ঢাকা, রোববার 26 November 2017, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২8, ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিশ্বনবী (সা:) এর প্রেমিক যাঁরা

মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম : মহানবী (সা:) এর সাথে মু’মিনের ঈমানী সম্পর্ক। তাঁকে ভালবাসা, তাঁর আদেশ-নিষেধ মান্য করা এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণ করা একজন মু’মিনের অপরিহার্য কর্তব্য। তবে প্রিয় নবী (সা:) এর প্রতি ভালবাসা, তাঁর আদর্শ গ্রহণ করা হতে হবে অকৃত্রিম ও লৌকিকতা মুক্ত। যেমন ভালবেসেছিলেন সাহাবায়ে কিরাম, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ী ও অলীগণ। রবিউল আউয়াল মাস আসলেই মু’মিনের হৃদয়কে নাড়া দেয়। কারণ, এ মাসে পৃথিবীতে আগমন করেছেন নবীকুল শিরোমনী, বিশ্বনবী, দু’জাহানের সর্দার হযরত মুহাম্মদ (সা:)। এ মাসে নবী প্রেমিকরা ইসলামী সংগীত, গজল, মিলাদ মাহফিল, ওয়াজ-নসীহত, মিলাদুন্নবী (সা:), সিরাতুন্নবী (সা:) ইত্যাদি আলোচনার মাধ্যমে প্রিয় নবীকে স্মরণ করে থাকেন। তাঁর প্রেম ভালবাসার যথার্থতা কোন কোন কাজে নিহিত সে সম্পর্কেও জানা আবশ্যক। প্রিয় নবী (সা:) এর খাঁটি প্রেমিকগণ নিম্ন বর্ণিত কাজ সমূহ করে থাকেন।
১. সবকিছুর উপর রাসূলূল্লাহ (সা:) কে প্রাধান্য দেন : আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর হাবীবকে পূর্বের এবং পরের সকল সৃষ্টির উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। রাসূল (সা:) বলেছেলন- আমি আদম সন্তানের সর্দার এতে আমার কোন গর্ব নেই, আমাকে প্রথমে কবর থেকে উঠানো হবে, আমি প্রথম সুপারিশকারী এবং প্রথমে আমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। সুতরাং মুমিনদের কর্তব্য হবে রাসূলূল্লাহ (সা:) কে প্রাধান্য দেয়া। সবকিছুর উপর তাকে স্থান দেয়া। হযরত আবু সুফিয়ান মুসলমান হওয়ার পূর্বে একদা স্বীয় কন্যা উম্মুল মু’মিন হযরত উম্মে হাবিবা (রা:) এর সাথে দেখা করতে মদীনায় আগমন করেন। হযরত আবু সুফিয়ান (রা:) গৃহে গিয়ে রাসূল (সা:) এর বিছানায় বসতে উদ্ধত হলে তার কন্যা তাকে বসতে বারণ করেন। আবু সুফিয়ান বললেন, হে কন্যা! আমার জন্য এ বিছানা উপযুক্ত মনে করছো না, নাকি এ বিছানার জন্য আমাকে উপযুক্ত মনে করছো না। কন্যা বললেন, এটি রাসূলূল্লাহ (সা:) এর বিছানা। আর আপনি হলেন মুশরিক (অপবিত্র)। আল্লাহ্র রাসূলের বিছানায় মুশরিকের বসা আমি পছন্দ করি না। অনুরূপভাবে সাহাবায়ে কিরাম রাসূল (সা:) এর সম্মান, তাঁর কষ্ট লাঘব ও আদেশ-নিষেধ মানার ব্যাপারে সদা পাগল পারা ছিলেন।
