ঢাকা, সোমবার 13 November 2017, ২৯ কার্তিক ১৪২8, ২৩ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিএনপির সমাবেশ এবং গণতন্ত্রের প্রশ্ন

আশিকুল হামিদ : রোববার, ১২ নভেম্বর এমন এক সময়ে নিবন্ধটি লেখা হচ্ছে যখন রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রায় ১৯ মাস পর সেখানে সমাবেশ করার অনুমতি পেয়েছে দলটি। এই অনুমতি দেয়া নিয়েও নাটক কম করা হয়নি। প্রথমে মৌখিক এবং তারপর লিখিত অনুমতি দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশÑ ডিএমপি। অনুমতির সঙ্গে এমন ২৩টি পূর্বশর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছিল, ডিএমপি তথা সরকার চাইলে যেগুলোর কয়েকটি পর্যন্ত ভঙ্গ বা লংঘন করার অভিযোগ ওঠানো মোটেই কঠিন কোনো ব্যাপার হতো না। অত্যন্ত অসম্মানজনক হলেও বিএনপি সেসব পূর্বশর্ত মেনেই সমাবেশ করার অঙ্গিকার করেছিল। সমাবেশ করেছেও।
অন্যদিকে অনুমতি দেয়ার মাধ্যমে গণতন্ত্রের প্রতি নিজেদের আস্থা ও সম্মানের ঘোষণা দিলেও সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সকল পন্থায় সমাবেশকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও কুমিল্লাসহ আশপাশের জেলাগুলো থেকে ঢাকা অভিমুখীন বাস চলাচল বন্ধ করিয়েছে সরকার। সারাদেশের শিডিউলে বিপর্যয় ঘটিয়ে ট্রেন চলাচলও বন্ধ রাখা হয়েছে। চলতে পারেনি লঞ্চ ও স্টিমারও। ফলে একদিকে মানুষ পড়েছে চরম দুর্ভোগের কবলে, অন্যদিকে ঢাকা মহনগরীতে সৃষ্টি হয়েছে হরতালের মতো অবস্থা। অনেকেই একে ‘আওয়ামী সরকারি হরতাল’ বলে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু এত কিছু করেও বিএনপির সমাবেশকে ভন্ডুল করা সম্ভব হয়নি। লাখ লাখ মানুষ গিয়ে জড়ো হয়েছেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেখানে ভাষণও দিয়েছেন।
১২ নভেম্বরের সমাবেশের পর্যালোচনা করা অবশ্য এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য আসলে গণতন্ত্রের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সরকারের মনোভাব সম্পর্কে ধারণা দেয়া। কারণ, বেশি আশাবাদী অনেকে মনে করেছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রায় সকল দেশের সম্প্রতি প্রকাশিত মনোভাবের কারণে সরকার সম্ভবত  তার মনোভাব ও কৌশলে পরিবর্তন ঘটাবে এবং একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সততার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে শুরু করবে। বলা দরকার, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের নামে যে প্রহসন করা হয়েছিল তার পর থেকেই বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার পক্ষ থেকে গণতন্ত্র ও নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের প্রতি আহ্বানের আড়ালে প্রকৃতপক্ষে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ বিষয়ে ৫ নভেম্বর থেকে ঢাকায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনÑ সিপিএ’র ৬৩তম সম্মেলন চলাকালেও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে। বিশ্বের ৫২টি গণতান্ত্রিক দেশের কেন্দ্রীয় সংস্থা সিপিএ’র এই সম্মেলন আয়োজনের সুযোগ পাওয়া বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে ছিল এক বিরাট সম্মানের ব্যাপার। কারণ, এই সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ বা সংসদের ৫৬ জন স্পিকার, ২৩ জন ডেপুটি স্পিকার এবং প্রায় সাড়ে পাঁচশ জন সংসদ সদস্য। এবারের সিপিএ সম্মেলনের মূল প্রতিবাদ্য বিষয় ছিল ‘কন্টিনিউয়িং টু এনহ্যান্স হাই স্ট্যান্ডার্ডস অব পারফরম্যান্স অব পার্লামেন্টারিয়ানস’Ñ যার অর্থ, সংসদ সদস্য বা পার্লামেন্টারিয়ানদের পারফরম্যান্সকে ধারাবাহিকভাবে উন্নত করার পন্থা নির্ধারণ এবং সে লক্ষ্যে নির্দেশনা দেয়া।
৫২টি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সংস্থা হিসেবে সিপিএ সঠিকভাবেই অমন একটি চমৎকার উদ্দেশ্যকে প্রধান বিষয়বস্তু এবং স্লোগান হিসেবে বেছে নিয়েছিল। কারণ, গণতন্ত্রে পার্লামেন্ট বা সংসদ সদস্যদের পারফরম্যান্স তথা নির্ধারিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনসহ তাদের কার্যক্রম ও অচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসদকে কার্যকর করতে এবং সংসদের মাধ্যমে জনগণের ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে তারা কতটা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেন দেশে দেশে সেটাও পর্যবেক্ষণ করা হয়। বিষয়টি সংসদ সদস্যদের নিজেদের জন্যও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নির্দিষ্ট মেয়াদ বা সময়ের পর তাদের আবারও ভোটের জন্য জনগণের কাছে যেতে হয়। ভোটার জনগণ তখন ভোট দেয়ার আগে বিগত দিনগুলোতে তাদের পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করে। এভাবে সব মিলিয়েই বলা যায়, সম্মেলনের প্রতিপাদ্য হিসেবে যথার্থ বিষয়বস্তুই নির্ধারণ করেছিল সিপিএ।
