ঢাকা, শুক্রবার 17 November 2017, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২8, ২৭ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

“কাফেরের তলোয়ার চাও কতল করিতে আমারে”

শফি চাকলাদার: নজরুল অসুস্থ হলেন কীভাবে? গত ৭৫টি বছরে অসংখ্য ‘কারণ’ উঠে এসেছে। প্রাথমিক অসুখটাই নির্ণয় করা যায়নি। এই ‘নির্ণয় করা যায়নি’র মধ্যেই আবার অসুখ ঢুকে পড়েছিল। যার কারণে কিছুটা সময় ব্যয় হয় এই অসুখ নির্ণয়ের জন্য। ঐ যে একটা প্রবাদ আছে না ‘ঘুমন্ত মানুষকে ঘুম থেকে জাগানো সম্ভব কিন্তু জেগে ঘুমানো মানুষকে জাগানো সম্ভব হয়কি। নজরুলের অসুখ-নির্ণয়টাও ঐরকমই। কারণ এটাতো অসুখের কারণে অসুস্থতা নয়। অনেক ডাক্তার নজরুলের অসুখ নির্ণয়ে এসেছেন এবং সঠিক অসুখ নির্ণয় না করতে পেরে যার যে রকম ধারণা তাই ব্যক্ত করেছে। ঐ ব্যক্ত করণটাই অবশেষে ব্যর্থতায় রূপ নিয়েছে। এবং তাদের ঐ ব্যর্থতাকে বিশ্ব চেয়ে দেখল এক বিশ্ব শ্রেষ্ঠ কবির বিদায়। এনিয়ে একাধিক গ্রন্থও লেখা হয়েছে অসংখ্য প্রবন্ধ নিবন্ধ হয়েছে- এগুলো সব লেখা হয়েছে ঐ ব্যর্থতায় ঢাকা অসুস্থতার রিপোর্টকে কেন্দ্র করে। আসলে ১৯৪২ এর ১০ই জুলাই কী হয়েছিল? তবে এটা আমি বলব যে ১৯৪২ এর ১০ই জুলাইর ঘটনাটি ছিল নজরুল অসুস্থতার সূচনা এবং সত্য করণ। আমি সেদিকে যাবার পূর্বে স্বয়ং নজরুলের রচিত গীতি কবিতার প্রতি দৃষ্টি রাখা দরকার। কবিতাটিকে এ পর্যন্ত সকলেই ‘অসংলগ্ন’ বলেই ক্ষান্ত হয়েছেন, তারা লাইনগুলোর প্রতিও গভীর মনযোগী হননি। যদি হতেন তবে নজরুলের অসুস্থতার প্রকৃত কারণটি পেয়ে যেতেন। কবিতাটি রচিত হয় ৫ই অক্টোবর ১৯৪২ সোমবার। ঘটনার ৮৮দিন পর। মাত্র ৫৭ দিন পরের ঘটনার কবিতাটি প্রকৃত চিকিৎসার কেন্দ্র হতে পারত। অথচ সকলেই কবিতাটিকে ‘অসংলগ্ন’ বলেই নিজেদেরকে সরিয়ে রেখে দিলেন। প্রত্যেকেই পরের মুখেই ঝাল খেয়েছেন। তারা ভেবেছেন ডা. বিধানে এমনটা বলেছেন- এটাই ঠিক। আর আমিতো এই ৭৫ বছর পর বলতে চাই ঐ বিধান বাবুকে ডাকাটাই ভুল হয়েছে। আর এটাতো ভেতর থেকে অসুস্থতা-অসুখ নয়? গীতি-কবিতাটির নাম ‘অপরূপ’। আমি এই তথাকথিত ‘অসংলগ্ন’ কবিতাটির পুরোটাই উদ্ধৃত তরেছি-

দেখিলাম অপরূপা যুবতী নদীর ধারে।

পীনোনুতা পরোধরা

পদ্মের মূত্রত্ত যেতে নারে॥

নীল শাড়ি জড়ায় অঞ্চল

সুখ-সমীকরণ হলো চঞ্চল,

মদনোন্নাদিনী

মদনেও চোখা বনে হানিতে পারে॥

দীঘল দেহ, বিপুলা নিতম্বিনী,

রূপ যেন দুষে আলতায়।

সরসীর পখিনী চরণ-পরকা চায়।

মেঘে রোদে খেলাখেলি বৃষ্টি

ডাগর নয়ন, মধু-ঘন দৃষ্টি;

