ঢাকা, রোববার 19 November 2017, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২8, ২৯ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ডুমুরিয়ার প্রবাহমান ভদ্রা আজ অস্তিত্বহীন

খুলনা অফিস : খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার এক সময়কার প্রবাহমান ভদ্রা আজ অস্তিত্বহীন। অবৈধ দখলদাররা নদীটির ৩০ কিলোমিটার খুবলে খেয়ে ফেলেছে। হারিয়ে যাওয়া নদীর বুকে গড়ে তোলা হয়েছে ইমারত। পরিণত হয়েছে গ্রাম-হাট-বাজারে। দেড় যুগ ধরে চলা দখলদারিত্বে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি আঁতাতের রাজনীতি কায়েম করেছে। নামে-বেনামে দখলের পর হাত বদলের মাধ্যমে পকেটে এসেছে কাড়ি কাড়ি টাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ড এ নদীর ৫৭৩ অবৈধ দখলদারের তালিকা তৈরি করেছে। এদিকে, সরকার ভরাট ও দখলে যাওয়া ভদ্রা এবং সালতা এ দু’টি নদী খননের উদ্যোগে মাথায় বাজ পড়েছে রাজনৈতিক সুবিধাভোগিদের। এখন তারা নানা হাত বদলের পর সর্বশেষ দখলে থাকাদের নিয়ে শুরু করেছে ‘খনন ঠেকাও’ আন্দোলন। দাবি করা হচ্ছে, ভূমিহীনদের পুনর্বাসন ও পরিকল্পিত নদী খননেরও। উপজেলা প্রশাসন দখলদার উচ্ছেদে মাইকিং করলেও সরছে না অবৈধভাবে নদীর বুক আঁকড়ে থাকাদের।
স্থানীয় সূত্র জানান, ভদ্রা ও সালতা নদী দু’টি আশির দশক থেকে পলি পড়ে ভরাট হতে থাকে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন জাতীয় পার্টির মন্ত্রী এইচ, এম, এ গফফারকে (বীর উত্তম) সরকার মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ভদ্রা নদীর চর অববাহিকা থেকে ১ একর জমি দান করেন। সেই সুবাদে তার ভাতিজা তৎকালীন জাপা নেতা (বর্তমানে আ’লীগ সদস্য) এইচ, এম, রউফ এবং তার ভাই যুবলীগ নেতা মাসুদ রানা নান্টুও বেশ কিছু খাস জমি অবৈধ দখল করেন। এছাড়া সাহস গ্রামের ভূমিদস্যু খ্যাত আব্দুর রহমানসহ কয়েকজন ডুমুরিয়া মৌজার কিছু জমি স্থায়ী বন্দোবস্ত নেন। পরবর্তীতে তারা ওই জমি প্লট আকারে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করেন। এই সূত্র মতে, ২০০১ সালে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর ডুমুরিয়া সদরের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা মোল্যা মোশাররফ হোসেন মফিজ, তার নিকট আত্মীয়রা এবং শোভনা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আ’লীগ নেতা সরদার আব্দুল গনি, সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা শেখ মতিয়ার রহমান বাচ্চু, বর্তমান ইউপি সদস্য ও বিএনপি নেতা শেখ আব্দুল কাদের, সাহস ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আ’লীগ নেতা শেখ আব্দুল কুদ্দুস, সাবেক ইউপি সদস্য ও বিএনপি নেতা মোজাফফর সরদারসহ তৎকালীন কতিপয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা একাট্টা হয়ে খাস জমি মোটা অঙ্কের আর্থিক চুক্তিতে বন্দোবস্তের নামে দখল পাইয়ে দেয়ার কথা বলে ভূমিহীনদের স্থায়ী বসতি স্থাপনের সুযোগ করে দেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবো’র সূত্র জানান, উল্লিখিত ব্যক্তিরাসহ ভদ্রা নদীর সীমানার মধ্যে ডুমুরিয়া থেকে দিঘলিয়া পর্যন্ত ৫৭৩ জন দখলদারের বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। অবৈধ দখলদারের তালিকায় আরও দেখা গেছে, সাহস মৌজায় মোফাজ্জেল ইসলাম শেখের (আ’লীগ নেতা বুলু’র পার্টনার) জে,বি-২, সাহস আশ্রায়ন প্রকল্পে ৯০টি টিন সেড ঘর, ভান্ডারপাড়া আবাসনে ২৬০টি ঘর, ভদ্রাদিয়া মৌজায় জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান গাজী আব্দুল হাদীর সেতু ব্রিজ, খান মো. মাহাবুর রহমানের সেফা এবি-২, জি,এম হাফিজুর রহমানের এবি-এ, উদয় চক্রবর্তীর ঘর, ডুমুরিয়া মৌজায় রউফ মীর, চিংড়া মৌজায় কাদের শেখ’র পাকাঘর, মো. আব্দুল হাই’র কাঁচা ঘর এবং মনিরুল মোল্লাসহ ৫৭৩ জন দখলদার রয়েছে। এছাড়া নদীর উন্মুক্ত জলাশয়ের কিছু অংশ মোল্যা পরিবারের সদস্য মনিরুল মোল্লা ও ফরিদ মোল্লাসহ অনেকেই অবৈধভাবে ভোগ দখল করছে। এমনকি ডুমুরিয়ার আইতলায় একটি মসজিদের নামে জমি দখল নিয়ে দখলকৃত জমি অন্য ব্যক্তির কাছে টাকার বিনিময়ে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অপরদিকে, ডুমুরিয়া সদর ইউপি চেয়ারম্যান ও আ’লীগ সদস্য গাজী হুমায়ুন কবির বুলু ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা সালতা নদীর ডুমুরিয়া বাজার অংশের বিপুল জায়গা দখল করে মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। যার কারণে অবৈধভাবে জমি দখলদার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নানা অজুহাতে নদী খনন কাজ বন্ধ করতে বৈধ-অবৈধ দখলদারদের নিয়ে বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ইউপি চেয়ারম্যান গাজী হুমায়ুন কবির বুলু নদী