অন্যদিকে আয়োজক রাষ্ট্র হলেও বাংলাদেশ কিন্তু সম্মেলনে আগত প্রতিনিধিদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ঘটিয়েছেÑ যার প্রমাণ পাওয়া গেছে অনেক প্রতিনিধির বক্তব্যে ও কার্যক্রমে। বলা বাহুল্য, এর কারণ সৃষ্টি করেছিল ‘নির্বাচিত’ নামের বর্তমান জাতীয় সংসদ। সিপিএ’র প্রতিনিধি হিসেবে আগতদের প্রায় সবার প্রতিক্রিয়াতেই পরিষ্কার হয়েছে, তাদের অনেকে এমনকি ভাবতেই পারেননি যে, বাংলাদেশের বর্তমান সংসদ সদস্যরা কোনো সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে যাননি। তারা জনগণের ভোটে ‘নির্বাচিত’ও হননি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি কথিত যে নির্বাচনের মাধ্যমে ‘নির্বাচিত’ হয়েছিলেন বলে তারা দাবি করে থাকেন সে নির্বাচন বিশ্বের দেশে দেশে ‘প্রহসন’ হিসেবেই বেশি পরিচিতি পেয়েছিল। এখনো, মেয়াদের প্রায় শেষ প্রান্তে এসেও বর্তমান সংসদের সদস্যরা তাদের সে দুর্নাম ঘোঁচাতে পারেননি।
এ ব্যাপারে প্রমাণ পাওয়া গেছে বিভিন্ন দেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদের মনোভাব, বক্তব্য ও কার্যক্রমে। উল্লেখযোগ্য কোনো দেশের কোনো জনপ্রতিনিধি বা তাদের নেতাকেই বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তার জোটের কোনো দলের নেতা বা সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচয়দানকারীদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কোনো দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসতে দেখা যায়নি। দেখা যায়নি বিশেষ করে গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়ে মতবিনিময় করতেও। বাংলাদেশের বর্তমান সংসদে সংসদীয় বিরোধী দল বলে যে কোনো দল বা গ্রুপ আছে এবং সে দলেরও যে রওশন এরশাদ নামের একজন নেত্রী আছেন তারও স্বীকৃতি পাওয়া যায়নি প্রতিনিধিদের তৎপরতায়। ঘটেছে বরং সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। সংসদের কথিত প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী রওশন এরশাদকে সিপিএ সম্মেলনে তৎপর দেখা যায়নি। তার দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বেছে বেছে ঠিক এ সময়ই সিঙ্গাপুরে গেছেন চিকিৎসার জন্য। বলা হচ্ছে, তিনি আসলে লজ্জায় কেটে পড়েছেন। এমন অবস্থায় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, সিপিএ সম্মেলনের কয়েক দিন আগে থেকে নিরাপত্তা বিধানের নামে বিদেশি প্রতিনিধিদের হোটেলের ভেতরে আটকে রাখার সুপরিকিল্পিত সরকারি কৌশল ব্যর্থ হয়েছে। বেশিরভাগ দেশের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারসহ জনপ্রতিনিধিরা গুলশানে গিয়ে সাক্ষাৎ করেছেন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন এবং ২০ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে। বুঝতে অসুবিধা হয়নি, প্রকারান্তরে তারা খালেদা জিয়াকেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অঘোষিত নেত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। সম্মানও সেভাবেই দেখিয়েছেন সকলে।
অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল, যখন বিদেশি জনপ্রতিনিধিদের কাছে সত্য আড়াল করতে গিয়ে সরকারকেই বরং নাজেহাল হতে এবং প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীনদের লক্ষ্য করা উচিত ছিল যে, তথ্য-প্রযুক্তির চরম বিকাশের বর্তমান পর্যায়ে শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে সক্ষম হওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে না। বর্তমান সংসদের ৩০০ জনের মধ্যে ১৫৪ জন কথিত সদস্যই যে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ সংসদে ঢোকার সুযোগ অর্জন করেছেন এবং বাকি ১৪৬ জনকেও যে ‘ভূতুড়ে’ ভোটাররা ভোট দিয়ে ‘জনপ্রতিনিধি’ বানিয়েছে- এসব তথ্য ঢাকায় এসেই বিস্তারিতভাবে জেনে গেছেন ৪৪ দেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। অনেকে ঢাকায় আসার আগেও জেনে এসেছিলেন। একই কারণে তথাকথিত নির্বাচিত সদস্য ও তাদের নেতা-নেত্রীদের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব ও সম্মান পেয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া।