২. তাঁর দরূদ পাঠ করেন : (ক) নবী প্রেমিক সদা তাঁর যথাযথ গুণকীর্তণ  করেন, তাঁর প্রতি দরূদ পেশ করেন। ইরশাদ হয়েছে,  অবশ্যই আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, নবীর প্রতি সালাত পেশ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরা তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করো। (সূরা আহযাব-৫৬) আল্লাহ তা’য়ালা এখানে আমরের শব্দ (নির্দেশ মূলক) শব্দ ব্যবহার করেছেন। আমরের (নির্দেশ মূলক) শব্দ ওয়াজিবকে কামনা করে। তাই রাসূল (সা:) বলেছেন, ঐ ব্যক্তি কৃপণ, যার সামনে আমার আলোচনা করা হচ্ছে কিন্তু সে আমার প্রতি দরূদ পড়ে না (তিরমিযী- ৫/৫৫১)। রাসূল (সা:) অন্যত্র বলেছেন- ঐ ব্যক্তির নাক ধূলা মিশ্রিত হোক, যার সামনে আমার আলোচনা করা হয় কিন্তু আমার প্রতি দরূদ পড়ে না (আহমদ)। অনেক ইবাদতে দরূদ শরীফ পড়া হয়। যেমন- নামাযে, খুতবায়, জানাযায়, আযানের পর, দোয়ার সময় ইত্যাদি ক্ষেত্রে।
৩. অধিক হারে তাঁর আলোচনা করেন এবং তাকে দেখার আগ্রহ পোষণ করেন : ইবনে কাইয়েম বলেন, যখন প্রিয় জনের আলোচনা অধিক পরিমাণে করা হয়, তখন সে তার হৃদয়ে হাজির হয়। তাই মু’মিন বান্দাহ প্রিয় নবী (সা:) এর আলোচনা যত বেশী করবে, তার হৃদয়ে মহব্বত তত গভীর হবে।
৪. আদবের সাথে তাঁর আলোচনা করেন : নবী প্রেমিক প্রিয় নবীর নাম ধরে আলোচনা না করে বরং গুণবাচক শব্দ নিয়ে তাঁর আলোচনা করেন। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন রাসূলের আহ্বানকে তোমরা তোমাদের একে অপরকে আহ্বানের মত গণ্য করো না। (সূরা নূর-৬৩) আল্লাহ তাঁর হাবীবকে পরিচয় দানের মাত্র চার জায়গায় ‘মুহাম্মদ’ নাম উল্লেখ করেছেন। এ জায়গাগুলো- সূরা আলে ইমরান-১৪৪, সূরা আহযাব-৪০, সূরা মুহাম্মদ-২, সূরা আল ফাত্হ-২৮। অন্যত্র ময্যাম্মিল, মুদ্দাস্সির, ইয়াছিন ইত্যাদি ছদ্মনামে ডেকেছেন।
৫. তাঁর মসজিদের আদব রক্ষার করে : নবী প্রেমিক তাঁর রাওযার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। সেখানে বাজে কথা বলে না, উচ্চস্বরে আওয়াজ করে না, অন্যকেও আওয়াজ করতে দেয়না। মসজিদে নববীতে দুইজন লোককে কথা বলতে দেখে হযরত ওমর (রা:) তাদেরকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করেন তোমরা কোথাকার লোক্? তারা বলল- তায়েফের। হযরত ওমর (রা:) তখন তাদেরকে বললেন- তোমরা এ শহরের হলে অবশ্যই তোমাদের শাস্তি দিতাম। তোমরা আল্লাহ্র রাসূলের মসজিদে আওয়াজ উচ্চ করছ। (সহীহ্ বুখারী ১/১২০)
৬. তাঁর বাণীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন : যারা বিশ্বনবীর প্রেমিক তাঁরা বাণীকে আদবের সাথে শ্রবণ করেন, হাদীসের পাঠে আদবের সাথে বসেন।  হাদীসের রঙে নিজেকে রঙ্গীন করার চেষ্ট করেন। ইমাম মালেক (র) হাদীসের পাঠ দানের পূর্বে হাদীসের সম্মনার্থে অযু করতেন, উত্তম পোষাক পড়তেন, টুপি পরতেন এবং দাড়ি আঁচড়াতেন।
