ঢাকা, বুধবার 15 November 2017, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২8, ২৫ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতায় এলো অগ্রহায়ণ নগরে নবান্নের কৃত্রিম আয়োজন

সাদেকুর রহমান : “দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত লঘুচাপটি বর্তমানে দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় সুস্পষ্ট লঘুচাপ আকারে অবস্থান করছে। যার একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর প্রভাবে খুলনা, বরিশাল এবং চট্টগ্রাম বিভাগের দু’-এক জায়গায় হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া দেশের অন্যত্র আংশিক মেঘলা থেকে মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। সারাদেশে রাতের তাপমাত্রা ১-২ ডিগ্ির সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেতে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা ১-৩ ডিগ্ির  হ্রাস পেতে পারে।”-এমনটাই ছিল কার্তিকের শেষ দিনের সন্ধ্যা ৬টা আবহাওয়ার পূর্বাভাস। গতকাল মঙ্গলবার দেয়া আবহাওয়ার তথ্য অনুযায়ী, এদিন দেশের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে চ্ট্টগ্রামে ৩৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি ও তেঁতুলিয়ায় ১৪ দশমিক ৮ ডিগ্রি। আর এদিন ঢাকায় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল যথাক্রমে ৩০ দশমিক ৬ ও ২১ দশমিক ৬ ডিগ্রি। আগের দিন দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল সীতাকুন্ডে ৩৪ ডিগ্রি। আর ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩২ দশমিক ৮ ডিগ্রি।
সংশ্লিষ্ট দফতরের তথ্য বলছে, গত ২১ বছরের মধ্যে এবারকার হেমন্ত-প্রকৃতি পুরোটাই উলট-পালট। দিনের বেলা গরম আর রাতে ঠান্ডা অনুভূত হলেও কুয়াশা পড়ছে না বললেই চলে। আবহাওয়া অধিদফতর এখনও ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দিয়ে চলেছে। আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরনের মধ্যেই বাংলা প্রকৃতিতে সশরীরে হাজির হলো কার্তিক-অনুজা মাসটি। আজ বুধবার পহেলা অগ্রহায়ণ। এর সাথে নবান্নের চিরন্তনী যোগ থাকলেও বর্ষণ-বন্যায় তাতে ছেদ পড়েছে। কোথাও কোথাও হালকা কূয়াশার সাথে তৃণ-লতায় শিশির পড়ছে।
অগ্রহায়ণের কাব্যিক নাম ‘অঘ্রান’। দিকে দিকে এখন যুগপৎ সোনালী আমন ধান কাটার ও বোরো ধান লাগানোর আয়োজন। কালের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ‘মরা’ কার্তিকের পর এদেশের মানুষ প্রবেশ করছে এক সার্বজনীন মৌখিক উৎসবে। পাকা ধানের মউ মউ গন্ধে দশদিক হবে বিমোহিত। নগরেও লাগবে এর ঢেউ। এদিকে, এবারও সরকার পহেলা অগ্রহায়ণে ‘জাতীয় কৃষি দিবস’ পালন করছে না।  অন্যদিকে জাতীয় নবান্নোৎসব উদ্যাপন পর্ষদ এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে পহেলা অগ্রহায়ণকে ‘জাতীয় নবান্ন উৎসব দিবস’ ঘোষণা করে সরকারি ছুটি দেয়ার দাবি পুনরুচ্চারন করে।
অগ্র’ ও ‘হায়ণ’ এই দু’অংশের অর্থ যথাক্রমে ‘ধান’ ও ‘কাটার মওসুম’। পন্ডিতদের অগ্রহায়ণ মাসের নামকরণ পূর্ণ সার্থকতায় উদ্ভাসিত। ধানের সুপুষ্ট সম্ভার রোদের ছটায় ঝলমল করে ক্ষেত-প্রান্তরে থাকা ধানের অনির্বচনীয় গন্ধে অভাবগ্রস্ত কৃষকের চোখে জেগেছে স্বপ্নের অরুণিমা। ঠোঁটে লেগেছে মহাসুখের হাসি। ধান ফসলে ভরে উঠছে কৃষকের আঙ্গিনা। হতাশা দূর করে নিয়ে আসছে আশা ভরা সুখময় ভবিষ্যৎ।
