ঢাকা, বুধবার 22 November 2017, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২8, ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ধান চাষ ও উৎপাদন হ্রাসে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকি বাড়ছে

এইচ এম আকতার : কৃষি জমি আর কৃষকের সংখ্যা পাল্লা দিয়ে কমছে। অন্যদিকে ধান উৎপাদনে লোকসান ঠেকাতে সবজি আর মৎস্য চাষের দিকে ঝুঁকছে অথবা অন্য বিকল্প তালাশ করছে দেশের কৃষকরা। এতে করে দেশে ধান উৎপাদন সংকটে পড়ছে। যা অচিরেই অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। গত এক দশকে আগের তুলনায় দ্রুত হারে কমেছে ফসলি জমির পরিমাণ, এটাকে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় একটি হুমকি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত এক দশকে প্রতি বছরে দেশে ফসলি জমির পরিমাণ ৬৮ হাজার ৭০০ হেক্টর করে কমেছে, যা দেশের মোট ফসলি জমির শূন্য দশমিক ৭৩৮ শতাংশ। অথচ তার আগের তিন দশকে প্রতি বছর ফসলি জমি কমেছে মাত্র ১৩ হাজার ৪১২ হেক্টর। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, মসজিদ-মাদরাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা নির্মাণে ব্যবহারের কারণে প্রতিদিনই কমছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। বিভিন্ন অনুসন্ধানে দেখা যায়, দিনে দুই হাজার বিঘা জমি কৃষি থেকে অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। একইভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন ৯৬ বিঘা জলাভূমি। সে সব জলাভূমিও ভরাট করে ভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, তামাক ও চিংড়ি চাষের ফলেও প্রতি বছর ২৪ হাজার বিঘা জমি কৃষিকাজের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে। শহরতলী কিংবা গ্রামে অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণ, নগরায়ন, শিল্পকারখানা নির্মাণ, ইটভাটা তৈরি, পুকুর-দিঘি খনন, মাছ চাষ ও নদী ভাঙনের ফলে ক্রমাগতভাবে প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। জানা গেছে, প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে একজন কৃষকের ব্যয় হয়ে থাকে ২৫ টাকার মত। আর এক কেজি ধানের বাজার মূল্য রয়েছে মাত্র ২০ টাকা। এতে করে প্রতি কেজি ধানে কৃষকের লোকসান হয়ে থাকে ৫ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মণ ধানে কৃষকের লোকসান গুণতে হচ্ছে প্রায় ২০০ টাকা। বন্যা, খড়ার মত প্রকৃতি দুর্যোগ দেখা দিলে পুরোটাই লোকসানের খাতায়। এসব কারণে এখন আর ধান চাষে কৃষকের কোন আগ্রহ নেই। তাছাড়া ধান চাষে কৃষক তেমন কোন ব্যাংকিং ঋণ পায় না। বাধ্য হয়ে বিকল্প কৃষি কাজের দিকে এগুচ্ছে দেশের কৃষকরা। সবজি আর মাৎস্য চাষের দিকে এগুচ্ছেন কৃষকরা। এতে করে তাদের লাভ হয় অনেক বেশি। আর ব্যাংকিং সাপোর্টও বেশি পেয়ে থাকেন। এতে কৃষি জমির পরিমাণও কম লাগে। কম বিনিয়োগে বেশি লাভ হয়ে থাকে। অতিমাত্রায় সবজি আর মৎস্য চাষে আগ্রহী হওয়ার কারণে দেশে প্রতি দিনই খাদ্য সংকট বাড়ছে। এ খাদ্য সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার হিমশিম খাচ্ছে। বাধ্য হয়ে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করছে। অথচ দেশের কৃষকরা যদি ধান চাষে আগ্রহী হতো তাহলে দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে চাল রফতানি করাও সম্ভব হতো। জানা গেছে, সারা বিশে^র মধ্যে সবচেয়ে বেশি খাদ্যের দাম বাংলাদেশে। বিশেষ করে মোটা চালের দাম। যে মোটা চাল অনেক দেশের গরুর খাবার হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে। আর বাংলাদেশে সে খাবারের দাম সবচেয়ে বেশি। এর প্রধান কারণ হলো ধান চাষে সাধারণ কৃষক আগ্রহ হারাচ্ছেন। সরকার শিল্প কারখানা প্রসারে যতটাই না আগ্রহী ধান চাষে ততটাই উদাসিন। আর এ কারণেই দিন দিন খাদ্য সংকট বাড়ছে। এ খাদ্য সংকট আরও প্রকট হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন এ খাতে সরকারকে আরও ভর্তুকি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ধান চাষের ব্যাপারে আরও মনোযোগি হতে হবে। তা না হলে খাদ্য সংকট আরও বাড়বে। মৎস্য চাষ, পোল্ট্রি খামার, হ্যাচারি, গরুর খামার প্রভৃতি কৃষিভিত্তিক প্রকল্পে সহজেই ব্যাংকিং ঋন পাচ্ছে। এতে নানা সুযোগ সুবিধাও রয়েছে। রয়েছে কর আবকাশ সুবিধাও। এসব কারণে বড় ধরনের বিনিয়োগে যাচ্ছেন অনেক শিল্প মালিকরাও। এতে করে লাখ লাখ কৃষকের কর্মসংস্থানও হচ্ছে। এসব কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে শিল্প ঘোষণা করলেও কৃষি কাজকে সরকার নিরুসাহিত করছে। এতে করে সাধারণ চাষিরা ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে সরকার যদি এসব কৃষককে আবার ধান চাষে আনতে না পারে তাহলে দেশের প্রকট খাদ্য সংকট দেখা দেবে। যা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে বলে মনে করে সংশ্লিষ্টরা। এখনও প্রতিবেশি ভারত থেকে আমাদের দেশে বীজ, সার, পানি এবং বিদ্যুতের দাম অনেক বেশি। একইভাবে এখানে শ্রমিকের দামও অনেক বেশি। এখনে মধ্যসত্ত্বভোগীর সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। বেড়েছে পরিবহনের খরচও। এসব মিলিয়ে কৃষিতে ধানের চাষ লোকসান ছাড়া কিছু নয়। অথচ বাংলাদেশের মানুষের একমাত্র প্রধান খাবার হলো ভাত। আর এ ভাত নিয়ে সরকারের আসলেই কোন পরিকল্পনা নেই। সরকার বলছে দেশে চালের চাহিদা রয়েছে ৩ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৪ কোটি মোট্রিক টন ধান। আমদানি হয়ে থাকে আরও প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন চাল। তাহলে দেশে কেন খাদ্য সংকট থাকবে। আসল কথা হলো সরকার জানেনা দেশে কি পরিমান চালের চাহিদা রয়েছে। আর কি পরিমান উৎপাদন হয়ে থাকে। অর্থাৎ চাল নিয়ে সরকারের কোন পরিকল্পনা নেই। আর এ কারণেই দেশে খাদ্য সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। আর সংকট কীভাবে কাটবে কবে কাটবে তা কেউ বলতে পারছে না। আবার আর্থিক অসঙ্গতি ও দুরবস্থার কারণে জমি বিক্রি করে বাস্তুহারা হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা। প্রতিনিয়ত অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে তৈরি হচ্ছে বাসগৃহ, দালান কোঠা, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, দীর্ঘ সেতু ইত্যাদি। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১১ বছরে ২৬ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩১ একর কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে যাওয়ায় কমে গেছে ধান চাষ। বর্তমানে দেশে মোট ভূমির পরিমাণ প্রায় ১৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন হেক্টর। এর মধ্যে ৬৬ দশমিক ৬ শতাংশ জমি কৃষি কাজে ব্যবহার করা হয়, আশঙ্কার বিষয় হলো- দেশে কৃষি জমির পরিমাণ দিন দিন কমছে। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে কৃষি জমি কমে যাচ্ছে তা কিন্তু নয়, সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণেও কমছে কৃষি জমি। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়াও এলএনজি টার্মিনাল, এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর, সাগরে ভাসমান জ¦ালানি তেলের ডিপো ও পাইপলাইন স্থাপন বাবদ আরো প্রায় ছয় হাজার একর জমি অধিগ্রহণের সরকারি সিদ্ধান্ত রয়েছে। কৃষি জমি যে কেউ যে কোনো কাজে ব্যবহার করতে পারেন। এটা নিয়ন্ত্রণের কোনো আইনি ব্যবস্থা নেই। এ জন্য আইন পরিবর্তন করে উর্বর ও কৃষি উপযোগী জমির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা বারবার বলা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো বিধিবিধান করা হয়নি এখন পর্যন্ত। জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০১০ এবং কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন ২০১০ অনুযায়ী