৭. তাঁর বাণীকে সত্য বলে বিশ্বাস  করেন : ঈমানের মূল হলো- রাসূলূল্লাহ (সা:) এর বাণীকে সত্য বলে বিশ্বাস এবং তিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সম্পর্কে যে সংবাদ দিয়েছেন তা সত্য বলে স্বীকার করা। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন- নক্ষত্রের কসম, যখন অস্তমিত হয়। তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট হননি এবং বিপথগামীও হননি এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। কুরআন অহী, যা প্রত্যাদেশ হয় (সূরা আন-নাজম- ১ -৪)।
৮. রাসূলূল্লাহ (সা:) এর আনুগত্য করেন : রাসূলূল্লাহ (সা:) এর কথা ও কাজ মেনে নেয়ার মূল হলো তার আনুগত্য করা। আল্লাহ তা’য়ালা আনুগত্য প্রসঙ্গে ইরশাদ করেন - যে ব্যক্তি রাসূলের হুকুম মান্য করবে সে আল্লাহ্র হুকুম মান্য করলো। আর যে ব্যক্তি বিমুখতা অবলম্বন করল, আমি আপনাকে তাদের জন্য রক্ষণাবেক্ষণকারী নিযুক্ত করে পাঠাইনি। (সূরা আন্ নিসা- ৮০)। আরো ইরশাদ করেন, বলুন! যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তবে আমার আনুগত্য কর, আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদেরকে ভালবাসবেন (সূরা আল ইমরান-৩১)। অন্যত্র ইরশাদ করেন- আনুগত্য কর আল্লাহ ও রাসূলের (আল ইমরান-১৩২)
৯. রাসূল (সা:) কে সাহায্য সহযোগীতা করেন : রাসূলূল্লাহ (সা) কে সাহায্য করা, তাঁকে হেফাযত করা ইত্যাদি প্রসঙ্গে বহু আয়াত রয়েছে। যেমন- আল্লাহর বাণী এই ধন-সম্পদ দেশত্যাগী নিঃস্বদের জন্যে, যারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টিলাভের অন্বেষণে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্যার্থে নিজেদের বাস্তভিটা ও ধন-সম্পদ থেকে বহিষ্কৃৃত হয়েছে, তারাই সত্যবাদী। (সূরা আল হাশর-৮)। হযরত আবু তালহা (রা) উহুদের যুদ্ধে রাসূলূল্লাহ (সা:) কে ঢাল স্বরূপ হেফাযত করেছেন।
১০. সাহাবায়ে কিরামকে সম্মান করেন : রাসূল (সা:) বলেন- আমার সাহাবীদেরকে গালি দিও না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ ব্যয় কর, তারপরও তাদের সামান্য কাছে যেতে পারবে না। (মুসলিম)। রাসূল (সা:) বলেছেন- আমার প্রত্যেকটি সাহাবী ন্যায়পরায়ণ। স্বয়ং আল্লাহ্ তা’য়ালা তাদের প্রশংসা করেছেন- “অবশ্যই আল্লাহ ঐ সব মু’মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট যারা গাছের নীচে আপনার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছে। তিনি জানেন, তাদের অন্তরে কি রয়েছে। (সূরা আল ফাতহ-১৮)। আল্লাহ তা’য়ালা আরো ইরশাদ করেন- মুহাম্মদ আল্লাহ্র রাসূল এবং তাঁর সহচরগণ কাফেরদের প্রতি বজ্র কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু ও সিজদারত দেখবেন। তাদের মুখমন্ডলে রয়েছে সিজদার চিহ্ন (সূরা: আল ফাতহ- ২৯)।