কাফেরের তলোয়ার

চাও কতল করিতে আমারে॥

গীতি কবিতাটির নাম অনুপাতে ১৪ লাইনের ১২ লাইন যেভাবে এগোচ্ছিল ১৩ এবং ১৪ লাইন হঠাৎ তা থেকে সরে গিয়ে এমন দু’টি লাইন অন্য কথা বলে ‘কাফেরেরÑ চাও কতল করিতে আমারে’তে চলে এলো এটাই অবাক করে। এতদিনের গুঞ্জন যে কবিকে প্রচ- আঘাত করা হয়েছিল ঘাড়ে ঐ ৫ই অক্টোবর ১৯৮২ এই অন্যখাতে প্রবাহিত হতে পারত। কিন্তু প্রত্যেকেই চলছিল হা-হুতোশী অমনযোগিতায়। এমন একটি নির্লজ্জ ঘটনা যে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ঘটতে পারে তা কল্পনায়ও কারো আসেনি। কিন্তু ঘটে ফল ২০১৩ তে সঙ্গীত শিল্পী মোস্তফা জামান আব্বাসী একটি গবেষণা গ্রন্থ লিখেন নাম ‘পুড়িব একাকী’। এই ‘পুড়িব একাকী’র ৩৫ নং অধ্যায়টি সত্য-সাক্ষী হিসেবে নজরুলের ঐ লাইনটির সাক্ষ্য বহন করতে পারে। তবে এত দেরীতে কেন? শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমদ ইন্তেকাল করেন ১৯৫৯ সালে ‘পুড়িব একাকী’ এরও ৫৩ বছর পর এমন তথ্য নিয়ে প্রকাশ পেল। ঘটনা ঘটে যায় ১৯৪২ এ। তাহলে এই মারাত্মক এবং মর্মন্তদ ঘটনাটি আব্বাসউদ্দিন পরিবার জানতেনÑ তাহলে কেন চেপে যাওয়া হল এমন দুনিয়া কাপানো অমানবিক ঘটনাটি। আবাবস উদ্দিন একাই নজরুলের সৃহৃদ ছিলেন না হিন্দু-মুসলমান অনেকেই নজরুলের বন্ধু-সুহৃদ(?) ছিলেন। সবাই ঘটনাটি হৃদয়ের মধ্যে চেপে রাখল? আব্বাস উদ্দিন কলিকাতা থেকে ঢাকায় চলে এরেন সপরিবারে। অথচ ঢাকায় এসেও থাকলেন নীরব? কী ধরনের ভীতি কাজ করেছিল যা ভিনদেশে এসেও ভীত করে রেখেছিল এই সত্য প্রকাশে? ‘পুড়িব একাকী’র ৩৫তম অধ্যায়ের ২৬০-২৬১ থেকে উদ্ধৃত করছিÑ প্রশিদ্ধ শিল্পী কে মল্লিক (নজরুলের মানু মিয়া) এবং নজরুলের কিছু বাক্সা লোচনাÑ

“কে মল্লিক, নজরুলের মানু মিয়া, রোজই এসে বসে থাকে। একদিন বলল, কাজীদা, ওদেরকে চেননা, বিষধর সর্পের চেয়েও কুটিল ওরা। ওদের সঙ্গে মিশি, কিছু কথা আমার কানে আসে। তারা ভাবে আমি শ্যামাসংগীতের গায়ক, আমি ওদের ধর্মেরই। তোমাকে সাবধান করা আমার ফরজ। তুমি আমাকে প্রায় বলো যে এগুলো আমার অমুলক সন্দেহ, তুমি বলে থাক যে কোনদিনই এই গ্রুপটি তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। সে অনেক কথা...