“ধন্য অগ্রহায়ণ মাস, ধন্য অগ্রহায়ণ মাস, বিফল জনম তার নাহি যার চাষ”- মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের গৌরব কবি কংকন মুকুন্দরাম প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগে বিখ্যাত ‘চন্ডীমঙ্গল’ কাব্যে এভাবেই অগ্রহায়ণ বন্দনায় মত্ত হন। সে যুগের কৃষিজীবী বাংলার গোলাঘর এ মাসে ধানে ধানে পূর্ণ হয়ে উঠতো। অর্ধ-সহস্রাব্দ পরের বাংলাদেশের চিত্রও সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা মাত্র যেন। সুজলা-সুফলা এই দেশটির প্রধান কৃষি ফসল ধান আর তা থেকে প্রক্রিয়াজাতকৃত ভাত এ ব-বদ্বীপবাসীর প্রধান খাদ্য।
বাল্যশিক্ষা বইয়ের হাতেখড়ি যে স্বরবর্ণে, সেই ‘অ’-তে রচিত ‘অগ্রহায়ণ’ বাংলা পঞ্জিকার অষ্টম মাস হলেও এক সময় তা ছিল সূচনা মাস। প্রখ্যাত মনীষী আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’ তে উল্লেখ আছে, “স¤্রাট আকবরের আমলে অগ্রহায়ণ মাস থেকে বাংলা বছরের গণনা করা হতো এবং এ জন্যই বাংলা সালকে ‘ফসলি সাল’ বলা হতো। অবশ্য পরবর্তীকালে ইংরেজ শাসনামলে বাংলা বছরের গণনার পরিবর্তন হয়ে  বৈশাখ থেকে শুরু করা হয়। হিজরি সালের সাথে মিল রাখার জন্যই বাংলা মাস গণনায় বর্তমান রেওয়াজ চালু হয়েছে মনে করাটা অপ্রাসঙ্গিক নয়। হিজরি (আরবি) বর্ষের প্রথম মাস মহররম এবং বাংলা বর্ষের প্রথম মাস  বৈশাখ একই সময়ে আসে।”
প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে চীনা স¤্রাট চীন শিং স্বয়ং মাঠে ধান বপন করে দেশব্যাপী একটি বার্ষিক উৎসবের প্রবর্তন করেন। জাপানে অতি প্রাচীনকাল থেকে সাড়ম্বরে নবান্ন উৎসব পালিত হয়ে থাকে এবং এ উপলক্ষে জাতীয় ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে। বঙ্গীয় এলাকায় আদিকাল থেকেই অনার্য বাঙ্গালিরা নবান্ন উৎসব উদযাপন করতো। ধান কাটা সারা হলে গ্রামবাংলায় পড়বে নিমন্ত্রণ আর নাইওয়ের ধুম। কৃষানী বধূ ও কন্যারা খেজুর রসে নতুন  চালের ফিরনি, পায়েশ, নকশী পিঠা ইত্যাদি তৈরি করবে। এসব বিলোবে পরিবার-পরিজন ও প্রতিবেশীদের। এটিই অগ্রহায়ণের চিরায়ত ঐতিহ্য।
যান্ত্রিক আর কংক্রিটের রাজধানীতেও নবান্নের আয়োজন হয়। যতই কৃত্রিমতা থাকুক না কেন সে আয়োজন নাগরিকদের মাতোয়ারা করে বৈকি! এছাড়া এ মাসে ওরশ, হিন্দুদের বৌ মেলা, সংকীর্তন, রাসলীলা ইত্যাদি উপলক্ষে স্মরণাতীতকাল ধরে গ্রামীণ জনপদে মেলা বসছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) কর্তৃক  বৈশাখ ১৩৯০ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের মেলা’ গ্রন্থে অগ্রহায়ণ মাস জুড়ে ৩০টি মেলা অনুষ্ঠানের উল্লেখ করা হয়েছে। কোন কোন লোক গবেষকদের মতে, এ মাসে ৪৮টি মেলা বসে।
অগ্রহায়ণ কেবল ফসল কাটা ও ফসল মাড়াইয়ের মাস নয়। এ মাসের ফসল তোলার ওপরই নির্ভর করে অনাগত দিনগুলোর সুখ-দুঃখ। পাশাপাশি শীতকে স্বাগত জানিয়ে ঋতুরাজ্যের সিংহাসনে বসিয়ে বিদায় নেয়ার প্রস্তুতিও চলে নিজের মধ্যে। নবান্নের সব রাগিনী মৃদুমন্দ সুরলহরী তুলে ক্ষুধার্ত মানুষ। অভুক্ত কৃষকের বুকে নতুন আবেগ জাগায় বলেই কি অগ্রহায়ণ এতটা কাঙিক্ষত মাস? ‘রূপসী বাংলা’র কবি জীবনানন্দ দাশের মতো প্রতিটি কৃষক হৃদয়ে তাই বুঝি অনুরণিত হয় “আমি এই অঘ্রানেরে ভালোবাসি বিকেলে এই রঙ!/ রক্তের শূন্যতা রোদের নরম রোম- ঢালু মাঠ/ বিবর্ণ বাদামী পাখি হলুদ বিচালি।”এ সময় সাধারণত মেঘমুক্ত আকাশ থাকে, বর্ষণও হয় না। এ মাসে বৃষ্টিপাত বাংলা প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকারক। খনার বচনে বলে “যদি বর্ষে আগনে/ রাজা যায় মাগনে।”
