ঢাকা, বুধবার 22 November 2017, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২8, ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অন্যদেখা : জাতীয় চিড়িয়াখানা

ডা. জিয়াউর রহমান সেলিম : ॥ পূর্ব প্রকাশিতের পর ॥ কি করেন? অমুক কলেজে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ি। আর কথা বলার রুচি হয়না আমার। এদেশে-এমাটির কি দোষ? অনেকে প্রয়াই বলি-দেশটার কিস্যু হবে না। বলুন-কিভাবে হবে? আমি বিশ্বাস করি বন্যপ্রাণী বা অন্যকোনো প্রাণীদের যারা ভালোবাসেনা, তারা মানুষ নামক প্রাণীদেরকেও ভালোবাসতে পারে না, এই পৃথিবীতে প্রকৃত বন্য এবং অসহায় হচ্ছে তারা। পৃথিবী কোথায় এগিয়ে যাচ্ছেÑ আর আমরা আছি বন্যপ্রাণীদের দিকে ঢিল ছুঁড়তে-তাদেরকে উৎপাত করতে ব্যস্ত। আন্তর্জাতিক রীতি মেনে দু’হাজার সাল থেকে জাতীয় চিড়িয়াখানা, দর্শকদের জন্য সপ্তাহে একদিন বন্ধ থাকে। এইদিন বন্য প্রাণীদের জন্য বয়ে আনে-মুঠো মুঠো আনন্দ-সুখ আর হাসি। সাংবাদিক কার্ডধারী ও কাঁধে ক্যামেরা ঝুলানো কিছু মানব সন্তানের কল্যাণহীন উৎপাত ও খুঁচিয়ে ঘা করার কিচু স্টাইলের কথাও এ লেখায় বলা দরকার। একদিন বাঁদরের খাঁচার সামনে এক সাংবাদিক আমাকে দেখেই কিছু কথা বলেন। ভাই আপনারা পচা কলা আর কতদিন দেবেন? খাঁচার ভেতরে বেশ কিছু কলার খোসা তখন গাঢ় নীল-কালো বর্ণ ধারণ করেছে। সকাল দশটার দিকে দেয়া কলাগুলোর খোসা বিকেল তিনটা চারটার দিকে স্বাভাবিক বর্ণ ধারণ করেছে। কিন্তু তার কাছে তা হয়ে গেছে পচা কলা। মেজাজ ঠিক রাখা শক্ত। তাকে বলি-কলার খোসা নিয়ে গবেষণা আপনার কতো দিনের? তিনি বিব্রত হন, কিছুটা আমতা আমতা করেন। আবার বলি আপনি কি জানেন কলার খোসা পটাশে পরিপূর্ণ এবং পটাশের রং কি? তিনি বললেন, না। তাকে আমি আমার চেম্বারের পাশে ল্যবরেটরিতে নিয়ে গেলাম। তারপর তিনি পটাশের রং চিনলেন এবং তার জিহবায় আলতো কামড় দিলেন। এরপর “বুঝতে পারিনি-ভুল হয়ে গেছে” জাতীয় বিড়বিড় শব্দ শুনি। “ছবিতে একটি আহত হরিণকে দেখা যাচ্ছে। ইনসেটে হরিণটির দগদগে ঘাযুক্ত শিং”। ব্যাস্, আর যায় কোথায়। প্রথম পাতায় রঙিন ছবি। শুরু হলো টেলিফোন আসা। আমি একবার হরিণটিকে দেখেও এলাম। ঘটনা হচ্ছে হরিণ বা এন্টিলোপ জাতীয় প্রাণীর শিং বলে কিছু নেই। শিং আকৃতির জিনিসটিকে বলে এন্টেলার। প্রতিবছর এই এন্টেলারের আকৃতি বদল হয়। শুধু পুরুষ হরিণেরই এন্টেলার থাকে এবং মনোলোভা সেই বস্তুটির গায়ে একজাতীয় সংযোজন আছে যাকে বলা হয় ভেলভেট। এই ভেলভেটটি প্রাকৃতিক বা শারিরীক কারণেই যারা ঘষে এবং অমসৃণ কোন কিচুর সাথে ঘষলে রক্ত বের হওয়াই স্বাভাবিক। এই যখম এমনিতেই সেরে যায়। ঐ হরিণটি খাঁচার খুব কাছে চলে আসায় এবং বিজ্ঞানের কল্যাণে প্রাপ্ত জুম লেন্সের ততোধিক কল্যাণে ছবি উঠে যায় এবং হৈচৈ বাঁধানোটাও সার্থক হয়! এখন দেশের লাখো লাখো পাঠক-জনতাকে কে জানাবে বা কে বোঝাবে? অথচ বিষয়টি সম্পর্কে সম্যকজ্ঞান আছে এমন কারো সাথে দুটো কথা বললেই এমন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা কখনোই ঘটেনা। ঐ সাংবাদিক পরে টেলিফোনে ক্ষমা চেয়েছিলেন যা এ জাতির কেউ জানে না। গরমের সময় কখনও কখনও বাঘ বা হরিণ পানিতে নেমে শরীর জুড়োতে চায়। তাতেও আছে কত কথা। দর্শকদেরই কেউ কেউ বলেন- নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে, নইলে