আমি জানি মানুমিয়া, সবজানি। আমার ওস্তাদ জমিরউদ্দিন খান বাবাজী নিজে বলেছেন, পানের সাথে সিঁদুর মিশিয়ে ভাস্তে কাদের জমিরিকে চির জীবনের জন্যে সঙ্গীতের জীবন থেকে বিদায় নিতে হয়। ওর কণ্ঠটি ছিল সবচেয়ে মিষ্টি। পানই তার কাল হলো। তার আগে আবদুল করিম বালি। তাকেও নানা রকম অন্যায় পানীয় খাইয়ে কণ্ঠটি সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে দিয়েছিল।

তোমাকে বলতে আমার কোনো সংকোচ নেই, ওরা বলাবলি করেছে যে তুমি যে সারাদিন পান খাও, তার মধ্যে মেশান হবে কাঁচা কঞ্জির রস।

আর আমার জিব্বা অবশ হয়ে যাবে। আমি হব উদ্মাদ, এই তো?

এ চিন্তায় আমি রাতে ঘুমুতে পারিনি। আল্লাহ্র নামে শপথ করছি যে এর একটি বাক্য বানান নয়। রেডিও স্টেশন থেকে রাতে যখন দেরি করে ফের, তোমার প্রতি হবে এ আক্রমণ।

আমার কোন শত্রু নেই, তা হতে পারে না। ওদেরকে আমি আগে থেকেই ক্ষমা করে দিচ্ছি। ওদের দেয়া বিষয় আমি আগেও হজম করেছি।

সেটা কী রকম?

হুগলি জেলে দেখি একটি সাপ আমাকে কামড়াতে আসছে। পরপর দু’বার। ‘আনন্দ বাজার পত্রিকা’তে খবরটি বের হবার পর ব্রিটিশ সাবধান হয়ে যায়। তাদের ইচ্ছে ছিল জাতশত্রু উঠতি কবিকে জ্যান্ত কবরে পাঠান। সেদিন যেমন পারেনি, এই ষড়যন্ত্রকারিরাও ব্যর্থ হবে। আমার ব্লাড প্রেসার দিন দিন বেড়েই ছলেছে। বাড়িতে অসুখ, ঋণ, পাওনাদারদের দাগাদা, তার উপর লেখার ফরমায়েস, নবযুগের চাকরি, আমার নার্ভ আর কিছুই নিতে পারছে না। আমাকে মেরে ফেলা সহজ।

ওদের সবাইকে চিনি না। কয়েকজনকে চিনি। তোমার উপর ক্ষ্যাপা নানা কারণে। 

কারণগুলো আমার অজানা নয়। এছাড়া নিউথিয়েটচার্সে যে ঘটনা ঘটেছিল তার একমাত্র তা জানত আবদুল কাদির ও সুফি জুলফিকার হায়দার। সে অনেক লম্বা ঘটনা। কেউ বলত ভদ্রলোকের হিন্দু মেয়েদের বাদ দিয়ে আমি কাননবালা, আঙুর বালা, ইন্দুবালা, হরিমতি, আশ্চর্যময়ী, কমলা ঝরিয়া এমনি আরও গানেওয়ালিদের দিয়ে রেডিও সরগরম করছি। রেকর্ডের ওরাই জমিয়ে আছে। তাই ওদের তথাকথিত ছাত্র-ছাত্রীরা রেডিও ও গ্রামোফোনে সুযোগ বঞ্চিত।

সামনে সাংঘাতিক ভদ্র, যেন তাহা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। কিন্তু ওদের কাছে আছে সর্বনাশা গু-াদের মতোই ছুরি লুকোনো।

মনে হয় মানু মিয়া, তুমি ওদের ছরি দেখে ফেলেছ। ওদের মধ্যে কেউ কেউ ভাবে আমিও সর্ব মুহূর্তে একটি ছুরি লুকিয়ে রেখেছি।

ওরা তোমাকে ছাড়বে না, মুসলমানদের মধ্যে প্রথম জ্বলন্ত প্রতিভা তুমি। এ প্রতিভা তাদের কাছে অসহ্য ঠেকেছে।

