ঢাকা, রোববার 26 November 2017, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২8, ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ

মনসুর আহমদ : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
মানবীয় আইনের বিরাট ব্যর্থতার উদাহরণ মার্কিন শাসনতন্ত্রের অষ্টাদশ সংশোধনীর মদ্য নিবারণ আইন। উক্ত আইন কার্যকরী করণে মোটামুটি ব্যয়ের পরিমান ছিল ৬৫ কোটি পাউন্ড।  এ ছাড়া উক্ত আইন কার্যকরী করার ব্যাপারে দু’শ ব্যক্তি নিহত, ৫লক্ষ ৩৪ হাজার ৩শত ৩৫ জন কারারুদ্ধ, এক কোটি ষাট লক্ষ পাউ- জরিমানা এবং ৪০ কোটি ৪০ লক্ষ পাউন্ডের মূল্যের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। কিন্তু আইনটি বাস্তবে ব্যথর্ হওয়ায় ১৯৩৩ সালে আইনটি বাতিল করা হয়। (১৩) কিন্তু মদ্য পান নিবারনেরজন্য ধাপে ধাপে অবতীর্ণ ইসলামী আইন দেড় হাজার বছর ধরে চালু রয়েছে। এ ভাবে মানবীয় আইনের মোকাবেলায় খোদায়ী আইনের সার্থকতার প্রচুর উদাহরণ পেশ করা যেতে পারে। যা প্রমাণ করে যে আইন প্রণয়নকারী হিসেবে রসুল (সা.)-ই বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি।
আইন প্রণয়নকারী হিসেবে রসুলের মর্যাদা গোটা বিশ্বের ও সমগ্র কালের যে কোন আইনপ্রনয়ন কারী ব্যক্তি বা সংস্থার ঊর্ধ্বে। আইনের উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত বা সমাজগত ভাবে মানবের কল্যাণ সাধন করা। ইসলামী আইন মানবকল্যণকে শুধুমাত্র ইহলোকেই সীমাবদ্ধ রাখতের  চায় না। এ ব্যাপারে কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, “ আল্লাহর তরফ থেকে তোমাদের নিকট এক নূরও স্পষ্ট কিতাব এসেছে। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায় এর দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন” (মায়েদা) ইসলামী আইনের চিরন্তনতা ও ব্যাপকতা স্থান-কালের সীমার ঊর্ধ্বে। ইসলাম ও ইসলামী রাষ্ট্র তামাম দুনিয়ার কল্যাণেই নিয়োজিত। আইনের বা রাষ্ট্রের এই বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর দ্বিতীয় কোন রাষ্ট্র, ধর্ম বা ব্যক্তিতে নেই; যে কারণেই ইসলামী আইন প্রণয়নে রসুলের মর্যাদা সমগ্র আইন প্রণয়নকারী সংস্থার ঊর্ধ্বে।
আল্লাহ্র নির্দেশেই রাসূল (সা.) প্রতিষ্ঠা করেন আল্লাহর আইনানুগ সরকার। এই আইনানুগ সরকার প্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন স্বয়ং রাসূল (সা.)। ইসলামকে সার্বজনীন ভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য এ রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা হয়। নিজ প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে রাসূল (সা.) নিজকে ঘোষণা দেননি বা বা জনসাধারণ নির্বাচন করে তাঁকে রাষ্ট্রপ্রধান বানান নি। তিনি ছিলেন আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নিয়োগকৃত রাষ্ট্রপ্রধান। তাঁর রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদা রেসালতের মর্যাদা থেকে আলাদা নয়। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রসুলের আনুগত্য প্রকারন্তরে আল্লাহরই আনুগত্য। যে কারণে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাসূলের আনুগত্য অস্বীকার করা বাস্তবে ইসলাম থেকে বহিষ্কার হয়ে যাওয়া। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন মর্যাদার অধিকারী রাষ্ট্রপ্রধান দ্বিতীয় কেউ নেই।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাসূল (সা.)- এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি প্রশাসনিক জবাবদিহিতার প্রচলন। আধুনিক কালে সরকারী কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণের ফলে সরকারী প্রশাসক তথা আমলাদের সংখ্যাই কেবল নয়, তাদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির ব্যাপক প্রসার ঘচেছে। সাথে সাথে প্রশাসকদের কর্মকা-ের বিষয়ে দায়িত্বশীলতার প্রশ্নটিও অত্যন্ত জরুরি হয়ে দেখা  দিয়েছে। আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার স্বার্থেই প্রশাসনিক জবাবদিহিতার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রায়  দেড় হাজা বছর পূর্বে এই প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও তা অর্জনের উপায় সম্পর্কে রাসূল (সা.) মৌলিক তত্ত্ব প্রদান করেছে।সে তত্ত্ব বর্তমান প্রশাসনিক  জবাবদিহিতা অর্জনের উপায় হিসেবে রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা Political Accountability আইনগত দায়িত্বশীলতা Legal Accountability ও পেশাগত দায়িত্বশীলতা Professonal Accountability সমূহের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। (১৪) এই জবাবদিহিতা (Accountability) যা একটি রাষ্ট সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনার  জন্য একান্ত প্রয়োজন সে সম্পর্কে সম্পর্কে রসুল (সা.) বহু শতাব্দী আগে ঘোষণা করেন, “আলা কুল্লুকুম রায়েন ওয়া কুল্লুকুম মাস্উলুন আন রাইয়াতিহি”- তোরা জেনে রেখ যে, তোমাদের প্রত্যেকেই একজন রক্ষক বা রাখাল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে তার অধীনস্থ ব্যক্তিদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। অতএব যিনি নেতা এবং মানুষের উপরে নেতৃত্ব করছেন তাকে তার অধীনস্থ লোকদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। পুরুষ তার পরিবারের সদস্যদের উপরে কর্তৃত্ব করে, সুতরাং তাকে পরিবারের অধীনস্থ লোকদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। স্ত্রী হচ্ছেন গৃহের কর্ত্রী, এবং সন্তানদের দায়িত্বশীলা, সুতরাং তাকে এদের সকলের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। (১৪) রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে এই জবাবদিহিতার চর্চা রসুলের সর্বোত্তম রাষ্ট্র নায়কের বৈশিষ্ট্যের প্রমান। সুষ্ঠু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এই জবাবদিহিতার চর্চা বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
ইনসাফ ও ন্যায়নীতির প্রতিষ্ঠার সর্বোত্তম আদর্শ রসুল (সা.)। পৃথিবীর কোন রাষ্ট্রপ্রধানই এমন সুন্দর ভাবে ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার উদাহরণ পেশ করতে পারবে না। বর্তমান কালের বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রশাসকগণ ইনসাফও ন্যায়নীাত প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা ও দাবি করেন কিন্তু নিজেরা ন্যায়নীতি পালনে প্রস্তুত নন। যে কারণে আজ বিশ্বময় ন্যায়নীতির এমন বিপর্যয়।
ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠায় তাঁর সফলতার পিছনে যে বিষয়টি বর্তমান ছিল তা হল খোদা ভীতি ও আখেরতের প্রতি বিশ্বাস। বর্তমান কালে আইনের পেছনে যে সার্বভৌমের কল্পনা করা হয় তার অস্তিত্ব সাময়িক ও ইজগতের সথে সম্প্রক্ত। রসুল (সা.) ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য ইহলৌকিক বিশাল আয়োজনের সাথে পরকালের প্রতি গভীর প্রত্যয় বোধ সংযোজন কিেছলেন  যে কারণে বিশ্বময় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমান কালের রাষ্ট্র প্রধানগণ যদি প্রশাসনকে পারলৌকিক বিশ্বাস উদ্ভুত রুচি বোধের উপর প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন তবে প্রশাসন ক্ষেত্র থেকে অন্যায়, দুর্ণীতি দূর হবে এবং রাষ্ট্র কল্যাণময় রূপ লাভ করবে।