হঠাৎ পানিতে নামবে কেন? যথাবয়সী একটি সিংহ মারা গিয়েছিলো জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে। বিশেষ মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে আমরা ক’জন ভেটেরিনারিয়ানের সাথে তৎকালীন কেন্দ্রীয় প্রাণিসম্পদ রোগ অনুসন্ধান কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সাব্বির আহমেদের সহযোগিতা ও যোগাযোগ রক্ষার কথা ভুলবোনা। মনিটরিং, ফলোআপ ও সহায়তাসহ আর যা যা এই ধরনের শব্দ আছে সবই ছিলো নিয়ম মাফিক। খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি সিংহটি। ক’দিনে নিস্তেজ হয়ে আসছে সে। মস্তবড় সিংহটি ধীরে ধীরে বিড়ালে পরিণত হচ্ছে। কাছে গিয়ে ছুয়ে দেখলেও কোন সমস্যা নেই। স্যালাইন দেয়া হচ্ছে দু’দিন হলো। শেষ অবস্থা প্রায় এবং যথারীতি মৃত্যুবরণ। পরদিন কাগজে খবর এলো এইভাবেÑ “গতকাল চিড়িয়াখানার মাংশাসী শাখার অমুক সেডের পুরুষ সিংহটি, চিড়িয়াখানার ভেটেরিনারি হাসপাতালে চিকিৎসার দীর্ঘ অর্যন্ত অবহেলা শেষে কাতরাতে কাতরাতে মৃত্যুবরণ করে।” মানুষের চোখে এখন ন্যাশনাল জিওগ্রাফি আর ডিসকভারি চ্যানেলের ছবি। সেই মানুষ আবার দর্শক হয়ে যখন আমাদের জাতীয় চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করে, তখন কিছুটা অবাক হবারই কথা। কিন্তু মানুষের সেই অনুভূতি, অবাক হওয়া আর আবেগকে পুঁজি করে তথাকথিত কিছু সাংবাদিক নামধারী অজ্ঞানতাপুষ্ট এসাইন্ড ম্যান এন্ড ওম্যান যখন এ ধরনের অঘটন ঘটান, যারা তা ঘটাতে সহায়তা দেন এবং যথারীতি ঘটনা ঘটার পর মুরুব্বী সাজেন, তারাও কার বা কাদের দ্বারা এসাইন্ড, জানতে ইচ্ছে করেছে সেদিনও-আজও ইচ্ছে করে। ভাই আসতে পারি? আমার চেম্বারে এক তরুণীর প্রবেশ। হ্যাঁ আসুন। দু’মিনিট পর আপনার সাথে কথা বলবো! মাইক্রোসকোপে কাজ করছিলাম তখন। ইটস ওকে। হ্যাঁ বলুন কি জন্য এসেছেন। অবসর হলে কথাটা বলি। আমার নাম তাহমিনা (ছদ্দনাম)। অমুক কাগজে কাজ করি। আপনার সাথে কিছু কথা বলতে চাই। আপনার আইডি কার্ড আছে? জ্বি আছে। এই যে! আমি তা দেখে ফেরৎ দেই এবং বলি- কিউরেটর স্যারের সাথে কথা বলুন। তিনি আমাকে বল্লে আমি কথা বলতে পারি। উৎপাত মাঝে মাঝে এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, শক্ত স্ট্রাটেজি না নিলে হচ্ছিলোনা যেন। তাছাড়া তা বিধানকেও খর্ব করে না। কিউরেটর স্যারের সাথে কথা বলেছি। তিনি বললেন আপনার সাথে কথা বলতে। একথা শুনে আমি ফোনে স্যারের সাথে কথা বলি। সাধারণ কিছু বিষয়ে স্যার আমাকে কথা বলতে পরামর্শ দেন। তাকে কথা বলার অনুমতি দিলে তিনি বললেন। এ বছর নতুন কি কি প্রাণী আসতে পারে আপনাদের? এ প্রশ্নের জবাবে ক’টা প্রাণীর নাম বলি। শুনলাম একটা বাঘের বাচ্চা হয়েছে। হ্যাঁ ঠিক শুনেছেন। ক’টা বাচ্চা হয়েছে? বলতে চাচ্ছি না। কেন? এ প্রশ্নের উত্তর কিউরেটর স্যার বা সংশ্লিষ্ট সেকশন অফিসার দেবেন। আপনার বলতে অসুবিধা আছে? আমার অসুবিধা নয়। আপনার বুঝতে অসুবিধা হবে। এই ডিটেইলসটা অন্যদিন বলা যাবে। ওরে বাপরে এত্তো ব্যাপার! তরুণীটির ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি। কোন ব্যাপার নেই ম্যাডাম। ব্যাপার হচ্ছে না বুঝতে পারা। আচ্ছা! গত এক বছরে আপনাদের এখানে কতটি প্রাণী মারা গেছে আমাকে একটু বলবেন প্লিজ! আপনার প্রশ্নের ধরন তীর্যকভাবে সরল। তার