দখলের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, তার স্থাপনার জমি রেকর্ডীয় মালিকদের কাছ থেকে কেনা, এক ইঞ্চি জমিও খাস না। তবে অনেকেই ভদ্রা ও সালতা নদী দখল করে স্থাপনা তৈরি এবং অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বরাদ্দ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে বলেও স্বীকার করেন তিনি। শোভনা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আ’লীগ নেতা সরদার আব্দুল গনি এবং সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা শেখ মতিয়ার রহমান বাচ্চু বলেন, তারা নদী খননের বিরুদ্ধে নন। তবে ভূমিহীনদের পুনর্বাসন এবং পরিকল্পিতভাবে নদী খনন করতে হবে। যাতে করে উচ্ছেদ হওয়া কমসংখ্যক মানুষ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পান। ডুমুরিয়া উপজেলা ভূমি অফিস সূত্র জানান, ১৯৮৬ সালে নদী ভরাটিয়া জমির কিছু অংশ দীর্ঘ মেয়াদী (৯৯ বছরের জন্য) বন্দোবস্ত দেয়া হয়। পরবর্তীতে সরকারি সিদ্ধান্তে এক কিলোমিটারের ভেতর বন্দোবস্ত না দেয়ার সিদ্ধান্ত হলেও ২০১৩-২০১৪ সালে উপজেলা ভূমি অফিসের কতিপয় কর্মকর্তা ও কর্মচারীর যোগসাজসে বেশ কিছু জমি অবৈধ পন্থায় বন্দোবস্ত দলিল করে দেয়া হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র জানান, ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে নদী দুটি খননের জন্য প্রকল্প জমা দেয়া হয়। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করে এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে সরকার সেপ্টেম্বর মাসে একনেকের বৈঠকে ৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে খনন কাজ শুরু হয়ে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে শেষ হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২৯ পোল্ডারের কর্মকর্তা মো. রাশেদুল ইসলাম ও হাসনাতুজ্জামান বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে সব ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ডুমুরিয়ার ভদ্রানদীর ভাঙ্গনে মসজিদের প্রক্ষালনসহ চলাচলের রাস্তা নদী গর্ভে : ডুমুরিয়ার ভদ্রানদীর ভাঙ্গনে কাঁঠালতলা বাজার নদীর গর্ভে বিলীন হতে চলেছে। এছাড়া বাজার জামে মসজিদের ওজু খানা ও প্রক্ষালন নদী গর্ভে নিমজ্জিত হয়ে গেছে। ফলে মুসল্লীসহ এলাকার সাধারণ মানুষ রয়েছে চরম শঙ্কার মধ্যে। এলাকাবাসী ও সরেজমিনে গিয়ে জানাগেছে, প্রবাহমান শিবশা’র শাখা নদী বুড়িভদ্রা ২৪ নং পোল্ডারের অধীন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কাঁঠালতলা বাজার হতে গোবিন্দকাটি পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার গ্রামরক্ষা বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ফলে গত বৃষ্টি মওসুম এবং সম্প্রতি ভদ্রার জোয়ারের পানির প্রবল তোড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের কয়েকটি স্থান ভেঙে গিয়ে সমগ্র এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এতে কাঁচাবাজারের অন্তত ১০/১৫টি দোকান, বাজার জামে মসজিদের ওজুখানা, টয়লেট ও গণশৌচাগার নদীগর্ভে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। ডুমুরিয়া উপজেলার কাঁঠালতলা বাজারের উত্তর পাশদিয়ে নদীটি প্রবাহিত। এর দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে গেছে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়ক। ফলে মহাসড়কটি রয়েছে চরম ঝুঁকিতে। মহাসড়কের অভ্যন্তরে কাঁঠালতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, মন্দিরসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ঐহিত্যবাহী কাঁঠালতলা বাজার এলাকার সুখ্যাতি কাঁচামালের জন্য বিখ্যাত হাট ছিল। কিন্তু সম্প্রতি ভদ্রার ভাঙ্গনের কবলে বাজারের ৬০ শতাংশ জায়গা নদীগর্ভে চলে গিয়ে বাজারটির অস্তিত্ব বিলীন হতে চলেছে। একাধিকবার ভাঙ্গনের কবলে পড়ে জোয়ারের পানিতে তলিয়ে এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। ভাঙ্গন রোধে বা স্থায়ী সংস্কার ও প্রতিকারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। কাঁঠালতলা বাজার কমিটির সভাপতি শেখ আব্দুল আজিজ, সাধারণ সম্পাদক শেখ হাসানুর রহমানসহ ব্যবসায়ীরা জানান, ভদ্রা নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে কাঁঠালতলা বাজারের অস্তিত্ব নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে ডুমুরিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান খান আলী মুনসুর জানান, কাঁঠালতলা এলাকায় এবার একাধিকবার নদীভাঙ্গন হয়েছে। ইতিপূর্বে ভাঙ্গন এলাকা পরিদর্শন করেছি। স্থায়ীভাবে বাঁধমেরামত সহ ভাঙ্গন রোধের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি। আশা করছি অচিরেই বাঁধ মেরামতের ব্যবস্থা করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