তোমার কথা সত্যি নয়, মানু মিয়া। যাদের কথা বলছ সে গ্রুপকে আমি চিনতে পারছি না। ওদের কোনো ক্ষতি করিনি। ওদের ধর্মের ক্ষতি করিনি। যারা সা¤্রাজ্য বিস্তার করেছে তাদেরও শত্রু নই আমি। শুধু তাই তারা আমাদের দেশ ছেড়ে চলে যাব, এইটুকু। প্রমিলা স্বেচ্ছায় আমাকে বিয়ে করেছে। আমরা সঙ্গে সে মুসলমানের মতোই ঘর করছে। আমার শাশুড়ি ও বিরজা মা আমাকে সর্বক্ষণ সহায়তা করছেন। আমি হিন্দুদের বিরোধী শক্তি নই।

তা সবাই জানে। প্রতিভাই তোমার শত্রু। তোমার বড় হওয়ার সহ্য করতে পারছে না কেউ কেউ। হিন্দু মুসলমানের ব্যাপারটাতো আছেই। ওটাইতো সবচেয়ে বড় প্রবলেম সংস্কৃতির লাইনে। ওরা ভাবে এটা তো আমাদের লাইন। কোথা থেকে এক মোসলা সব তছনছ করে দিয়ে গেল। বিশেষ করে, তুমি ‘নবযুগ’ এ যা লিখেছ, তা ওদের রক্তে আসুন ধরিয়ে দিয়েছে।”

কে মল্লিক আর নজরুলের কথোপকথনে সে সময়ের সংস্কৃতি অঙ্গনের একটি অলিখিত বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। অবশেষে ঘটনা ঘটেই গেল। এবং যে ঘটনাটি ঘটে গেল-অর্থাৎ রাতের আঁধারে ঘাড়ের আঘাত। প্রচ- আঘাতÑ যে আঘাতে নজরুল পড়েছিল ঐ রাস্তার ধারে। ঘটনার ৮৮ দিন পর কবির এই ‘অপরূপা’ গীতি কবিতাটি প্রমাণ করে নজরুল অবশ্যই সুস্থ্য হয়ে উঠতেন। কিন্তু হয়নি কারণ ডা. বিধান রায় এন্ড গং নজরুলের চিকিৎসার দায়িত্ব পান। ডা. রায় যে ধারণায় চিকিৎসা করেছিলেন তা সম্পূর্ণ ভিন্ন মতে ওনার বানানো মতে। এবং ব্যাপারটা দাঁড়ালো ‘যদিও রোগী বসেছিল, বদ্যি এসে শুইয়ে দিন।” ওরকম আঘাত-এর ফলে আমি মনে করি ধীরে ধীরে এবং ভুল প্রেসক্রিপসনে ওষুধের কারণে নানান জটিল রোগ এসে জড় হয়। যে রোগের নামগুলো এসেছে তা নজরুলের শরীরে ছিল না। ঐ আঘাতই ছিল এর কারণ। ঐ সময়ের নজরুল চিকিৎসা আঘাতকে সামনে রেখে করা হয়নি। কারণ ঐ ‘আঘাত’ই ছিল নজরুলকে শেষ করে দেয়ার অস্ত্র। তাই রোগীকে শেষ করে দেয়াই যেখানে লক্ষ্য সেখানে আঘাতটাকে আড়াল তো করতেই হয়। আর এমন জঘন্য কাজটিও তো তাহলে প্রকাশ হয়ে যেতে। এখানে লজ্জা ঢাকতে ছিল এবং দৃষ্টি অন্যখাতে প্রবাহিত করণ ছিল প্রধান ভাবনা। আঘাত প্রাপ্তর ৮৮দিন পরও নজরুল যে কবিতাটি রচেন তাতে প্রমাণ হয় ‘আঘাত’ জনিত চিকিৎসা হলে নজরুল সুস্থ্য হয়ে উঠতেন। কিন্তু চিকিৎসরা তা করেননি বরং যাতে অন্য ধরনের রোগের দেখা দিক নজরুলের শরীরে সেদিকেই তাদের দৃষ্টি ছিল এবং প্রেসক্রিপসনও ওভাবেই করা হয়েছিল। কতটা তৎপর এবং কতটা নিয়ন্ত্রণ অলিখিত চিঠির কারণে বিষয়টি একদম ধামাচাপ পড়ে যায়। নজরুলের সুহৃদ (?) রা মনে হয় ওদের দ্বারা ম্যাসমারাইজড হয়ে পড়েছিল নয়কি?