কর্মসূচি : নগর যন্ত্রণা ভুলিয়ে গ্রামবাংলার নবান্ন উৎসবের প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে দিতে দীর্ঘদিন ধরে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করছে কতিপয় সংস্কৃতিসেবীর সংগঠন জাতীয় নবান্ন উৎসব উদযাপন পর্ষদ। এবারের নবান্ন আয়োজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যারয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের বকুলতলা এবং ধানমন্ডি লেকের মুক্তমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে। ‘এসো মিলি সবে নবান্নের উৎসবে’ শ্লোগানে ১৯তম জাতীয় নবান্ন উৎসবের উদ্বোধন করবেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রবীণ সাংবাদিক তোয়াব খান।  সকাল ৭টা ১ মিনিটে বাঁশির সুরের মূর্ছনায় উৎসবের সূচনা হবে চারুকলার বকুলতলায়। সকাল ৯টায় সেখান থেকেই বের হবে নবান্ন শোভাযাত্রা। মধ্যাহ্ন বিরতির পর দুপুর ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত একযোগে উৎসব চলবে উভয় মঞ্চে। শোভাযাত্রার পর উৎসব প্রাঙ্গণে ‘নবান্ন’ শীর্ষক আর্ট ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হবে। চারুকলার আর্ট ক্যাম্পে প্রবীণ শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী, আবদুল মান্নান, আবদুশ শাকুর শাহসহ ২০ জন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী অংশ নেবেন।
উৎসবে নবান্ন কথন ছাড়াও রাজধানী ঢাকার ৪৭টি দলের সঙ্গীত, নৃত্য, আবৃত্তি ও যন্ত্রসঙ্গীত এবং মানিকগঞ্জের চান মিয়ার দলের লাঠিখেলা, নড়াইলের নিখিল চন্দ্রের দলের পটগান, নেত্রকোনার দিলু বয়াতীর দলের মহুয়ার পালা, খুলনার দলের ধামাইল গান ও গারোদের ওয়ানগালা নৃত্য পরিবেশিত হবে। থাকবে ঢাক-ঢোলের বাদন আর মুড়ি-মুড়কি-বাতাসা ও পিঠার আয়োজন। উৎসব অঙ্গনে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেবে ল্যাবএইড।
অন্যদিকে আবহমান বাংলার সংস্কৃতি থেকে দূরে থাকা শিশুসহ সবার কাছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতি নতুন করে সামনে আনতে ‘প্রাণ চিনিগুঁড়া চাল’ আয়োজন করছে নবান্ন উৎসব-১৪২৪। আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী এ উৎসব হবে ধানমন্ডি লেকে।  পুথিপাঠ, গাজীর কিসসা, পালা গান, পুতুল নাচ, বায়োস্কপ, নাগরদোলা, পালকি, লাঠি খেলা ও বানর নাচে ভরপুর থাকবে তিনদিনের এ নবান্ন উৎসব। থাকবে ঢেঁকি, কুলা, মাথাল, জাঁতাকলসহ গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী নানা প্রদর্শনী। থাকবে ৩০টি বাহারি পিঠার স্টল। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এ আয়োজন থাকবে সবার জন্য উন্মুক্ত। উৎসবের সাংস্কৃতিক পর্বে গান পরিবেশন করবেন জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, ফকির আলমগীর, আবু বকর সিদ্দিক, লিলি ইসলাম, অনিমা রায়, ফেরদৌসী কাকলীসহ নামকরা শিল্পীগণ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