উল্লেখ্য, চলতি বছর ২০১৭ সালেরই এপ্রিল অনুষ্ঠিত ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ)-এর ১৩৬ তম সম্মেলনের সময়ও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া এবং তৎপরতা দেখা গিয়েছিল। বাংলাদেশের রাজধানীতে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত এবং ৫ এপ্রিল ছয় দফা ‘ঢাকা ঘোষণা’র মধ্য দিয়ে সমাপ্ত ওই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গণতান্ত্রিক বিশ্বের ১৩১টি দেশের ৬৫০ জন সংসদ সদস্য, ৫৩ জন স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার এবং ২০৯ জন নারী পার্লামেন্টারিয়ানসহ মোট এক হাজার ৩৪৮ জন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি অংশ নিয়েছিলেন। এশিয়ার তো বটেই, ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়াসহ বেশিরভাগ দেশের জনপ্রতিনিধিরাই সেবার গুলশানে গিয়ে সাক্ষাৎ করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে। তাকেই দেখিয়েছিলেন নির্বাচিত প্রধান নেত্রীর সম্মান। সরকারের কোনো চেষ্টা, কৌশল ও পরিকল্পনাই সেবার সফল হতে পারেনি। সিপিএ সম্মেলনেও আইপিইউ সম্মেলনকেন্দ্রিক ঘটনাবলীর পুনরাবৃত্তি লক্ষ্যনীয় হয়ে উঠেছিল। সিপিএ সম্মেলনের সমাপ্তিকালীন ঘোষণায়ও বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং সংসদ সম্পর্কে আশান্বিত হওয়ার মতো কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অবশ্য এ সম্পর্কে সিপিএ’র আগেই ধারণা পরিষ্কার করেছে। সিপিএভুক্ত অনেক দেশই ইইউ-এর সদস্য। সে ইউরোপীয় ইউনিয়নই সম্প্রতি তার বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কিত বার্ষিক রিপোর্টে বলেছে, দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাটাই এখনো বাংলাদেশের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। দেশটিতে বিরোধী দলকে শুধু সংসদের বাইরেই রাখা হয়নি, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়ও তাদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। গত ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত ইইউ’র রিপোর্টে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জের জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে গিয়ে বলা হয়েছে, দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থ-সমাজিক ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হলেও মানবাধিকার সুরক্ষা ও সংরক্ষণ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র দুটিতে বাংলাদেশ উন্নতি করতে পারেনি। ইইউ বলেছে, নাজুক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক পরিবেশের সংকোচন বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড, গুম এবং বিরোধী দল ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকান্ডসহ সাধারণ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের অব্যাহত অবনতি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এখনো গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
রিপোর্টে জানানো হয়েছে, রাজনৈতিক সংলাপ, জনকূটনীতি ও উন্নয়ন সংস্থাসমূহের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ইইউ নিবিড়ভাবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। এই পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রকৃত বিরোধী দলগুলো বাধ্য হয়ে সংসদের বাইরে রয়েছে এবং দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের কোনো প্রভাব ও অংশগ্রহণ নেই। থাকলেও তা খুবই সামান্য। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রকৃত বিরোধী দলগুলো অংশ নিলেও প্রতিটি নির্বাচন ছিল সংঘাতপূর্ণ এবং প্রশ্নবিদ্ধ। জোর করে হারানো হয়েছে বিরোধী দলের প্রার্থীদের। ইইউ’র রিপোর্টে বিগত চারদলীয় জোট সরকারের দ্বিতীয় প্রধান দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে বলা হয়েছে, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অপরাধের অভিযোগে নেতাদের মৃত্যুদন্ড দিয়ে এবং নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ওপর সার্বক্ষণিক চাপ অব্যাহত রেখে জামায়াতকে কার্যত ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।