কবি ঢাকাতে আমার পর যে সকল ডাক্তাররা কবির রোগ নির্ণয় করেছেন তা-তো ইতিমধ্যেই ভুল প্রেসক্রিপসনের ফসল। যেমন আলঝাইমার্স বা অন্যরোগ ইত্যাদি। প্রচ- আঘাতে নজরুলের ঘাড়ের সাথে মস্তিষ্কের যে সূক্ষ্ম টিস্যু বা টিস্যুগুলো হয় ছিঁড়ে গিয়েছিল নয় পিষে গিয়েছিল। যার ফলে নজরুল সে সময় প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু যাকে পঙ্গু করার লক্ষ্যে এমন আঘাত করা তাকে সুস্থ করার চিকিৎসা করবে কারা? ঐ ‘অপরূপা’ গিিত কবিতাটি প্রমাণ করে নজরুল অবশ্যই সুস্থ হতেন এবং গীতি-কবিতার শেষ দু’টি লাইন প্রমাণ করে ‘কাফেরের তলোয়ার-চাও কতল্্ করিতে আমারে ‘নজরুলকে অবশ্যই আঘাত করা হয়েছিল। গীতি-কবিতাটি যারা পড়েছেন তারা ‘অসংলগ্ন’ বলেই ক্ষান্ত হয়েছেন গভীরে যাননি। ইউরোপে যখন কবিকে নেয়া হয়েছিল তখন এসব রোগ তো কবির শরীরে/মস্তিষ্কে দানা বেঁধেছিল। একযুগ পর- রোগ থেকে রোগের জন্ম হতে পারে।

ঢাকায় যখন ধানমন্ডিতে কবিকে আমি প্রায় তিনবছর সেবাযতœ করেছি। কত অসাধারণ এক কবি। কত শক্তিশালী ছিল তার আনাগোনা, কত তুঙ্গে ছিল তার আদর্শ। আরো কত কি তিনি যুক্ত করতে পারতেন সঙ্গীতে, সাহিত্যে। কিন্তু হিংসে হীনমন্যতা লজ্জাহীনতা এই ক্ষুদ্র মানুষটিকে কত অসভ্য কত অমানুষ কত অমানবিক করে দেয় যে, এত বড় এক বিশ্ব শ্রেষ্ঠ মানুষকেও অসহায় করে দিতে কুণ্ঠাবোধ হলো না। ‘হিংসে, রাজনীতির কবলে চলে যায় তখন তা হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর-নজরুল এই ভয়ঙ্কর শব্দটির খপ্পড়ে পড়ে গিয়েছিলেন। ধানমন্ডির কবি ভবনে কত অসহায়ভাবে হেঁটে চলতেন। গান শুনতেন, হারমোনিয়মের উপরে রাখা খাতা তুলে নিয়ে জিভে আঙ্গুল ভিজিয়ে পৃষ্ঠা উল্টাতেন। তারপর হারমোনিয়মের উপর রাখতেন। ইশারা করতেন ঐ পৃষ্ঠার গানটি গাইতে। রাতে গভীর রাতে মশারির ভেতর তাকালে দেখা যেত কবি একটি হাত মাথার নিচে রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে আছেন, চোখের কোণে মুচকি হাসি, কি ভাবতেন ওভাবে? চা ছাওয়ার অভ্যেসটা ছিল, অর্থাৎ চা দিলে খেয়ে নিতেন-তশতরিতে ঢেলে। টিভি দেখতে ভালবাসতেন। ঢাকায় যখন কবি এসে উঠলেন তার জন্য বরাদ্দ বাড়িতে তখন তার পিঠে বেডশো-এর কটা দাগ ছিল। সেবা-শুশ্রƒষায় সেরে উঠেছিল। বাড়ি যখন তাকে ছাড়তে হলো তখন কিছুতেই নামতে চাইছিলেন না। জোর করে নামাতে হয়েছিল, রেলিং শক্ত করে ধরে নামবেন না বলে চিৎকার করছিল। অথচ চিরকুট আসল কবি অসুস্থ পিজি হাসপাতালের ১১৭নং কক্ষে ভর্তি করা হয়েছে। তখন কবি চিকিৎসার ঊর্ধ্বে। ‘অপরূপা’ গীতি কবিতাটির লাইনটি আমি বলব যখন আমি আবিষ্কার করলাম তখন মনে পড়ল কবিকে যে ‘আঘাত’ করা হয়েছিল তাই তো সত্যি। একেবারে নির্ভেজাল সত্যি ঘটনা। সাংস্কৃতিক অঙ্গন এমন ঘটনাকে কাঁধে শির উঁচু করে কথা বলছে সকল সময় যে, আমরা সংস্কৃতিমনা। কিন্তু হিংসা, হীনমন্যতা শব্দগুলোকেও আঁকড়ে ধরে আছি। এগুলো প্রয়োগ করতে না পারলে মনে হয় বাপ-দাদার সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে গেল। ঘর-বাহির- সবখানেই এর পদচারণা। কিন্তু মুখে রয়েছে অসাম্প্রদায়িক শব্দটির মুচকি হাসির প্রকাশে। নজরুলকে জাতি হারালো এটা ঠিক- কিন্তু আমরা যারা এই ‘অপরূপা’ কবিতাটি ০৫ অক্টেতে লেখা-। মূল চিকিৎসা থেকে দূরে সরিয়ে নজরুলকে দেয়া হলো খেলার পুতুলী’ চিকিৎসা। ঐ যে কিছুক্ষণ আগে এ খেলায় ‘আবিষ্কার’ শব্দটি ব্যবহার করলাম এ কারণে যে, ৭৫ বছরের মধ্যে কারো দৃষ্টিতে এই লাইনটির গুরুত্ব অনুভব হয়নি, যা নজরুল স্বয়ং ঐ অসুস্থ-অস্থিরতায় লিখে রাখলেন? তবে এটা বলা যেতেই পারে ‘নজরুল’ কেন এভাবে আঘাত পেলেন? কেন ‘নজরুল আজও তেমন আদর পাচ্ছে না? কেন ‘নজরুল’ গেজেট-অন্তর্ভুক্ত হয়ে ‘জাতীয় কবি’ সংসদ স্বীকৃতি পেল না? তবুও নজরুলই আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার-যখন শান্ত যখন অশান্ত সকল সময়ে! আমাদের আদর্শ, আমাদের চেতনা। 

