ঢাকা, বুধবার 22 November 2017, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২8, ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আমার দেখা ভূ-স্বর্গ

এডভোকেট সৈয়দ এহতেশামুল হক : মোগল সম্রাটের “ভূ-স্বর্গ” গান্ধিজীর “আলোর কিরণ” মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর “শাহরগ” জন্মু কাশ্মির দেখার ইচ্ছা ছিল বাল্যকাল থেকে, তার ও অনেক পরে আজ থেকে দীর্ঘ ২৪ বছর পূর্বে ১৯৯২ খ্রীস্টাব্দের এপ্রিল মাস ডাক্তার বুলবুল সরওয়ার লিখিত “ঝিলাম নদীর দেশ” বইটি পাঠ করলাম আবার পাঠ করলাম, পুনঃপাঠ করলাম। মনে হতে লাগল পৃথিবীর ভূ-স্বর্গ কিছুদিন পরই আমার এডভোকেটশীপ লিখিত পরীক্ষা, প্রস্তুতি নিতে হবে তাই মনে মনে তীব্র আকাক্সক্ষা অনুভব করলাম এবং আল্লাহ তায়ালার দরবারে বিনীতভাবে এ আরজি পেশ করলাম যে, জীবনে একবার হলেও যেন জম্মু-কাশ্মির এর বহু ইতিহাস ঐতিহ্য বিজড়িত পৃথিবীর ভূ-স্বর্গ জম্মু-কাশ্মির এর গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর দেখার সুযোগ করে দেন আমীন। এরপর ৬ বার ভারতবর্ষ সফরের সুযোগ হয়েছে। কিন্তু জম্মু-কাশ্মির সফরের আশা পূরণ হলো না। ৭ম বারের মত সফরে ভাই খোকন বড়ুয়ার তত্ত্বাবধান ও সহযোগীতায় জম্মু-কাশ্মির তথা শ্রীনগর সফর এর আশা পূরণ হতে চললো। ২রা মে’ ২০১৫ ইংরেজী রোজ শনিবার গরীব উল্লাহ শাহ মাজার সংলগ্ন সৌদিয়া বাস কাউন্টার থেকে বিকেল ৩.৩০ মি. এর সময় বাংলাদেশের বেনাপোল সীমান্ত সফর আরম্ভ করি, পৌঁছি ০৩/০৫/২০১৫ ইংরেজি সকাল ৭টায়। সেখান থেকে বাংলাদেশের বেনাপোল এবং ভারতের পেট্রোপোল সীমান্তে কাস্টম ও ভিসা কার্যক্রম সমাপ্তির পর বেলা ১টার দিকে পেট্রোপোল থেকে Volvo যোগে কলিকাতার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। পৌঁছি ৩.৩০ মি. সেখানে একদিন অবস্থানে পর্যন্ত ঐ Volvo যোগে বাবুর্চী, তত্ত্বাবধায়ক খোকন বড়ুয়াসহ আমরা ৫৮ জনের একঝাঁক সফরপ্রেমি জন্মু-কাশ্মির (শ্রীনগর) সহ ভারতের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিজড়িত স্থানগুলো সফরের উদ্দেশ্যে ০৪/০৫/২০১৫ ইংরেজি সন্ধ্যা ৭.৩৫ মি. সফর আরম্ভ করি, ০৫/০৫/২০১৫ ইংরেজি বিকাল ৪.৩০ মি. রাজগীর হইতে সফর শুরু করে Up Last সীমান্তে পৌঁছি ০৭/০৫/২০১৫ ইংরেজি দিবাগত রাত ২.৩৫ মি. Up Last সীমান্তে পৌঁছি ০৮/০৫/২০১৫ ইংরেজি রাত ৯.৪৬ মি. এবং হরিয়ানা সীমান্তে পৌঁছি ০৯/০৫/২০১৫ ইংরেজি রাত ১০.১১ মি.। সেখানে অপূর্ব স্থাপত্য নিদর্শন ওয়ারেশী শাহ’র মাজার, দেয়া শরীফ, কালিয়া, সাবরি, মাহমুদ শাহ ও নাগ বাবার মাজার দর্শন/জেয়ারত করি। অতঃপর পাঞ্জাবের অমৃতসর স্বর্ণ মন্দির থেকে সুজনপুর, মধুপুর হয়ে জে. কে. (জম্মু কাশ্মীর) এর উদ্দেশ্যে সফর আরম্ভ করি। জম্মু পৌঁছি ১০/০৫/২০১৫ ইংরেজি সন্ধ্যা অনুমান ৭.৩০ মি. সেখান থেকে কাশ্মীর (শ্রীনগর) এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলে এ প্রতিকুল আবহাওয়া, রাস্তার দুরবস্থা ইত্যাদি কারণে উদমপুর পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি মিলে তাই আমরা উদমপুর না গিয়ে ঐ দিন জম্মুতে একটি আশ্রমে অবস্থান করি। অতঃপর জম্মুস্থ একটি দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য সম্বলিত জামে মসজিদে আসর ও মাগরিবের নামাজ আদায় করি। সেখানে বিকাল বেলা রাস্তার/ফুটপাতে সবজির সোপ, নুডলস, খুব আনন্দ করে (খুরখুরে) খাই। বেশ মজা এবং নতুন আইটেম। ১১/০৫/২০১৫ ইংরেজি তারিখ রাত্রে কাশ্মির (শ্রী নগর) রওয়ানা হওয়ার অনুমতি পেলাম। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের শুকরিয়া আদায় করলাম এবং সকালের গাড়িতে যার যার আসন গ্রহণ করলাম। মহান আল্লাহ তায়ালার সাহায্য ও রহমত কামনা করে সহিসালামতে যাতে কাশ্মির পৌঁছতে পারি সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করে কাশ্মিরের (শ্রীনগর) উদ্দেশ্যে রওয়ানা শুরু করলাম। জম্মু থেকে ২৪৮ কি.মি. দূরত্বে জম্মু কাশ্মিরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর, ২০ কি.মি. পর থেকে শুরু হয়। চোখের সামনে বিশাল পাহাড়। আমাদের বাস এ্যাঙ্গেল হয়ে উঠে যাচ্ছে সেই পাহাড়ে, এই পাহাড়ের সাথে আমাদের বান্দরবান, রাঙ্গামাটি কিংবা জাফলং পাহাড়ের তেমন সাদৃশ্য নাই। এ্যাডভেঞ্জার নেশায় আমার ঘুম আসছিল না। ৬০ জন যাত্রীর মধ্যে আমরা ৪/৫ জন যাত্রী সম্ভবত জেগে ছিলাম। আমি অপলক নেত্রে দেখতে লাগলাম প্রকৃতির সীমাহীন অলৌকিক সম্ভার। পাহাড়ের গায়ে জমে উঠেছে ধোঁয়া (বাষ্প) কিছু কিছু বাড়িঘর চোখে পড়ছে। পার্শ্বে বয়ে যাচ্ছে নদী তার দু’কুলে নুড়ি পাথরের বিশাল সমাবেশ। ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে জম্মু শহর। আমাদের বাস ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাচ্ছে। ভূপৃষ্ঠ থেকে অনেক উপরে। যা ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯০০০ ফুট উপরে উঠে যাচ্ছে। প্রতিটি বাঁকে গাড়ি ঘুরবার সময় অ্যাডভেঞ্জার/ ভয় দুটোই অনুভূত হচ্ছিল। কারণ গতকালই এখানে এক্সিডেন্ট এ ২৩ জনের সলিল সমাধি হয়েছে। তথাপি সীমাহীন সৌন্দর্য্য ধারণ করে আছে এই পর্বতমালা। কুয়াশার মধ্যে চোখে পড়ল অসংখ্য ঝর্ণা ধারা, বেশ কয়েকবার দেখা গেল জলপ্রপাত এমনি এক জলপ্রপাতকে পাশে নিয়ে আমরা যোহরের নামাজ এবং মধ্যহ্নভোজের বিরতি করলাম। আমাদের সাথে থাকা বাবুর্চি ঘণ্টা দু’য়েকের মধ্যে রন্ধনকর্ম সম্পাদন করবেন। রাস্তার পাশেই পাহাড়ের উপরে ছোট্ট মসজিদ। সেখানে টয়লেটের ব্যবস্থা আছে। আমরা যার যার মত টয়লেট সেরে কয়েকজন মসজিদে যোহরের নামাজ আদায় করতে ঢুকলাম। ইমাম সাহেব একটি ভেড়ার চামড়ার জায়নামাজে দাঁড়িয়ে ইমামতি করলেন। যেহেতু ঈমান সাহেব মুসাফির ছিলেন না। তাই আমাদের দু’রাকাত কসরের পরিবর্তে ঈমাম সাহেবের সাথে চার রাকাত যোহরের ফরজ নামাজ আদায় করতে হয়। নামাজের পর আনমনে পৃথিবীর ভূস্বর্গ (The Paradise of the Earth) কাশ্মিরের সৌন্দর্য্য দেখতে থাকি। পাহাড়ের চূড়ায় রাস্তার পার্শ্বে সারি সারি গাছ, বিভিন্ন রঙের সাজানো ফুলের সারি মনে মনে বলি কোন নিখুঁত শিল্পীর তুলিকে আঁকা এ দৃশ্য। এমনি সময়ের ডাক পড়ে বাবুর্চির রন্ধন সম্পন্ন হয়েছে এবার মধ্যহ্নভোজের পালা। মধ্যাহ্নভোজ শেষ করে প্রায় ৪টার দিকে সকলে গাড়িতে উঠে যার যার আসন গ্রহণ করলাম। আবারও সেই সফর শুরু। আঁকা-বাঁকা পাহাড়ী পথ অতিক্রম করে উপরের দিকে উঠতে আরম্ভ করলাম। কিছুক্ষণ পর আবার নিচের দিকে নামতে আরম্ভ করলাম। সেখানে সম্রাট জাহাঙ্গীরের লাগানো বিশাল চিনারবৃক্ষ তরে তরে সাজানো বিভিন্ন বাহারী ফুলের সারি। যতই কাশ্মিরের অর্থাৎ শ্রীনগরের নিকটবর্তী হতে চললাম ততই ঠা-া অনুভব করতে লাগলাম। শীতে মোটামুটি শরীর কম্পিত হতে লাগল। সফরসঙ্গী প্রায় সকলেই শীতবস্ত্র পরিধান করেছেন দেখা যায় অর্থাৎ সকলে শীত বস্ত্র সাথে করে নিয়ে এসেছেন দেখে শীত আরো বেশি অনুভব হতে লাগল। সফরসঙ্গীগণের দিকে অসহায়ের মত তাকাতে আমার পিছনের সিটে বসা সফরসঙ্গী অবসর প্রাপ্ত অফিসার জনাব আবু তাহের সাহেব বললেন আমার একটি অতিরিক্ত সোয়েটার আছে আপনি চাইলেই... আমি সাথে সাথে রাজী হয়ে গেলাম এবং ঐ সোয়েটার পড়েই কাশ্মির সফর করলাম। রাত যত গভীর হতে লাগল গুটি গুটি বৃষ্টি আর শীতের মাত্রাও বাড়তে শুরু করল। (অসমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