গুম, খুন ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণে বাংলাদেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে বলে মতপ্রকাশ করে ইইউ’র রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, ব্লগার ও ধর্মনিরপেক্ষ লোকজনসহ অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন। সরকার অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে ব্যর্থ হওয়ায় আইনের শাসন ও আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এই অবস্থা বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে নেতিবাচক অবদান রাখছে। ওদিকে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করা হয়েছে সত্য কিন্তু বিচার বিভাগ সত্যিকারের স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনগণের আকাংক্ষা পূরণ করতে পারেনি। এসবের বাইরে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার ক্রাইমস ডিনায়াল অ্যাক্ট এবং সিটিজেনশিপ অ্যাক্টের মতো বিভিন্ন আইন ও সেগুলোর বাস্তবায়ন জনগণের বাকস্বাধীনতার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং করতে পারে বলেও ইইউ’র রিপোর্টে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট আরো কিছু বিষয়েও ইইউ’র বার্ষিক এ রিপোর্টে বক্তব্য রাখা হয়েছে, যেগুলোর কোনো একটিও সরকারের পক্ষে যায় না। বিশেষ করে দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো প্রকৃত বিরোধী দলের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে ইইউ যা বলেছে, তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করার তো কোনো সুযোগই নেই। ক্ষমতাসীনরা নিজেরাই এ সুযোগ নষ্ট করেছেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে আয়োজিত ‘ডিজিটাল’ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তারা বিরোধী দলের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধংদেহী অভিযান চালিয়ে এসেছেন। এখনো সে অভিযান বন্ধ হওয়ার লক্ষণ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন ও একতরফা নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীনদের দমন-নির্যাতন বরং কল্পনার সকল সীমা ছাড়িয়ে গেছে। উল্লেখ করা দরকার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৫ জানুয়ারির ওই নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। শুধু তাই নয়, গণতন্ত্রের স্বার্থে সংস্থাটি এমনকি নির্বাচনের সময় কোনো পর্যবেক্ষক পাঠাতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। ইইউ শেষ পর্যন্তও কোনো পর্যবেক্ষক পাঠায়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি জোট বলেই সচেতন ও বেশি আশাবাদী অনেকে মনে করেছিলেন, ক্ষমতাসীনরা সংস্থাটির ওই প্রতিক্রিয়া ও কার্যক্রম থেকে শিক্ষা নেবেন এবং দেশের ভেতরে গণতন্ত্রের জন্য সুযোগ তৈরি করবেন। অন্যদিকে পরিস্থিতির বরং আরো অবনতি ঘটেছে। অবনতি ঘটছে এখনো। আর সেজন্যই ইইউকে তার বার্ষিক রিপোর্টে সরকারের উদ্দেশে কঠোর বক্তব্য রাখতে হয়েছে।
গুম ও গুপ্তহত্যার মতো বিচারবহির্ভূত কর্মকান্ড সম্পর্কে ইইউ’র রিপোর্টে যা বলা হয়েছে সেসবের সঙ্গেও ভিন্নমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, কোনো বিষয়েই ইইউ আসলে নতুন কিছু বলেনি। বস্তুত সরকার স্বেচ্ছাচারী ও কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠার কারণে বাংলাদেশে একদিকে বিরোধী গণতান্ত্রিক দলগুলো আন্দোলন দূরে থাকুক এমনকি সাধারণ কোনো কর্মসূচিও পালন করতে পারছে না, অন্যদিকে এসব দলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি আক্রান্ত অন্য সকলের জন্যও ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। গুম ও গুপ্তহত্যার মতো অপরাধ তো বেড়ে চলেছেই। সমগ্র এ প্রেক্ষাপটেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা অন্য কারো মাধ্যমে উপহাস ও সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার পরিবর্তে সরকারের উচিত ইইউ’র বার্ষিক রিপোর্টটিকে যথোচিত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া ও মূল্যায়ন করা এবং দেশকে গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে অনতিবিলম্বে উদ্যোগী হয়ে ওঠা। অন্যদিকে সরকার সম্প্রতি নতুন পর্যায়ে দমন-নির্যাতন এবং গ্রেফতার ও মামলায় জড়ানোর এমন ভয়ংকর অভিযান শুরু করেছে যার পরিণতি অত্যন্ত অশুভ ও ধ্বংসাত্মক না হয়ে পারে না। এর ফলে গণতন্ত্রের সম্ভাবনাও সুদূরপরাহত হয়ে পড়ছে।
এ ব্যাপারেই সর্বশেষ ধারণা পাওয়া গেছে বিএনপির ১২ নভেম্বরের সমাবেশকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহে। মুখে বললেও এবং কাগজে-কলমে অনুমতি দিলেও যানবাহন চলাচল বন্ধ করার পাশাপাশি গ্রেফতারের অভিযান চালানোর মাধ্যমেও সরকার এই সমাবেশকে বাধাগ্রস্ত ও ভন্ডুল করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে। এটা অবশ্যই শুভ লক্ষণ নয়।
বলা দরকার, গণতন্ত্র চাইলে এমন অবস্থা চলতে পারে না। সরকারের উচিত অনতিবিলম্বে গণতন্ত্রসম্মত অবস্থানে ফিরে আসা এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য স্পষ্ট করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