নজরুলকে গিরে কত স্মৃতিই না আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে। হোক না সে নজরুল বিগত ত্রিশ বছর যাবৎ অসুস্থ। নজরুল কিছুইকি বুঝতেন না, সেই কৌতূহলও পূর্ণ হয়েছে আমার। যখন তার দ্বিতীয় পুত্র প্রখ্যাত গীটারবাদক কাজী অনিরুদ্ধ ইসলাম ইন্তেকাল করলেন (১৯৭৪-২২ ফেব্রু.) তাকে জানানো হল, রাতে গিয়ে তাঁর শোবার বিছানায় অঝোরে কাঁদছেন। ৩০ জুন ১৯৬২ দিনটি তার স্ত্রীর মৃত্যু দিবসেও তাকে অস্থির দেখা যেত। চোখ ছল ছল করত। তার বিছানায় অপরিচিত কাউকে দেখলে হাত ধরে টেনে উঠিয়ে েিতন কিন্তু নিজের কাউকে দেখলে এমন করতেন না, এমন অসংখ্যবার কৌতুহলপূণৃ হয়েছে। কিন্তু যখনই এই ‘অপরূপা’ গীতি কবিতাখানি পড়ে শেষ দুটো লাইনে এসে চোখ পড়ে তখন ‘কৌতূহল’গুলো নীরব হয়ে যায়। এমন হীনমন্যতা মানুষের মধ্যে জন্মাল কি করে। নজরুলই তো তার ‘হেনা’ গল্পে প্রশ্ন রাখেন, ‘মানুষ এত ছোট হলো কি করে? তাদের মাথার উপর অমন উদার অসীম নীল আকাশ, আর তারই নিচে মানুষ কি সঙ্কীর্ণ, কি ছোট।’ কিন্তু এ উপমা এ শিক্ষণীয় বাক্য ইতর-জঘন্যদের কখনোই শিক্ষা দিতে পারেনি-পারবে না। এই ‘অপরূপা’ গীতি কবিতাখানি অনেকেই পড়েছেন, পড়ে বলেছেন, ‘অসংলগ্ন’। তারা হয়তো ভাবতেই পারেননি যে, গীতি কবিতাটির শেষ দু’টি লাইন বাস্তবে হতে পারে? হিংসা-বিদ্বেষ মানুষকে এতটা অন্ধ করতে পারে এত কারোরই ভাবনায় আসেনি। নজরুল অসুস্থ হয়েছেন হীন মানুষদের দ্বারা এবং দলটি এতই একীভূত এবং নিয়ন্ত্রিত ছিল, ঘটনাটি চাপাই থাকল বছরের পর বছর। সমস্ত চিকিৎসা করা হল অন্যখাতে দৃষ্টিপাতে। সেই রাচী, লুম্বিনী পার্ক, নানান চিকিৎসা, ইউরোপে চিকিৎসা সবগুলোই দৃষ্টি অন্যত্র বইয়ে দেয়ার লক্ষ্যে। ইউরোপ নেয়া হলো কবিকে এক যুগ পর। সামান্য সর্দিজ্বরও সুচিকিৎসার অভাবে নিউমোনিয়া ব্রঙ্কাইটিস মারাত্মক দিকে ঠেলে দিতে পারে। যে চিকিৎসা এই একযুগ ধরে করা হয়েছিল তা তো আই-ওয়াশ এবং যে ওষুধপথ্য দেয়া হয়েছিল তা-কি নজরুলকে আলজাইমার ধরনের রোগে আক্রান্ত করার লক্ষ্যে নয়তো? এতসব চক্রান্তের মধ্যে নজরুলের জন্য এমনটা যে হয়নি, এ তো হতেই পারে। কিন্তু নজরুলের একান্ত সুহৃদরা সত্যিই কি ঐ সময় বিবেকহারা হয়ে থেকেছেন? ‘পুড়ির একাকী’ গ্রন্থ রচয়িতার পিতা আব্বাস উদ্দিন আহমদ থেকেই এই তথ্য জেনে থাকবেন কিন্তু কেন এই ঘটনা চেপে রাখলেন এবং ১৯৫৩ সালে যখন ভিয়েনায় কবিকে নেয়া হয় তখন কেন এই বিবৃতি পত্রিকায় এলো না যে, কবিকে ঘাড়ে আঘাত করা হয়েছিল? সুহৃদ অথচ সুহৃদের মত সিনসিরিয়াটির সামান্যটাও প্রকাশ পায়নি। আর ষড়যন্ত্রকারীরা এক যুগব্যাপী ভুল প্রেসক্রাইব করে তাদের লক্ষ্যে পৌঁছে আই-ওয়াশ ধরনে ভিয়েনায় পাঠানো হয়। এটাও জানা যায় যে, ডা. বিধান চন্দ্র রায় ব্যক্তিগত পর্যায়ে ভিয়েনায় গিয়েছিলেন যাতে রিপোর্টটি মনমত হয় এবং এও শোনা যায়, ঐ রিপোর্টটিও ‘হারিয়ে যাওয়া’ খাতে ডাস্টবিনে চলে গেছে। এই হল নজরুল অসুস্ষতার করুণ অধ্যায়। বিশ্বের করুণতম নিদর্শনসমূহের ‘নজরুল-অধ্যায়’টি যে অন্যতম শ্রেষ্ঠতম স্থানটি অধিকার করে আছে তা নিয়েই নজরুলের তথাকথিত সুহৃদবৃন্দ এবং ষড়যন্ত্রকারীরা একই মিছিলে উল্লাস করুক-। হায় এভাবেই যবনিকা হল ‘নজরুল’ এবং নজরুলের সর্বশেষ এই ‘অপরূপা’ গীতি কবিতাখানি প্রমাণ করে যে, ষড়যন্ত্রহীন চিকিৎসায় নজরুল সুস্থ হয়ে উঠতেন কারণ ঘটনার ৮৮ দিন পরেও ‘নজরুল’ সম্পূর্ণ জ্ঞানহারা হননি। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