ঢাকা, শনিবার 18 November 2017, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২8, ২৮ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

স্কুল-কলেজ জাতীয়করণ ও এমপিওভুক্তির দৃশ্যপট

এ.কে.এম শামছুল হক রেনু : একটু লক্ষ্য করলেই দৃশ্যমান হয়, দেশের প্রায় স্থানেই বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা সদরে অনেক বেসরকারি স্কুল ও কলেজ জাতীয়করণ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। তন্মধ্যে নামী দামী, সুপ্রতিষ্ঠিত, ভালো ফলাফল ও অনেক মানসম্পন্ন বেসরকারি স্কুল কলেজও জাতীয়করণ থেকে বাদ পড়ছে। তাই উন্নত বেসরকারি স্কুল কলেজকে জাতীয়করণের দাবিতে দেশের অনেক স্থানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকার জনগণ একাত্ম হয়ে মানববন্ধন, পথসভা, মিছিল ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের বরাবরে স্মারকলিপি দিয়ে আসছে।  
এমনিভাবে ময়মনসিংহ জেলার পুরাতন ও ঐতিহ্যবাহী ফুলবাড়িয়া কলেজকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনা থেকে জাতীয়করণের দাবিতে ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকার জনগণ সম্মিলিতভাবে কলেজ প্যাভিলিয়নে আন্দোলন, সভা সমাবেশ ও মিছিল করলে উক্ত কলেজের একজন শিক্ষক মারা যায়। যে দায় দায়িত্ব কর্তব্যরত পুলিশ ও এলাকার সংসদ সদস্যের ওপর বর্তায়। এনিয়ে যথারীতি মামলাও রুজু করা হয়। এমনিভাবে জাতীয়করণ থেকে বাদ যাওয়া প্রায় বেসরকারি স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীর প্রায় সময়ই দেশের কোন না কোন স্থানে জাতীয়করণের দাবিতে সভা সমাবেশ, মানববন্ধন, মিছিল এবং উপজেলা ও জেলা প্রশাসকের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করে থাকে। অনেকের মন্তব্য বেসরকারি থেকে জাতীয়করণের ব্যাপারে স্কুল কলেজের শিক্ষার গুণগত মান, ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা, পরীক্ষার ফলাফল, প্রতিষ্ঠানের বয়সসহ অন্যান্য ক্রাইটেরিয়া বিবেচনা করে যদি বেসরকারি পর্যায় থেকে জাতীয়করণ করা হত। তবে হয়তোবা এলাকার অন্যান্য বেসরকারি স্কুল ও কলেজের ছাত্র, শিক্ষক ও এলাকার জনগণ একাত্ম হয়ে জাতীয়করণের ব্যাপারে কোন অবস্থাতেই মানববন্ধন, সভা সমাবেশ, মিছিল, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা কর্মকর্তার নিকট স্মারকলিপি দেয়ার প্রয়োজন মনে করতনা। যখনই ভালো স্কুল ও কলেজকে বাদ দিয়ে তুলনামূলকভাবে অতীব অনুন্নত স্কুল ও কলেজকে বেসরকারি থেকে জাতীয়করণ হচ্ছে তখনই এলাকার বঞ্চিত উন্নত, ভালো ও মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দিন দিনই জাতীয়করণের দাবি দাওয়া উত্থাপিত হচ্ছে। সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় সংসদ সদস্যের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করেই নাকি এ ধরণের বৈপরীত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। অর্থাৎ স্থানীয় এমপি এলাকার যে স্কুল ও কলেজকে পছন্দ করে সুপারিশ করে থাকে সে হিসেবেই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নাকি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে।
