ঢাকা, বৃহস্পতিবার 16 November 2017, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২8, ২৬ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আসামে মুসলিম বিরোধী ষড়যন্ত্র

ভারতের বাংলাদেশ সংলগ্ন রাজ্য আসামে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে। গত সোমবার অ্যাকশন কমিটি ফর আসাম নামের এক অসাম্প্রদায়িক সংগঠনের উদ্যোগে দেশটির রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ধর্মীয় ও ভাষিক সংখ্যালঘু সম্মেলনে এই অভিযোগ উত্থাপন করতে গিয়ে বলা হয়েছে, বিজেপি সরকার আসাম রাজ্যের ৫০ লক্ষ মুসলমানকে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে। আর নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়লে ৫০ লক্ষ মুসলমান ভোটাধিকার থেকেও বঞ্চিত হবেন। এমন অবস্থায় তারা আর ভারতীয় নাগরিক থাকার সুযোগ পাবেন না। সেই সুযোগে তাদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে আসাম তথা ভারত থেকেই তাড়িয়ে দেয়া হবে।  জোর করে ঠেলে পাঠানো হবে বাংলাদেশে।
অথচ তারা কোনো বিচারেই বাংলাদেশি নন। তাদের সকলের জন্মই হয়েছে আসামের মাটিতে। সে কারণে আইনত তারা জন্মসূত্রেই আসাম তথা ভারতের নাগরিক। কিন্তু বিজেপি সরকার এমন এক আইনের অজুহাত অবলম্বন করার কৌশল নিয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, ২০১৪ সাল পর্যন্ত যারা আসামে এসেছে কেবল তাদেরকেই ভারতের নাগরিকত্ব দেয়া হবে। আপত্তি উঠেছে একটি বিশেষ কারণে। দেখা যাচ্ছে, আইনটির আশ্রয় নিয়ে বিজেপি সরকার ২০১৪ সাল পর্যন্ত আগত সকল হিন্দুকে নাগরিকত্ব দিতে সম্মত হলেও মুসলিমদের ব্যাপারে কঠোরভাবে বিরোধিতা করছে। কথা শুধু এটুকুই নয়। একই আইনের আড়াল নিয়ে সরকার এমন মুসলিমদেরও নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকার করছে, যারা ২০১৪ সালের অনেক আগে আসামে জন্ম নিয়েছে। তাদের মধ্যে ৫০-এর বেশি বয়সী হাজার হাজার মুসলিমও রয়েছেন। তাদের সকলকেই বিজেপি সরকার ২০১৪ সালের পর আসামে আগত বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করতে চাচ্ছে।
এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ধর্মীয় ও ভাষিক সংখ্যালঘু সম্মেলনে জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের সভাপতি মওলানা আরশাদ মাদানীসহ আসামের হিন্দু ও মুসলিম রাজনীতিক, অধ্যাপক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, আসামের ৫০ লক্ষ মুসলিমকে নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাদের বাপ-দাদার ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ করার পদক্ষেপ নেয়া হলে তারাও নিশ্চয়ই নীরবে বসে থাকবে না। তারা বরং অবশ্যই প্রতিরোধের চেষ্টা চালাবে। পরিণামে হিংসা, মারামারি, খুনোখুনি ছড়িয়ে পড়বে। রক্ত ঝরবে আসামে। ভারতীয় মুসলিমরা তো বটেই, আসামের মুসলিমদের সমর্থনে এগিয়ে আসবে অন্য সব রাজ্যের সাধারণ মানুষও। তেমন অবস্থায় আজকের শান্ত আসাম মিয়ানমারে পরিণত হবে, যার পরিণতি রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের জন্যও অশুভ হয়ে উঠবে। সেই অশুভ পরিণতি এড়ানোর উদ্দেশ্যে হলেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত আসাম রাজ্যের বিজেপি সরকারকে অনতিবিলম্বে মুসলিম বিরোধী পদক্ষেপ নেয়া থেকে নিবৃত্ত করা।
মওলানা আরশাদ মাদানীসহ সম্মেলনের বক্তারা প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন, যারা ভারতীয় নয় আমরা তাদের ভারতীয় বানাতে চাই না। কিন্তু যে মুসলিমরা চারশ বছরের বেশি সময় ধরে বংশ পরম্পরায় আসামে বসবাস করে এসেছেন তাদের কেবলই মুসলিম হওয়ার কারণে আসাম তথা ভারত থেকে বিতাড়িত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে দেয়া হবে না। কারণ, এই মুসলিমরা কেবল আসামেই জন্ম নেননি, তাদের পূর্বপুরুষেরা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামেও অংশ নিয়েছেন। অনেকে এমনকি স্বাধীনতার জন্য জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন। অন্যদিকে এত বছর পর এসে বিজেপি সরকার সেই সব মুসলিমকেই ভারতীয় নয় বলে প্রচার করতে শুরু করেছে। তাদের জমা দেয়া পঞ্চায়েত নথি পর্যন্ত মানা হচ্ছে না।
অ্যাকশন কমিটি ফর আসাম আয়োজিত দিল্লি সম্মেলনে আসামের মুসলিমদের পক্ষে আরো অনেক তথ্য-পরিসংখ্যান ও ঐতিহাসিক দলিলসহ যুক্তি হাজির করা হয়েছে- যেগুলো প্রমাণ করে, চিহ্নিত ৫০ লক্ষ মুসলিম সকল বিচারেই জন্মগতভাবে ভারতীয় এবং আসামের নাগরিক। দিল্লি সম্মেলনে মওলানা মাদানীসহ বক্তারা বলেছেন এবং আমরাও মনে করি, এত বিপুলসংখ্যক মুসলিমকে আসাম থেকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর পরিকল্পনার পেছনে আসল উদ্দেশ্য মুসলিম বিরোধী ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন। কথাটা বলার কারণ, ২০১৪ সালকে সময়কাল হিসেবে নির্ধারণ করা হলেও বিজেপি সরকার শুধু মুসলিমদের ব্যাপারেই কড়াকড়ি করছে। পার পেয়ে যাচ্ছে হিন্দুরা। শুধু তাই-নয়, সরকার একই সঙ্গে এমন এক উদ্ভট দাবিও হাজির করেছে যেন এই ৫০ লক্ষ মুসলিমের সকলেই আসামে গেছে বাংলাদেশ থেকে এবং গেছেও ২০১৪ সালের পর! আমরা অ্যাকশন কমিটি ফর আসামের উদ্যোগে আয়োজিত দিল্লি সম্মেলনের যুক্তি, বক্তব্য এবং দাবি ও আহ্বানের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করি এবং এভাবে ৫০ লক্ষ মুসলিমকে তাদের বাপ-দাদার ভিটে-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ না করার জন্য আসামের বিজেপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। এ ব্যাপারে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়া দরকার। কারণ, আসামকে মিয়ানমার বানানোর ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে বলে দিল্লি সম্মেলনে যে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ না নেয়া হলে নতুন একটা সংকটের সৃষ্টি হবে। অমন আশংকার পরিপ্রেক্ষিতেই দিল্লি সম্মেলনে কেন্দ্রীয় সরকারকে  সতর্ক করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