছে।
রংপুর পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান জানান, ঘটনাস্থল থেকে যাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যিনি মারা গেছেন এবং যারা অসুস্থ তারা সবাই জামায়াত শিবিরের সমর্থক। যিনি মারা গেছেন তিনি জামায়াতের কর্মী। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের প্রবণতা ছিল এ ঘটনায়। সেটা মাথায় রেখে আমরা কাজ করছি।
এদিকে শনিবার দুপুরে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে মানববন্ধন করেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন।  দুপুরে ক্ষতিগ্রস্ত ঠাকুরটারি এলাকায় রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে কয়েকশ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন মানববন্ধন করে। আধাঘন্টাব্যাপী মানববন্ধনে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। তারা এ ঘটনার জন্য স্থাণীয়  জামায়াত শিবিরের লোকজনকে দায়ী করেছেন।
এসময় স্থানীয় দুলাল চক্রবর্তী জানান, এ ঘটনায় জামায়াত-শিবিরের স্থানীয়রা জড়িত। তারা উস্কানি দিয়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। এর মাধ্যমে আমাদের সাম্প্রতিক সম্প্রীতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা এখনও আতংকে আছি। আমরা নিরাপত্তা চাই। আর যেন কোন অঘটন না ঘটে। তিনি প্রশাসনের উদ্দেশ্যে বলেন, প্রকৃত যারা অপরাধী তারাই যেন এ ঘটনায় গ্রেফতার হন, নিরপরাধ কেউ যেন গ্রেফতার না হয়। সেজন্য প্রশাসনকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
ইউএনও জিয়াউর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ঘর নির্মাণের সহায়তা  দেওয়া হচ্ছে। ১০টি পরিবারকে তিন হাজার করে টাকা সাহায্য ও ঘর নির্মাণের জন্য ঢেউটিন, শুকনো খাবার দেওয়া হচ্ছে। ঘর তৈরির জন্য যা প্রয়োজন, তা দেওয়া হবে। ইতোমধ্যেই ঘর নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
শনিবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি সাংবাদিকদের জানান, ফেসবুক স্ট্যাটাসের পর স্থানীয়রা কয়েকদিন যাবত উস্কানি ছাড়ানোর চেষ্টা করেছে। শুক্রবার জুমআর দিন তারা পরিকল্পিতভাবে বেছে নিয়ে এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে হামলা করেছে। মন্দির ভাংচুর করেছে এবং এই এলাকা রক্তাত করেছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এখানে পরিস্থিতি উত্তেজিত করে এখানে একটি ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করা। কিন্তু এলাকাবাসী ও জনপ্রতিনিধিরা এই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীুকে রুখে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে স্থানীয় প্রশাসন  থেকে ঘর  তৈরি করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পাঁচ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত: গত ২৯ অক্টোবর মহানবী (স.) ও পবিত্র মক্কা শরীফকে অবমাননা করে ফেসবুকে ছবি আপলোড ও স্ট্যাটাস দেয়ার অভিযোগে রংপুর সদর উপজেলার  এমডি টিটোর বিরুদ্ধে গঙ্গাচড়া থানায় মামলা করেন লালচাঁদপুর গ্রামের মুদি দোকানি আলমগীর হোসেন। তাকে গ্রেফতারের দাবিতে গত মঙ্গলবার বিক্ষোভ করে এলাকাবাসী। তারা স্মারকলিপিও দেন পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকের কাছে। সেখানে ২৪ ঘন্টার সময় বেঁধে দেয়া হয়। এরপর গত শুক্রবার ওই যুবককে গ্রেফতারের দাবিতে জুমআর নামাজের পর স্থানীয় হরকলি বাজারে মানববন্ধন করে এলাকাবাসী। মানববন্ধন শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিক্ষোভ চলাকালে হিন্দুদের বাড়িতে আগুন দেয়ার অভিযোগ উঠে মুসল্লীদের বিরুদ্ধে। এসময় পুলিশের সাথে সংঘর্ষে গুলীতে নিহত হন হাবিবুর রহমান নামের মুসল্লী। গুলীবিদ্ধসহ আহত হন অন্তত ২০ জন। মাহবুবুর রহমান নামের এক মুসল্লী এখনও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার অবস্থা আশংকাজনক। এ ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আবু রাফা মো. আরিফকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন ও কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
রংপুরে ২ হাজার জনকে আসামী করে পুলিশের মামলা:
শীর্ষনিউজ : রংপুরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তি ও অবমাননাকর ছবি পোস্ট করার অভিযোগে সংঘর্ষ, অগ্নি সংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় গঙ্গাচড়া থানায় ২৫-৩০ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ২ হাজার জনের নামে পৃথক দুটি মামলা করেছে পুলিশ।
গঙ্গাচড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিন্নাত আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গঙ্গাচড়া, কোতোয়ালি ও তারাগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ৩৬ জনকে আটক করে পুলিশ।
এদিকে শুক্রবার রাতে রংপুর সার্কিট হাউস মিলনায়তনে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গার উপস্থিতিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
রংপুরের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, ওই অপ্রীতিকর ঘটনার তদন্তে রংপুর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু রাফা মো. রফিকুল ইসলামকে প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন-রংপুর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুর রহমান সাইফ ও রংপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলাম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