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাসূল (সা.) সার্ববৌমত্বের যে ধারণার উপরে আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রশাসন কার্য প্রতিষ্ঠিত করেন তা- ই বিশ্ববাসীর জন্য মঙ্গলময়। তিনি আসমানী বিধান হিসেবে শরিয়তের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। যার ফলে কোন রাষ্ট্র জনগোষ্ঠীর সমর্থন থাকা সত্ত্বেও ইসলাম বিঘোষিত ন্যায় বিচার ও অধিকারের পথে বাধা সৃষ্টিকারী কোন মতামত ইসলাম সমর্থন করে না। এক জাতি অন্য জাতির স্বার্থ নষ্ট করতে পারে না। বা অন্য জাতির কল্যাণ উপেক্ষা করে কোন জাতি তাদের আইন প্রয়োগ করতে পারে না। অনুরূপ ভাবে সংখ্যাগরিষঠ দল অন্যায় ভাবে সংখ্যালঘিষ্ট দলের স্বার্থ বিরোধী আইন প্রণয়ন করতে পারে না যদিও তা সাধারণ ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ বলে গন্য করা হয়। রাসূলের সার্বভৌমত্বে ধারণা ব্যাপক ভাবে বিশ্বমানবের কল্যাণের সাথে জড়িত। তাই বর্তমান অশান্ত বিশ্বের প্রয়োজন রসুলের সার্বভৌমত্ব গ্রহণ করা।
শুধু আইনের মূলনীতি প্রণয়নই নয় বরং রসুল (সা.) রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মদীনায় ইহুদী ও পৌত্তলিকদের সাথে যে চুক্তি করে ছিলেন তা ছিল শান্তি প্রতিষ্ঠায় সকলের কল্যাণ ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য ইতিহাসে প্রথম রাষ্ট্র ভিত্তিক চুক্তি।  প্রকৃত পক্ষে এ চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমেই মুসলমানরা একটি আলাদা জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং একটি ইসলামী রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়।
মদীনার এ চুক্তি ছিল একটি মূল্যবান আন্তর্জাতিক চুক্তি। এ চুক্তি অনুযায়ী মুসলমানর ভিন্ন ধর্মাবলম্বী রাষ্ট্রের সাথে জোট ভুক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠা করে আধুনিক কালের লীগ অব নেশনস। এ চুক্তি সম্পাদন করে রসুল (সা.) একটি সার্বজনীন নীতি প্রতিষ্ঠিত করার পথ সুগম করে ছিলেন। এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি নয়া ভিত্তি স্থাপন করেন। (১৫) আধুনিক রাষ্ট্র নায়কদের জন্য এতে রয়েছে এক বিরাট আদর্শ। রাসুলের সম্পাদিত চুক্তি ভালকরে করলে দেখতে  পাওয়া যাবে যে এ চুক্তির মধ্যে ছিল একটি সুনির্দিষ্ট মহৎ উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য হল স্বাধীন ভাবে ধর্মমত প্রচার এবং শান্তিপূর্ণ ভাবে ধর্মপালন করার অধিকার প্রতিষ্ঠা। এ ভাবেই তিনি সর্বকালের রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য রখে গেলেন স্থায়ী বিশ্বশান্তিপ্রতিষ্ঠার নীতি ও উদাহরণ।
রাসূলের শান্তি চুক্তির উদ্দেশ্য এই নয় যে, বিজিত জাতিকে চিরদিন অধীনস্ত রাখা, বঞ্চিত রাখা এবং তাদেরকে অপমানিতক রা।বরং ইসলামে শান্তি চুক্তির অর্থ হচ্ছে শত্রু বা বন্ধু উভয়ের জন্যই ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাসূল (সা.) যে সমস্ত চুক্তি পরিচালনা করেছিলেন তার উদ্দেশ্য ছিল ন্যায় বিচার ও সাম্যের প্রতিষ্ঠা করা এবং স্বৈরাচার দমন করা। আধুনিক বিশ্বনেতৃবৃন্দ দাবি করেন যে, যুদ্ধের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল  ন্যায় বিচার, সাম্য প্রতিষ্ঠা এবং স্বৈরাচার দমন। কিন্তু তাদের এ দাবি আল্লাহর প্রাতি বিশ্বাসের  শক্তিতে বলীয়ান নয়, যে কারণে ইউরোপীয় শক্তি সমূহের ১৮৭০ সালের যুদ্ধ, ১৯১৪ সালের যুদ্ধ এবং  ১৯৩৪ সালের যুদ্ধের  কারণ হতো না। 
