ঢাকা, শনিবার 18 November 2017, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২8, ২৮ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আবারো উত্তপ্ত হচ্ছে রাজপথ

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ে আন্দোলনের পথেই যেতে হচ্ছে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। একইসাথে এই দাবিতে অনঢ় থাকা অন্যান্য রাজনৈতিক দলও এই আন্দোলনে যোগ দেবে। এরই মধ্যে জোটের বাইরে থাকা অন্য দলগুলোর সাথে আন্দোলনের বিষয়ে আলোচনাও হয়েছে। গত ১২ নবেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়াদী উদ্যানের মহাসমাবেশে বিএনপি চেয়ারপার্সন ও জোটের শীর্ষ নেতা বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, সবাইকে নিয়েই তিনি কাজ করছেন। একইসাথে সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনেরও ইঙ্গিত দিয়েছেন।
জানা গেছে, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ ইস্যুতে ন্যূনতম ছাড় দিতে রাজি নয় ২০ দল। তারা বলছে, সরকার যদি তাদের একগুয়েমী পরিহার করে আলোচনার মাধ্যমে চলমান সংকটের সমাধান না করে তাহলে আন্দোলনেই তার সমাধান ঘটানো হবে। এজন্য সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছে জোট। তারই অংশ হিসেবে বুধবার জোটের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন বেগম জিয়া। সেখানে নির্বাচন ইস্যুই ছিল প্রধান আলোচনার বিষয়। জোটের শীর্ষ নেতারাও বলেছেন, সরকারকে আহ্বান জানানো সত্ত্বেও যদি নিরপেক্ষ সরকার ইস্যুতে সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ না ঘটে, তাহলে আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।
আন্দোলনের বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, এবার আওয়ামী আর একতরফা নির্বাচন করতে পারবে না। তাদেরকে সহায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন দিতে হবে। তিনি বলেন, তারা সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে। কিন্তু এই সংবিধানতো তারাই সকলের মতামতকে তোয়াক্কা না করে সংশোধন করেছে। সংবিধানতো জনগণের জন্যই। এটি সংশোধন করেই নির্বূাচনের পরিবেশ তৈরী করতে হবে। অন্যথায় বিরোধী জোট ঘরে বসে থাকবেনা। রাজপথের আন্দোলনেই এবারের সংকটের সমাধান করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার বিএনপিকে নিয়ে যেসব কথা বার্তা বলছে সেটি তারা ভয়ে বলছে। কারণ তারা জানে, নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে। তাই তারা যেনতেন ভাবে ক্ষমতায় থাকতে চায়। এবার দেশের জনগণ সেটি হতে দিবে না।
জানা গেছে, নতুন বছরের শুরু থেকেই ‘সক্রিয়’ আন্দোলনে মাঠে নামবে ২০ দলীয় জোট। তার আগে চলতি বছরের বাকি দেড় মাস দল গোছানো এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি, গুম-খুনসহ সরকারের নানা অনিয়ম তুলে ধরে জনমত গড়ে তোলার কাজ করবেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এই ইস্যুতে দল ও জোটের বাইরে থাকা অন্যান্য সংগঠন ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সাথে আলোচনা করবেন বেগম জিয়া। তারই অংশ হিসেবে আজ শনিবার দলের ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা পরিষদ ও যুগ্ম সম্পাদকদের নিয়ে বৈঠক করবেন তিনি। ফলে আপাতত সভা-সমাবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে দলটির কার্যক্রম। সূত্রের দাবি, এখনই সক্রিয় আন্দোলনে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই বিএনপির। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সরকার সমঝোতার পথে না আসলে নতুন বছরের শুরুতেই ধাপে ধাপে আন্দোলন গড়ে তোলার ছক কষছে দলটি।
জানা গেছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কাজ শুরু করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। তবে চলতি বছরের শেষের দিকে অথবা নতুন বছরের শুরুতে সিলেটে হযরাত শাহজালাল রহ. এর মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করবেন তিনি। এ বিষয়ে সিলেট সিটি মেয়র ও বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী দৈনিক সংগ্রামকে জানান, ম্যাডাম খালেদা জিয়া সিলেটে হযরত শাহজালালের মাজার জিয়ারতে আসবেন এটি দলের পক্ষ থেকে আমাকে জানানো হয়েছে। তবে কখন আসবেন সেটি জানানো হয়নি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনি কেবল মাজার জিয়ারতেই এখানে আসবেন। রাজনৈতিক কোন কর্মসূচি নেই বলে আমি জানি।
সূত্র মতে, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার আহ্বান অব্যাহত রাখতে চায় বিএনপি। তারই অংশ হিসেবে আগামী ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে আরেকটি ‘বড় সমাবেশ’ করতে চাইছেন দলীয় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। ইতোমধ্যে দলীয়ভাবে এই নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ওই সমাবেশের মাধ্যমে বিজয়ের মাসেই ‘বিজয়’ বার্তা দিতে চাইছেন বিএনপি নেত্রী। একইসাথে সরকারের প্রতি তিনি নিরপেক্ষ সরকারের দাবিও জানাবেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের এক নেতা বলেন, ম্যাডাম চিকিৎসা শেষে ফেরার পর তেমনভাবে সাংগঠনিক কাজ করতে পারেননি। তিনি সাংগঠনিক কাজে হাত দিয়েছেন। অল্প সময়ের মধ্যেই এসব কাজ শেষ করবেন। সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করেই আগামী নির্বাচনের রসদ জোগাড় করবেন ম্যাডাম। তিনি বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির সমাবেশ দেখে সরকারের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তাই তারা (ক্ষমতাসীনরা) এত সহজে আমাদের দাবি মেনে নিবে না। দাবি আদায়ে এখন আমাদের সামনে আন্দোলন ছাড়া কোনো পথই খোলা নেই। তবে এখনই আমরা সক্রিয় আন্দোলনে যাচ্ছি না।
দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বলেন, আমরা আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্ততি নিচ্ছি। নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা বলছি। দাবি আদায়ে নেতাকর্মীরাও সক্রিয় হচ্ছেন। সোহরাওয়ার্দীতে একটি সফল সমাবেশ করেছি। এর মাধ্যমে নেতাকর্মীরা অনেক চাঙ্গা। সরকার নিরপেক্ষ সরকারের দাবি না মানলে আন্দোলনে যেতেই হবে।
আন্দোলনের বিষয়ে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহসভাপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ (বীর বিক্রম) বলেন, বিএনপি ভোটের জন্য প্রস্তুত, একইসাথে আন্দোলনের জন্যও প্রস্তুত। তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে চায়, জনগণের সেবা করার দায়িত্ব পেতে চায়। কিন্তু এই সরকারের আমলে একটি নির্বাচনও সুষ্ঠুভাবে হয়নি। খোদ ঢাকা শহরের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে রাজধানীবাসী ভোট দিতে পারেননি। বিএনপির প্রার্থীর কোনো এজেন্ট ছিল না, বেগম জিয়ার গাড়িবহরে তিনবার আক্রমণ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে বিশ্বাস করা যায় না। তবু আমরা আশা করব আওয়ামী লীগ সরকারের চৈতন্যোদয় হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের একগুয়েমী আচরণের কারণে নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে বেশ কিছুদিন শান্ত থাকা রাজপথ আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। তারা বলছেন, বিরোধী জোটসহ দেশে বিদেশে সবাই নির্বাচন ইস্যুতে একটি বাস্তব সম্মত উপায় বের করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের অনিহা, বারবার সংলাপের আহ্বান প্রত্যাখ্যান, সমঝোতা না করাসহ নির্বাচন কমিশনের সরকার প্রীতির কারণে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সামনে আন্দোলন অনিবার্য হয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের আন্দোলনে তারা আগের ভুলগুলো করবেন না। অতীতের অভিজ্ঞতাগুলো তাদের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনকে আরো বেগবান করে তুলবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতাসীন আ’লীগ যে চলমান রাজনৈতিক সংকটের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান চায়না সেটি দলটির সিনিয়র নেতাদের বক্তব্যেই ফুটে উঠেছে। একইসাথে তারা স্বরণ করে দিয়ে বলেন, দেশের প্রায় সব ক’টি রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এবার সবার কাছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। সব রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনকালীন সহায়ক দেশবাসী দেখতে চায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার যদি সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে সরকার ব্যর্থ হয় তাহলে আগামী নির্বাচন ঘিরে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকট আরো বাড়বে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