কৃষি জমি কৃষিকাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কোনো কৃষি জমি ভরাট করে বাড়িঘর, শিল্পকারখানা ইটভাটা বা অন্য কোনো অকৃষি স্থাপনা কোনোভাবেই নির্মাণ করা যাবে না উল্লেখ করে একটি নামমাত্র আইন থাকলেও এর শাস্তির বিষয়টি স্পষ্ট নয়। পরিকল্পনাহীন নগরায়নের ছোবলে বৈচিত্র্যও হারাচ্ছে কৃষি। ইটভাটার জন্যও প্রতি বছর হাজার হাজার একর আবাদি জমি অনাবাদিতে পরিণত হচ্ছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকায় ধানের জমিতে বাঁধ দিয়ে লোনা পানি প্রবেশ করিয়ে চিংড়ি চাষ হচ্ছে। কোথাও হচ্ছে লবণের উৎপাদন। নানাভাবে কৃষি জমি অনুৎপাদনশীল কর্মকা-ে ব্যবহার চলছে। এ ধরনের অবস্থা ক্রমাগতভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক দশকে দেশে কৃষি জমির ব্যাপক সংকট সৃষ্টি হবে- তা সহজেই ধারণা করা যায়। জনসংখ্যা অনুপাতে চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত কৃষি জমি না থাকলে স্বাভাবিকভাবে দেশে খাদ্য আমদানি হ্রাস পাবে। তখন দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য বিদেশ থেকে খাদ্য উৎপাদন করতে হবে। ফলশ্রুতিতে অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হবে। কৃষি জমি সুরক্ষার জন্য সরকারিভাবে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে। আমাদের অর্থনীতিতে নানা পালাবদল ঘটেছে গত কয়েক দশকে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির দাপট অনেকটা কমে গেছে। সারা বিশ^ যখন খাদ্য উৎপাদনে ব্যস্ত তখন বাংলাদেশ শিল্প প্রম্পাসারণে ব্যস্ততা দেখাচ্ছেন্ আর খাদ্য ক্রয়ের নামে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছেন। সারা বিশে^ অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে টাকা হলে যুদ্ধের জন্য অস্ত্রের কোন ঘাটতি হবে না। একটি দুর্বল দেশ চাইলেই পারমানবিক অস্ত্রও ক্রয় করতে পারবে। কিন্তু টাকা হলেই সে দেশ খাদ্য পাবে না। এ বছর খাদ্য সংকট কাটাতে সরকার সারা বিশ^ চষে বেড়িয়েও চাল পায়নি। ৩০ টাকার চাল ৬৫ টাকায় খেতে হচ্ছে। কিন্তু কিছুই করার ছিলনা সরকার এবং সাধারণ জনগণের। এত কিছুর পরেও সরকার ধান চাষে কেন মনোযোগি হচ্ছে না তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। এক শ্রেণির কর্মকর্তা কমিশন বাণিজ্যের কারণেই দেশের অব্যাহত খাদ্য ঘাটতি চায়। এখন শিল্প ও সেবাভিত্তিক কর্মকা-ের মধ্যে আমাদের অর্থনীতি নতুন ঠিকানা খুঁজছে। কিন্তু দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষিজমির ব্যবস্থা না করে শিল্প ও সেবাভিত্তিক অর্থনীতি টেকসই হবে না- এটা সবাইকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। বর্তমানে উন্নত কৃষি প্রযুক্তি এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির অনুসরণের কারণে খাদ্য উৎপাদন আগের তুলনায় বেড়েছে বটে। বর্তমানে দেশে কোনো খাদ্য সংকট নেই। তবে এ অবস্থা একটানা দীর্ঘদিন বজায় থাকবে না। ক্রমাগত কৃষি জমি ব্যবহারের ফলে এক সময় জমির উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পায়, এ কথা মনে রাখতে হবে সবাইকে। উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়ার পর আমাদের কৃষি উৎপাদন তথা খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। এব্যাপারে জানতে চাইলে সিনিয়র পরিকল্পনা সচিব অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, দেশে ধানের চাষ কমেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ ধান চাষের তুলনায় মৎস্য এবং সবজি চাষে লাভ বেশি। তবে ধান চাসে লোকসান হয় সেটি সঠিক নয়। এ বছর প্রতি মণ ধানের দাম ছিল ৮০০-১০০০ টাকা পর্যন্ত। এবছর ধান চাষ করে কৃষকরা অনেক খুশি। তবে কৃষিকে ভর্তুকি আরও বাড়ানো নিয়ে সরকার চিন্তা ভাবনা করছে। এতে করে ধান চাষে আগ্রহ আরও বাড়বে বলে মনে করেন সরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