১১. রাসূল (সা:) এর স্ত্রীদেরকে সম্মান করেন : রাসূল (সা:) এর স্ত্রীগণ হলেন মুমিনদের মাতৃতুল্য। নবী প্রেমিকগণ তাদেরকে অবশ্যই ভালবাসেন। ইমাম মালেক বলেন, যে ব্যক্তি হযরত আবু বকর (রা:) কে গালি দেয়, তাকে বেত্রগাত করা হবে। আর যে ব্যক্তি হযরত আয়েশা (রা:) কে গালি দেবে তাকে হত্যা করা হবে। তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি প্রত্যুত্তরে বলেন- যে তাদেরকে গালি দিল সে কুরআনের খেলাফ করলো। (আস সারেমুল মাসলুল- ৫৭১)। ইবনে কাসীর বলেন- ওলামায়ে কিরাম এ ব্যাপারে একমত যে, কুরআন মজীদের আয়াত নাযিল হওয়ার পরে যে ব্যক্তি হযরত আয়েশা (রা:) কে গালি দেয় সে কাফির। কারণ, সে কুরআনকে বিশ্বাস করে না।
১২. তাঁর সুন্নাতকে হিফাযত করেন : সুন্নাতকে হিফাযত করার অর্থ হলো তাঁর সুন্নাত সমূহকে বিদআত থেকে মুক্ত রাখেন, সুন্নাত অনুযায়ী আমল করেন, পরিবর্তন পরিবর্ধন থেকে মুক্ত রাখেন, হুবহু অন্যের নিকট বর্ণনা করেন। রাসূল (সা:) বলেছেন, আল্লাহ তা’য়ালা ঐ ব্যক্তির চেহারা উজ্জ্বল রাখুন, যিনি আমাদের থেকে শুনে হুবহু অন্যের নিকট পৌঁছে দিয়েছে, অনেক শ্রবণকৃত ব্যক্তি শ্রবণকারী থেকে অধিক সংরক্ষণকারী হয়। রাসূলূল্লাহ (সা:) বলেছেন- আমার কথায় যে ব্যক্তি এসব কথা অন্তর্ভূক্ত করে যা আমার কথা নয় তা প্রত্যাখ্যাত (বুখারী-৩/ ১৬৭)
১৩. তাঁর সুন্নত সমূহ প্রচার করেন : মহানবী (সা:) কে ভালবাসা ও সম্মান করার পূর্ণতা হলো তার সুন্নাত সমূহ প্রচার করার ব্যাপারে আগ্রহী হওয়া। রাসূলূল্লাহ (সা:) বলেছেন- আমার থেকে একটি কথা জানলেও তা অপরের নিকট পৌঁছিয়ে দাও (সহীহ বুখারী- ৩ /১৪৫)। বিদায় হজ্জের ভাষণের সর্বশেষ কথা ছিল- তোমরা যারা উপস্থিত তারা আমার কথাগুলো অনুপস্থিতদেরকে পৌঁছিয়ে দাও। তাঁর এ কথা শুনে আরাফাত মাঠে উপস্থিত সোয়া লক্ষ সাহাবীর অধিকাংশই সমগ্র পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দাওয়াত পৌঁছাতে চলে যান। তাঁর সুন্নত সমূহ প্রচার করা এবং মানুষদের শিখানো তাঁকে ভালবাসার অন্যতম নিদর্শন।
১৪. তাঁকে প্রেরণের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করেন : আল্লাহ তায়ালা দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য রাসূলকে প্রেরণ করেছেন। যেমন, আল্লাহ তা’য়ালার বাণী- তিনি আপন রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীন সহকারে প্রেরণ করেছেন, যেন এ দ্বীনকে অপরাপর দ্বীনের উপর জয়যুক্ত করেন, যদিও মুশরিকরা তা অপ্রীতিকর মনে করে (সূরা তাওবা-৩৩)। অন্যত্র ইরশাদ করেন- তিনি তাঁর রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে একে অন্য সমস্ত দীনের উপর জয়যুক্ত করেন। সত্য প্রতিষ্ঠারূপে আল্লাহই যথেষ্ট (সূরা ফাতহ-২৮)। অতএব, একজন নবী প্রেমিকের প্রধান ও একমাত্র কাজ হল দীনকে বিজয়ী করার নিমিত্তে সদা সক্রিয়ভাবে কাজ করা। যেমনটি করেছেন আমাদের প্রিয় নবীসহ অন্যান্য নবী-রাসূলগণ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