ঢাকা, শুক্রবার 17 November 2017, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২8, ২৭ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নিজস্ব সক্ষমতায় দেশীয় মজুদ কয়লায় অনেক বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব

শাহেদ মতিউর রহমান : ভাল মানের কয়লা নিজ দেশে মজুদ থাকার পরেও ভারতের আদানি পাওয়ার থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে ২৫ বছরের চুক্তি করেছে সরকার। আর এক হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াটের এই বিদ্যুৎ কিনতে সরকার প্রাথমিকভাবে ব্যয় নির্ধারণ করেছে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা।  বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিশাল বাজেটের অর্থ বিদ্যুৎ আমদানিতে ব্যয় না করে বরং আমরা নিজেরাই উত্তরাঞ্চলের উৎকৃষ্ট মানের নিজস্ব কয়লা ব্যবহার করে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ আমরা নিজেরাই উৎপাদন করতে সক্ষম। কিন্তু কি কারণে সরকার নিজস্ব সক্ষমতা না বাড়িয়ে বিদ্যুতের মতো একটি স্পর্শকাতর জ্বালানি খাতকে বিদেশ নির্ভর করছে তা বোধগম্য নয়। 

বাংলাদেশের  উত্তরাঞ্চলের বড় কয়লা খনি দিনাপুরের বড় পুকুরিয়া। এছাড়া অন্যান্য স্থানসহ মোট পাঁচটি কয়লা খনিতে দেশে এখন কয়লার মজুদ আছে তিন হাজার তিনশ’ মিলিয়ন টন।  মজুদ কয়লার গুনাগুণ নিয়েও মতামত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা । তারা বলেছেন বাংলাদেশের মজুদ কয়লার বড় বিশেষত্বই হচেছ এর বার্নিং ক্ষমতা বেশি যা সচারাচর অন্যান্য দেশের কয়লার নেই। এছাড়া বাংলাদেশের কয়লা পোড়ানো পর ক্ষতিকর সালফার এর পরিমাণও থাকে কম। সেই হিসেবে আমরা নিজেদের কয়লা ব্যবহার করেই বেশি লাভবান হতে পারি।  

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আদানি পাওয়ার থেকে বিদ্যুৎ কিনতে দাম যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও কোন নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। কারণ হিসেবে সূত্রটি বলছে, প্রাথমিকভাবেই দেখা গেছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ইউনিট প্রতি ২৯ পয়সা বেশি দরে বিদ্যুৎ কেনার দর নির্ধারণ করা হয়েছে।  চুক্তির শর্ত মোতাবেক আদানির  প্রতি ইউনিট ৬ টাকা ৮৯ পয়সা দরে পর্যায়ক্রমে ১৬শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনতে ২৫ বছরে সরকারের ব্যয় হবে ১ লাখ ৯০ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। আর বিদ্যুৎ কিনতে হবে ডলারে। এতে রিজার্ভের ওপর চাপ বৃদ্ধিসহ দেশের আর্থিক খাতে নানামুখী ক্ষতি বয়ে আনবে। এতসব ক্ষতির দিক বিবেচনায় না নিয়েই সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি  বিদ্যুৎ কেনার এই প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে।

এদিকে ভারতের আদানি পাওয়ার থেকে বেশি মূল্যে বিদ্যুৎ আমদানি প্রসঙ্গে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ বিভাগের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, কয়েকটি অতিরিক্ত আইটেমে বাড়তি ব্যয় হবে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানে, যা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। এর মধ্যে রয়েছে ৯০ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ, কর্পোরেট ট্যাক্স ও অক্সিলিয়ারি কনজামশনের কারণে ব্যয় বৃদ্ধি। সেখানে আরও বলা হয়, আদানি পাওয়ারের প্রাথমিক প্রস্তাবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ৭ টাকা ৫৩ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে এটি কমিয়ে ৬ টাকা ৮৯ পয়সা করা হয়েছে। 

ভারতের বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানি থেকে বিদ্যুৎ কেনার প্রাথমিক আলোচনার সূত্রপাত শুরু হয় দীর্ঘ আট বছর আগেই। সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার পূর্বেকার  প্রস্তাবনায় বলা হয়েছিল, বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার লক্ষ্যে ২০১০ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়। এর আওতায় ভারত থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট ‘আদানি পাওয়ার লিমিটেড’-এর সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। এ ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে আদানি পাওয়ার গত বছর ১৮ ফেব্রুয়ারি একটি সমন্বিত কারিগরি ও বাণিজ্যিক প্রস্তাব দাখিল করে। প্রস্তাবটি বিভিন্ন কমিটি কর্তৃক যাচাই-বাছাই এবং আদানি পাওয়ারের সঙ্গে নেগোসিয়েশনের পর শেষতক বিদ্যুৎ বিভাগ এটি অনুমোদন দেয়।

বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য আদানি পাওয়ার ঝাড়খন্ডে ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রফতানির জন্য সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক সরকার, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অনাপত্তিপত্র সংগ্রহের দায়িত্বও আদানি পাওয়ারের। ইতিমধ্যেই ভারত সরকার প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে শর্তসাপেক্ষে বিদ্যুৎ সরবরাহের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে সে দেশের কোনো আইনগত পরিবর্তন বা রাজনৈতিক ঘটনার কারণে বিদ্যুৎ বিভাগকে যাতে বাড়তি ব্যয় বহন করতে না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও নিশ্চয়তা দিতে ভারত সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কর ও শুল্ক ছাড় দেয়ার জন্য ভারতের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।

একইসাথে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রকল্পের আওতায় ঝাড়খন্ড থেকে বাংলাদেশের সীমানা পর্যন্ত ৯০ কিলোমিটার এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বগুড়া পর্যন্ত ১৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কথা রয়েছে বলে জানায় বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর বিদ্যুতের চাহিদা ১০ থেকে ১৪ শতাংশ হারে বাড়ছে। সে হিসাবে ২০২১ সালে দেশে দৈনিক ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