বেসরকারি একটি জরিপে উল্লেখ করা হয় এমন অনেক জেলা ও উপজেলা রয়েছে এবং যেখানে জাতীয়করণ করা হয়েছে, অনেক জেলা ও উপজেলার স্কুল ও কলেজ যেমনি পুরাতন নয় তেমনি প্রতিষ্ঠানসমূহের বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল খুব ভালো না। তদুপরি সার্বিক পারফরম্যান্সের বিবেচনায় কোন মতেই বেসরকারিকরণ থেকে জাতীয়করণের যোগ্যতা উপযুক্ততায় বিবেচনার ধারে কাছেও নহে। এ ব্যাপারে অজস্র উদাহরণ যার সীমা নেই। তাই বলা চলে ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া কলেজকে যার বেসরকারিকরণ থেকে জাতীয়করণের জন্য আন্দোলন, সভাসমাবেশ, মানববন্ধন, মিছিল ও স্মারকলিপি প্রদান করেছে এটা তাদের ন্যায্য দাবিরই বহিঃপ্রকাশ। এ ন্যায় দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে উক্ত প্রতিষ্ঠানের যে শিক্ষক মারা গিয়াছে তার স্মৃতি যেমনি অমর তেমনি তার বিদেহী আত্মাও অম্লান। যা উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকার মানুষের নিকট যুগ যুগ ধরে অম্লান স্মৃতি ও ইতিহাস হয়ে থাকবে।
সমসাময়িক পত্রপত্রিকার সংবাদ ও সূত্রে জানা যায় ওই এলাকার সংসদ সদস্যের বদান্যাতার প্রেক্ষাপটেই নাকি উক্ত ফুলবাড়িয়া কলেজকে আগে ভাগে অন্যান্য বেসরকারি কলেজগুলোর সাথে জাতীয়করণ করা হয়নি। যদি তাহাই হয়ে থাকে, তা যেমনি দুঃখজনক তেমনি বেদনার পুঞ্জীভুত মহাকাব্য ও অনিয়মের দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হলে অত্যুক্তি হওয়ার কিছু নয়। ফুলবাড়িয়া কলেজের মতো আরও যে সমস্ত এলাকার উন্নত বেসরকারি স্কুল ও কলেজ এখনো জাতীয়করণ করা হয়নি এ সবের ভুলভ্রান্তি, স্বজনপ্রীতি, যে কোন ধরণের অসদুপায়, পক্ষপাতিত্ব ও জড়তা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানের মানদন্ডের ওপর নিরপেক্ষভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলে অনেকেই মনে করে থাকে। কিশোরগঞ্জ পাকুন্দিয়া উপজেলার শত বছরের ওপরে পুরাতন ও ঐতিহ্যবাহি কোদালিয়া এস.আই উচ্চ বিদ্যালয় এবং হোসেন্দী উচ্চ বিদ্যালয় বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল, খেলাধুলা, পড়াশোনায় বহু বছর ধরে অগ্রগামী হলেও, আজো ছাত্র, শিক্ষক ও এলাকার মানুষের প্রত্যাশা ও দাবি থাকলেও প্রতিষ্ঠান দুটি শত বছর পূর্বে যে অবস্থায় ছিল এখনো সেই অবস্থাতেই রয়েছে। এ সমস্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ তো দূরের কথা, প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নের অবস্থা, নাজুক ও স্থবিরতা বড়ই দুঃখজনক। তদুপরি এ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এমন কিছু বেসরকারি স্কুল ও কলেজকে জাতীয়করণ করা হয়েছে তুলনামুলকভাবে সবকিছু উপযুগ মিলিয়ে এ সমস্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা তো দূরের কথা এর আশেপাশেও যাওয়ার কথা নয়।           