মানে! মানে খুব সহজ। আপনাকে এখন আসতে হবে। মৃত্যুর যাবতীয় রেকর্ড নিয়মিত উপরে পাঠানো হয়। সেখান থেকে আপনি পারলে সংগ্রহ করবেন। কেন? এজন্য যে, এ প্রশ্নটা আপনার বিশতম প্রশ্ন হতে পারতো। আপনি আসলে কি জানতে এসেছেন তা আমার জানা শেষ। বয়স তো কম হচ্ছে না। কিছু মনে করবেন না। আপনার একটা ভিডিটিং কার্ড পেতে পারি। অবশ্যই! একটা ভিজিটিং কার্ড হাতে দিয়ে তরুণীকে যাবার ইশারা করি। আমি দরজায় দাঁড়ালে তিনি চলে যান। ঘটনা খুব সিম্পল। কিছু কিছু কাগজে থাকা ইল মটিভেটেড গ্রুপের কাজ এটা। মানুষ মরে-প্রাণীও মরে। সারাদিনে সারাদেশে হাসপাতালে, দুর্ঘটনায় কমপক্ষে কয়েক হাজার মানুষ মারা যায় আবার মানুষ জন্মায়। কিন্তু জাতীয় চিড়িয়াখানায় কোন প্রাণীর মরা চলবে না। এরা যুগ যুগ বেঁচে থাকবে। অমর এসব প্রাণীর জীবন ধারা এবং জীবন বৃত্তান্ত না জেনে কালার ফুল মৃত্যুর সংবাদ ছাপানো অনেকের জন্য আবশ্যক বৈকি! আন্তর্জাতিক একটি সু সেমিনারে অংশ নেয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো আমার। সেখানে আমার মতো আরও অনেক সহকর্মীতো বটেই, এদেশীয় অনেকেই শুনেছেন-বিদেশে চিড়িয়াখানায় পশুপাখি অসুস্থ হলে, রীতিমতো জানানো হয় এবং সাংবাদিকরা তার ফলোআপ জনগণকে সঠিকভাবে জানানোর পবিত্র দায়িত্বটি পালন করেন আর আমাদের এখানে যা হয়নি তা, যা হওয়া সম্ভব নয়, যা ছিলনা তা, ইত্যাদি মনের মাধুরী মিশিয়ে অসত্যের বেসাতির মাধ্যমে, বিভ্রান্ত করে সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলার যে গুরুদায়িত্বটি মাঝে মাঝে পালন করেন অনেকে, তাদেরকে কি বলবো? তাই বাঘের তিন-চারটি বাচ্চা হলে ক্যাপটিভিটিতে তার লালন পালন যে কতো কষ্টকর, তা যারা জানেন তারাই বলতে পারেন। এই উপমহাদেশে ক’জন মানুষ আছেন যারা বাঘ নয়, বাঘের বাচ্চা হবার পর সঠিকভাবে বাঁচিয়ে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত লালন পালন করতে পেরেছেন? এছাড়া গত নব্বই দশকের শেষ দিকে ট্রাইপানোসোমিয়াসিস জনিত রোগে ক’টা বাঘ-সিংহের অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু দিয়ে যে ধরনের ন্যাক্কারজনক ভূমিকা পালন করেছে কিছু সাংবাদিক নামধারী মানব ও সংবাদপত্র, তাতে ভবিষ্যতে অন্তত: পঞ্চাশ বছরের জন্য আমার মতো অনেকেরই মন এমনিতেই তেতো হয়ে থাকবে। মানুষের মন বলে কথা যা পশু এবং জানোয়াররাও বোঝে, অনেক সময় মানুষ তা বোঝে না! এসবার তাই চিড়িয়াখানার সকল কর্মকর্তা মিলে তৎকালীন মহাপরিচালকের পরামর্শক্রমে, ক’জন সাংবাদিকের কাছে চিড়িয়াখানার বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে কিছু বৈজ্ঞানিক তথ্য তুলে ধরা হয়। কোন প্রাণীর এদেশের আবহাওয়ায় কতদিন বাঁচে, কোন সেডের বিশেষ কোন প্রাণীটির বয়স এমন কতো এবং বাঁচার সম্ভাবনা কতদিন, আয়ু ফুরিয়ে এসেছে কিনা, ইত্যাদি। এতে কাজ হয়েছিলো কতোটুকু জানি না। মানুষ মানুষের জন্য না হয়ে পশু এবং জানোয়ার সম্পর্কিত সঠিক তথ্যও যে মানুষের জন্য হতে পারে, সেদিন বুঝেছিলাম। (সমাপ্ত) লেখক : ডা. জিয়াউর রহমান সেলিম, জাতীয় চিড়িয়াখানার সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বর্তমানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এনএটিপি-২ প্রকল্পের এসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