চুক্তি প্রণয়নই নয়, চুক্তির কার্যকারীতা রক্ষার বিরাট আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন রসুল (সা.)। চুক্তি সম্পাদন করার পর তার শর্তাবলী ভঙ্গ করা অশান্তির কারণ। নিজ স্বার্থের বিপক্ষে  চুক্তির শর্তাবলী যতই ক্ষতিকর হোক না কেন তা ভঙ্গ করা অন্যায়। এ সত্য প্রতিষ্ঠায় সন্ধির মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে আবু জান্দালকে রসুল (সা.) শত্রুদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আর এ ভাবেই তিনি উত্তম রাষ্ট্রপ্রধানের আদর্শ হিসেবে সন্ধির মূল প্রতিশ্রুতি পালন  করলেন শত অসুবিধা ও বেদনা থাকা সত্ত্বেও। রসুলের  হোদায়বিয়ার চুক্তি ও বিভিন্ন চুক্তির অনুসরণই বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন জাতির মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রেরণার উৎস হতে পারে। 
একজন উত্তম রাষ্ট্র নায়ক হিসেবে রসুলের আইন প্রয়োগ নীতি সর্ব কালের জন্য উত্তম আদর্শ। আইনের ক্ষেত্রে তিনি ধীরে ধীরে উন্নয়নে পথে অগ্রসর হয়েছিলেন। প্রথমে তিনি মানুষের মনে ইসলামের মর্মবাণী পৌঁছাবার ও তা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালিয়ে ছিলেন।  পরবর্তী কালে মদীনায় তিনি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ধীরে ধীরে জাহেলিয়াতে যুগের আইন সমূহ পরিবর্তন করে তদস্থলে ইসলামী আইন স্থাপন করেন। যেমন উত্তরাধিকারী আইন  তৃতীয় হিজরীতে, বিবাহ ও তালাকের আইন সপ্তম হিজরীতে, ফৌজদারী আইন অষ্টম হিজরীতে এবং সূদ সম্পর্কিত আইন নবম হিজরীতে পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। রাসূলের আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ ছিল মানুষের নির্ভেজাল কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যে, সে কারণে ইসলামী আইন বাস্তবায়নে শাসক ও শাসিতের মাঝে কখনই জটিলতা সৃষ্টি হয়নি।
ইসলামী আইন কতিপয় আদেশ নিষেধের স্বেচ্ছচার নয়, বরং মানুষের অধিকার ও কর্তব্য বর্ণনা ও তা প্রতিষ্ঠা ইসলামী আইনের লক্ষ্য। এ লক্ষ্য হাসিলের উদ্দেশ্যে পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে তিনি সমাজকে এমন নৈতিক প্রশিক্ষণ প্রদান করলেন যেন সব মানুষ খোদার কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতিতে বিনম্র হয়। তাদের রুচি ও সংস্কৃতি গড়ে উঠল পরকালের গভীর প্রত্যয় বোধের উপরে। ফলে ইসলামী আইন সহজ ভাবে সমাজ কর্তৃক গৃহিত হল।
আইন প্রণয়নের পূর্বে একটি জাতির মাঝে আইন গ্রহণের এমন মনোবৃত্তির নজির সৃষ্টি পৃথিবীর কোন রাষ্ট্রপ্রধানের নেই। পৃৃথিবীতে আইনের প্রতি উপেক্ষা গ্রহণের অনীহা ও আইন ভঙ্গের প্রবণতা আজ চরমে উপনীত, কারণ অইন গ্রহণের ফলে ব্যক্তি -সমাজে কল্যাণ ও মঙ্গল সৃষ্টির প্রতি মানব মনের সন্দেহ। যে কারণে যতই সুন্দর আইন প্রণয়ন হোক না কেন আইনের ফাঁক দিয়ে বেঁচে যাবার চতুরতা অবলম্বন মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা ও সামাজিক সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইন বাস্তবায়নে আজ তাই রাসূলের আদর্শে মানব মনোভাব প্রস্তুত করা প্রয়োজন।
রাসূল (সা.) একদিকে যেমন ছিলেন আইন প্রণয়নকারী, প্রয়োগকারী সার্বভৌম সত্তা, অন্যদিকে ছিলেন আইনের ব্যাখ্যাকারী আদর্শ বিচারক। বিচারকের অবহেলা দুর্বলতার কারণে আইন বর্তমান থাকা সত্ত্বেও আইনের সুফল থেকে সমাজ বঞ্চিত হয়। ন্যায় বিচার আইনকে মহামান্বিত করে তোলে। রসুল (সা.) ছিলেন ন্যায় বিচারকের সর্বোত্তম আদর্শ।  আল্লাহর ঘোষণায় প্রতিফলিত হয়েছে বিচারক হিসেবে রসুলের চরিত্র। আল্লাহর বাণী -“হে মুমিনগণ ! “তোমরা ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকারী হও। যদিও তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে অথবা তোমাদের পিতামাতা ও আত্মীয় স্বজনদের বিরুদ্ধে কোন বিরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। তবুও যে কোন মূল্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা কর”। আল্লাহর এ ঘোষণা বাস্তবায়নে অত্যুজ্জ্বল আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন রাসূল (সা.)। বিশর নামে এক মুসলমানের বিরুদ্ধে জনৈক ইহুদীর
বিচার প্রার্থনা ও বিচারের রায় ইহুদীর পক্ষে প্রদান, চুরির অপরাধে সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীকে অব্যাহতি প্রদানে  অস্বীকৃতি এবং এ ধরনের অসংখ্য ন্যা য় বিচার প্রতিষ্ঠার উদাহরণ রয়েছে রসুলের জীবনে। মদীনায় হিজরতের পর জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলে সম্মিলিত ভাবে রসুলকে বিচারক হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তাঁর সামনে সকল ধরনের মোকাদ্দমা পেশ করা হতো। তিনি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী রায় প্রদান করতেন যা সকলে বিনায়বনত চিত্তে  মেনে নিত।
একটি জাতির অশান্তির অন্যতম কারণ জাতির মধ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত না থাকা । ন্যায় বিচারের অবর্তমানে জাতির নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে, কর্তৃত্ব লোপ পায়। এ ব্যাপারে রসুল (সা.)-এর বাণী স্মরণীয়। তিনি ফরমান-“যত দিন কোরায়েশগণ ক্ষমা প্রার্থীকে ক্ষমা করবে, ন্যায়বিচার প্রার্থীর প্রতি সুবিচার করা হবে, তত দিন পর্যন্ত তারা খেলাফত ও নেতৃেত্বর উপর যুক্ত বলে বিবেচিত হবে এবং খেলাফত ও নেতৃত্ব  তাদের মাঝে থাকবে। পক্ষান্তরে  যখন তারা ক্ষমা প্রার্থীর প্রতি ক্ষমা ও বিচার প্রার্থীর প্রতি সুবিচার পরিহার করবে, তখন তাদের প্রতি আল্লাহর ও ফেরেশতাদের অভিশাপ পতিত হবে। ” রসুলের এ হাদিস সে কালের এবং কোরায়েশদের জন্যই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সমস্ত কালের সমস্ত মানুষের জন্য একই সত্য - সুবিচার সমাজের কল্যাণ ও তার স্থায়িত্বের জন্য মূল শর্ত।
বিচার প্রার্থীদের উপরে অত্যন্ত মহব্বতের দৃষ্টিতে বিচার ফায়সালা করাই ছিল রসুলের নীতি। প্রতিশোধ, হিংসা বা ঘৃণা নয়, বরং অন্তরে একটি পবিত্র মমতা বোধ নিয়ে বিচার প্রার্থীদেরকে ফয়সালা প্রদান  ন্যায় বিচারের দাবি। হজরত মায়েয বিন মালেক (রা.) এবং আযদ্ বংশের গামেদী গোত্রের মহিলার বিচার এবং তাদের ব্যাপারে রসুলের মন্তব্য শ্রদ্ধাভরে সকল বিচারকের স্মরণ করা প্রয়োজন। (১৬)
বিচারের নামে প্রহসন নয়, বরং মামলার বিষয়টি পুংঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বিশ্লেষণ, উপযুক্ত সাক্ষ্য গ্রহণ, নিরপেক্ষ ভাবে প্রজ্ঞা ও বিবেকের প্রয়োগ সুষ্ঠু ও ন্যায় বিচারের শর্ত।  রসুল (সা.) এ  বিষয় গুলোর উপরে তীক্ষè দৃষ্টি রেখে বিচার ফায়সালা করেছেন এবং সমস্ত বিচারক যেন এ গুলো মেনে চলে তার প্রতি জোর তাগিদ দিয়েছেন। রসুল (সা. ) ইরশাদ করেন, “বিচারক যদি সত্য নির্ধারণে, ন্যায়ের উদ্ধার কল্পে তার সর্ব শক্তি নিয়োগ করেন, তার চেষ্টায় এতটুকু ত্রুটি না করেন এবং যথার্থ সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে রায় দেন, তবে আল্লাহ রব্বুল আ’লামীনের দরবারে তিনি সাধারণ মুসলমান অপেক্ষা দ্বিগুণ পুরস্কার লাভ করবেন।”
রাসূল (সা.) আরও ফরমান, “বিচারক তিন প্রকার। তার মধ্যে দুই প্রকারই নারকীয়, শুধু এক প্রকার স্বর্গীয়। যারা জেনে শুনে অন্যায় অবিচার করে, প্রকৃত সত্যর বিরূদ্ধে রায় দেয়, তারা উভয়ই দোজখী। আর যে ন্যায় বিচারক, যে সত্য ও ন্যায়কে উপলব্ধি করে, ন্যায়ভিত্তিক রায় দেয় সে বেহেশতী। ( ১৭)
ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা রসুলের আগমনের লক্ষ্য। তিনি এক শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছেন। ইসলামী বিধানের উদ্দেশ্যই হল মানুষকে সৎ পথে পরিচালিত করা। যখন কোন অবাধ্য ব্যক্তি বা জাতিকে শিক্ষা দীক্ষা, তালিম তরবিয়ত, ওয়াজ নসীহত দ্বারা সত্য ও ন্যায়পথে পরিচালিত করা সম্ভব হবে না, তখন তাদেরকে প্রশাসনিক আইন অনুসারে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করে সৎপথে আসতে বাধ্য করা হবে। দুষ্টু ও অবাধ্য লোকেরা যখন ন্যায়নীতিকে পদদলিত করে নিজেরা ন্যায়নীতির উপরে চলবে না এবং অন্যদেরকে ন্যায় নীতির উপর স্থির থাকতে দেবে না, তখন তাদেরকে দমন করার জন্য অইনের শাসন ও উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা অপরিহার্য।
আইনের শাসন পৃথিবীতে বর্তমানে নেই বললেই চলে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে আইন প্রণয়নের জন্য সৃষ্টি করা হচ্ছে সংসদ। সংসদ কর্তৃৃক রচিত আইন রাষ্ট্রে কার্যকরী করার জন্য রয়েছে সরকারের বিরাট প্রশাসন যন্ত্র।
আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের বিপুল আয়োজন থাকা সত্ত্বেও সমাজ থেকে অন্যায় অবিচার শেষ হয়নি;কারণ ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার করার জন্য প্রয়োজন শাসক ও শাসিত ও সমগ্র জনগণের পরকালের প্রতি গভীর বিশ্বাস। পরকাল বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে একটি জাতির রুচি ও সংস্কৃতি গড়ে  উঠলে সেখানে আইনের শাসন সুষ্ঠু ও সুন্দর ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
আইনবেত্তা ও সমাজ সচেতন ব্যক্তিগণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে রসুলের আনীত পয়গাম সম্পর্কে চিন্তা করলে স্পষ্ট ভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন যে আইন ও দ-দান করেই পৃথিবীতে কখনো শান্তি ও নিরাপত্তা অর্জিত হয়নি, এবং ভবিষ্যতেও হবে না। একমাত্র খোদা ভীতি ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস ভিত্তিক আইনের প্রয়োগই বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদানের যোগ্যতা রাখে।  একটি রাষ্ট্রের শাসক ও শাসিত, প্রশাসক -প্রজা সকলে যখন রাসূল (সা.) প্রদত্ত খোদায়ী আইনকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে গ্রহণ করবে, তখনই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। আমাদের আজ তাই বড়ই প্রয়োজন রসুলকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা। (সমাপ্ত)
তথ্য সূত্র :
সূরা মুল্ক- আয়াত-৩
সূরা দাহর- আয়াত-৩ 
স্যার আবদুর রহীম-এর ইসলামী আইনতত্ত্ব
ইসলামী আইন- গাজী শামসুর রহমান
গ্রোটিয়াস: De JureBelli Ac Pacis, Book  I
উদ্ধৃত:
রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাস,  নির্মলকুমার সেন।  (পৃঃ ১৪৭)
রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাস,  নির্মলকুমার সেন।
ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ- মজিদ কাদ্দুরী
সুন্নতে রসুলের আইনগত মর্যাদা- সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী
মেশকাত শরীফ- হাদিস নং-৪৪৪০
Roussau:Scial Contract, রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাস,  নির্মল কুমার সেন।
নীতি বিজ্ঞানের মূল কথা- ড. এম হুদা
ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব-সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী
লোক প্রশাসনের রূপরেখা- ড. মুহম্মদ আবদুল ওয়দুদ ভূঁইয়া
 বোখারী; মুসলিম
 মহানবীর শাশ্বত পয়গাম- আবদুর রহমান আয্যাম
 মেশকাত - কিতাবুল হদুদ
 মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় রসূল মুহম্মদ (সা.) - মওলানা মুহম্মদ  আমিনুল ইসলাম

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