এমপিওভূক্ত স্কুল ও কলেজের শিক্ষকগণ চাকরির সিনিয়রিটি হিসেবে ১৬-২৯ হাজার টাকা সরকারি স্কেলে বেতন পাওয়ার পরও স্কুল কলেজ থেকে এর চেয়ে আরো ১০/১২ হাজার টাকা বেশী বেতন পেয়ে থাকে। তাছাড়া দুই ঈদ ও পুজার সময় বেতনের সমহারে মহার্ঘ্য ভাতা এবং অবসরে যাওয়ার পর যথাযথ স্কেলে পেনশন ভাতা ও এককালীন পেনশন পেয়ে থাকে। কিন্তু যে সমস্ত স্কুল ও কলেজ এমপিওভূক্তি হয়নি, তারা ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া বেতনের অর্থ পেয়ে কোনমতে কায়ক্লেশে চাকুরী করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এমপিওভূক্তহীন দেশের অধিকাংশ স্কুল কলেজের ব্যবস্থাপনার দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় “ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার রেজাল্ট মানসম্মত শিক্ষকমন্ডলী থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের বসার বেঞ্চ, শিক্ষকদের বসার চেয়ার, পড়ানোর টেবিল থেকে শুরু করে অনেক স্কুল কলেজের গৃহের বেড়া এবং খড়ের নড়বড়ে দৃশ্যমানও হয়ে থাকে। এ নিবন্ধিিট লেখার পূর্বে এমপিওভূক্তহীন একটি কলেজের শিক্ষক পরিচয়ে জনৈক শিক্ষকের নিকট থেকে ডাকযোগে একটি পত্র পেয়ে থাকি। উক্ত পত্রে জনৈক শিক্ষক লিখেছেন, তিনি বেশ কয়েক বছর এমপিওহীন একটি কলেজে শিক্ষকতা করছেন। তার আশা ছিল কলেজটি এমপিওভূক্তি হবে এবং উক্ত কলেজের শিক্ষকগণ জীবিকা অর্জনের আশার আলো দেখতে পাবে। কিন্তু এ আশার পিছে অন্যান্য শিক্ষকদের সাথে বছরের পর বছর প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষকতা করে আমলেও এমপিওভূক্তির আশার আলো দেখতে পারছে না। বয়স ও আনুষঙ্গিক কারণে এ মুহূর্তে তাদের অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগও পরাহত।
তদুপরি ছাত্রছাত্রীদের নিকট থেকে আদায়কৃত বেতন পরবর্তী মাসের ১৫/২০ তারিখের মধ্যে নিতে হয়। যা কোন সময় অর্ধেক, কোন সময় আরো কম। কিন্তু কখনও ফুল বা সম্পূর্ণ বেতন নেয়া সম্ভব হয়নি। এ অবস্থা চাকরির শুরু থেকে হর হামেশা লেগেই আছে। তাছাড়া কলেজের বেঞ্চ, টেবিল, চেয়ার ও পাঠ্যদান সামগ্রী এবং অনেক সময় কলেজের বেড়া নিজেদের পকেট থেকে দিয়েই করাতে হয়। পত্রে আরো বলা হয়েছে, ঈদ, পূজা আসলে উক্ত কলেজের শিক্ষক, শিক্ষিকা ও স্টাফের অন্যান্যরা বেতনের টাকা দিয়ে ছেলে মেয়ে ও অন্যান্যের জন্য কেনাকাটা সম্ভব হয়ে উঠেনি। যেন সবকিছু বিষাদের দিনাতিপাত। না পারি বলতে, না পারি সইতে। পত্রে আরো বলা হয়েছে তাদের যে অবস্থা এমপিওভুক্তহীন বেসরকারি স্কুলগুলোর অবস্থাও তেমনি।
এ ব্যাপারে তার মনের কথাগুলো নিবন্ধে লেখার কথা বার বার পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে যেন কর্তৃপক্ষ সুনিপুনভাবে এ সমস্ত এমপিওভূক্তহীন সাড়া দেশের স্কুল ও কলেজের যথাযথ খোঁজ খবর নিয়ে স্কুল, কলেজের পড়ার মান, ফলাফল ও যথাযোগ্য শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিচার করে যেন একটা ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। অনেক জায়গাতে এ ব্যাপারে স্বজনপ্রীতি এবং শিক্ষা বিভাগের একশ্রেণীর কর্মকর্তাদের উদাসীনতার কারণে এ সমস্যা সমাধান দীর্ঘসূত্রিতা হচ্ছে বলে পত্রে উল্লেখ করা হয়। আরো বলা হয় অনুন্নত কলেজ ও স্কুল এমপিওভূক্তি হলেও অজ্ঞাত কারণে বারবারই ভালো প্রতিষ্ঠানগুলো বাদ পড়ছে। যে ব্যথা বলার জায়গা নেই। যা বলেও, বলা হল না শেষ। তাছাড়া পত্রে আরো বিস্তারিত অনেক কিছু উল্লেখ করা হয়। যা সংক্ষিপ্ত এ কলেবরে ইচ্ছে থাকলেও তুলে ধরতে না পেরে পত্রবাহক জনৈক শিক্ষকের নিকট নিজের অপারগতা জানিয়ে অশ্রু চোখে বিদায় নিতে হল নিজেকে।
দেশের স্কুল কলেজ বেসরকারিকরণ থেকে জাতীয়করণ,এমপিওভূক্তহীন স্কুল কলেজের যে অবস্থা তা আজ আর কারো না জানার কথা নয়। এসব কিছু বিবেচনা করে এমপিওভুক্তহীন স্কুল, কলেজ, মাদরাসাগুলোর সার্বিক অভাব অভিযোগ আমলে নিয়ে বিশেষ করে এমপিওভূক্তি হওয়ায় আগ পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিবছর এককালীন সরকারি অনুদান এবং দুই ঈদ ও পুজার সময় সরকারি মহার্ঘ্য ভাতার ব্যাপারে সদয় দৃষ্টিপাত মানবতার দাবি রাখে।
ফুলবাড়িয়া বেসরকারি কলেজকে জাতীয় করণের দাবিতে যে কলেজ শিক্ষক নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেছে এমন যাতে আর কারো ভাগ্যে না ঘটে এবং এমপিওভুক্তহীন জনৈক কলেজ শিক্ষকের মত এমন দুঃখের পত্র যাতে আর কারো পাঠাতে না হয় ইহাই সদাশয় কর্তৃপক্ষের নিকট একজন নগন্য নিবন্ধক হিসেবে সবিনয়ে প্রত্যাশা।
স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের আগেও স্বাধীনতার পরে সবারই আশা ছিল দেশের শ্রমজীবী, পেশাজীবীসহ সকল স্তরের গণমানুষের মুখে হাঁসি ফুটবে, দেশ থেকে দারিদ্র্য, নিরপেক্ষতা, অনিয়ম, দুর্নীতি চিরতরে দুর হয়ে সুখী সমৃদ্ধশালী স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে উঠবে। অন্ন, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান ও বিনোদনের মৌলিক অধিকারগুলো সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। আজ স্বাধীনতার ৪৬ বছরের পরও জনৈক শিক্ষকের মতো অনেকের কন্ঠে যখন দুঃখ বেদনার আকুতি শুনতে হয়, তা যেমনি বিষাদের তেমনি দুঃখ বেদনার মহাকাব্য।
জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণানুযায়ী ২৮৫টি কলেজ ও ২৭১টি স্কুলের জাতীয়করণ প্রক্রিয়া চললেও তালিকাভূক্তি নিয়ে অনিয়মের বড় প্রমাণ হচ্ছে নীতিগত অনুমোদনের পরও ১৭টি কলেজের নাম বাদ দিয়ে তালিকার অন্য একই সংখ্যক কলেজের নাম ঢোকানো হয়েছে। স্কুলের তালিকার বেলাতেও এমন পরিবর্তন উড়িয়ে দেয়া যায়না। তাছাড়া এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে প্রয়োজনীয় সকল যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক স্কুল কলেজকে জাতীয়করণ করা হচ্ছেনা। বিপরীতে শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হলেও অনেক বেসরকারি স্কুল কলেজকে জাতীয়করণ তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এত সব অনিয়মের পরও ন্যায়সঙ্গত সমাধানই হোক বেসরকারি স্কুল কলেজের জাতীয়করণ ও এমপিওভূক্তির ব্যাপারে দুঃখ, কষ্ট,    আহাজারি লাঘবের কাক্সিক্ষত সমাধান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