ঢাকা, রোববার 19 November 2017, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২8, ২৯ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হারানো দিনের ভূত

শফিকুল ইসলাম শফিক : বহুকাল আগের কথা। কোন এক গ্রামে মস্ত বড় কয়েকটি জঙ্গল ছিল। এমনকি আশেপাশের গ্রামগুলোতেও জঙ্গল ছিল। সেই গ্রামের একটি ছেলে মিঠু। বয়স ১০ বছর। তার দাদুর কাছে যখন তখন ভূতের গল্প শুনত। মিঠু গ্রাম থেকে দূরবর্তী একটি প্রাইমারি স্কুলে পড়ে। পাড়ার সকল ছেলেমেয়ে দলবেঁধে স্কুলে যেত। কখনও সে ভূতের ভয় পায় না। আর মা-বাবা তো ওকে একা যেতে দেয় না। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সরু রাস্তা। রাস্তা দিয়ে স্কুলে হেঁটে আসতে অনেক সময় লাগত। রাস্তা ছিল বেশ আঁকাবাঁকা। তাই রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসতো কিছু পথ। এরপর জঙ্গলের পাশ দিয়ে সোজা জমির উঁচু আইল দিয়ে স্কুলে পৌঁছত।
মিঠু ভূতের অনেক গল্প শুনেছে এবং মুখস্থ করেছে। প্রায় প্রায় সহপাঠীদের কাছে তা বলে। অনেক মজা করে। একদিন মিঠু তার দাদুকে বলল, ‘‘আচ্ছা দাদা, আমি শুনেছি সবাই ভূতের গল্প শুনে দারুণ ভয় পায়। আমি কেন ভয় পাই না? আজ তোমার কাছে এমনি গল্প শুনতে চাই।’’ প্রথমে দাদু না-না জবাব দিলেন। মিঠু কাঁদতে লাগল। নাতির অনুরোধ আর ধরে রাখতে পারলেন না। এরপর দাদু ভয়ঙ্কর কিছু ভূতের গল্প বলতে লাগলেন। দাদু বললেন, তুমি নিশ্চয় আজ অনেক ভয় পাবে। রাতে একাকী ঘুমাতে পারবে না। আর কোথাও একা যেতে পারবে না। মিঠু বলল, ‘‘দাদু বাহানা চলবে না। তুমি যদি জানো, তাহলে বলতে এত আপত্তি কিসের?’’ দাদু আদর করে মিঠুর কপালে চুমু দিলেন। অনেক সোহাগ করলেন। দাদু ভূতের কিছু গল্প বলতে শুরু করলেন।
ঘটনা: এক
তখন গরুর গাড়ি বা মহিষের গাড়ি ছাড়া যানবাহনের বিকল্প কোন গাড়ি ছিল না। এক চাল ব্যবসায়ী হাটে যেত। গরুর গাড়ি নিয়ে হাটে আসা-যাওয়া করতো। একদিন হাট শেষে অনেক রাতে একা বাড়ি ফিরছিল। পথের মধ্যে ভীষণ ভয়ের সম্মুখীন হলো। রাস্তায় মস্ত বড় অবিকল একটি মানুষের ছবি। বেশ বড় দুটি পা। দাঁড়িয়ে আছে। সারা রাস্তা আলোকিত। এরপর সে উচ্চ স্বরে চিৎকার করতে লাগল। সামনে আর এগুতে পারল না। পথ চলা বন্ধ। আশেপাশের কিছু লোকজন ছুটে এলো। কিন্তু এসে তারা কাওকেই দেখতে পেলো না। অবশেষে নির্ভয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিল।
ঘটনা: দুই
একদিন অনেক রাতে এক লোক একা বাড়ি ফিরছিল। সেও অত্যধিক সাহসী। হঠাৎ এক জঙ্গলের সামনে আসতে না আসতেই থমকে গেলো। কে যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে কখনও হাঁটছে, আবার কখনও থামছে। এরপর বিকট শব্দে চেঁচামেচি করতে লাগলো। গ্রামের কিছু লোকজন সেখানে গেল। জিজ্ঞাসা করল, কী হয়েছে? লোকটি সব কিছু খুলে বললো। তার সারা শরীর ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। গ্রামবাসী এসে সেখানে কাওকে দেখতে পেল না। অবশেষে তাকে বাড়িতে নির্বিঘেœ পৌঁছে দিল। অতঃপর তারা ফিরে এসে বাড়িতে ঘুমিয়ে পড়ল।
ঘটনা: তিন
আমাদের বাড়ির রাস্তার পশ্চিম পাশে অনেক বড় একটি জঙ্গল ছিল। জঙ্গলের ধারে একটি ছোট্ট পুকুর। সেখানে মাঝ রাতে নানান রকম শব্দ শোনা যেত। মনে হয় কে যেন ঠিক কাপড় কাচছে। অথবা পুকুরে গোসল করছে। একদিন এক লোক ভর দুপুরে সেই পুকুরের নিকটে ঘোড়া বেঁধে রেখেছিল। ঘোড়া ঘাস খাচ্ছিল। বিকেল বেলা সেখানে গিয়ে ঘোড়াটা খুঁজে পেলো না। এদিক সেদিক কোত্থাও কারও চোখে পড়ল না। অবশেষে দেখলো পুকুরের পানিতে ঘোড়াটা মরে ভেসে আছে। লোকটি ঘোড়ার জন্য বেশ আফসোস করতে লাগলো। এখন আর সেই জঙ্গল নেই। মস্ত বড় পুকুর কাটা হয়েছে। এরপর মিঠু খুব ভয় পেয়ে গেল। দাদুকে ভূতের গল্প করতে নিষেধ করলেন। এমন গল্প আর কোনদিন শুনতেও চায়নি।
অতঃপর মিঠু সেদিন থেকে বেশ কয়েকদিন স্কুলে গেল না। মিঠুর স্কুলে না যাওয়ার কারণটা অবশেষে তার মা-বাবা জানতে পারলেন। বললেন, বাস্তবে ভূত বলে জগতে কিছুই নেই। আগের মানুষের কাছে আমরা ভূতের নানান গল্প শুনে থাকি। তা সত্য নয়। আর আগের মানুষ অনেক ভীতু ছিল।
এখনকার মানুষ অত্যধিক সাহসী। সহজে কোন কিছুতে ভয় পায় না। এসব কথা শুনে মিঠু কিছুদিন পরে স্বাভাবিক হলো। অতঃপর স্কুলে যাওয়া শুরু করল। তবে এখন কারও সাথে আর জমির আইল দিয়েও স্কুলে যায় না। স্কুলে যায় আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে। মাঝে মাঝে তবুও ভয় লাগে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